প্রধান উপদেষ্টা নিয়ে সংকটের পূর্বাভাস

May 9, 2011, 3:29 PM, Hits: 2554

 প্রধান উপদেষ্টা নিয়ে সংকটের পূর্বাভাস

alt

হ-বাংলা নিউজ  : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পরবর্তী প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে বর্তমান প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হককে মানবে না বিএনপি। দলটির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া গত ২৯ এপ্রিল গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান। দলীয় সূত্রগুলো এ তথ্য জানিয়েছে।


সূত্রমতে, বর্তমান সরকারের বাকি মেয়াদে এ বিষয়ে সরব থাকারও সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। শিগগির বিএনপি এ অবস্থানের কথা জানান দেবে। খালেদা জিয়া ১ মে গাজীপুরের শ্রমিক সমাবেশে এ ধরনের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘কোনো দলীয় প্রধান বিচারপতিকে পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করা হলে তা মেনে নেওয়া হবে না।’


জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এম কে আনোয়ার বলেন, ‘বর্তমান প্রধান বিচারপতিকে যদি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা করা হয়, তবে বিএনপি সে নির্বাচনে অংশ নেবে না। এই ইস্যুতে বিএনপি জনগণের কাছে যাবে এবং আন্দোলন গড়ে তুলবে।’


বিএনপির এই অবস্থানকে আগামী তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন নিয়ে আরেক রাজনৈতিক সংকটের পূর্বাভাস হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
বিএনপির নীতিনির্ধারক পর্যায়ের একাধিক নেতার মতে, জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে এ বি এম খায়রুল হককে প্রধান বিচারপতি করা হয়েছে। পরবর্তী প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রেও জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন হচ্ছে বলে দলটি নিশ্চিত হয়েছে। বিএনপি মনে করে, দুই দুইবার জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ উদ্দেশ্যমূলক।


জানা গেছে, প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক ১৭ মে অবসরে যাচ্ছেন। বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনকে পরবর্তী প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দেওয়া হবে বলে ব্যাপক আলোচনা রয়েছে। এমনটা হলে খায়রুল হকই হবেন আগামী তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের সময় সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি। অবশ্য মো. মোজাম্মেল হোসেনকে প্রধান বিচারপতি করতে হলে বিচারপতি শাহ আবু নাঈম মোমিনুর রহমান আরেক দফা জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের শিকার হবেন। তিনি খায়রুল হকের চেয়েও জ্যেষ্ঠ ছিলেন। গত বছরের সেপ্টেম্বরে খায়রুল হককে প্রধান বিচারপতি করা হলে শাহ আবু নাঈম মোমিনুর রহমান ছুটিতে যান। প্রায় সাত মাস পর তিনি গত ২৭ এপ্রিল এজলাসে বসেন। তিনি বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের একটি বেঞ্চের নেতৃত্বে রয়েছেন। তাঁর পরে যথাক্রমে জ্যেষ্ঠ দুই বিচারপতি হলেন—বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেন ও বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা।


যোগাযোগ করা হলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ বলেন, ‘বিএনপির মানা না মানাতে কিছু যায়-আসে না। তা ছাড়া এখন সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়া চলছে। সংশোধনের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি হবেন, নাকি অন্য কোনোভাবে হবে, তা বলার সময় আসেনি।’ তিনি বলেন, বিএনপি এ বি এম খায়রুল হককে প্রধান উপদেষ্টা না মেনে যদি কোনো বিশৃঙ্খল অবস্থা সৃষ্টি করতে চায়, তা হবে অপরিপক্ব সিদ্ধান্ত।


বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ প্রথম আলোকে বলেন, বিএনপি অন্যায় পন্থা অবলম্বন করে কাউকে প্রধান উপদেষ্টা করার বিপক্ষে। তিনি বলেন, ‘আমরা সংবিধানে বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে। তাই জ্যেষ্ঠতা অনুযায়ী প্রধান বিচারপতি চাই। কেননা সর্বশেষ অবসরে যাওয়া প্রধান বিচারপতি প্রধান উপদেষ্টা হবেন। কাউকে প্রধান উপদেষ্টা করতে গিয়ে যদি বারবার জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করা হয়, তাহলে তার পেছনে খারাপ উদ্দেশ্য কাজ করাটাই স্বাভাবিক।’


বিএনপির আরেক জ্যেষ্ঠ নেতা জানান, বিএনপির পক্ষ থেকে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে খায়রুল হককে নিয়ে দলের আপত্তির বিষয়টি অনানুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরা হয়েছে। আইনজীবীদের মাধ্যমে এ বিষয়টি সরকারের কাছে তুলে ধরা হয়েছে।


সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতিও জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে পরবর্তী প্রধান বিচারপতি নিয়োগ না দিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। সমিতির সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা।
খন্দকার মাহবুব প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা চাই কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি যেন সৃষ্টি না হয়। এ জন্য কাউকে প্রধান উপদেষ্টা করতে অন্য কারও জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন না করার দাবি জানানো হয়েছে। জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করা হলে বিচার বিভাগের মর্যাদাও ক্ষুণ্ন হয়।’


জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সাবেক সভাপতি নাজমুল হুদা বলেন, ‘খায়রুল হককে প্রধান উপদেষ্টা করা হলে বিএনপি তা মানবে না। বিএনপি মনে করে, কে এম হাসানকে প্রধান উপদেষ্টা করা নিয়ে যে বিতর্কিত অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল, আবার তা হতে যাচ্ছে।’


বিএনপির একাধিক সূত্র জানায়, খালেদা জিয়া গত ২৩ এপ্রিল বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্যদের সঙ্গে বৈঠকে খায়রুল হককে আওয়ামী লীগের দলীয় বলে উল্লেখ করেন। খালেদা জিয়া বিএনপির নেতাদের এ ব্যাপারে নিজ নিজ এলাকায় জনমত সৃষ্টিরও নির্দেশ দেন।


মওদুদ আহমদের মতে, খায়রুল হক এমন কিছু বিষয়ে রায় দিয়েছেন, যা আওয়ামী লীগের অবস্থানের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। বিশেষ করে পঞ্চম সংশোধনী নিয়ে তাঁর রায় রাজনৈতিক। কিন্তু বাকশালের বিষয়ে জোর কোনো অবস্থান তিনি নেননি।


বিএনপির নেতাদের বক্তব্যের সারমর্ম হলো, জ্যেষ্ঠতা মেনে শাহ আবু নাঈম মোমিনুর রহমানকে পরবর্তী প্রধান বিচারপতি করা হোক। তিনি অবসরে যাবেন চলতি বছরের নভেম্বরে। অর্থাৎ বিএনপি প্রকারান্তরে শাহ আবু নাঈমকে পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে দেখতে চায়।


এ পরিস্থিতিকে বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের সময়ের সংকটের সঙ্গে তুলনা করা চলে। তখন সর্বশেষ সাবেক প্রধান বিচারপতি কে এম হাসানকে প্রধান উপদেষ্টা মানতে রাজি হয়নি আওয়ামী লীগ। সে সময় আওয়ামী লীগের অভিযোগ ছিল, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে আইন সংশোধন করে বিচারপতিদের অবসরের বয়স দুই বছর বাড়িয়ে ৬৫ থেকে ৬৭ বছর করা হয়, যাতে করে ২০০৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে বিএনপির পছন্দের বিচারপতি কে এম হাসান নিযুক্ত হতে পারেন। এ উদ্দেশ্যে বিচারপতি ফজলুল করিম ও রুহুল আমিনের জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে কে এম হাসানকে প্রধান বিচারপতি করা হয়েছিল।


কে এম হাসানকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে মানা না-মানাকে কেন্দ্র করে ২০০৬ সালের অক্টোবর-নভেম্বরে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে রক্তক্ষয়ী হানাহানি হয়। যার জের ধরে দেশে জরুরি অবস্থা জারি হয় এবং সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দুই বছর ক্ষমতায় থাকে।


 
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ