দেশে নেশায় অপচয় দিনে ৫০ কোটি টাকা

April 12, 2011, 9:21 AM, Hits: 2723

দেশে নেশায় অপচয় দিনে ৫০ কোটি টাকা

 

http://www.dailykalerkantho.com/admin/news_images/484/image_484_144052.jpg

মাসুদ কার্জন ও এস এম আজাদ : ঢাকা থেকে : তাঁর বয়স ৫২ বছর। রোগাটে চেহারা। শক্ত কণ্ঠে বললেন, 'জীবনের ওপর মায়া নাই আমার। বাঁইচা কী হইব? আমার সব শেষ...।'
জানা যায়, লোকটার স্ত্রী মারা গেছেন। চার ছেলেমেয়ের কেউই কাছে নেই। মেয়েদের বিয়ে হয়েছে। ঢাকার বংশালে একটি দোকান ছিল। ছিল মোটামুটি সুখের সংসার। কিন্তু এখন আর কিছুই নেই। সব হারিয়েছেন। তাঁর শরীরে এইচআইভি পজিটিভ। আর এ রোগ বাঁধিয়েছেন তিনি স্রেফ মাদক সেবন করতে গিয়ে। হেরোইন দিয়ে শুরু হলেও একসময় শিরায় মাদক নিতে থাকেন। ২০০৮ সালে জানতে পারেন এইচআইভিতে আক্রান্ত হওয়ার কথা।


নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রৌঢ় মানুষটা কান্নাজড়িত কণ্ঠে এ প্রতিবেদকদের কাছে বলেন, 'আমার মতো কেউ যেন ভুল না করে। নেশা আমার জীবন শেষ করছে।' ছেলেমেয়েদের কাউকে এ অসুস্থতার কথা জানাননি তিনি।


এইচআইভি পজিটিভদের সংগঠন 'মুক্ত আকাশ বাংলাদেশ'-এর সদস্য তিনি। রাজধানীর একটি হাসপাতালে বসে কথা হচ্ছিল তাঁর সঙ্গে।


ঢাকার বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক যুবক। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালে গাঁজা দিয়ে শুরু। পরে ফেনসিডিল হয়ে এখন ইয়াবায় ঠেকেছেন তিনি। জানালেন, এ নেশার কারণে তাঁর শারীরিক-মানসিক-আর্থিক সব ধরনের শান্তি নষ্ট। ক্রমে একা হয়ে পড়ছেন তিনি।


রাজধানীসহ সারা দেশে এ রকম অসংখ্য মানুষের সন্ধান মেলে, যাদের আজ নেশায় দিশাহারা অবস্থা। তারা শুধু যে নিজেরাই শেষ হচ্ছে তা নয়, ভোগাচ্ছেন পরিবার-পরিজনসহ গোটা সমাজকে। অস্বাভাবিক যন্ত্রণাময় জীবনের পাশাপাশি জড়িয়ে পড়ছে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে।


অপরাধের নেপথ্যে নেশা : গত ৮ জানুয়ারি রাজধানীর গেণ্ডারিয়ায় দীপ্ত দাস শুভ নামের এক শিশু ছাত্রকে হাত-পা বেঁধে বাথরুমের ড্রামের ভেতরে ডুবিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। একই সময় ওই শিশুর বাবা ব্যবসায়ী বিভূতি রঞ্জন দাস বাবুলকে জবাই করার চেষ্টা চালানো হয়। এ ঘটনার নায়ক প্রতিবেশী তাজুল ইসলাম সাগরকে গ্রেপ্তার করছে পুলিশ। গ্রেপ্তারের পর সাগর জানায়, সে মাদকাসক্ত। নেশার টাকার জন্যই সে এসব ঘটনা ঘটায়। হত্যা করে সে পায় মাত্র তিন হাজার ৭০০ টাকা। গত ১৪ জানুয়ারি রাজধানীর আগারগাঁও এলাকায় প্রকাশ্যে খুন হন ৪১ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ফজলুর রহমান। এক মাস পর একই কায়দায় খুন হন শ্যামপুর-কদমতলী থানা আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি মোহাম্মদ উল্লাহ। দুটি হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে ছিল দলীয় বিরোধ। ব্যবহার করা হয় ভাড়াটে খুনি। পুলিশ ও গোয়েন্দারা খুনিদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারে সক্ষম হয়। জানা যায়, এরা সবাই মাদকাসক্ত। ফজলু হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়া দুলালের দাবি, হত্যাকাণ্ড ঘটানোর আগে সে পেয়েছিল মাত্র দুই পুরিয়া হেরোইন। মোহাম্মদউল্লাহ হত্যাকাণ্ডে জড়িত জাকিরের দাবি, তাদের দলের সঙ্গে মাত্র আট হাজার টাকায় চুক্তি হয়েছিল।


মাদক ডিপো বলে খ্যাত সাভারের আমিনবাজারের বরদেশী গ্রামে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মাদক ব্যবসার আধিপত্যকে কেন্দ্র করে র‌্যাব ও পুলিশের কর্মকর্তাসহ প্রায় অর্ধশত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া ঢাকার আগারগাঁও বিএনপি বস্তি, ডেমরার সিটিপল্লী, গণকটুলি, চানখাঁরপুল, কামরাঙ্গীরচরসহ বিভিন্ন মাদক স্পটে অনেক খুনের ঘটনা ঘটেছে মাদককে কেন্দ্র করে।


নেশার বিষ বিস্তার :
ফ্যামিলি হেলথ্ ইন্টারন্যাশনালের তথ্য মতে, বাংলাদেশে প্রায় অর্ধকোটি মাদকসেবী আছে। পুরুষ, নারী ও শিশু মিলে প্রায় এক লাখ মানুষ মাদক বিক্রি ও পাচারের সঙ্গে জড়িত। একজন মাদকসেবী প্রতিদিন গড়ে ১০০ টাকা খরচ করলে দেশে মাদকের পিছেই ব্যয় দাঁড়ায় দিনে ৫০ কোটি টাকা।


মাদকের ছোবলে অকালে ঝরে পড়ছে বহু তাজা প্রাণ। মাদকসেবীদের সংগঠন 'নিরন্তর প্রচেষ্টা'র হিসাব অনুযায়ী, গত সাত বছরে রাজধানী ও আশপাশে এক হাজার মাদকাসক্ত মারা গেছে। সংগঠনের সভাপতি দ্বীন মোহাম্মদ বলেন, 'সাত বছরে পথে পথে ধুঁকে মারা গেছে ১৭০ মাদকাসক্ত। এরা ছিল পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন।'


নামের বাহার : জানা গেছে, দেশে কমপক্ষে ৩২ ধরনের মাদক ব্যবহার হয়। মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তালিকা অনুযায়ী হেরোইন, গাঁজা, চোলাই মদ, দেশি মদ, বিদেশি মদ, বিয়ার, রেকটিফায়েড স্পিরিট, কেডিন, ফেনসিডিল, তাড়ি, প্যাথেডিন, ব্রুপ্রেনরফিন, টিডি জেসিক, ভাং, কোডিন ট্যাবলেট, ফার্মেন্টেড, ওয়াশ (জাওয়া), বনোজেসিক ইনজেকশন (ব্রুপ্রেনরফিন), টেরাহাইড্রোবানাবিল, এঙ্এলমুগের, মরফিন, ইয়াবা, আইসপিল, ভায়াগ্রা, সানাগ্রা, টলুইন, পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট, মিথাইল, ইথানল, কিটোন ইত্যাদি দ্রব্য মাদক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। মাদকসেবীদের কাছে আরো জানা যায়, গরুর চিকিৎসায় ব্যবহৃত লোপেজেসিক মাদ্রাজি ইনজেকশন নামে পরিচিত। ইনোকটিন, সিডাঙ্নিসহ বিভিন্ন ঘুমের ট্যাবলেট, জামবাকসহ ব্যথানাশক ওষুধ কিংবা টিকটিকির লেজ পুড়িয়েও অনেকে নেশা করে থাকে। পথশিশুরা জুতা তৈরির সলিউশন দিয়ে তৈরি করছে ডান্ডি। চিকিৎসকরা জানান, হেরোইন, গাঁজা, ফেনসিডিল, ইয়াবা এবং বিভিন্ন ঘুমের ওষুধের মিশ্রণে তৈরি মাদক ব্যবহারকারীরাই বেশি চিকিৎসা নিতে আসে। এদের ৭০ শতাংশেরই বয়স ২১ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে।


দাপট চম্পা-বাবার : হেরোইন-ফেনসিডিলের দাম বৃদ্ধি ও সরবরাহ কমে যাওয়ায় নেশাখোরদের কাছে এখন সবচেয়ে প্রিয় ইয়াবা। সহজলভ্য হওয়ায় দামও পড়ে গেছে।


র‌্যাব সূত্র জানায়, রাজধানীতে সক্রিয় ৪০ জন ইয়াবা ব্যবসায়ী মোবাইল ফোনে বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। অভিযানে তাদের অনেকেই গ্রেপ্তার হচ্ছে। ২০০৮ সালে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হওয়া কিশোর আবদুল মন্নাফ গোয়েন্দা পুলিশকে জানায়, শীর্ষ সন্ত্রাসী পিচ্চি হেলালের ছোট ভাই রাজুর নির্দেশে সে মাদক ব্যবসায় নামে। তার নিয়ন্ত্রণে ২০ কিশোর জহুরী মহল্লা, তাজমহল রোড, আসাদগেট, কুমিল্লা বস্তিসহ আরো কয়েকটি এলাকায় নিয়মিত ইয়াবা, ফেনসিডিল ও আইসপিল বিক্রি করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা তাদের প্রধান গ্রাহক।


শতাধিক সম্রাট-সম্রাজ্ঞী : সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র মতে, রাজধানীতে ছোট-বড় মিলিয়ে মাদক ব্যবসায়ী আছে প্রায় ৮০০। এর মধ্যে গডফাদার বা সম্রাট বলে পরিচিত শতাধিক। ওই দলে আছে সম্রাজ্ঞীও। কারো কারো রাজনৈতিক পরিচয়ও আছে। সম্রাট বা সম্রাজ্ঞীদের একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তারা নিজেরাই শুধু নয়, পুরো পরিবারই মাদক ব্যবসায়ী। এমনকি তারা ছেলে বা মেয়ে বিয়ে দিতেও মাদক ব্যবসায়ী খোঁজ করে। উদাহরণ হিসেবে আসে বিএনপি বস্তির করিমুন্নেসার কথা। তার মেয়ে রনি বেগম ও মেয়েজামাই লিটন দুজনই মাদক ব্যবসায় জড়িত।


 
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ