আজ অমলিন আনন্দের দিন

April 14, 2011, 9:02 AM, Hits: 2392

আজ অমলিন আনন্দের দিন

alt

হ-বাংলা নিউজ  :  কালের যাত্রা নিরন্তর, নিরবধি। মহাকালের রথ সেই পথযাত্রায় পেরিয়ে গেল ১৪১৭ বাংলা বর্ষের সীমারেখা। আজ বৃহস্পতিবার। পয়লা বৈশাখ, বঙ্গাব্দ ১৪১৮। নতুন বছরের পরিক্রমা শুরু হলো বাঙালির নিজস্ব বর্ষপঞ্জিতে। বাংলা ভাষাভাষীর জীবনে এল এক অমলিন আনন্দের দিন। আজ বৈশাখী উৎসব।
আজ এক প্রেরণার দিনও। ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষ এক অভিন্ন হূদয়াবেগ নিয়ে মিলিত হবে একই উপলক্ষে। পয়লা বৈশাখ ছাড়া এত বড় সর্বজনীন উৎসবের উপলক্ষ আর নেই। এই উৎসবের মধ্য দিয়ে বাঙালি তার আপন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের আলোকে জাতিসত্তার পরিচয়কে নতুন তাৎপর্যে উপলব্ধি করে গৌরব বোধ করে। এই গৌরব ও চেতনাই বাঙালিকে প্রেরণা জুগিয়েছে আপন অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে।
রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের নানা বয়সী মানুষ সাড়ম্বরে উৎসবের আনন্দে মেতে উঠবে। পোশাক-পরিচ্ছদ, খাওয়াদাওয়া, গানবাদ্য— সবকিছুতেই প্রাধান্য পাবে বাঙালিয়ানা। আড্ডা, আমন্ত্রণ, উচ্ছ্বাসে কেটে যাবে দিনটি। বিশেষত, ঢাকায় শহুরে নাগরিকদের গৎবাঁধা জীবনযাত্রায় যোগ হবে ভিন্নতার স্বাদ। সকালেই নগরবাসী ঘর থেকে বেরিয়ে পড়বে সুসজ্জিত হয়ে। নারীরা পরবেন লাল-সাদা শাড়ি, পুরুষের পরনে নকশা করা পাঞ্জাবি ও ফতুয়া। বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকবে গালে, বাহুতে আলপনা আঁকা ফুটফুটে শিশুরা।
রমনার বটমূলে ছায়ানটের প্রভাতি গানের আসর, চারুকলায় মঙ্গল শোভাযাত্রা, রবীন্দ্রসরোবরে গানের আসর, বাংলা একাডেমীতে বৈশাখী মেলা। শহরজুড়ে আরও নানা আয়োজন। নবীন গ্রীষ্মের প্রখর তাপ উপেক্ষা করে পথে পথে ঘুরে, কখনো বা রমনা-সোহরাওয়ার্দী-বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের গাছতলায় বসে তুমুল আড্ডায় মেতে কেটে যাবে উৎসবের বেলা।
বাংলা সনের প্রবর্তন কবে হয়েছিল, কে তার প্রবর্তক, তা নিয়ে পণ্ডিতমহলে আছে নানা বিতর্ক। বেশির ভাগ মানুষেরই মত, মোগল সম্রাট আকবর এর প্রবর্তক। তিনি ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দে, হিজরি ৯৬৩ সালে যে ‘তরিক-ই-ইলাহি’ নামের নতুন সনের প্রবর্তন করেছিলেন দিল্লিতে, তখন থেকেই আঞ্চলিক পর্যায়ে বাংলা সনের গণনা শুরু হয়েছিল। তবে রাজা শশাঙ্ক, সুলতান হোসেন শাহ ও তিব্বতের রাজ স্রংসনকেও বাংলা সনের প্রবর্তক বলে মনে করেন কেউ কেউ। ‘সন’ শব্দটি আরবি এবং ‘সাল’ শব্দটি ফারসি। এই শব্দ দুটির কারণে বাংলা সন বা সাল মুসলিম শাসকদেরই প্রবর্তিত বলে পণ্ডিতেরা মনে করেছেন। বৈদিক যুগে অঘ্রানকে বছরের প্রথম মাস বলে গণ্য করা হতো। তবে এই অঞ্চলের চাষাবাদের সঙ্গে মিলিয়ে খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে ফসলি সন হিসেবে বৈশাখকেই বছরের প্রথম মাস ধরে বাংলা সনের গণনা শুরু হয়েছিল। সুবাদার মুর্শিদ কুলি খানের সময়ে বৈশাখ মাসের শুরুতে খাজনা আদায়কে কেন্দ্র করে পয়লা বৈশাখে এক ধরনের আর্থসামাজিক আনন্দ-উৎসবের সূচনা হয়েছিল বলে গবেষকেরা মনে করেন।
বছরের প্রথম দিনে আনন্দ-উৎসবের মধ্য দিয়ে নতুন বছরকে বরণ করে নেওয়ার রীতি-রেওয়াজ মানবসমাজে সুপ্রাচীন। কৃষিপ্রধান বাংলায় খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে বছরের প্রথম দিনে পুণ্যাহের আয়োজন করতেন রাজা বা জমিদারেরা। প্রজারা এ দিন খাজনা দিয়ে নতুন বছরের জন্য জমির পত্তন নিতেন। জমিদারেরা প্রজাদের জন্য আয়োজন করতেন ভোজের। চিত্তবিনোদনের জন্য যাত্রা, পালা, টপ্পা, গম্ভীরা, বাইজি নাচের সঙ্গে থাকত কৃষি ও কারুপণ্য নিয়ে মেলার আয়োজন। ঘোড়দৌড় বা গরুর গাড়ির দৌড়ের প্রতিযোগিতা করা হতো কোনো কোনো গ্রামে। পুণ্যাহ অনুসরণে অচিরেই আরও একটি অনুষ্ঠানের সংযোগ ঘটেছিল পয়লা বৈশাখে; সেটি হালখাতা। ব্যবসায়ীরা এর আয়োজন করতেন। সাংবৎসরিক যাঁরা বাকিতে কেনাকাটা করতেন, তাঁদের আমন্ত্রণ জানানো হতো। উত্তম আহারাদির বন্দোবস্ত করা হতো। দোকানঘরটি ধুয়েমুছে করা হতো ঝকঝকে। ছিটানো হতো পঞ্চবটীর পাতা ভেজানো পবিত্র জল। আপ্যায়ন শেষে পুরোনো বাকি শোধ করে খাতকেরা আগামও কিছু জমা করে যেতেন নতুন খাতায়। পুণ্যাহ ও হালখাতা ছিল মূলত অর্থনীতিনির্ভর অনুষ্ঠান। ১৯৫০ সালে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হলে পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে পুণ্যাহ আয়োজন বন্ধ হয়ে যায় এবং হালখাতাও তার জৌলুশ হারাতে থাকে।
প্রাচীন ও মধ্যযুগের সাহিত্যে পয়লা বৈশাখ উৎসবের কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না। বাঙালির বৈশাখী উৎসব একেবারেই আধুনিক কালের সংযোজন। বিশেষত, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর গান ও কবিতায় বৈশাখকে তুলে ধরেছেন নতুন রূপে। খরতপ্ত বৈশাখের অন্তর্নিহিত শক্তিকে আহ্বান করেছেন জীর্ণ পুরোনোকে সরিয়ে দিতে। তিনিই বৈশাখকে চিরকালের জন্য বাঙালির চেতনায় স্থান করে দিয়ে গেছেন সৃজন, নবীনতা, প্রেরণা ও আনন্দের অনিঃশেষ উৎস হিসেবে।
ব্রিটিশ শাসন অবসানের পর সেই চেতনা বাঙালিকে উদ্বুদ্ধ করেছে পাকিস্তানি শোষণ-শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রামে। অতীত ঐতিহ্যের গৌরব, সংস্কৃতির প্রতি অনুরাগ, জাতিসত্তার চেতনা পয়লা বৈশাখের উৎসবকে নানা পরিবর্তনের মধ্যে পরিণত করেছে বাঙালির জীবনের প্রধান উৎসবে।
আজ সরকারি ছুটি। পত্রপত্রিকাগুলো নববর্ষ উপলক্ষে প্রকাশ করেছে বিশেষ সংখ্যা। বেতার ও টেলিভিশন চ্যানেলগুলো সম্প্রচার করছে বিশেষ অনুষ্ঠান।

 
সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ