মা - জসিম মল্লিক

October 20, 2010, 9:32 AM, Hits: 2870

মা - জসিম মল্লিক

১.

সেটা ছিল এক বর্ষনমুখর দিন। কী প্রবল বৃষ্টি। ধর্ষকামী প্রমাদের মতো বৃষ্টির রিরংসা। ঝড়ও কী ছিল সেদিন বাতাসে! গাছেরা হেলে পরছিল ঘরের চালার উপর। কয়েকটা কাক আমরা গাছের ডালে বসে অবিরাম কা কা রব করছিল। কাকগুলো কেনো এমন অলুক্ষুনে ডাক ডাকছে! এই অসময়ে এত বৃষ্টিইবা কোনো!  প্রকৃতির মধ্যে একটা স্তব্দতা নেমে এসেছে। পাখির কলতান থেমে গেছে। এরই মধ্যে ছোট্ট একটি ঘর। সেই ঘরে একজন মানুষ শুয়ে আছেন। আসলে ঘুমিয়ে আছেন। যে ঘুম কখনো ভাঙ্গেনা। আহা কী শান্তির ঘুম! মুখে হাসি লেগে আছে। একটু আগেই তিনি তার ৮৬ বছর জীবনের ইতি টেনেছেন। এই বাড়িতেই পার করেছেন জীবনের ৭১টি বছর। পনেরো বছর বয়সে বধু হয়ে এসেছিলেন। তারপর অনেক লড়াই সংগ্রাম। একটু আগেই সব শেষ হয়েছে। ..ঘুমিয়ে গেছে শ্রান্ত হয়ে আমার গানের বুলবুলি..। বৃষ্টির ঝরোকা চারদিকে ছাপিয়ে পরছে। এর মধ্যে যিনি ঘুমিয়ে আছেন তিনি আমার মা।

মা - জসিম মল্লিক
আমাদের  সবচেয়ে বড় দুর্বলতার নাম হচ্ছে ’মা’। আমি সবসময় মনে মনে ভাবতাম আমার মা কোনোদিন আমাকে ছেড়ে যাবেন না। কোনোদিন না। গেলে সেটা আমি মেনে নেবো না। এ নিয়ে মায়ের সাথে আমার ঝগড়া হতো। বয়স হয়ে গেলে মানুষের কথা বলার ঝোঁক বেড়ে যায়। ইদানিং কথা বলতে গিয়ে মা তাল হারিয়ে ফেলতেন। একটার সঙ্গে আরেকটার কোনো মিল নেই। আবোল-তাবোল, অর্থহীন পুরোনো দিনের কথা বলতে বলতে ভুল হয়ে যায়, এক কথা থেকে পারস্পর্যহীন আর এক কথা এসে পড়ে, কখনো ভবিষ্যৎ চাকরি, ছেলে-মেয়ে কিংবা রোগা হয়ে যাওয়া চেহারার কথা বলতে বলতে সম্পূর্ণ অবাস্তব জগতে চলে যায় মা। বলে, একটা বাড়ি করবি, আমি দেখে যেতে চাই তুই কিছু করেছিস। পুরো তেরো কাঠা জমির ঘেরওয়ালা, ছটা আম, চারটে কাঁঠাল, একটা আমড়া, সজনে, দশটা সুপারি আর দশটা নারকেল গাছ লাগাবি। গোয়ালঘরের চালের ওপর লকলকিয়ে উঠবে লাউডগা। কোনো সুদূর ছেলেবেলায় দেখা পুরোনো ছবিটাকে মা আবার টেনে এনে দূর ভবিষ্যতের গায়ে টাঙিয়ে রাখছেন।


এভাবেই এগিয়ে যাচ্ছে মা ধীর পায়ে মৃতুøর দিকে। দীর্ঘ সব ঘুমহীন রাত জেগে ভাবতে ভাবতে মায়ের মনে সব অতীত ভবিষ্যৎ গুলিয়ে ওঠে, জট পাকায়। বুদ্ধুদের মতোই তখন মার মুখে কথা ভেসে ওঠে। কথা বলতে বলতে আস্তে আস্তে হাল্কা হয়ে যায় মায়ের মন, আর তখন এসব একা একা দীর্ঘ দিনরাত্রিগুলোকে আর একটু সহনীয় মনে হয় মার।

২.

সেই দৃশ্যগুলোর আর জন্ম হবে না কোনোদিন। ঢাকা থেকে  স্টীমার রকেটটি ভোঁ দিয়ে যখন বরিশাল ঘাটে থামতো তখনও রয়ে যেতো অন্ধকার। পনেরো মিনিটের মাত্র রিকশা পথ। মনে হয় পথ আর ফুরোয় না। আকাশভরা তারা, তার পূবদিকে আকাশের রঙ ময়ূরের গলার মতো রঙিন। সামান্য ঠান্ডা অনুভূতি হয় ভোরের সকালে। সেই হিম ধুয়ে দেয় বাতাসকে। বাতাস এখন বড় শীতল, বড় উদার। একটু পরেই এক অপার্থিব দৃশ্যের অবতারণা হবে। এই একটি মুহূর্তের জন্যে এক বছরের অপেক্ষা থাকে মায়ের। ঘরের সামনে যখন রিকশাটা থামে, দেখা যাবে মাথায় ঘোমটা টানা ছোট্ট বুড়িয়ে যাওয়া মানুষটি দাঁড়িয়ে আছে। নিদ্রাহীন চোখে ক্লান্তির ছাপ। আমাকে জড়িয়ে ধরেন। গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে পাগলের মতো আদর করতে থাকেন। তারপর বাচ্চাদের মতো লুকিয়ে কাঁদেন, অন্য কেউ টের না পায়। আমি হচ্ছি মায়ের ছোট সন্তান, যাকে মা কখনোই ভালোমতো কাছে পাননি। আর কী পাবেন?  মায়ের শূন্য কোলকে আমি ভরিয়ে তুলতে পারিনি। কিছুই শেষ পর্যন্ত আমার হয় না। সব কেমন যেন একদিন হারায়।

বাড়িতে গেলে যে ক’টা দিন মায়ের কাছে থাকতাম, মা কেবল গল্প করতো। নদী, নৌকা আর গাছগাছালির গল্প। মায়ের হাতে জাদু ছিল। মাটি কথা বলতো মায়ের সঙ্গে। যা কিছু মায়ের হাতে রোপণ করা হতো তাই লকলকিয়ে উঠতো। মাছ, ধান আর পিঠে-পায়েসের গল্প। একঘেঁয়ে, তবু কান পেতে শুনি আমি। ছোটবেলায় যখন বছরে দু-তিন মাস মায়ের সঙ্গে মামা বাড়িতে থাকতাম, তখন নদী, নৌকো, মাছ আর ধান আমার অস্তিত্বের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল। এখন সেসব গল্প করে মা, মায়ের গলায় জল-মাটির নোনা আর সোঁদা গন্ধ বাতাসে ছড়িয়ে যায়। তবু সবকিছু ছাপিয়ে ওঠে সেই পিঁপড়ার কামড়, শেষ রাত্রির আবছায়ায় ঘুম ও স্তব্ধতার মধ্যে এক ”অলৌকিক নিরুদ্দেশ যাত্রা”।

রাত বাড়তে থাকলে মায়ের সঙ্গে আমার কথা জমে ওঠে। মা অপেক্ষায় থাকেন কখন আমি আড্ডা সেরে ঘরে ফিরবো, কখন আমাকে একা পাওয়া যাবে। অদ্ভুতভাবে মা তাকিয়ে থাকেন ঘোলা চোখে আমার দিকে। ভাবেন এই কি আমার সন্তান? আমি কি একে চিনি ভালোমতো? একদিন ছোটবেলায় মা আমাকে অদ্ভুত একটি প্রশ্ন করেছিলেন! তুমি তো কখনো আমার কাছে কিছু চাও না, কারণটা কী? আমি লাজুক হেসে বলেছিলাম, আমি তো আপনার ছেলে, চাইতে হবে কেনো! আপনি কি বোঝেন না সন্তানের প্রয়োজন? মা তখন বলেছিলেন, ’সন্তান না কানলে মায়েও দুধ দেয় না’। খুব মনে পড়ে মায়ের সেসব কথা। আর মা আমাকে এসব বলবেন না।

ছোটবেলায় মা সবসময় সততা আর আদর্শের কথাই বলেছেন। অন্যকে আঘাত না করার কথা বলেছেন। একজন নিরক্ষর মানুষ হয়েও এতখানি ধৈর্য, সহনশীলতা আর মানবতা আমি খুব বেশি মানুষের দেখিনি। খুব শৈশবে পিতৃহীন হওয়ার কারণে আমার মা অসম্ভব এক যুদ্ধের ময়দানে লড়াই করে গেছেন সারাটা জীবন।

৩.

মা আর ফিরবেন না! কখনই না! যে যায় সে আর ফেরে না! এ বছর  ২০ মার্চ মায়ের সাথে আমার শেষ দেখা হয়। কখনও চেতন কখনও অবচেতনে ছিলেন মা তখন। তাতে কী! মাতো আছেন! আসার সময় আমার হাত শক্ত করে ধরে বলেছিলেন, ’বাবা তোমার সাথে আর আমার দেখা হবে না! আর না! আমি চলে যাব। সবাই আমার পাশে থাকবে কিন্তু তুমি থাকবা না। দুঃখ করবা না। আমার দোয়া সবসময় তোমার সঙ্গে থাকবে’। মায়ের এসব কথা মেনে নেয়ার লোক আমি না। আমি বল্লাম, আপনার সাথে আবার আমার দেখা হবে। আমিতো প্রতিবছর আসি আপনাকে দেখতে। মা বলেন, ’তুমি ওদেশে কেনো থাকো! কী আছে ওদেশে! নিজের দেশ ছেড়ে কেউ যায়’! আবার নিজে  নিজেই বলেন, ’তোমাকে তো যেতে হবে। তোমার ছেলেমেয়েরা আছে না! আমার যেমন তোমার জন্য খারাপ লাগে তোমারও তো ওদের জন্য খারাপ লাগে’! তারপর আমার মাথায় পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে মিষ্টি করে বলেন, ’যদি শোনো আমি মারা গেছি তোমাকে আসতে হবে না। তুমি আমার জন্য দোয়া করো তাহলেই হবে’।

১০ সেপ্টেম্বর ছিল ঈদের দিন। রাতে ফোন করলাম। ওখানে ঈদ শুরু। মায়ের কণ্ঠটা একটু শুনতে যদি পাই। মা আজকাল আর কথা শুনতে পান না। শুধু শেখানো কথা বলেন। ফোনটা ধরে শুধু তিনবার ’হ্যালো হ্যালো হ্যালো’ বললেন। নিস্তেজ কন্ঠ। আর কোনো কথা নয়। মায়ের সাথে এটাই আমার শেষ কথা। মা আর কোনোদিন আমার সাথে কথা বলবেন না! কোনাদিন না! কত কথা যে জমা করে রাখতেন। বলতে গিয়ে তালগোল পাকিয়ে ফেলতেন। কখনও অভিমান করতেন, কখনও রাগ, কখনও খিল খিল করে হাসতেন। একদিন আমার হাত ধরে বললেন, তোমার কথা একজনে আমারে কইছে।

আমি বললাম, কী কইছে।

তিনি আনন্দময় হেসে বললেন, তুমি নাকি আমার কথা পত্রিকায় লেখছো! তুমি নাকি লেখো!

আমি হাসি। মা জনেন আমি লিখি কিন্তু ভুলে যান।

১২ সেপ্টম্বর। মার অবস্থা ভালোনা। কথা বন্ধ। আমার রাত দিন উৎকন্ঠায় কাটে। দেশে যাবার জন্য মনে মনে প্রস্তুত হই। ১৪ সেপ্টেম্বর। রাত দু’টায় ফোনটা আর্তনাদ করে উঠে। শব্দটা শুনে মনে হয় আমার আত্মাটা বেরিয়ে যাবে। ছুটে গিয়ে ফোন ধরি। কেউ কিছু বলে না। ফোন রেখে দেই। আবার বেজে উঠে ফোন। এবার আমার স্ত্রী ফোন ধরে। ওরা আমাকে না বলে আমার স্ত্রীর কাছে খবরটা দেয়। আমি কী আর কিছু বুঝি না! তখন বাংলাদেশে ১৫ সেপ্টেম্বর দুপুর বারোটা।

৪.

সেদিনের আকাশেও সপ্তর্ষি ছিল, ছায়াপথ ছিল না। মা বসে থাকেন পাশে। পিঠে হাত বোলান। কথা বলেন না। এভাবেই নীরবে মাতা-পুত্রের সময় পার হয়ে যায়। ধুলারাশির মতো আকীর্ণ নক্ষত্রপুঞ্জ বিপুল একটি অনির্দিষ্ট পথের মতো পড়ে থাকে, ওখানে রোজ ঝড় ওঠে, ঝড়ো হাওয়ায় নক্ষত্রের গুঁড়ো উড়ে সমস্ত আকাশে ছড়ায়। সপ্তর্ষির চেহারা শান্ত। প্রশ্নচিহ্নের মতো। ব্যক্ত ও অব্যক্ত জগতের সীমায় বসে আছেন সাতজন শান্ত-সমাহিত ঋষি। মৃতুøর পর থাকে কি কোনো চেতনা?  অথবা আর একবার কি জন্ম নেয়া যায়? মৃতুø, মহান একটি ঘুম, তার বেশি কিছু না। ছেলেবেলায় মেলা শেষে ফাঁকা মাঠে শুয়ে থেকে আকাশ দেখা হতো। দেখতে দেখতে কোনো শূন্যতায় পৌঁছে যেতো মন। পার্থিব কোনোকিছুই আর মনে থাকতো না। তখন আকাশে থাকতেন দেবতারা, মানুষের ইচ্ছা পূরণ করতেন। আজ তারা কেউ নেই- না মনে, না আকাশে। তবু আজও সপ্তর্ষির অদৃশ্য আলো শরীর আর মনে অনুভব করা যায়।

আবার যদি দেখা হয় মায়ের সঙ্গে। আবার যদি! আমার মাথায় একটু হাত রাখো তো মা, একটু হাত রাখো। মা মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন, কেন রে?

সব ভুলিয়ে দাও তো মা, ভুলিয়ে দাও তো। বুদ্ধি, স্মৃতি, অবস্থা ভুলিয়ে দাও। আবার ছোট হয়ে কোলে ফিরে যাই...

(আমার মায়ের মৃতুøতে যারা সমবেদনা জানিয়েছেন সবাইকে আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি)

 
সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ