তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল - বিরোধীদের শক্তি দেখতে চায় সরকার

June 3, 2011, 11:59 AM, Hits: 2535

তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল - বিরোধীদের শক্তি দেখতে চায় সরকার
alt

হারুন জামিল : ঢাকা থেকে : সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায় অনুযায়ী সরকার সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান তুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও এখন এর নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া পর্যালোচনা করছে। এ ইসুতে আগামী রোববার বিরোধী দলের ডাকা হরতাল কর্মসূচি এবং তৎপরবর্তী আরও কী ধরনের প্রতিক্রিয়া হতে পারে তা গভীরভাবে দেখা হচ্ছে। সরকারের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এ নিয়ে দু’টি মত সৃষ্টি হয়েছে। এক পক্ষ চাইছে, সুপ্রিম কোর্টের রায়ের কথা বলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান তুলে দিতে। তাদের বক্তব্য এখনই সেটা করা না গেলে ভবিষ্যতে আর কিছুই করা যাবে না। অপর পক্ষ সুপ্রিম কোর্টের রায়, বিরোধী দলের দাবি ও জনগণের মতামতকে প্রাধান্য দিয়ে আপস-আলোচনার মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান বের করার পক্ষপাতী। তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধানে কিছুটা পরিবর্তন আনার পক্ষে। তবে এই মতের সমর্থকেরা মনে করেন, সংবিধান সংশোধনের গুরুত্বপূর্ণ এই ইসুøতে বিরোধী দলের সাথে আলোচনা করেই পরিবর্তন আনতে হবে। এর বাইরে কোনো কিছু করতে গেলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না।
সংশ্লিষ্ট উচ্চপর্যায়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, তত্ত্বাবধায়ক ইসুøতে সরকার এখন সুপ্রিম কোর্টের রায়ের কথা বলে যে প্রচারণা চালাচ্ছে, তা সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার আলোকেই করা হচ্ছে। সরকারের নীতিনির্ধারকেরা এখন দেখতে চাইছেন তত্ত্বাবধায়ক ইসুøতে বিরোধী দল কতটা অগ্রসর হতে পারে। বর্তমান সরকারের আড়াই বছর সময়কালে বহু বিষয়ে আন্দোলন গড়ে তোলার মতো পরিবেশ থাকলেও বিরোধী দল সেগুলোকে কাজে লাগাতে পারেনি। তাদের কোনো কথাতেই সরকারি দল তেমন পাত্তা দেয়নি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারপদ্ধতি সুপ্রিম কোর্ট বাতিল করে দেয়ার পর বিরোধী দলের দুর্বল অবস্থানকেই এখন তারা কাজে লাগাতে চাইছে।
সূত্র জানিয়েছে, সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে সম্প্রতি একাধিক গোয়েন্দা সংস্থাকে দিয়ে মাঠপর্যায়ে জরিপ পরিচালনা করা হয়। এসব জরিপে দেখা যায়, সরকারের জনপ্রিয়তা কমতির দিকে। ২০০৮ সালে যে ধরনের জনপ্রিয়তা নিয়ে বর্তমান মহাজোট সরকার ক্ষমতায় এসেছিল, নানা কারণে তাতে নি্নগতি এসেছে। এই মুহূর্তে নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগ ও মহাজোট আর আগের মতো সুবিধা করতে পারবে না। সরকারের প্রতি জনগণের যে উচ্চ আশা ছিল, এখন তা অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছে। সিটি করপোরেশন, পৌরসভা এবং চলমান ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে সরকারের বিরুদ্ধে জনমতের প্রতিফলন ঘটেছে। যদিও সর্বত্র একটি ভীতিকর অবস্থা বিরাজ করায় রাজপথে এর প্রকাশ ঘটছে না। কিন্তু সব নির্বাচনেই জনগণ নীরবে তাদের রায় দিয়ে যাচ্ছে। একটি সংস্থার পক্ষ থেকে সরকারের এই নি্নমুখী জনপ্রিয়তার কারণে সম্ভব হলে মধ্যবর্তী নির্বাচনের চিন্তাভাবনা করার কথাও বলা হয়। তবে এ ব্যাপারে সম্ভাব্য কিছু ঝঁুকির কথাও উল্লেখ করা হয়।
জানা গেছে, সরকারকে সংশ্লিষ্ট একটি সংস্থার পক্ষ থেকে এমন মত জানানো হয় যে, আগামীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বহাল রাখা হলে পুনরায় নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে আসা কঠিন হবে। এসব বিষয় পর্যালোচনা করে এই বিধান বিলুপ্ত করার সিদ্ধান্ত হয়। তবে সরকার নিজে থেকে এ বিষয়ে সরাসরি উদ্যোগী না হয়ে এর দায়দায়িত্ব আদালতের ওপর চাপানোর কৌশল নেয়।
একটি সূত্র অবশ্য বলেছে, প্রধানমন্ত্রী নিজে তত্ত্বাবধায়ক সরকার তুলে দেয়ার ব্যাপারে সংশয়ে ছিলেন। কিন্তু প্রতিবেশী দেশের এক গোয়েন্দা লবি প্রধানমন্ত্রীকে আশ্বস্ত করেছে যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগের আবার ক্ষমতায় আসা অনেকটাই অসম্ভব হয়ে দাঁড়াতে পারে। আদালতের ওপর দায় চাপিয়ে এ ব্যবস্থা বিলুপ্ত করা গেলে আওয়ামী লীগের পুনর্নির্বাচিত হতে তেমন বেগ পেতে হবে না। আর এই ইসুøতে সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধী দলের করার তেমন কিছু থাকবে না। এই বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী প্রভাবিত হয়ে নতুন অবস্থান নিয়েছেন। তবে এই ইসুø নিয়ে বড় রকমের আন্দোলন গড়ে তোলার সম্ভাবনা দেখা গেলে কঠোর অবস্থান থেকে পিছিয়ে এসে দুই মেয়াদের জন্য তত্ত্বাবধায়কব্যবস্থা রাখা হতে পারে। প্রয়োজনে এ ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টে রিভিউয়ের আবেদন করা হতে পারে সরকারের পক্ষ থেকে।
সূূত্র জানিয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রায় নিয়ে বিচারপতিদের মধ্যে বিভক্তির বিষয়টি মাথায় রেখে অতিরিক্ত দু’জন বিচারপতি নিয়োগের পরই এই মামলা নিষ্পত্তির জন্য উঠানো হয়। এর পরও আপিল বিভাগের সব বিচারপতি এই সাংবিধানিক মামলায় একমত হয়ে রায় প্রদান করতে পারেননি। যদিও সংখ্যাগরিষ্ঠের রায়ের আলোকেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিষয়টি ইতোমধ্যে বাতিল বলে ঘোষিত হয়েছে।
সূত্র জানিয়েছে, মামলার রায় ঘোষণার পরও অতি দ্রুত এই বিধান বাতিল করার পক্ষে সরকারের নীতিনির্ধারকেরা সম্মত হননি। তারা রায়ের আলোকেই অন্তত আরও দু’বার নির্বাচন করার পক্ষপাতী ছিলেন। কিন্তু সদ্যবিদায়ী প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হককে নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হলে সরকারের উচ্চমহল আগেকার ভাবনা থেকে সরে আসে। বিএনপি এ বি এম খায়রুল হককে কোনো অবস্থাতেই প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে মেনে না নেয়ার ঘোষণা দিলে পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করে। নীতিনির্ধারকেরা সরকারের শেষপর্যায়ে এই বিতর্ক করার চেয়ে আগে থেকেই নিষ্পত্তি করা ভালো বলে মনে করেন। তাদের বক্তব্য হচ্ছে, শেষপর্যায়ে বিতর্ক উঠলে বিরোধী দল নির্বাচনে সুবিধা আদায় করবে। আর এখনই এ বিষয়ে বিতর্ক চললে অন্তত একটি সমঝোতা করার মতো পরিবেশ সৃষ্টি হবে। তা ছাড়া বিরোধী দল মধ্যবর্তী নির্বাচনের যে দাবি জানাচ্ছে, তা আদায়ে তাদের শক্তি কতটুকু তা-ও যাচাই করা সম্ভব হবে। এসব ভাবনা ও পরিস্থিতি পর্যালোচনায় সরকার তার পূর্ব অবস্থান থেকে সরে এসেছে। এখন তত্ত্বাবধায়কব্যবস্থা বাতিলের জন্য সরকারি দলের পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করার বিষয়েও প্রচারণা জোরদার করা হবে।
উল্লেখ্য, দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এর আগে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টিসহ অন্যান্য বিরোধী দলকে সাথে নিয়ে আন্দোলন করেছিল। তখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে নিজেদের ব্রেইন চাইল্ড হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন বর্তমান সরকারপ্রধান। সেই সময়ের আন্দোলনে এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টিও অংশীদার ছিল। কিন্তু একটি বিশেষ মহলের নির্দেশনায় জাতীয় পার্টির পক্ষ থেকে তত্ত্বাবধায়কব্যবস্থা বাতিলে এখন উল্লাশ প্রকাশ করা হচ্ছে।
এ দিকে আইন বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, অতীতে বাংলাদেশের উচ্চ আদালত বহু বিষয়ে হইচই ফেলে দেয়ার মতো রায় দিলেও সেগুলোর মধ্য থেকে অনেক রায় বাস্তবায়ন করা আজো সম্ভব হয়নি। অবাস্তবায়নযোগ্য বহু রায় উচ্চ আদালত থেকে দেয়া হয়েছে।
এ ব্যাপারে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান নয়া দিগন্তকে বলেন, সুপ্রিম কোর্ট কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে অসাংবিধানিক বললেও দেশের প্রয়োজনে আরও দুই টার্ম রাখার কথা বলেছে। এখানে কেন এখনই এ ব্যবস্থাকে তুলে দেয়া প্রয়োজন মনে করা হলো, তা বোধগম্য নয়। সরকারি দলের পক্ষ থেকেও রায়ের পর এই বিধান তুলে দেয়ার কথা বলা হয়নি, বরং তারা রাখার পক্ষেই ছিলেন। এখন যে বিতর্ক উঠেছে তাতে সরকার মনে করলে বিষয়টির ব্যাখ্যা চাওয়ার জন্য ফের সুপ্রিম কোর্টে রেফারেন্স পাঠানো যেতে পারে। আবার এ মামলায় যে রায় হয়েছে সেটিকে রিভিউ করার জন্যও আবেদন করা যেতে পারে। কিন্তু সে দিকে না গিয়ে বিতর্ক অর্থহীন। বিষয়টি যদি রাজনৈতিক বিতর্ক ধরে নেয়া হয় তবে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে এর সমাধান ঐকমত্যের ভিত্তিতেই করতে হবে। আর আইনি সমস্যা হলে আইনগত সমাধান খঁুজতে হবে। এখন সরকার যেটি ব্যাখ্যা দিচ্ছে সেটি বিএনপি গ্রহণ না করলে তাতে দেশবাসীর কোনো লাভ হবে না। আবার বিএনপিকে বলতে হবে তারা কোনটি চায়।
ড. আকবর আলি খান বলেন, আমার মনে হয় এটি একটি রাজনৈতিক ইসুøতে পরিণত হচ্ছে। আমরা আগেও এ ধরনের বিতর্ক দেখেছি। এতে কারো লাভ হয় না। এই হানাহানির অবসান হওয়া উচিত। তিনি বলেন, আলোচনার মাধ্যমে উপায় খঁুজে বের করা ছাড়া বিকল্প নেই।
প্রবীণ আইনজীবী ও সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রফিক-উল হক এ প্রসঙ্গে জানান, সুপ্রিম কোর্টের রায়ে কিন্তু এখনই তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা তুলে দিতে হবে সে কথা লেখা নেই। বরং তা আরও দুই মেয়াদ রাখার কথা বলা আছে। এখন এ নিয়ে যে রাজনৈতিক বিতর্ক চলছে তা কারো কাম্য নয়। অপ্রয়োজনে আমরা হইচই বাধিয়ে দিয়েছি। রাজনৈতিক বিতর্ক অবসানে ঐকমত্যের প্রয়োজন। কিন্তু আমরা কেউ সেপথে এগোচ্ছি না­ বললেন প্রবীণ আইনজীবী ব্যারিস্টার হক।

 
সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ