দেশে জমজমাট পীর-ব্যবসা

June 3, 2011, 11:57 AM, Hits: 3481

দেশে জমজমাট পীর-ব্যবসা


পারভেজ খান : ঢাকা থেকে : হজরত মাওলানা জালালউদ্দিন আহমেদ ওরফে বাদশা হুজুরের দরবার শরিফ ঢাকার যাত্রাবাড়ী-ডেমরা সড়কের পাশে। মাছপট্টির পাশে একটি ভবনের দোতলায় দুটি Pir_-_Vondoo_-_SaKiLরুম ভাড়া নিয়ে খোলা হয়েছে 'বাদশা হুজুরের জালালী দরবার।' বড়পীর আবদুল কাদের জিলানীর বংশধর দাবিদার এ পীর অসাধ্য সাধন করতে পারেন! হুজুর রোগীদের সঙ্গে দেখা করেন, তবে তার আগে সেই রোগীকে তিনটি পর্যায় পার হয়ে আসতে হয়। হুজুরের লোকের কাছে আগে সমস্যা জানাতে হবে লিখিতভাবে। হুজুর পানি পড়া দেবেন। ১৫ দিন পর ওই রোগীকে আবার আসতে হবে। এ সময়ও হুজুর দেখা না দিয়ে রোগীকে তাঁর স্বাক্ষর করা দুটি মুরগির ডিম দেবেন এবং ডিমের দাম নেবেন। এই ডিম রোগীকে বাসায় নিয়ে তুলোর মধ্যে রাখতে হবে। যদি ডিম থেকে বাচ্চা হয়, তবেই রোগী হুজুরের সাক্ষাৎ পাবে। সেই বাচ্চা এনে হুজুরকে খোসাসহ দিতে হবে। এই মুরগির বাচ্চা নাকি জিনের খাবার। হুজুর রোগীদের সঙ্গে কথা বলেন আধো অন্ধকারে, শুধু মোমবাতি জ্বালিয়ে। তাঁর দর্শন ফি ৯৯৯ টাকা আর একটি দেশি মুরগি। টাকা কম হলে হুজুর অনেক সময় দয়া করেন কিন্তু মুরগি আনা বাধ্যতামূলক।


পীর জালাল উদ্দিনের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তাঁর এক সহকর্মী জানান, হুজুর এখন 'মাটি কাবায়' আছেন। এটা কোথায়, কোন পথ দিয়ে যেতে হয় জানতে চাইলে তিনি হেসে বলেন, 'মাটি কাবা' এক ধরনের আধ্যাক এবাদতের নাম। হুজুর এখন সেটা করছেন। পরে অবশ্য ওই সহকর্মী হুজুরের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলিয়ে দেন।


হুজুর এ প্রতিবেদককে বলেন, 'আমি কারো কাছ থেকে টাকা নিই না। কেউ খুশি হয়ে টাকা বা এটা-ওটা দেন, এতে আমার সংসার চলে। আর জিন ডেকে চিকিৎসা করি আল্লাহর পবিত্র কালাম দিয়ে।' হুজুর বলেন, আল্লাহর কালাম খাঁটি হওয়ায় এই চিকিৎসায় বিফল হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। জিন মানুষের চেয়ে নিচে, আয়ত্তে এনে তাদের দিয়ে কাজ করানো সম্ভব। আর কাজ না হলে তার জন্য জিন আর রোগীর ভাগ্য দায়ী। তিনি রোগীদের আগে থেকেই এ কথা বলে নেন। ফলে তাঁর বিরুদ্ধে কেউ কোনো অভিযোগ আনতে পারে না।


গত বৃহস্পতিবার সকালে এই বাদশা হুজুরের আস্তানায় কথা হয় গুলশান আরা ও রওশন আরার সঙ্গে। এই দুই বোন এসেছেন কেরানীগঞ্জের আগানগর থেকে- তিন বছর ধরেই আসছেন। গুলশান আরা জানান, ছোট বোন রওশন আরার ছয় বছর হলো বিয়ে হয়েছে। সন্তান হচ্ছে না বলে স্বামী তালাক দেওয়ার হুমকি দিচ্ছেন। জিন হুজুর মুরগির বিনিময়ে পানিপড়া, ডিমপড়া, ডাবপড়া অনেক দিয়েছেন। দিয়েছেন তাবিজও। কিন্তু ফল শূন্য। আজ হুজুর জিনের বাদশার কাছ থেকে জেনে তাদের বলবেন, কেন রওশন আরা মা হতে পারছে না। হুজুরকে এর আগে এক জিন জানিয়েছিল, কোনো এক রাতে রাস্তায় এক জিনের সঙ্গে রওশন আরার দেখা হয়েছিল। রওশন জিনকে সালাম দেয়নি। সে কারণে জিনের অভিশাপেই সে মা হতে পারছে না। আজ জিনের বাদশাকে দিয়ে ছোট জিনের সঙ্গে রওশন আরার মীমাংসা করিয়ে দেবেন হুজুর। হুজুর তাঁকে জানিয়েছেন, আজই শেষ চেষ্টা এবং আজ কোনো টাকা নেবেন না। শুধু তিন ডজন মোমবাতি, তিন ডজন আগরবাতি, এক ডজন গোলাপ জল আর জিনের বাদশার জন্য তিনটি ডালিমসহ তিন পদের কিছু মিষ্টি ফল লাগবে। কাজ না হলে হুজুরকে দোষ দেওয়া যাবে না। বুঝতে হবে, আল্লাহই চাচ্ছেন না। তিনি সর্ব শক্তিমান, তাঁর ওপরে কারও ক্ষমতা নেই।


রাজধানীসহ সারা দেশে এ রকম 'পীর-ব্যবসা' এখন জমজমাট। তথাকথিত এই পীর-হুজুররা তাবিজ, পাথর, ঝাড়ফুঁক, 'জিন' দিয়ে যত বড় রোগ-ব্যাধি হোক আর যত জটিল সমস্যাই হোক, শতভাগ গ্যারান্টি দিয়ে চিকিৎসা শুরু করে দেন। এই পীর-হুজুররা নিজেদের নবী-পয়গম্বর বা বুজুর্গ ব্যক্তিদের বংশধর আর আধ্যাক সাধক দাবি করে পত্রিকা আর টেলিভিশনে চটকদার বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রলুব্ধ করেন মানুষকে। সহজ-সরল অসহায় মানুষ হামেশাই প্রতারিত হচ্ছে এদের কাছে। এক হিসেবে জানা গেছে, সারা দেশে এ ধরনের পীর-হুজুরের সংখ্যা হাজারের ওপরে। এদের অধিকাংশই বিজ্ঞাপনসর্বস্ব। বাস্তবে এদের দেখা মেলে না। এদের অধিকাংশের 'চিকিৎসা-বাণিজ্য' চলে মোবাইল ফোনে। এদের রোগী সবাই প্রবাসী, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যপ্রবাসী অশিক্ষিত ও স্বল্প শিক্ষিত মানুষ। আর গুটিকয়েক যাদের দেশের মাটিতে দেখা মেলে, তাদের বাণিজ্য চলে পুলিশ আর স্থানীয় মাস্তানদের সহযোগিতায়। রাজধানীর কয়েকটি পীরের আস্তানায় ঘুরে এবং নানা সূত্রে অনুসন্ধান চালিয়ে এসব তথ্য জানা গেছে।

চটকদার যত বিজ্ঞাপন :
তথাকথিত পীর-হুজুরদের বেশির ভাগ বিজ্ঞাপন ছাপা হয় সেসব পত্রপত্রিকা বা সাময়িকীতে, যেগুলো মধ্যপ্রাচ্যে বেশি চলে। একটি বিজ্ঞাপন এ রকম : 'বিশ্বের বিভিন্ন নামিদামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে উচ্চ ডিগ্রি নেওয়া আউলিয়াকুলের শিরোমণি বাদশা সোলায়মানের বংশধর হজরত আবুল হোসাইন (রা.) এখন বাংলাদেশে। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বিশেষ আমন্ত্রণে তিনি দেশে এসেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান তাঁর কাছে সশরীরে হাজির হয়ে দোয়া নিয়েছেন। অনেক দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান তাঁকে রাষ্ট্রীয় রত্নপদক দিয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশের সব টেলিভিশনে তাঁর জীবনীর ওপর প্রামাণ্যচিত্র প্রচার হয়েছে। তিনি শতভাগ নিশ্চয়তা দিয়ে সব সমস্যার সমাধান করতে পারেন। তিনি বসেন বায়তুল আমীন দরবার শরিফ, বি-১১, সুবাস্তু টাওয়ার, তৃতীয় তলা, বাড্ডা, ঢাকা। তাঁর ফোন নম্বর ০১৭৩৩৭৮৩৬২৯।


আরেকটি বিজ্ঞাপন : ২০০৯ সালের ৪ জুন বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে মিসরের কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ে জিন দেখিয়ে তাঁর কাছ থেকে সনদ ও সংবর্ধনা নিয়েছেন শাহ হজরত সালমান ফারসি। ২৩ বছর ধরে তিনি জিন সাধনা করেন। তাঁর দুটি মাদ্রাসায় ৮৯০ জন জিন লেখাপড়া করছে। সমস্যার সমাধানই এ হুজুরের একমাত্র সাধনা। তাঁর দরবারের নাম নূরানী শরিফ, সেঞ্চুরি আর্কেড, দ্বিতীয় তলা, মগবাজার, ঢাকা। তাঁর ফোন নম্বর ০১৭২৫৮৩০৭৮০।


আরো একটি বিজ্ঞাপন_সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারকে জিন দেখিয়ে পদক পেয়েছেন ঐশ্বরিক অন্তর্যামীর সর্বশ্রেষ্ঠ পথপ্রদর্শক মাওলানা নূরুল ইসলাম। ভারতের অটল বিহারি বাজপেয়ি এবং পাকিস্তানের নওয়াজ শরিফও তাঁকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। সুপার ন্যাচারাল পাওয়ার আর জিনের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে তিনি যেকোনো সমস্যার সমাধান দিতে পারেন। বরিশালের কাঠপট্টি এবং ঢাকার টিকাটুলিতে বসেন তিনি। ফোন নম্বর-০১৭৫৪৮৪২৬১৯।

 

আরেক ভণ্ডপীর নাসির উদ্দিন ওরফে নাসু হুজুর। অনেকে লাল সালু হুজুর বলেও ডাকে। তাঁর আস্তানা বাড্ডা এলাকায়, নাম সোলমাইদ দরবার শরিফ। তবে এ আস্তানায় পুলিশের কয়েক দফা অভিযানের কারণে এখন ফাঁকা। গা-ঢাকা দিয়েছেন এই পীর আর তাঁর সহযোগীরা। পীর পরিচয়ের আড়ালে তাঁর মূল ব্যবসাই হচ্ছে প্রতারণা আর অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয় দেওয়া। তাঁর আরেকটি পরিচয় তিনি 'বসুমতী হাউজিং' নামের একটি তথাকথিত প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। ছিটেফোঁটা জমি না থাকলেও পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে তিনি অসংখ্য লোকের কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে বাড্ডা থানায় মামলা রয়েছে ৭৪টি।


ভারাক্রান্ত বিশেষণে : 'এ সময়ের মহাপুরুষ, বিশ্ববরেণ্য জ্ঞানতাপস, আধ্যাক জগতের শিরোমণি, গায়েবি জিন সাধক, বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টিকারী' বিশেষণধারী আলহাজ নজিবুল্লাহ শাহ দাবি করেন, তিনি ১০ বছর জিনের দেশে ছিলেন। জিনের বাদশা তাঁকে দেশে পাঠিয়েছেন। ২১টি মুসলিম দেশের রাষ্ট্রপ্রধান তাঁকে স্বর্ণপদক ও উপাধি দিয়েছেন। তিনি আগুন ও পানির ওপর দিয়ে হাঁটতে পারেন, পারেন শূন্য থেকে শত শত মণ ফল আনতে। বিয়ে করেছেন জিনকন্যাকে। তাঁর মোবাইল নম্বর-০১৭৫৩২৩২০৭৭। আস্তানার নাম দরবারে শাহজালালী, ১২৪/বি, রিংরোড, মোহাম্মদপুর, ঢাকা।
'সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টিকারী, আধ্যাক জগতের পরশমণি, মহাসাধক' দাবিদার আলী হোসেন তৌহিদীর ঠিকানা : আল কিসমত, বনানী বাজার, সিটি সুপার মার্কেটের দোতলায়। ফোন নম্বর-০১৭৪২৮১৬৫৬২।


'বিশ্বের প্রথম জিন ও পরিসাধক ও আলোড়ন সৃষ্টিকারী ব্যক্তিত্ব, অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী' আল কোরাইশী বাবার ঠিকানা মতিঝিলের নূরানী মসজিদের দ্বিতীয় তলায়। ফোন নম্বর-০১৭৫৯৫২৮৩৬৩।


'এ যুগের তান্ত্রিক জিনসাধক ও শাস্ত্রীয় বিদ্যায় কালজয়ী মহাসাধক ও বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টিকারী' বাকীর রাব্বানী। তিনিও যেকোনো সমস্যার লিখিত চুক্তিতে তাৎক্ষণিক সমাধান দিতে পারেন। তাঁর ঠিকানা পায়রা পাথর ঘর, ৬৯ ভিআইপি রোড, কাকরাইল, ঢাকা। ফোন নম্বর-০১৯১১৩১৭৩৭৮।


'আধ্যাক মহাশক্তিবান পুরুষ, তাত্তি্বক গুরু ও রুহানি শক্তির অধিকারী পীরে কামেল, এলমে মোক্তাদির' কেবলা বাবা ঢাকা ছাড়াও রাজশাহী এবং দেশের বাইরে সিঙ্গাপুরে বসেন। বিজ্ঞাপনে সিঙ্গাপুরের ঠিকানা নেই। ঢাকার বনানী এবং রাজশাহীর বাগমারায় তাঁর অফিসের নাম 'ভাগ্য সন্ধানী'। ফোন-০১৭৫১১১২৮৭০।


'ভবিষ্যদ্বাণীর জীবন্ত কিংবদন্তি, পীরে কামেল, সাধককুলের শিরোমণি, জৈনপুরের গদিনশিন পীর' আলহাজ হজরত মাওলানা আহমদ আলী জৈনপুরীর (রুহানি বাবা) খেদমতে আছেন ১১ হাজার প্রবীণ জিন এবং তিনি অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারেন! ঠিকানা সোনারগাঁয়ের মোগড়াপাড়ার মহাপবিত্র হুজরা শরিফ। ফোন-০১৭৩৮০৮৩৬০৯।


আরেকটি দাবি এ রকম_'১৩ বছর বয়সে হঠাৎ করে উধাও হয়ে জিনের দেশ কোহেকাপে চলে গিয়েছিলেন আলহাজ হাফেজ মাওলানা আবু সুফিয়ান। সেখানে দীক্ষা লাভ করেন ২৩ বছর। শেষ পর্যন্ত সদয় হয়ে মানুষের সেবা করতে লোকালয়ে ফিরে এসেছেন রুহানি জগতের খাঁটি প্রজ্ঞাদাতা, ইসলামী রেনেসাঁর এই অগ্রনায়ক। তাঁর সঙ্গে সার্বক্ষণিক থাকেন এক ডজন জিন। তাঁর আস্তানা ২৭ বাবর রোড, মোহাম্মদপুর, ঢাকা। ফোন-০১৭৪৬৬২৪৭০৮।


ঠিকানা আছে, আস্তানা নেই : 'সাধক ওস্তাদ গুরুজি' সাদেকুল মাওলা ওরফে জিন হুজুরের প্রতিষ্ঠানের নাম বায়তুল হক। পত্রিকায় প্রকাশিত বিজ্ঞাপনে ঠিকানা দেওয়া ১৬/৩ পূর্ব ধোলাইপাড়, শ্যামপুর, ঢাকা। কিন্তু এই ঠিকানায় গিয়ে এ প্রতিবেদক কোনো কার্যালয় তো দূরে থাক সাইনবোর্ডও খুঁজে পাননি। টেলিফোন করা হলে ওপাশ থেকে একজন ফোন ধরলেও কোনো জবাব দেননি।


ঢাকার ৩৩ বায়তুল মোকাররমের দ্বিতীয় তলা ঠিকানা উল্লেখ করে বিভিন্ন বিজ্ঞাপন ছাপা হচ্ছে 'সত্য সাধন' নামে আরেক প্রতিষ্ঠানের। প্রচারণায় নিজাম উদ্দিন আউলিয়ার বংশধর দাবি করেন 'জীবন্ত কিংবদন্তি' হুজুর সায়্যিন কাদির। কিন্তু বায়তুল মোকাররম মার্কেটে গিয়ে দেখা গেল, এ নম্বরে কোনো দোকান বা অফিস নেই। ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে জানা গেল, মার্কেটে যখন নম্বর দেওয়া হয়, তখনই ৩৩ নম্বর ঘরটি দুই ভাগে বিভক্ত করে ৩৩/এ ও ৩৩/বি করা হয়। এখন হাসান অ্যান্ড সন্স এবং ৩৩/বি-তে ভেনাস জুয়েলার্স ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। হাসান জুয়েলার্সের দোকানকর্মী মানিক এবং ৩৪ নম্বরে তারা জুয়েলার্সের সেলসম্যান রতন  জানান, সত্য সাধন প্রতিষ্ঠানের খোঁজে মাঝেমধ্যেই লোকজন এসে খুঁজে না পেয়ে চলে যান।


কাকরাইলে পায়রা পাথর ঘর জিন সাধক দাবিদার বাকির রাব্বানীর প্রতিষ্ঠান। বিজ্ঞাপনে ঠিকানা উল্লেখ আছে ৬৯ ভিআইপি রোড, কাকরাইল। সেখানে গিয়ে দেখা গেছে, পাথর ঘর নামে কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। এখানে একটি গাড়ির শোরুম আছে।


মূল লক্ষ্য প্রবাসীরা :
বিজ্ঞাপনে যে মোবাইল ফোন নম্বর দেওয়া হয়, দেশ থেকে কোনো ফোন করলে সেটা ধরা হয় না। ধরলেও 'হুজুর নেই, দেশের বাইরে আছেন' বলে দ্রুত কেটে দেওয়া হয়। দেশের বাইরে থেকে ফোন এলে তখনই কেবল রিসিভ করা হয়। এরপর মানি-অর্ডারে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে এখান থেকে তাঁর জন্য সেই তথাকথিত 'চিকিৎসা বা রত্ন পাথর' পাঠানো হয়। প্রতারিত হয়ে দেশে ফিরে আসার পর ওই ব্যক্তি আর হুজুরদের কোনো সন্ধান পান না। বিজ্ঞাপনের ঠিকানায় গিয়ে দেখেন পুরোটাই ভুয়া।


রাজধানীর শান্তিনগরের সিদ্দিকুর রহমান নামে এক ব্যক্তি জানান, তিনি গত ২২ বছর ধরে লিবিয়ায় ছিলেন। একের পর এক তিনটি প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দেখে যোগাযোগ করে তিনি প্রতারিত হয়েছেন। সিদ্দিকুর রহমান বলেন, পরে দেশে এসে খোঁজ নিয়ে দেখেছেন, বিজ্ঞাপনে উলি্লখিত ঠিকানায় ওই প্রতিষ্ঠানই নেই। ভণ্ড হুজুরদের পাল্লায় পড়ে তাঁর খরচ গেছে প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা।
১২৪/৪, শান্তিনগর প্লাজার দরবারের নূরানীর মালিক 'এশিয়া মহাদেশের অন্যতম আধ্যাক সাধক চিশতী' বিশেষণধারী গোলাম রাব্বানীর বিরুদ্ধে রয়েছে শত শত প্রতারণার অভিযোগ। তাঁর অফিসে গিয়ে দেখা যায় চিকিৎসা নিতে আসা এক তরুণীর সঙ্গে তাঁর রীতিমতো ঝগড়া চলছে। চকবাজার থেকে ভাইকে সঙ্গে নিয়ে আসা এ তরুণীর অভিযোগ, এই পীর ভণ্ড। চিকিৎসার নামে তাঁর সঙ্গে প্রতারণা করছে। তবে গোলাম রাব্বানী এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তিনি দীর্ঘদিন কারাবন্দি ছিলেন। সেখানেই পরিচয় হয় এক সাধকের সঙ্গে। এর সুবাদে আজ তিনিও সাধক। আমল ও এলেম দ্বারা তিনি যেকোনো সমস্যার সমাধান করতে পারেন।


নেই পুলিশি অভিযান : বছর ১৫ আগে ঢাকার ডিবি পুলিশ এক দফা ঝটিকা অভিযান চালিয়েছিল এই ভণ্ড পীরদের গ্রেপ্তার করতে। তখন লাকুটিয়ার লালন পীরসহ বেশ কয়েকজন গ্রেপ্তারও হয়েছিল। সেই শেষ। এরপর আর অভিযান নেই। অভিযোগ আছে, এই পীররা তাঁদের বাণিজ্য বহাল তবিয়তে চালাতে এখন এই পুলিশেরই সাহায্য নিয়ে চলছেন। তাই তাঁদের গ্রেপ্তারের প্রশ্নই আসে না। এ ছাড়া যে পীর যে এলাকায় আস্তানা গেড়েছেন, সেই এলাকার সন্ত্রাসীরাও 'সপ্তাহ' প্রাপ্তির কারণে এ পীরদের সহযোগিতা করে থাকে। ফলে কেউ প্রতারিত হয়ে প্রতিবাদ করতে গেলে ওই সন্ত্রাসীরাই তাদের প্রতিহত করে। ফলে সবদিক দিয়ে বেশ ভালো অবস্থানে আছেন এই ভণ্ড পীর-হুজুররা।


এ ব্যাপারে জানতে চাইলে পুলিশের মহাপরিদর্শক হাসান মাহমুদ খন্দকার  বলেন, কেউ সুনির্দিষ্ট অভিযোগ নিয়ে আসে না বলেই পুলিশ ব্যবস্থা নিতে পারে না। এ ধরনের প্রতারণা বন্ধে পুলিশ শিগগিরই মাঠে নামবে বলেও তিনি আশ্বাস দেন।


http://www.kalerkantho.com/admin/news_images/539/image_539_159033.jpg

ধনাঢ্য পীর লিটন দেওয়ান-কাহিনী

দেশের এ ধরনের সহস্রাধিক পীর নামধারী ব্যক্তির মধ্যে এখন যিনি সবচেয়ে বেশি প্রভাবশালী, তাঁর নাম লিটন দেওয়ান চিশতি। তিনি নিজেকে শেষ দর্শনের জ্যোতিষরাজ এবং বাংলাদেশের দেওয়ানি খাজা দরবার শরিফের বর্তমান গদিনশিন পীর হিসেবে দাবি করে থাকেন। অনুসন্ধানে জানা যায়, তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করা লিটন দেওয়ান এখন কোটিপতি। ঢাকার শান্তিনগর ও কাকরাইলে একটি বাড়িসহ মোট ১৪টি ফ্ল্যাট এবং ১১টি মাইক্রোবাসসহ একটি প্রাডো গাড়ি আছে।


লিটন দেওয়ান সম্পর্কে তাঁর বড় ভাই শহিদুল দেওয়ান জানান, লিটন দেওয়ানের বয়স ৩৮ বছর। লেখাপড়া করেছেন তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত। এরই মধ্যে তিনি পাঁচটি বিয়ে করেছেন এবং বর্তমানে তাঁর চারজন স্ত্রী আছেন।


লিটন সম্পর্কে এলাকাবাসী জানায়, এক সময় তাঁরা খুবই দরিদ্র ছিল। তাঁর বাবা ছিলেন একজন ফেরিওয়ালা। ফেরি করে পুরনো কাঁসা-তামা কেনাবেচা করতেন। লিটন পরের জমিতে চাষাবাদ ও দিনমজুরের কাজ করতেন।


লিটনের গ্রামের বাড়ি মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর থানার বাগবাড়ী। এখন সেখানে বিশাল অট্টালিকা বানিয়েছেন লিটন দেওয়ান। বানিয়েছেন নজর কাড়ার মতো মুন্সীগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী কাঠ-টিনের দোতলা ঘর। সান বাঁধানো বিশাল পুকুর। জমিদার বা রাজবাড়ির আদলে তৈরি করা হয়েছে বাড়িটি।


লিটন দেওয়ানের বড় ভাই জানান, এই পাকা ভবনটি তৈরিতে ব্যয় হয়েছে আড়াই কোটি টাকা। বানানো হয়েছে 'দেওয়ান-ই-খাজা শেষ দর্শন দরবার শরিফ'। বাড়ির সামনে বাবার কবর। এ কবরটিকেও রীতিমতো মাজার বানিয়েছেন লিটন দেওয়ান। নাম দেওয়া হয়েছে 'আবদুস সাত্তার দেওয়ান চিশতির মাজার শরিফ'।


লিটন সম্পর্কে প্রতিবেশী কামাল বলেন, 'লিটন প্রথম শ্রেণীর প্রতারক। সে আগে এলাকায় জাল টাকা তৈরি করতে গিয়ে গ্রেপ্তারও হয়। তখন এলাকাবাসী তাকে গ্রাম থেকে বের করে দেয়। লিটন একসময় দিনমজুরের কাজ করে ক্ষেতে আলু তুলত। কিছুদিন ভারতে চোরাচালানও করত। তবে এখন অঢেল টাকার মালিক এবং এলাকায় দান-খয়রাত করে।'


লিটন দেওয়ানের জ্যোতিষ চর্চার কার্যালয় আগে ছিল রাজধানীর পলওয়েল মার্কেটে, এখন আছে একটি বিলাসবহুল বিপণি বিতানে। লিটন দেওয়ানের কার্যালয়ে গেলে দেখা যায়, বিভিন্ন মন্ত্রীর সঙ্গে রয়েছে তাঁর ছবি। জানা যায়, লিটন বিভিন্ন ছোটখাটো সংগঠনে অনুদান দিয়ে অনুষ্ঠানে অতিথি হয়ে যেতেন, পদক নিতেন এবং সেখানেই মন্ত্রীদের সঙ্গে ছবি ওঠাতেন। এসব ছবিই তাঁর প্রতারণার একটি বড় হাতিয়ার।


লিটন দেওয়ান নিজেকে পীর দাবি করে বলেন, হজরত মাইনুদ্দিন চিশতির দরবার শরিফের খাজা বাবার আওলাদ বর্তমান গদিনশিন পীর সাইয়েদ হাসনাইন চিশতির কাছে তিনি বায়াত গ্রহণ করেন ২০০৮ সালের ২১ এপ্রিল। ওই দিন সাইয়েদ হাসনাইন তাঁকে চিশতিয়াসহ অন্যান্য তরিকার খেলাফত দান করেন এবং বাংলাদেশের দেওয়ানি খাজা দরবার শরিফের বর্তমান গদিনশিন পীর হিসেবে তাঁকে ঘোষণা দেন।



 
সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ