বিশ্বেক্ষুদ্র ঋণের ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ :ড. ইউনূস

June 8, 2011, 8:14 AM, Hits: 2005

বিশ্বেক্ষুদ্র ঋণের ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ :ড. ইউনূস


নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ও গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, নিম্নআয়ের মানুষকে ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে রাখা মানে বৈষম্যমূলক সমাজ গড়া। ক্ষুদ্রঋণকে সকল গরীব মানুষের নাগালের মধ্যে নিয়ে আসতে হবে- এর কোন বিকল্প নেই। পৃথিবীর শত শত কোটি মানুষ প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ থেকে বঞ্চিত। এটা কোন রকমেই গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থা হতে পারে না। গরীবের জন্য কর্মসংস্থান যখন সর্বত্র একটা বড় রকমের সমস্যা সেখানে ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে স্বকর্ম সংস্থান একটা সম্ভাবনার সৃষ্টি করে। বর্তমানে সারা বিশ্বে বাংলাদেশ ক্ষুদ্রঋণের ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিয়ে চলেছে।

মঙ্গলবার রাজধানীর ইউনূস সেন্টারেহ-বাংলার সাথে একান্ত সাক্ষাত্কারে তিনি একথা বলেন। তিনি ক্ষুদ্রঋণ, তার নিজের দেয়া নতুন ধারণা সামাজিক ব্যবসা, গ্রামীণ ব্যাংক পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে খোলামেলা মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, দারিদ্র্য সৃষ্টি হয়েছে অর্থনীতি বিষয়ে আমাদের তাত্ত্বিক কাঠামো থেকে, তার প্রয়োগের মাধ্যমে, আমাদের ধারণাগত ভ্রান্তির কারণে। তাত্ত্বিক কাঠামোতে পরিবর্তন না আনলে আমরা বাস্তব জগতে পরিবর্তন আনতে পারবো না। গ্রামীণ ব্যাংক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গ্রামীণ ব্যাংক ও আমার জীবন মিশে গেছে। এখন ধাপে ধাপে গ্রামীণ ব্যাংককে এবং আমাকে পৃথকভাবে চলার আয়োজন করতে হবে। হঠাত্ করে আমাদেরকে পৃথক করতে গেলে এটা প্রতিষ্ঠানের উপর একটা বিরাট ধাক্কা আসবে। যেটা মোটেই মঙ্গলজনক হবে না।

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে প্রথমেই জানতে চাওয়া হয়েছিল বহুল আলোচিত সামাজিক ব্যবসা বিষয়ে। এর বর্তমান ও ভবিষ্যত্ কি?

মুহাম্মদ ইউনূস : সামাজিক ব্যবসা একটা নতুন ধারণা।  অর্থনীতি শাস্ত্রে ব্যবসা মানে মুনাফা অর্জন করা। সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জনের জন্য সকল সৃজনশীলতাকে কাজে লাগানো। সামাজিক ব্যবসার ধারণাটি এসেছে ব্যক্তিগত মুনাফা অর্জনের ইচ্ছা থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করে মানুষের সমস্যা সমাধানের জন্য ব্যবসা সৃষ্টি করা। এই ব্যবসার মূল লক্ষ্য সমস্যা সমাধান করা। ব্যক্তিগত অর্থ উপার্জন নয়। যেমন, আমাদের দেশের বৃহত্তর এলাকায় নিরাপদ পানীয় জলের অভাব আছে। কেউ যদি এমন একটা ব্যবস্থা করতে পারে যে, একটি নির্দিষ্ট এলাকার সবাইকে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য মূল্যে নিরাপদ পানি সরবরাহ করছে, এর পেছনে তার ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হবার কোন ইচ্ছা নাই, তাকে কোন লোকসানও দিতে হচ্ছে না- তাহলে এটা হবে তার সামাজিক ব্যবসা। এরকম বহু সমস্যা সমাধানে সামাজিক ব্যবসার ধারণাটা কাজে লাগানো যায়। মানুষ নিজে লাভবান না হয়ে ব্যবসা করতে চাইবে কিনা সেটাই হলো প্রশ্ন। মানুষের মধ্যে এরকম ইচ্ছা আছে বলেই আমার ধারণা।  মানুষ যেরকম স্বার্থপর, একইভাবে মানুষ স্বার্থহীন। নিঃস্বার্থ কাজ করার স্পৃহা যদি মানুষের মধ্যে থেকে থাকে তাহলে সামাজিক ব্যবসা ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হবে।  কাজেই আমি বলবো সামাজিক ব্যবসা অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বিরাট পরিবর্তন আনতে সহায়ক হতে পারে।  মানুষের বহু সমস্যার সমাধান এর মাধ্যমে দ্রুত অর্জন হতে পারে।

হ-বাংলা  : বর্তমান বহুজাতিক কোম্পানি যেভাবে বিশ্বে তাদের ব্যবসার প্রসার করছে সেখানে সামাজিক ব্যবসা টিকে থাকবে বলে কি আপনি মনে করেন?

মুহাম্মদ ইউনূস : টিকে না থাকলে চলে যাবে। হয়তো এই ধারণায় কোন পরিবর্তনও ভবিষ্যতে আসতে পারে। কাঠামো পরিবর্তন হতে পারে। আমার আশা যে এটা টিকে যাবে। সব ব্যবসায়ের মধ্যেই তো মানুষ আছে।

হ-বাংলা  : ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমের ভবিষ্যত্ কোন দিকে যাচ্ছে ? দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বর্তমানে এই কার্যক্রম কোন পর্যায়ে আছে বলে আপনি মনে করেন?

মুহাম্মদ ইউনূস : পৃথিবীব্যাপী ক্ষুদ্রঋণ সম্প্রসারিত হচ্ছে।  এনিয়ে নানা আলোচনা চলছে। এটাকে শুধু ব্যাংকিং খাতের ন্যায্য সম্প্রসারণ হিসাবে দেখা হবে, নাকি এটাকে দারিদ্র্য নিরসনের হাতিয়ার হিসাবে দেখা হবে, নাকি এটাকে ব্যক্তির স্বকর্ম সংস্থানের উদ্যোগের একটা ভিত্তি হিসাবে দেখা হবে, এগুলি নিয়ে বিতর্ক হচ্ছে। এর কোনটার মধ্যে কোন বিরোধ নাই। ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে শুধু ভাগ্যবান কিছু লোকের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার কোন যৌক্তিকতা নাই। গরীব মানুষকে ঋণ দিয়ে যে ঋণের টাকা ফেরত পাওয়া যায় সেটা প্রমাণ হয়ে গেছে। কাজেই কোন অজুহাতে নিম্ন আয়ের মানুষকে ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে রেখে দেয়ার কোন সুযোগ নাই। সকল মানুষকে ব্যাংকিং ব্যবস্থার আওতায় না আনলে একটা বৈষম্যমূলক সমাজ সৃষ্টি হতে বাধ্য। ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থা ক্রমাগতভাবে এ প্রশ্নটা তুলে ধরছে। ক্ষুদ্রঋণের ব্যবহারকে আমি স্বকর্ম সংস্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার পক্ষপাতী। বিশেষ করে মহিলাদের  স্বকর্ম সংস্থানের উপর জোর দিয়ে এসেছি। ক্ষুদ্রঋণের মূল ধারণা থেকে বের হয়ে অনেকে এটাকে এখন ভিন্ন দিকে প্রবাহিত করার চেষ্টা করেছেন এবং অনেক সংকটের সৃষ্টি করেছেন। কেউ কেউ এটাকে ভোক্তা ঋণ হিসাবে ব্যবহার করে মালামাল বিক্রির কাজে লাগাচ্ছেন, কেউ ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচি পরিচালনা করে ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হবার চেষ্টা করেছেন। মেক্সিকো, বলিভিয়া এবং ভারতে এনিয়ে সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। সমাধান হিসাবে আমি ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী পৃথক ব্যাংক সৃষ্টি করার জন্য পৃথক আইন প্রণয়ন করার প্রস্তাব করেছি। পৃথক রেগুলেটরী অথরিটি সৃষ্টি করার কথা বলেছি। ক্ষুদ্রঋণকে গরীব মানুষের নাগালের মধ্যে নিয়ে আসতে হবে - এটার কোন বিকল্প নেই। পৃথিবীর শত শত কোটি মানুষ প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ থেকে বঞ্চিত। এটা কোন রকমেই গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থা হতে পারে না। গরীবের জন্য কর্মসংস্থান যখন সর্বত্র একটা বড় রকমের সমস্যা সেখানে ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে স্বকর্মসংস্থান একটা সম্ভাবনার সৃষ্টি করে। আনন্দের ব্যাপার হলো সারা বিশ্বে বাংলাদেশ ক্ষুদ্রঋণের ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিয়ে চলেছে।

হ-বাংলা  : গ্রামীণ ব্যাংক নিয়ে কিছু কথা বলি। গ্রামীণ ব্যাংক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে সরকার একটি কমিটি করেছে। কমিটি কিছু সুপারিশও করেছে। এ বিষয়ে আপনার মতামত কী?

মুহাম্মদ ইউনূস : পর্যালোচনা কমিটিকে অল্প সময়ে একটা বিরাট কাজের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। গ্রামীণ ব্যাংক সম্বন্ধে তাদের কোন অভিজ্ঞতা ছিল না। হঠাত্ করে তাদের এ দায়িত্ব নিতে হয়েছে।  যেসব বিষয়ে তথ্য যাচাই করে তাদের সিদ্ধান্ত দিতে হয়েছে সেসব ক্ষেত্রে তারা সঠিক সিদ্ধান্তে আসতে পেরেছেন। যেমন, নোরাড তহবিলের ব্যবহার বিধিসম্মতভাবেই হয়েছে, এতে কোন আইন ভঙ্গ হয়নি। এই সিদ্ধান্ত তাঁরা দিয়েছেন। দ্বিতীয়ত, গ্রামীণ ব্যাংকের সুদের হার বাংলাদেশে ক্ষুদ্রঋণের ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন এবং সেটা ক্রমহ্রাসমান পদ্ধতিতে নির্ধারিত শতকরা ২০ শতাংশ। সেটাও তারা স্পষ্টভাবে বলেছেন। তারা ভুল পথে চলে গেছেন যখন সহযোগী সংস্থা সম্বন্ধে সুপারিশ দিতে গেছেন। তারা যেহেতু এই প্রতিষ্ঠানগুলো সম্বন্ধে আগে থেকে জানতেন না, এবং এসব প্রতিষ্ঠান সম্বন্ধে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করার সময়ও তাদের হাতে ছিল না - তারা একটা ভুল ধারণার উপর ভিত্তি করে অনেকগুলো সুপারিশ করেছেন। তারা বলেছেন, এর মধ্যে দুইটি প্রতিষ্ঠানকে গ্রামীণ ব্যাংকের নিজস্ব ‘বিভাগে’ রূপান্তরিত করতে হবে। দু’টি স্বাধীনভাবে প্রতিষ্ঠিত এবং আইন অনুসারে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানকে কীভাবে গ্রামীণ ব্যাংকের নিজস্ব ‘বিভাগে’ রূপান্তরিত করা হবে সেটা তারা চিন্তা করে দেখার সুযোগ  পাননি। তারা ধরে নিয়েছেন এগুলো গ্রামীণ ব্যাংকের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান। কাজেই গ্রামীণ ব্যাংক চাইলেই তা হয়ে যাবে। অন্যান্য সহযোগী প্রতিষ্ঠানকেও একীভূতকরণ ও অধিগ্রহণের মাধ্যমে সীমিত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার প্রস্তাব করেছেন। এই রকম করার আইনগত কোন সুযোগ গ্রামীণ ব্যাংকের নেই।

সুপারিশে বলা হয়েছে, গ্রামীণ ব্যাংকের আইন ভঙ্গ করে গ্রামীণ ব্যাংক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করেছে। যদি তাঁরা দলিলপত্র দেখে নিশ্চিত হতে পারতেন যে, গ্রামীণ ব্যাংক কোন প্রতিষ্ঠান সৃষ্টিও করেনি, অন্য কোন প্রতিষ্ঠানের মালিকও নয় - তাহলে অনেকগুলো কঠোর মন্তব্য তাদের করতে হতো না। অনেকগুলো ভিত্তিহীন সুপারিশ করারও প্রয়োজন হতো না।

হ-বাংলা  : স্যার, এই ভিত্তিহীন সুপারিশগুলো কী?

মুহাম্মদ ইউনূস : পর্যালোচনা কমিটি গ্রামীণ ব্যাংক সংস্কার কমিশন গঠন করে নতুন আইন প্রণয়ন করার পরামর্শ দিয়েছেন। কমিটি তাদের কার্যকালে গ্রামীণ ব্যাংকের সঙ্গে পরিচিত হবার কোন সুযোগ পাননি। তারা গ্রামীণ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আসার সুযোগ পাননি। তারা কোন গ্রামে গিয়ে গ্রামীণ ব্যাংকের সদস্যদের সঙ্গে বসে তাদের সঙ্গে মত বিনিময়ের সুযোগ পাননি, তারা ২৬ হাজার কর্মকর্তা কর্মচারীর সঙ্গে বসার সুযোগ পাননি, তারা গ্রামীণ ব্যাংকের সরকারী, বেসরকারী বোর্ড সদস্যদের সঙ্গে মত বিনিময়ের সুযোগ পাননি। আমাকে তারা একদিন বাংলাদেশ ব্যাংকে তাদের কার্যালয়ে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। আমি সেখানে গিয়ে  তাদের নানা প্রশ্নের জবাব দিয়ে এসেছি। সেটা ঘন্টাখানেকের জন্য স্থায়ী ছিল। কমিটির রিপোর্টে বলা হয়েছে গ্রামীণ ব্যাংক ব্যক্তি-নির্ভর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়ে পড়েছে।   তাদের মন্তব্য থেকে সাধরণত ধারণা করা হবে যে, এটা ব্যবস্থাপনা পরিচালকের মেজাজ-মর্জির উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। কেন তাদের এরকম মনে হয়েছে সেটা বুঝারও কোন উপায় নেই। গ্রামীণ ব্যাংকের বোর্ডের চেয়ারম্যান যাঁরা হয়েছেন তারা প্রত্যেকেই স্বনামধন্য ব্যক্তিত্ব। আমাদের প্রথম চেয়ারম্যান ছিলেন প্রফেসর ইকবাল মাহমুদ। তারপর যারা চেয়ারম্যান হয়েছেন তারা হলেন প্রফেসর কায়সার হোসেন, ড. আকবর আলী খান, প্রফেসর রেহমান সোবহান এবং তবারক হোসেন। সরকারের মনোনীত যে দু’জন সদস্য বোর্ডে থাকেন তাঁরা বরাবরই সরকারের সচিব বা অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার লোক ছিলেন। যে দু’জন সরকারি সদস্য এখন আছেন তাঁরা দু’জনেই দু’টি মন্ত্রণালয়ের সচিবের দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁরা সবাই একজন ব্যক্তির ইচ্ছার উপর আতসমর্পণ করে গেছেন, নিজেদের কোন মতামত রাখেননি এটা বিশ্বাস করানো খুব মুশকিলের কাজ হবে। কমিটি তাঁদের সম্বন্ধে যে মন্তব্য করেছেন সেটা মোটেই তাঁদের প্রতি সুবিচার করা হয়নি।

বোর্ডে ঋণ গ্রহীতা শেয়ার মালিকদের নয়জন প্রতিনিধি সম্বন্ধেও কমিটি দুঃখজনক মন্তব্য করেছেন। তাঁরা প্রশ্ন করেছেন, এই অশিক্ষিত মহিলারা ব্যাংকিং সম্বন্ধে কী বোঝেন? একজন অধ্যাপকের বা আমলার ব্যাংকিং সম্বন্ধে যা বুঝার সেটা বুঝার দরকার এই নয়জন বোর্ড সদস্যের নেই। তাঁদের বুঝার দরকার যে, এই ব্যাংকের মালিক তাঁরা। যে কারণে এই ব্যাংক সৃষ্টি হয়েছে সে কাজটি সঠিকভাবে হচ্ছে কিনা সেটা দেখা। তাঁদের চাইতে ভাল এটা কে বুঝবে? গ্রামীণ ব্যাংককে তাঁরা  যেভাবে বোঝেন অন্য কারো সাধ্য নেই এর চাইতে এই ব্যাংক ভালো করে বুঝার। জুতা যে পরে সে বুঝে জুতা পরে আরাম লাগছে, নাকি পায়ে ফোস্কা পড়ছে। এটা বুঝার জন্য তো পাদুকা শিল্পী হবার দরকার নাই। যিনি বাড়ির মালিক তাঁকে তো আর্কিটেক্ট হবার দরকার নাই। বাড়িটি তাঁর কাছে আনন্দদায়ক হয়েছে কিনা, বসতযোগ্য হয়েছে কিনা এটা বিচার করার দায়িত্বই তো তাঁর। কমিটির মন্তব্য দেখে মনে হয়েছে কমিটির সদস্যরা নয়জন বোর্ড সদস্যের ব্যাংকিং বিষয়ে পরীক্ষা নেবার জন্য প্রস্তুত। বাস্তবে তাঁরা সুপারিশও করেছেন যে, ‘পরিচালকের জন্য যোগ্যতা ও উপযুক্ততার মাপকাঠি প্রণয়ন করা যেতে পারে।’ যে যোগ্যতা ও উপযুক্ততার মাপকাঠির কথা চিন্তা করে তাঁরা এই সুপারিশ করেছেন সে মাপকাঠিতে গ্রামের নয়জন গরীব মহিলা উত্তীর্ণ হতে পারবেন কিনা সেটা আগে জানা দরকার। তাঁরা মালিকদের প্রতিনিধিদের সংখ্যা নয়জন থেকে কমিয়ে ছয়জনে নামিয়ে আনার সুপারিশ করেছেন। তাঁদের সুপারিশ উল্টা হলেই সঙ্গত হতো। যেহেতু ব্যাংকের মালিকানার ৯৭ শতাংশ ঋণ গ্রহীতাদের কাছে, বোর্ডে তাঁদের সংখ্যাও সে অনুপাতে হওয়াটাই ন্যায্য হবে- এটাই সঙ্গত সুপারিশ হতো। অর্থাত্ তাঁদের সংখ্যা বাড়ানোর জন্য সুপারিশ করলে তা যুক্তিসঙ্গত হতো।

হ-বাংলা  : কমিটি গ্রামীণ ব্যাংকের অধ্যাদেশ পরিবর্তন করার সুপারিশ করেছে। কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী এই ব্যাংককে তাঁরা সরকারি ব্যাংকের আদলে দেখতে চান - এ বিষয়ে আপনার মতামত কী?

মুহাম্মদ ইউনূস : কমিটি গ্রামীণ ব্যাংক অধ্যাদেশ সংশোধনের প্রস্তাব করে এই ব্যাংককে পাকাপোক্ত সরকারি ব্যাংক হিসাবে দেখতে চান। সরকার যখন সরকারি ব্যাংককে বেসরকারি মালিকানায় দিয়ে দেবার জন্য বহুদিন চেষ্টা-প্রচেষ্টা  চালিয়ে যাচ্ছে, সেখানে এমন একটি ব্যাংক যেটা গরীব মহিলাদের মালিকানার একটা বেসরকারি ব্যাংক, যেটা একটা অনন্য ব্যাংক হিসাবে সারাবিশ্বে অনুকরণীয় হয়েছে, যেটা তার সাফল্যের জন্য শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছে- তাকে কেন সরকারি ব্যাংকে রূপান্তরিত করতে হবে এটার কোন ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া যায় না। সরকারি ব্যাংক হলে ব্যাংকগুলো ভালো চলে এরকম কোন ধারণা থেকে কি তাঁরা এমন প্রস্তাব করছেন?

এছাড়া কমিটিতে যাঁরা ছিলেন তাঁরা গ্রামীণ ব্যাংক বিষয়ে তাঁদের অভিজ্ঞতার সীমাবদ্ধতা, তাঁদের জন্য বরাদ্দকৃত সময়ের সীমাবদ্ধতা, সব কিছু মিলিয়ে তাঁদের সুপারিশগুলোকে গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে আনতে পারেননি। একটা প্রতিষ্ঠান যখন সুনামের সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছে, তার আইনকাঠামো, মালিকানা কাঠামো পরিবর্তনের জন্য ব্যস্ত হবারও বা কারণ কি? পরিবর্তন করার প্রয়োজনীয়তা থাকলে সেটা যাঁরা এই আইনের আওতায় এই ব্যাংক পরিচালনা করছেন তাঁদের পরামর্শে হওয়াই তো বাঞ্ছনীয় হবে।

হ-বাংলা  : আপনি যে দারিদ্র্য জাদুঘরে পাঠাতে চেয়েছেন সেই দারিদ্র্য বিমোচনে আপনার যে স্বপ্ন তা কিভাবে পূর্ণরূপ নেবে বলে আপনি মনে করেন।

মুহাম্মদ ইউনূস : পৃথিবীর বুক থেকে দারিদ্র্য মুছে দেয়া সম্ভব, দারিদ্র্যকে জাদুঘরে পাঠানো সম্ভব এ নিয়ে বিতর্ক করার কোন অবকাশ নাই।  কিন্তু কখন, কিভাবে তা করা যাবে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠে।  আমি আমার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।  অন্যরা তাদের প্রচেষ্টা জোরদার করবেন। কারো প্রচেষ্টা থেমে থাকবে না। সরকারকে তার প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। সরকার নাগরিকদের উদ্বুদ্ধ করে যাবে যাতে তারা তাদের উদ্যোগ সমষ্টিগতভাবে, ব্যক্তিগতভাবে চালিয়ে নিতে উত্সাহিত হয়। তাদের উদ্যোগের প্রতি সরকারের নীতিভিত্তিক সমর্থন থাকতে হবে। ব্যবসায়ী সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে। তারা এগিয়ে আসলে তাদের প্রযুক্তিকে দারিদ্র্য নিরসনের কাজে পাওয়া যাবে। আমি সামাজিক ব্যবসার ধারণাটা সবার কাছে তুলে ধরছি। আমি মনে করিয়ে দেবার চেষ্টা করছি যে, দারিদ্র্য দরিদ্রদের দ্বারা সৃষ্টি হয়নি। দারিদ্র্য সৃষ্টি হয়েছে অর্থনীতি বিষয়ে আমাদের তাত্ত্বিক কাঠামো থেকে, তার প্রয়োগের মাধ্যমে,  আমাদের ধারণাগত ভ্রান্তির কারণে।  তাত্ত্বিক কাঠামোতে পরিবর্তন না আনলে আমরা বাস্তব জগতে পরিবর্তন আনতে পারবো না।

হ-বাংলা  : গ্রামীণ ব্যাংক ও আপনার সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য বলে জানতো মানুষ। এখন এ পর্যায়ে এসে আপনার কেমন লাগছে?

মুহাম্মদ ইউনূস : গ্রামীণ ব্যাংক ও আমার জীবন মিশে গেছে। এখন ধাপে ধাপে গ্রামীণ ব্যাংককে এবং আমাকে পৃথকভাবে চলার আয়োজন করতে হবে।  হঠাত্ করে আমাদেরকে পৃথক করতে গেলে প্রতিষ্ঠানের উপর একটা বিরাট ধাক্কা আসবে। যেটা মোটেই মঙ্গলজনক হবে না।  এবিষয়ে একটা প্রস্তাব আমি ১৫ মার্চ, ২০১০ তারিখে লেখা একটা চিঠিতে মাননীয় অর্থমন্ত্রীর কাছে করেছিলাম।  সেই প্রস্তাব মতে অগ্রসর হওয়াটাই সব চাইতে মঙ্গলজনক হবে। এই চিঠিতে প্রস্তাব করেছিলাম যে, আমি ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ থেকে অবসর নেবো। এর পর আমাকে গ্রামীণ ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান করা হলে তাতে আমি ব্যাংকের সঙ্গে যুক্তও রইলাম, অথচ কোন নির্বাহী পদে থাকলাম না।  ব্যাংকের মধ্যেও আমার প্রস্থান নিয়ে অহেতুক অনিশ্চয়তা এবং জল্পনা-কল্পনার সুযোগ সৃষ্টি হবার সুযোগ থাকলো না।

হ-বাংলা  : গ্রামীণ ব্যাংককে আপনি ভবিষ্যতে কোন অবস্থায় দেখতে চান?

মুহাম্মদ ইউনূস : গ্রামীণ ব্যাংকের হাতে অনেক কাজ। সব চাইতে বড় কাজ হলো গ্রামীণ ব্যাংকের ঋণগ্রহিতাদের সন্তানদেরকে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করা এবং সে ভবিষ্যত্ তাদের হাতে তুলে দেয়া।  গ্রামীণ ব্যাংক একটা শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান।  এটা ৮৩ লক্ষ দরিদ্র পরিবারের সঙ্গে সাপ্তাহিক ভিত্তিতে সরাসরি যুক্ত। এই শক্তিকে ব্যবহার করতে পারলে এদের জীবনে নানা পরিবর্তন আনা সম্ভব। গ্রামীণ ব্যাংককে তার নিজস্ব আইন কাঠামোর অধীনে নিজস্ব স্বকীয়তা নিয়ে অগ্রসর হতে দিলেই সে এপথে অগ্রসর হতে পারবে। এটা গরীবের মালিকানায়, নারীদের পরিচালিত গরীবের নিজস্ব একটা ব্যাংক- এসত্য মেনে নিয়ে তাকে আইন কাঠামোর অধীনে স্বাধীনভাবে চলতে দেবার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। সরকার এর উপর প্রভাব খাটাতে গেলেই এটার মূল লক্ষ্য ব্যাহত হবে। গরীবের পরিচালনাকে কিভাবে আরো শক্তিশালী করা যায়, কার্যকর করা যায় সেটা নিয়ে আমরা চিন্তা ভাবনা করতে পারি, কিন্তু সরকারের মাধ্যমে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকা কোনক্রমেই সমীচীন হবে না। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে একে রাজনীতির সঙ্গে জড়িত করার অর্থই হবে এর পতন নিশ্চিত করা। আমরা বহুদিন থেকে বলে আসছি যে বোর্ডের চেয়ারম্যান নিয়োগের ক্ষমতা বোর্ডের উপর ছেড়ে দিতে। চেয়ারম্যান এখন সরকার নিয়োগ করেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে গ্রামীণ ব্যাংকের আইন সেভাবে সংশোধনও হয়েছিল। কিন্তু সে সংশোধনী সংসদে উত্থাপিত না-হওয়ায় আবার আগের আইনে ফিরে যেতে হয়েছে। গ্রামীণ ব্যাংকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে আইনের সে সংশোধনীকে আবার বহাল করতে হবে। অর্থাত্ চেয়ারম্যান নিয়োগের ক্ষমতা বোর্ডের হাতে ছেড়ে দিতে হবে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিকল্প  নেই

হ-বাংলা  : স্যার এবার দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে একটু কথা বলি। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নিয়ে বর্তমানে জোরালো বিতর্ক চলছে। একটা হরতালও হয়ে গেছে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতি সম্পর্কে আপনি কি ভাবছেন?

মুহাম্মদ ইউনূস : বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পটভূমিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া বিকল্প কিছু নেই। যত দিন এই রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন না হবে ততদিন এই কাঠামো থেকে আমরা বের হতে পারবো না। এই নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি করলেই দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা, এমনকি সহিংসতা সৃষ্টি হতে পারে। এ বিতর্কে দেশকে যেন আবারও  ঠেলে দেয়া না হয়।

হ-বাংলা  : আপনাকে ধন্যবাদ।

মুহাম্মদ ইউনূস : তোমাদেরকেও ধন্যবাদ।

 
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ