এখনো দাসত্বের শিকলে বন্দি চা শ্রমিকরা

June 12, 2011, 5:39 PM, Hits: 2560

এখনো দাসত্বের শিকলে বন্দি চা শ্রমিকরা


হ-বাংলা নিউজ : ব্রিটিশদের শোষণ-নির্যাতন থেকে মুক্তির আশায় চা শ্রমিকরা প্রায় ৯০ বছর আগে ‘মুল্লুকে চলো’ বা ‘বাড়িতে চলো’ আন্দোলনের ডাক দিয়েছিল। ব্রিটিশ গোর্খা বাহিনী বন্দুকের নল চেপে ধরেছিল আন্দোলনকে ঘিরে। ১৯২১ সালের ২০ মে চাঁদপুর জাহাজঘাটে নির্বিচারে গুলি করে মারা হয়েছিল শত শত চা শ্রমিককে। এই শ্রমিকরা তাদের আদিভূমিতে ফিরে যাওয়ার জন্য সিলেট ও আসামের বিভিন্ন বাগান থেকে বিদ্রোহ করে সপরিবারে রওয়ানা হয়েছিল। কিন্তু বন্দুকের কাছে তারা পরাজিত হয়। সেই পরাজয়ের বৃত্তে এখনো তারা বন্দি। শোষণমুক্তি তাদের ভাগ্যে জোটেনি। দাসত্বের শিকলেই বাঁধা তাদের জীবন। বেদনাবিধুর ঐ দিনকে প্রেরণা হিসেবে নিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয়ে গত শুক্রবার সিলেট অঞ্চলের বিভিন্ন বাগানে চা শ্রমিকরা ‘মুল্লুকে চলো’ দিবস পালন করেছে। কর্মসূচি পালনকালে তারা কিছু দাবি তুলে ধরেছে। এরমধ্যে রয়েছে— চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ন্যূনতম ১০০ টাকা নির্ধারণ, রেশন হিসেবে ৫ কেজি চাল ও মাসে ২ কেজি চা পাতা প্রদান, বাগানে ওএমএস চালু, প্রতিটি বাগানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন, আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণ, শ্রমিকদের ভূমির স্থায়ী মালিকানা প্রদান, ২৬ ধারাসহ শ্রমিক স্বার্থবিরোধী সব কালো আইন বাতিল, ২০ মে চা শ্রমিক দিবস রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন ও ছুটি ঘোষণা ইত্যাদি।


সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা যায়, ব্রিটিশ শাসনামলে ১৮৪০ সালের দিকে আসাম, সিলেট, চট্টগ্রামের পাহাড়ি অঞ্চলে চা চাষের সূচনা হয়। ১৮৫৪ সালে সিলেটের মালনীচড়ায় এই অঞ্চলের প্রথম বাণিজ্যিক চা বাগানের যাত্রা হয়। চা চাষে কঠোর পরিশ্রম করতে হয় বিধায় শ্রমিক সংকট দেখা দেয়ায় ইংরেজ মালিকরা শ্রমিক সংগ্রহের নতুন পন্থা বের করে। তারা বিভিন্ন লোভনীয় প্রস্তাব দিয়ে ভারতের অভাবপীড়িত বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আজীবন কাজ করার শর্তে শ্রমিক সংগ্রহ শুরু করে। চা গাছে নাড়া দিলেই টাকা ঝরে— এমন কথা বলে সাঁওতাল, মুন্ডা, কোলবিল, কুর্মী, বাউরি, ননিয়া, কাহার, দেশোয়াল, লোহার, ভূমিজ, কৈরি ইত্যাদি আদিবাসী গোষ্ঠীর শ্রমিকদের বিহার, উড়িষ্যা, মাদ্রাজ, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ প্রভৃতি অঞ্চল থেকে নিয়ে আসা হয়। তাদের দিয়ে বড় বড় পাহাড়ের জঙ্গল পরিষ্কার করে চা গাছ রোপণ করানো হয়। চা বাগান সৃজন করতে গিয়ে পাহাড়ে বন্যপ্রাণীর আক্রমণ আর নানা অসুখ-বিসুখে কত শ্রমিক যে মারা গেছে তার হিসাব নেই। কোনো শ্রমিক কাজে অনীহা দেখালে বা চলে যেতে চাইলে তার ওপর নেমে আসত অমানবিক নির্যাতন। অন্যদিকে, শ্রমিকরা যাতে কিছু টাকা-পয়সা সঞ্চয় করে চলে যেতে না পারে সেজন্য তাদের দেয়া হতো নামমাত্র মজুরি। এই মজুরি দিয়ে এক বেলা খাবার জোগাড় করাও কঠিন। পাশাপাশি শ্রমিকদের মদ খাইয়ে মাতাল করে রাখার অপকৌশলও নিয়েছিল ইংরেজ মালিকরা। প্রতিটি বাগানেই অত্যন্ত নিম্নমানের মদের কারখানা গড়ে তোলা হয়। চা শ্রমিক নারী-পুরুষরা সারাদিন হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে রাতে মদ খেয়ে বুঁদ হয়ে থাকে। মাতাল করে রাখার এই ধারা আজো অব্যাহত আছে সব চা বাগানে। পাশাপাশি চা শ্রমিকদের সন্তানদের কৌশলে শিক্ষা থেকেও দূরে রাখা হয়। এখনো বাগানে নামমাত্র স্কুল প্রতিষ্ঠিত হলেও এসব স্কুলে লেখাপড়ার খুব একটা সুযোগ নেই চা শ্রমিক সন্তানদের।


মালিকদের অত্যাচার-নির্যাতন আর মানবেতর জীবন থেকে মুক্তি পেতে ১৯২১ সালে সিলেট ও আসাম অঞ্চলের বিভিন্ন বাগানের চা শ্রমিকরা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। তারা ‘মুল্লুকে চলো’ আন্দোলনের ডাক দেয়। এতে নেতৃত্ব দেন চা শ্রমিক নেতা পণ্ডিত দেওশারন, গঙ্গা দীক্ষিত প্রমুখ।


এদিকে দিবসটি উপলক্ষে গতকাল চা শ্রমিক সংগঠন ও সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্ট সিলেট ও মৌলভীবাজারের বিভিন্ন বাগানে কর্মসূচির আয়োজন করে। কর্মসূচিতে চা শ্রমিকরা তাদের অভিশপ্ত জীবন থেকে মুক্ত করার আকুতি জানায়। চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক রাজভজন কৈরি বলেন, ব্রিটিশ আমলে চা শ্রমিকরা যেমন নিষ্পেষিত ছিল, আজো তেমনই আছে। চা শ্রমিকদের মানবেতর জীবনের দিকে কেউই নজর দেয়নি। তিনি চা শ্রমিকদের মৌলিক দাবি-দাওয়া পূরণে সরকার ও মালিকপক্ষকে এগিয়ে আসার অনুরোধ জানান।

 

 

 
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ