মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার দখলে নিচ্ছে মিয়ানমার ও নেপাল

June 10, 2011, 9:56 AM, Hits: 2444

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার দখলে নিচ্ছে মিয়ানমার ও নেপাল

skyline_of_kuala_lumpur_malaysia_-_SaKiL

দীন ইসলাম : মালয়েশিয়া থেকে : মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার দখল করে নিচ্ছে তাদেরই পার্শ্ববর্তী মিয়ানমার ও নেপাল। বাংলাদেশী শ্রমিকদের সঙ্গে দুই, তিন বা চার বছরের চুক্তির পর বর্তমানে নতুন তা নবায়ন করছে না মালয়েশিয়া অভিবাসন কর্তৃপক্ষ। তাই বাংলাদেশী শ্রমিকের বিকল্প হিসেবে তারা অধিক সংখ্যায় নেপাল বা মিয়ানমারের শ্রমিকদের বেছে নিচ্ছেন। এর পাশাপাশি ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও পাকিস্তানের শ্রমিকদেরও একটি অংশ ওই দেশে যাচ্ছে। তবে তা সংখ্যায় উল্লেখ করার মতো নয়।

নতুন এসব শ্রমিক মালয়েশিয়ার গার্মেন্টস, কাঠ ফ্যাক্টরি, কৃষি, শিল্প, গ্লাভসসহ বিভিন্ন কোম্পানিতে কাজ করছেন। বিভিন্ন দেশের এসব শ্রমিক নিজ দেশ থেকে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ নিয়ে আসায় কাজের শুরুতেই মালিকদের মন জয় করছেন। মালয়েশিয়ায় বসবাসরত ও দেশে ফিরে আসা কয়েক জন বাংলাদেশী শ্রমিকদের সঙ্গে আলাপ করে এসব তথ্য জানা গেছে। তারা জানান, বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেয়ার ব্যাপারে মালয়েশিয়ার কোম্পানিগুলোর মালিকদের বর্তমানে আগ্রহ নেই।

নিষেধাজ্ঞা থাকায় এটা এখন শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে। তারা নেপাল বা মিয়ানমারের শ্রমিকদের দিকে ঝুঁকছেন বেশি। কারণ ওই দু’দেশের শ্রমিকরা নিয়মিত কাজ করেন। মালিকের সঙ্গে কোন ধরনের তর্কে জড়ান না। কুয়ালালামপুরে নতুন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলসিসিটিতে বসে কথা হয় বরিশালের অধিবাসী রাসেলের সঙ্গে। তিনি মালয়েশিয়ার যহোর বাহারোর আরমানিয়া কোম্পানিতে কর্মরত ছিলেন। তিনি জানালেন, বাংলাদেশী শ্রমিকদের রাখতে চাইছে না মালয়েশিয়া সরকার। এর বদলে তারা নেপালি ও মিয়ানমারের শ্রমিকদের ঢুকাচ্ছেন। মালয়েশিয়ানদের বক্তব্য, তাদের দিয়ে অনেক কাজ করানো যায়। তিনি জানান, বাঙালিরাই বাঙালিদের শক্র।

একজন আরেক জনের ভাল দেখতে পারেন না। শক্রতা থাকলে চুক্তি নবায়নে বাধা দেন বাঙালিরাই। মালয়েশিয়ার বিখ্যাত ব্রান্ড শপ ‘ই ওয়ান’ কোম্পানিতে কাজ করেন যশোরের সেলিম মিয়া। চুক্তি নবায়ন না করায় এখন তিনি দেশে ফিরে আসার অপেক্ষায় রয়েছেন। তিনি জানালেন, মালয়েশিয়ান হারবেস্টের ‘ই ওয়ান’ কোম্পানিতে গত এক বছর আগেও ৪২০০ বাঙালি শ্রমিক কাজ করতাম। এখন ওই কোম্পানিতে মাত্র ২২০০ বাঙালি শ্রমিক কাজ করছেন। বাকি জায়গায় নেপালি শ্রমিকদের দিয়ে পূরণ করা হয়েছে। সেলিম জানালেন, দেশে ফিরে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছি।

আগামী জানুয়ারিতে দেশে ফিরবো। এখনই দেখতে পাচ্ছি আমাদের শূন্যস্থানে নেপালি শ্রমিকরা হাজির। দেশে ফিরে আসতে এয়ারপোর্টে আসার আগেই তাদের কাজে লাগিয়ে দেয়া হচ্ছে। তিনি জানান, নেপালি শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে আমরা জেনেছি মালয়েশিয়া আসতে তাদের মাত্র ৮০ হাজার টাকা (বাংলাদেশী টাকায়) খরচ করতে হয়েছে। একই সঙ্গে কোন ধরনের দালালদের উৎপাত নেই। মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ার শ্রমিক সেলিম জানালেন, মিয়ানমারের শ্রমিকদের ‘ইউনো কার্ড’ দেয়া হয়। এ কার্ড ব্যবহার করে তারা সাত থেকে আটটি দেশে যেতে পারেন। মালয়েশিয়াতে কাজ করতেও তাদের কোন ধরনের ওয়ার্ক পারমিট নিতে হয় না। মালয়েশিয়ার চিংহাইয়ের স্কাইউড কোম্পানিতে কর্মরত ছিলেন দিনাজপুরের চিরিরবন্দর এলাকার কামাল পাশা ফজলুল হক। তিনি জানালেন, অন্য দেশ থেকে শ্রমিক নেয়ার জন্য মাঠ তৈরি করতে ব্যস্ত মালয়েশিয়া পুলিশ ও তাদের দেশের বিশেষ বাহিনী ‘রেলার’। বাংলাদেশী শ্রমিকদের ভিসার মেয়াদ থাকলেও যখন তখন তাদের ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

ক্যাম্পে আটকে রাখা হচ্ছে মাসের পর মাস। বিষয়গুলো মালয়েশিয়াতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস জেনেও কিছুই করছেন না। ওদিকে লঙ্কাউই ও পেনাংয়ে বসবাসরত বাংলাদেশী শ্রমিকদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, সমুদ্রবেষ্টিত ওই দুই এলাকার হোটেল পরিষ্কার বা বয় হিসেবে বাঙালিরা কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। এজন্য মাঝে মধ্যেই মালয় বা চাইনিজ হোটেল মালিকের সঙ্গে তারা গোলমাল বাঁধিয়ে দেন।

মালিকের সঙ্গে গণ্ডগোল বাঁধিয়ে দেয়ায় বাংলাদেশী শ্রমিকদের বাধ্য হয়ে দেশে ফিরে আসতে হচ্ছে। লঙ্কাউই সমুদ্র সৈকতের পাশে এবি মোটেলে কর্মরত মানিকগঞ্জের শ্রমিক নূর হোসেন তালুকদার জানালেন, বাঙালি শ্রমিকদের মধ্যে অহমিকাবোধ বেশি। তারা পরিষ্কার- পরিচ্ছন্নতার কাজ করতে চান না। অন্য দিকে নেপালি শ্রমিকরা সব ধরনের কাজ করেন। তারা ‘না’ শব্দটি করেন না। এজন্য তাদের কদর বেশি। দিন দিন মালয়েশিয়ার শ্রম বাজারে তাদের গুরুত্ব বাড়ছে। কুয়ালালামপুরের পুটুরিয়ায় অবস্থিত বিখ্যাত চেইন শপ ‘মাই ডিন’-এ কথা হয় প্রতিষ্ঠানটির ম্যানেজার ও মিয়ানমারের নাগরিক শিপ্পনের সঙ্গে। তিনি জানালেন, অনেক দিন আগেই মালয়েশিয়া সরকার মিয়ানমারের অধিবাসীদের নাগরিকত্ব দিতে চেয়েছিল। তবে ওই সুযোগ মিয়ানমারের নাগরিকরা গ্রহণ করেনি। পাশাপাশি দেশ থাকায় আমাদের প্রতি মালয়েশিয়ার সফট কর্নার হয়তো থাকতে পারে। এজন্যই আমাদের আলাদা চোখে দেখে তারা কাজ করার সুযোগ করে দিচ্ছেন।


অবৈধদের বৈধ করলে নতুন শ্রমিক নেবে না মালয়েশিয়া

নতুন করে আর বিদেশি শ্রমিক না নেওয়ার কথা বিবেচনা করছে মালয়েশিয়া সরকার। সরকারের আগের ঘোষণা অনুযায়ী দেশটিতে বর্তমানে অবৈধভাবে বসবাসরত প্রায় ২০ লাখ বিদেশি শ্রমিককে যদি বৈধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তবেই এমনটা ঘটতে পারে বলে গতকাল বৃহস্পতিবার জানিয়েছেন সরকারি এক কর্মকর্তা। চলতি মাসের শেষ দিকেই এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বিদেশি শ্রমিক আমদানির ক্ষেত্রে মালয়েশিয়া এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম বৃহৎ। বিশেষ করে কৃষি, নির্মাণ শিল্প ও অন্যান্য খাতের কাজে এসব বিদেশি শ্রমিককে নিয়োগ দেওয়া হয়। শ্রমিকদের বেশির ভাগই দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের।


স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ডেপুটি সেক্রেটারি জেনারেল রাজা আজাহার রাজা আবদুল মানাপ জানান, অবৈধভাবে বসবাসরত ২০ লাখ বিদেশি শ্রমিককে সাধারণ ক্ষমা এবং তাদের কাজের অনুমতি দেওয়া হবে কি না, এ ব্যাপারে আগামী ২২ জুন মন্ত্রিসভার বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। সরকারের হিসাব অনুযায়ী দেশটিতে ২০ লাখ বৈধ এবং ২০ লাখ অবৈধ শ্রমিক রয়েছে।
রাজা আজাহার জানান, অবৈধ শ্রমিকদের বৈধ করার বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে প্রথম প্রস্তাব ওঠে গত বছর। তিনি বলেন, সরকার যদি 'সাধারণ ক্ষমা'র প্রস্তাবটি পাস করে, তবে নতুন শ্রমিক আমদানি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।


সিদ্ধান্তটি অনুমোদিত হলে যেসব শ্রমিকের কাগজপত্র নেই, তাদের মালয়েশিয়া থাকতে হলে নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান জোগাড় করতে হবে। ওই কম্পানিকে তাদের জামিনদার হতে হবে। আজাহার বলেন, 'অবৈধ শ্রমিকদের আমরা একটা সুযোগ দিচ্ছি। যদি তারা কাজ করতে চায়, তবে স্পন্সর (জামিনদার) জোগাড় করে আবেদন করতে হবে।'
অবৈধ শ্রমিকদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হলেও তা কত দিনের জন্য বহাল থাকবে কিংবা কোন কোন খাতের শ্রমিকের বেলায় প্রযোজ্য হবে, এ ব্যাপারে কিছু জানাননি আজাহার। ২২ জুনের বৈঠকে প্রস্তাবটি অনুমোদন পেলে ১ জুলাই থেকেই তা কার্যকর করা হবে।


এর আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিশামুদ্দিন হুসেইন গত সপ্তাহে জানান, শ্রমিক সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে সাধারণ ক্ষমার প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে। তবে কোনো মানবপাচারকারী এ আইনের সুযোগ নিতে পারবে না।







 
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ