ঘুষ শেখায় শিক্ষা ভবন

June 16, 2011, 7:21 AM, Hits: 3216

ঘুষ শেখায় শিক্ষা ভবন

http://www.kalerkantho.com/admin/news_images/552/image_552_162772.jpg

হ-বাংলা নিউজ : ঢাকা থেকে : নিরীহ চেহারার লোকটির বয়স ৫০-এর কাছাকাছি হবে। ভবনের মূল গেট দিয়ে ঢুকতে গিয়েই ধাক্কা খেলেন দায়িত্বরত আনসার সদস্য শহিদুলের হাতে। তিনি প্রায় পড়েই যাচ্ছিলেন। কোনোমতে সামলে উঠে একটু ধাতস্থ হয়ে আনসার সদস্যকে বললেন, 'বাবা, আমি নীলফামারী থেকে এসেছি। আমাকে একটু ভেতরে যেতে দেন।'
কাছে গিয়ে জানা গেল, তিনি একজন শিক্ষক। নীলফামারীর একটি মাধ্যমিক স্কুলে শিক্ষকতা করেন। মাস ছয়েক আগে উচ্চতর বেতন স্কেল পাওয়ার জন্য আবেদন করেছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত ওই আবেদনের কোনো সাড়া পাননি। তাই বিষয়টার খোঁজ করতে এসেছেন ঢাকার হাইকোর্ট মোড়ের শিক্ষা ভবনে। মানুষ গড়ার কারিগর এই শিক্ষক শিক্ষা ভবনে এসেই প্রথম ধাক্কা খেলেন প্রহরীর কাছে। তখনো তিনি বুঝে উঠতে পারেননি, তাঁর জন্য অপেক্ষা করছে আরো 'ধাক্কা'।
এরপর তাঁর আসার কারণটা অনেক অনুনয়-বিনয় করে জানালেন প্রহরী আনসারকে। আনসার সদস্য শহিদুল তখন এই শিক্ষককে পাঠালেন পাশের 'তাৎক্ষণিক সেবাকেন্দ্রে'। সেখানে গিয়ে শিক্ষক কেন শিক্ষা ভবনে এসেছেন, তার পুরো বর্ণনা দিলেন। সব শুনে সেবাকেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসেন বললেন, 'এসব কাজে এখানে আসতে হলে স্কুলের প্রধান শিক্ষকের প্রত্যয়নপত্র লাগে। সেটা কি এনেছেন?'
শিক্ষক 'না' বলার সঙ্গে সঙ্গে কর্মকর্তা বললেন, 'ভেতরে যেতে পারবেন না। এই খাতায় নিজের নাম ও স্কুলের নাম লিখে যান। আমরা পরে সংশ্লিষ্ট শাখায় পাঠাব। আপনি বাড়ি চলে যান, আপনার কাজ হয়ে যাবে।'
বিফল মনোরথে শিক্ষক সেবাকেন্দ্র থেকে বেরিয়ে এলেন। রাস্তায় গিয়ে দাঁড়ালেন। একটু সময় কাটালেন। একজন এসে ফিসফিস করে কিছু একটা বললেন। তখন শিক্ষক পরে আবার গেটে গিয়ে সেই আনসার সদস্য শহিদুলের সঙ্গে হাত মেলানোর নাম করে ৫০ টাকা গুঁজে দিলেন এবং এরপর অনায়াসে শিক্ষা ভবনের দোতলায় অবস্থিত মাধ্যমিক শাখার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কক্ষে যাওয়ার সুযোগ পেয়ে গেলেন তিনি। তাঁকে অনুসরণ করে দেখা গেল, ওই শাখার কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করেই তিনি চলে এলেন অফিস সহকারীদের একজন মনিরুল ইসলামের কাছে। এসে বললেন, 'ছয় মাস ধরে ঘুরছি। কিন্তু উচ্চতর স্কেল আর পাই না।'
শিক্ষককে উচ্চতর স্কেল পাইয়ে দেবেন বলে কথা দিলেন মনিরুল ইসলাম। বিনিময়ে তাঁকে ঘুষ দিতে হবে ৪৫ হাজার টাকা। শিক্ষক রাজি হয়ে বললেন, 'আগে স্কেল পাই, তারপর আপনার টাকা দেব।'
কিন্তু মনিরুল এতে রাজি নন। এ নিয়ে চা খাওয়ার নাম করে শুরু হলো উভয় পক্ষে আলোচনা। কিন্তু শেষ রফা কী হলো, তা আর জানা গেল না।
একই দিন গত ৩১ মে বগুড়া থেকে শিক্ষা ভবনে আসেন আরেক শিক্ষক। তিনি চুক্তি করলেন নূরে আলম নামের একজন অফিস সহকারীর সঙ্গে। তাঁর চুক্তির বিষয় হচ্ছে উচ্চতর স্কেলে বেতন তোলার যাবতীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা। এ জন্য নূরে আলমকে ওই শিক্ষক দেবেন ৬০ হাজার টাকা।
এর কিছুক্ষণ আগেই হবিগঞ্জ থেকে আরেক শিক্ষক আনসার সদস্য আরিফের হাতে ৫০ টাকা গুঁজে দিয়ে সরাসরি চলে যান শিক্ষা অধিদপ্তরের মাধ্যমিক শাখায়। ফিরে আসার পর তাঁর কাছ থেকে জানা গেল, তিনি এমপিওভুক্তির জন্য এক অফিস সহকারীর সঙ্গে এক লাখ টাকার মৌখিক চুক্তি করে এলেন।
দেশের প্রায় ৩০ হাজার সরকারি-বেসরকারি মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান; ইবতেদায়ি, দাখিল ও আলিম মাদ্রাসার প্রায় ১০ লাখ শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী আছেন। তাঁদের চাকরিসংক্রান্ত যাবতীয় কাজ ঢাকার এই শিক্ষা ভবনের কবজায়। সারা দেশ থেকে প্রতিদিন এখানে নানা কাজে আসেন গড়ে প্রায় আড়াই হাজার শিক্ষক। আবার এই ভবনের কর্মকর্তারাও সবাই শিক্ষক। সরকারি কলেজ (বিসিএস শিক্ষা ক্যাডার) ও মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষকরা প্রেষণে পদায়ন হন এখানে। কথায় বলে, কাক কাকের মাংস খায় না। কিন্তু এই শিক্ষা ভবনে যে খায়, তা ওপরের তিনটি চিত্র থেকেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে শিক্ষা ভবনে এসে শিক্ষাগুরুদের ঘুষের ধাক্কা সামলানোর নানা মর্মান্তিক কাহিনী। এই ভবনে ঘুষ ছাড়া কোনো কাজ হতে চায় না। একশ্রেণীর শিক্ষক কর্মকর্তা বনে গিয়ে এখানে বসে নিরীহ শিক্ষকদের বছরের পর বছর ধরে শিখিয়ে যাচ্ছেন ঘুষ কাকে বলে, কত প্রকার ও কী কী!
ঘুষ দেওয়াও তো অপরাধ_এর জবাবে হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার গাজীপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রভাষক আবদুর রউফ অসহায়ের মতো বললেন, 'ঘুষ না দেওয়ায় আমার টাইম স্কেলের ফাইল হারিয়ে গিয়েছিল। দুই মাস ঘুরে পরে ঘুষ দেওয়ায় ফাইল পাওয়া যায়। আমরা ঘুষ দিতে বাধ্য হই।'
অনুসন্ধানে জানা যায়, শিক্ষা ভবন নামে পরিচিত এই মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরে (মাউশি) শিক্ষকদের এমপিওভুক্তির জন্য নির্ধারিত ঘুষের পরিমাণ সর্বোচ্চ দেড় লাখ টাকা, টাইম স্কেলের জন্য ৫০ থেকে ৮০ হাজার টাকা, উচ্চতর স্কেলে বেতনের জন্য ৫০-৬০ হাজার টাকা, পদোন্নতির জন্য ২০ হাজার টাকা, বদলির জন্য সর্বোচ্চ তিন লাখ টাকা। এ ভবনে ঘুষ লেনদেন নিয়ে যখন একটু হৈচৈ হয়, তখন ঘুষের কৌশল পাল্টে যায়। তখন আর ভবনে বসে নয়, পল্টন ও তোপখানার কয়েকটি হোটেলে চা-পান-সিগারেট খাওয়ার ছলে চলে ঘুষ বিনিময়। এ ছাড়া শিক্ষা ভবনে রয়েছে দালালচক্র। দালালের উৎপাত এতই বেশি যে, এদের খপ্পরে পড়ে সহজ-সরল শিক্ষকদের সর্বস্বান্ত হওয়ার খবর পাওয়া যায়।
তদন্ত কমিটি : মাউশি বা শিক্ষা ভবনের এসব দুর্নীতি চিহ্নিত করার জন্য দফায় দফায় তদন্ত কমিটি হয়। কিন্তু তাদের সুপারিশ অনুযায়ী দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। মাউশির এসব দুর্নীতিতে কারা জড়িত, তা চিহ্নিত করার জন্য গত বছরের জুন মাসে একই দপ্তরের পরিচালক (মনিটরিং অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশন) অধ্যাপক দিদারুল আলমকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। ওই কমিটির প্রতিবেদনে দুর্নীতি বন্ধে বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়েছিল। এক বছরেও সেসব সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হয়নি। এ অবস্থায় গত ৫ মে একই ব্যক্তিকে প্রধান করে তিন সদস্যের আরো একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিকে সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। কিন্তু এখনো সেই প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে।
দুটি তদন্ত কমিটিরই প্রধান অধ্যাপক দিদারুল আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, 'বিভিন্ন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছর তদন্ত করতে গিয়ে দেখলাম, সবাই বলছে শিক্ষা ভবনে ঘুষ না দিলে কোনো কাজ হয় না। যখন জানতে চাই, কার কাছে কত টাকা ঘুষ দিয়েছেন, বলুন। তখন আর কেউ নাম বলেন না। এ অবস্থায় তদন্ত করা খুব কঠিন। এ ছাড়া মাধ্যমিক, কলেজ ও মাদ্রাসা শাখার সব অফিস সহকারীকে ঘুষের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করেছি। কিন্তু সবার উত্তরের ধরন দেখে মনে হয়েছে, তারা সবাই ধোয়া তুলসীপাতা।' তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ সম্পর্কে তিনি বলেন, 'ওই প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়েছিল, কোনো অফিস সহকারীকেই ছয় মাস বা এক বছরের বেশি এক টেবিলে রাখা যাবে না। আন্তদপ্তর বদলি করতে হবে। এতে দুর্নীতি হয়তো বন্ধ হবে না, কিন্তু কমে যাবে বলে আমি মনে করি।' মে মাসের তদন্ত সম্পর্কে তিনি বলেন, কাজ চলছে। তাড়াতাড়িই প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।
মহাপরিচালকের 'মহান' নজর : মাউশির মহাপরিচালক অধ্যাপক মো. নোমান উর রশীদ কালের কণ্ঠকে বলেন, 'একসময় শিক্ষা ভবন শতভাগ দালাল পরিবেষ্টিত ছিল। অতীতে যেসব দালাল ছিল, তাদের বের করে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ভিজিল্যান্স টিম গঠন করা হয়েছে। এ টিমের সদস্যরা কিছুক্ষণ পরপরই পুরো ভবন পরিদর্শন করেন। ফলে দালালরা দূর হয়ে যায়। এ ছাড়া ঘুষদাতা ও গ্রহীতারা আতঙ্কে থাকেন।' তিনি আরো বলেন, 'প্রত্যেক কর্মকর্তাকে নির্দেশ দিয়ে বলা হয়েছে, ফাইল যেন জমে না থাকে। আগের দিনের ফাইল যদি কোনো কারণে পরের দিন গিয়ে কোনো কর্মকর্তার কক্ষে পাওয়া যায় তাহলে ওই কর্মকর্তাকে জবাবদিহি করতে হয়। এর ফলে এখন আর কোনো কর্মকর্তার কক্ষেই ফাইল থাকে না।' এভাবে দুর্নীতিও কমে গেছে বলে দাবি করেন তিনি। তিনি বলেন, 'কর্মচারীদের আন্তদপ্তর বদলি সম্ভব নয়। কারণ এটা বিধিতে নেই।'
শিক্ষক নেতার কঠোর উক্তি : শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ মো. সেলিম ভুঁইয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, 'শিক্ষা ভবনের দুর্নীতির কথা বলে লাভ নেই। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পেঁৗছেছে যে, ভবনটির দেয়ালও এখন ঘুষ খাওয়া শুরু করেছে। এসব ঘুষের খবর শিক্ষামন্ত্রীর কাছে পেঁৗছানো হয় না।' তিনি আরো বলেন, 'যে দপ্তরের মহাপরিচালকই ঘুষের ভাগ নেন, সেই দপ্তর কতখানি সৎ থাকে? অথচ এই ব্যক্তিকেই সরকার মহাপরিচালকের পদে এক বছরের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছে!'
জবাব নেই মহাপরিচালকের : শিক্ষক নেতা অধ্যক্ষ মো. সেলিম ভুঁইয়ার বক্তব্যের জবাবে মাউশি মহাপরিচালক অধ্যাপক মো. নোমান উর রশীদ কোনো জবাব দেবেন না বলে কালের কণ্ঠকে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, 'শিক্ষকরাই বিচার করবেন, আমি কেমন।'
হারিয়ে যায় কাগজ : গত ২৪ মে সিলেটের নবীগঞ্জ থেকে একজন শিক্ষক শিক্ষা ভবনের মাধ্যমিক শাখায় আসেন একটি অভিযোগের তদন্তের বিষয়ে কথা বলতে। এক মাস আগেও তাঁকে এখান থেকে বলা হয়েছে, আবেদনের ফটোকপি দিয়ে যান, পরে দেখা হবে। এবারও একই কথা শুনে নিচে এসে এই প্রতিবেদকের সামনে দাঁড়িয়ে দুঃখের কথা বলতে বলতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে গালি দিয়ে শিক্ষা ভবন ছেড়ে যান।
কাগজ কোথায় যায়, জানতে চাইলে মাউশির পরিচালক (কলেজ ও প্রশাসন) অধ্যাপক দীপক কুমার নাগ কালের কণ্ঠকে বলেন, 'কাগজ হারিয়ে যাওয়ার কোনো অভিযোগের প্রমাণ দেখাতে পারলে আমি আর এ ভবনে চাকরিই করব না।'
ঘুষের আরেক কৌশল : মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলা থেকে এক কলেজশিক্ষক এ প্রতিবেদককে জানান, শিক্ষা ভবনের কলেজ শাখার এক কর্মচারী তাঁর এমপিওভুক্তির কাজ করে দেবেন বলে এক লাখ টাকা নিয়েছেন। ঢাকার তোপখানার একটি হোটেলে বসে এ টাকা দিয়েছেন তিনি। কিন্তু ছয় মাস পরও তাঁর সেই কাজ হয়নি। হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার এক শিক্ষক বলেন, 'আমি ইনক্রিমেন্ট পাওয়ার জন্য মাধ্যমিক শাখার এক কর্মচারীকে পল্টন মোড়ে ৭৫ হাজার টাকা দিয়েছি। তিন মাস হয়ে গেছে। কিন্তু কাজ হয়নি।'
অভিযোগকারীদের কেউ ঘুষখোর কর্মচারীদের নাম বলতে রাজি হননি। তাঁদের ভাষ্য, তাঁদের নাম বললে কোনো দিনই কাজ হবে না। কোনো আবেদন জমা দিলেই তাঁরা গায়েব করে দেবেন।
ঘুষের মাধ্যম যারা : মাউশিতে আসা শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে এখানকার কলেজ ও প্রশাসন শাখা, মাধ্যমিক শাখা ও মাদ্রাসা শাখায় কর্মরত অফিস সহকারীদের মাধ্যমে ঘুষের লেনদেন হয় বেশি। যাঁদের নাম পাওয়া গেছে, তাঁরা হলেন মাধ্যমিক শাখার জাকির হোসেন মলি্লক, মনোয়ার হোসেন, মনিরুল ইসলাম, আলী আহমেদ, সৈয়দ লিয়াকত আলী ও নূরে আলম; মাদ্রাসা শাখার জাহিদুল ইসলাম, আবদুল খালেক, আবদুল আজিজ, গোলাম রসুল, নিজামুল কবির আর কলেজ শাখার মোস্তফা পাটোয়ারি। এ ছাড়া ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে কিছুদিন আগে মাউশি থেকে দুজন অফিস সহকারীকে বদলি করা হয়েছে। তাঁরা হলেন কলেজ শাখার কামরুজ্জামান ও মাধ্যমিক শাখার জাহাঙ্গীর। প্রথমজনকে বদলি করা হয়েছে ঢাকা কলেজে এবং দ্বিতীয়জনকে বদরুন্নেসা কলেজে।
আরো জানা গেছে, জাকির হোসেন মলি্লকের ঢাকায় দুটি বাড়ি রয়েছে। শিক্ষা ভবনে তাঁরই সহকর্মীরা বলেন, 'তিনি বাড়ি বানিয়েছেন ঘুষের টাকায়।'
এ বিষয়ে জাকির হোসেন মলি্লককে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, 'এটা মিথ্যা কথা। মাস শেষে যা বেতন পাই তা দিয়েই সংসার চালাই।'
অন্য অভিযুক্তরাও একই কথা বলেন।
বগুড়া থেকে আসা শিক্ষকের উচ্চতর স্কেলে বেতন পাওয়ার যাবতীয় প্রক্রিয়া ৬০ হাজার টাকা ঘুষের বিনিময়ে সম্পন্ন করার চুক্তির ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে অফিস সহকারী নূরে আলম তা অস্বীকার করে কালের কণ্ঠকে বলেন, 'কতজনই তো কত কথা বলে! সব কথা ধরতে নেই।'
আর নীলফামারী থেকে আসা শিক্ষক, যিনি ভবনে ঢুকতেই প্রহরীর ধাক্কা খেয়ে পরে ঘুষের চুক্তি করেন অফিস সহকারী মনিরুলের সঙ্গে, সেই চুক্তির বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে মনিরুল ইসলামও যথারীতি অস্বীকার করে জানান, কোনো শিক্ষকের সঙ্গে তিনি এভাবে চুক্তি করে কাজ করেন না। তিনি বলেন, 'ঘুষ নেওয়ার বিষয়ে শুধু আমাদের দোষারোপ করা হয়। অথচ শিক্ষকদের কাছ থেকে পরিচালনা কমিটির সদস্যরা, কর্মকর্তারা যে ঘুষ নেন, সেটা কেউ দেখে না!'
মাউশির সহকারী পরিচালক (বেসরকারি কলেজ) মো. জসিম উদ্দিনের বিরুদ্ধে এর আগে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে পত্রপত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হয়। তাঁর কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, 'আমি এসবের সঙ্গে জড়িত নই। আমার টেবিলে প্রচুর কাজ। অন্যদিকে তাকানোর সময়-সুযোগ আমার নাই।'
শিক্ষামন্ত্রীর ঝটিকা সফর : শিক্ষা ভবনের এই ঘুষ-দুর্নীতির কারণে গত বছরের জুন এবং চলতি বছরের জানুয়ারিতে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ ঝটিকা সফরে যান মাউশিতে। দুবারই তিনি একই কায়দায় ঘুষের বিরুদ্ধে কথা বলেন। তিনি বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারীর কক্ষে গিয়ে বলেন, 'আপনারা কি ঘুষ নেন? সাবধান! ঘুষ নেবেন না। আপনারা কে কী করেন, তার সব খবর আমার কাছে আছে।' শিক্ষামন্ত্রী দুই দিনে প্রায় চার ঘণ্টা অবস্থান করেন শিক্ষা ভবনে। শেষের দিন ভবন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরই বাইরে থেকে কাজে আসা কয়েকজন শিক্ষক এ প্রতিবেদককে প্রশ্ন করে বলেছিলেন, 'শিক্ষামন্ত্রী ভালো মানুষ। কিন্তু তিনি কি এভাবে ঘুষখোরদের ধরতে পারবেন?'
শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের কাছে এ ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, 'গত আড়াই বছরে শিক্ষাক্ষেত্রে ঘুষের পরিমাণ অনেক কমেছে। তার পরও আমরা চেষ্টা করছি ঘুষ-দুর্নীতি কমানোর জন্য। কিন্তু রাতারাতি পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।' তিনি আরো বলেন, 'ঘুষ নেওয়ার ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া ব্যবস্থা নিতে পারি না। যখনই প্রমাণ পাচ্ছি তখনই ব্যবস্থা নিচ্ছি।'
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, 'আমি অ্যাকশন নেব আর ঘুষ নেওয়া বন্ধ হবে, এটা মনে করি না। ঘুষ বন্ধ করতে হলে প্রয়োজন জনসচেতনতার। এটাই পারে ঘুষ-সংস্কৃতি বন্ধ করতে।'

 
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ