বিচারপতি খায়রুল হকের যত কীর্তি - দুস্থদের টাকা নেয়া নিয়ে তোলপাড়

May 31, 2011, 7:43 AM, Hits: 3098

বিচারপতি খায়রুল হকের যত কীর্তি - দুস্থদের টাকা নেয়া নিয়ে তোলপাড়

alt

প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের বিপুল পরিমাণ টাকা গ্রহণের খবর একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশের পর তোলপাড় শুরু হয়েছে। আর কোনো বিচারক ওই তহবিলের অর্থ গ্রহণ করেছেন কি না আইনজীবীরা তা অনুসন্ধান শুরু করেছেন। একজন প্রধান বিচারপতি, যাকে সরকারি কোনো কোনো মহল ‘শতাব্দীর সেরা বিচারক’ এবং ‘পৃথিবীর ক্ষণজন্মা বিচারকদের একজন’ বলে উল্লেখ করে, তার এই কীর্তিতে পুরো বিচার অঙ্গনে হইচই পড়ে গেছে। সুপ্রিম কোর্টের একাধিক সূত্র বিচারপতি খায়রুল হকের আরও কীর্তি তুলে ধরে তা প্রকাশের জন্য সংবাদমাধ্যমের কাছে অনুরোধ জানিয়েছেন। বিচারপতি খায়রুল হকের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে, গতকাল একটি জাতীয় দৈনিকে ত্রাণ তহবিলের অর্থ গ্রহণের খবর প্রকাশের পর তিনি মুষড়ে পড়েছেন। এ খবর গণমাধ্যমে গেল কী করে­ ঘনিষ্ঠজনদের কাছে বারবার তা-ই জানতে চেয়েছেন তিনি।


সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ২০০৯ সালের ২৭ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে ১০ লাখ ৩৭ হাজার টাকা নেয়ার পর বড় ছেলের বিয়ে দেন বিচারপতি খায়রুল। এ উপলক্ষে অফিসার্স ক্লাবে জমকালো অনুষ্ঠান করা হয়। এর অল্প দিন আগে, একই বছর ২১ জুন তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘স্বাধীনতার ঘোষক’ উল্লেখ করে এক রায় প্রদান করেন। সূত্র জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলের অর্থ দুস্থ ও অসহায় মানুষের জন্যই বরাদ্দ। প্রধান বিচারপতির এই অর্থ নেয়াটা শুধু অনৈতিক ও অশোভনই নয়, বিচারপতিদের আচরণবিধিরও পরিপন্থী। অতীতে গুরুতর অসুস্থ বিচারপতিদের এ ধরনের সাহায্য নেয়ার প্রস্তাব দেয়া হলেও যুক্তিসঙ্গত কারণেই তারা তা নিতে অস্বীকৃতি জানান। বিচারপতি খায়রুল হক তার ১৩ বছরের বিচারিক জীবনে ৩০টি রায় লিখেছেন। এর সবই রাজনৈতিক মামলা। মুন সিনেমা হলের মালিকানাসংক্রান্ত একটি মামলায় তিনি সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করে রায় দেন। এই রিট মামলাটি তার কোর্টে বিচারের আগে একাধিকবার প্রত্যাখ্যাত হয়। আইনের বিধান অনুযায়ী কোনো রিট মামলা একবার খারিজ হয়ে গেলে তা একই গ্রাউন্ডে বিচারের জন্য গ্রহণ করা যায় না। কিন্তু বিচারপতি খায়রুল হক এ ধরনের একাধিক মামলা গ্রহণ ও পরিচালনা করেছেন। তার একটি ঘনিষ্ঠ সূত্র নাম প্রকাশে অনিচ্ছা ব্যক্ত করে বলেন, রাজনীতি জড়িত আছে এমন মামলা তিনি শুনতে পছন্দ করতেন। এ ছাড়া তিনি যেসব মামলায় ‘দুঃসাহসিক রায়’ দিয়েছেন বলে প্রচার করা হয়, এর বেশির ভাগই বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর দেয়া রায়। ফখরুদ্দীন-মইন উদ্দিনের সময়ে তিনি কোনো সাহস দেখাতে পারেননি। সে সময়কার বিশেষ সরকার সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের তিনটি তালিকা করেছিল। এতে বিতর্কিত, অযোগ্য ও দুর্নীতিবাজদের নাম স্থান পায়। বিচারপতি খায়রুল হকের নাম ওই তালিকায় ছিল।


আইন মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র গতকাল জানায়, প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলের টাকা মূলত দুস্থ ও বিপদাপন্ন লোকদের মধ্যে বণ্টন করা হয়। সচ্ছল কোনো লোক এ টাকা গ্রহণ করেন না। বিচারপতি খায়রুল হক ২০০৮ সালের জানুয়ারিতে সিডর-বিধ্বস্ত এলাকার জন্য প্রধান উপদেষ্টার ত্রাণ তহবিলে তার পুরো এক মাসের বেতন ৪২ হাজার টাকা দান করেছিলেন। এ সময় সুপ্রিম কোর্টের বিচারক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাদের একদিনের বেতন দান করলেও খায়রুল হক ব্যতিক্রম করেন। এমন সচ্ছল লোক কিভাবে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলের টাকা নিজ নামে নিলেন­ সে প্রশ্ন অনেকের। এ ছাড়া বিচারিক জীবনের শেষদিকে খুলনা, বাগেরহাট ও গোপালগঞ্জ সফরে গিয়ে তিনি অধঃস্তন বিচারকদের কাছ থেকে সোনার নৌকা, সোনার দাঁড়িপাল্লা, বাঘ ও হরিণের চামড়া, সুন্দরবনের মধুসহ বিভিন্ন উপঢৌকন নেন বলে জানা গেছে।


সূত্রটি উল্লেখ করেছেন, বিচার প্রশাসন ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের সাবেক ডিজি বিচারপতি বদরুজ্জামান তার চিকিৎসার জন্য একবার আইন মন্ত্রণালয়ে অর্থ বরাদ্দের অনুরোধ জানান। কিন্তু মন্ত্রণালয় তাকে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে টাকা নেয়ার প্রস্তাব দেয়। বিচারপতি বদরুজ্জামান এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। অপর একজন সাবেক প্রধান বিচারপতি তার দায়িত্ব পালনকালীন কিছু দিনের জন্য দু’টি সরকারি গাড়ি ব্যবহার করেছিলেন। যেটি তার প্রাপ্য ছিল। এরপরও তিনি অবসর গ্রহণের পর একটি দৈনিকে তাকে নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক কার্টুন ছাপা হয়।


এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সিনিয়র অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, বিদায়ী প্রধান বিচারপতির প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে এভাবে অর্থগ্রহণ উচ্চ আদালতের ভাবমর্যাদা জঘন্যভাবে ক্ষুণ্ন করেছে। এ বি এম খায়রুল হক ঠাণ্ডামাথায় বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে প্রধান বিচারপতির পদ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেছেন। তিনি দেশের রাজনীতিতে সঙ্ঘাতমূলক ও অনাকাঙ্ক্ষিত অবস্থার সৃষ্টি করেছেন। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে কলুষিত করার চেষ্টা করেছেন। নিজস্ব চিন্তা থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক ও জাতির জনক বলে রায় দিয়েছেন। তিনি তো ইতিহাসবিদ নন। তিনি সাংবিধানিক ইতিহাস সৃষ্টি করতে চেয়েছেন। প্রধান বিচারপতির পবিত্র পদ যেভাবে ব্যবহার করেছেন ত্রাণ তহবিল থেকে অর্থ গ্রহণ তার প্রমাণ। তিনি ঠাণ্ডামাথায় বিশেষ এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে গেছেন। এ জন্য জাতির সামনে দিন দিন তার চরিত্র উন্মোচিত হচ্ছে।

 


 
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ