মোটর মেকানিক থেকে এখন চোখের ডাক্তার

June 17, 2011, 3:34 PM, Hits: 2810

মোটর মেকানিক থেকে এখন চোখের ডাক্তার


ইসমত মর্জিদা ইতি : চট্টগ্রাম থেকে : মোটর মেকানিক দিদারুল ইসলাম এখন চট্টগ্রামের নিউ আগ্রাবাদ কমিউনিটি চক্ষু হাসপাতালে চোখের ডাক্তার। তিনি নিয়মিত রোগী দেখেন এবং চোখের ছানি অপারেশনসহ বিভিন্ন ধরনের অপারেশন করেন। ৫০ টাকা দিয়ে নাম এন্ট্রি করানোর পর কম্পিউটারে টেস্ট করার জন্য তাকে আরো দিতে হয় ১০০ টাকা। পরে তার চেম্বার থেকেই রোগীদের ৫০০-৬০০ টাকার ওষুধ কিনতে হয়। তবে এই হাসপাতালের কনসালট্যান্ট হিসেবে ডা. জসীম উদ্দিন এবং ডা. এম ও ফারুকের নাম হাসপাতালের গেটের সাইনবোর্ডে লাগানো রয়েছে।


এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম লায়ন্স চক্ষু হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. জসীম উদ্দিন আহমেদ যায়যায়দিনকে জানান, হাসপাতালটির সঙ্গে তিনি চুক্তি করেছিলেন এই শর্তে যে, তার পরিচালনায় এই হাসপাতালটি চলবে। পরবর্তীকালে দিদারুল ইসলাম নিজেই ডাক্তার সেজে রোগী দেখা শুরু করলে তিনি আর সেখানে যান না।


দিদারুল ইসলাম অবশ্য অকপটে তার শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং আগের পেশার কথা স্বীকার করে বুধবার সকাল সাড়ে ১১টায় তার চেম্বারে এই প্রতিবেদককে বলেন, ২০০৩ সালের পর থেকে তিনি পাঁচলাইশের কাতালগঞ্জে এমএম ভিশন চক্ষু ক্লিনিকে আসা-যাওয়া করতেন। সেখান থেকেই তার চোখের ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন শুরু। তখন তিনি তার বাবার সঙ্গে মোটর মেকানিকের কাজ করতেন। তিনি আগ্রাবাদ সরকারি কলোনি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেছেন। তার ইন্টারমিডিয়েট কমপ্লিট করা হয়নি। বেপারীপাড়া গুলবাগ আবাসিক এলাকায় আগ্রাবাদ কমিউনিটি হাসপাতালটিও তাদের জমিতে অবস্থিত। তার চোখের ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য আগের মালিকের কাছ থেকে তিনি নিউ আগ্রাবাদ কমিউনিটি চক্ষু হাসপাতালের স্বত্ব কিনে নেন। শুরু করেন ডাক্তারি পেশা। কিছুদিন তিনি একজন এমবিবিএস ডাক্তার রেখেছিলেন। পরে তার কাছ থেকে হাতেখড়ি হয়ে গেলে তিনি নিজেই রোগী দেখা শুরু করেন। দিদারুল ইসলাম দাবি করেন, তিনি ৬ মাসের এলএমএফ কমপ্লিট করেছেন। তিনি ইন্টারমিডিয়েটে ফেল করলেও সঠিক চিকিৎসাই দেন রোগীদের। কারণ, তার অভিজ্ঞতা ভালো।
সরেজমিনে আগ্রাবাদ কমিউনিটি চক্ষু হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেছে, ৫ তলাবিশিষ্ট এনেস টাওয়ারের নিচতলায় ৬ রুমের এই হাসপাতাল।


প্রতিদিন এই হাসপাতালে ৫০-৬০ জন রোগী আসেন। রোগী দেখা হয় সকাল ৮টা থেকে দুপর ১টা পর্যন্ত। ভিজিট ৫০ টাকা হওয়ায় আগ্রাবাদ, বেপারীপাড়া, মিস্ত্রিপাড়া, হালিশহর ও হাজীপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত চোখের রোগীরা তাদের সমস্যা নিয়ে আসেন। রোগীদের অনেকেই না জেনে এসে ভুল চিকিৎসার শিকার হয়েছেন। কিন্তু রোগীদের আর্থিক অসচ্ছলতা কিংবা ভয়ে কেউই আইনের আশ্রয় নিতে পারেননি। তিনি আগ্রাবাদ কমিউনিটি চক্ষু হাসপাতালের প্যাডে চিকিৎসাপত্র লিখেন। সেখানে ডাক্তারের নাম এবং পেশাগত পদবির কথা উল্লেখ নেই।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, তিনি শিশু থেকে বয়োবৃদ্ধদের চোখের চিকিৎসায় নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালসের অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের নির্দেশনা দেন। রোগীদের একজন ৩৬ বছর বয়সী মাঈনুদ্দিন গত ১২ জুন চোখের ছোট্ট একটি সমস্যা নিয়ে এই হাসপাতালে এসেছিলেন। তাকে দেখে দিদারুল ইসলাম তার ব্যবস্থাপত্রে নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালসের চোখের ড্রপ অ্যাপরুড্রক্স, ড্রেজাট্রল, ডাইনাক-টিআর, সিনারজিন ও ডিউরেসেফ ওষুধ দেন। ব্যবস্থাপত্রে দেখা যায়, ওষুধের ব্যবহারবিধি অগোছালোভাবে লেখা। একই সঙ্গে এই রোগীকে দেয়া হয়েছে এসব ওষুধের সঙ্গে আরো ৩টি চোখের ড্রপ। প্রতিটি ব্যবস্থাপত্রে রোগীদের ৫০০-৬০০ টাকার ওষুধ কিনতে হয়। এলাকাবাসীর কাছ থেকে খবর নিয়ে বেপারীপাড়া মসজিদের পাশে বসবাসকারী নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন মধ্যবয়সী ব্যক্তি এই প্রতিবেদককে জানান, তার চোখ দিয়ে পানি পড়ত। বছর দেড়েক আগে তিনি দিদারুল ইসলামকে দেখান। দিদারের মাত্রাতিরিক্ত ওষুধে তার চোখে ইনফেকশন দেখা দেয়। এরপর তিনি চট্টগ্রাম পাহাড়তলী চক্ষু হাসপাতালে গিয়ে তার চোখের চিকিৎসা করে আরোগ্য লাভ করেন। কয়েকদিনের অনুসন্ধানে ২০-২৫ জন রোগীর সঙ্গে কথা হয়েছে, যাদের বেশিরভাগই তার কাছে চিকিৎসা করিয়ে চোখের জন্য বিপদ ডেকে এনেছিলেন।


সাইনবোর্ডে হাসপাতালটির কনসালট্যান্ট হিসেবে এখনো ডা. জসীম উদ্দিনের নাম থাকলেও তিনি জানান, অনুমতি ছাড়াই দিদারুল ইসলাম সাইনবোর্ডে তার নাম ব্যবহার করছেন। এরপরও তিনি কোনো অ্যাকশন নিতে পারছেন না। কারণ, তিনি ভয়ে আছেন। প্রকাশ্যে বিরুদ্ধাচরণ করলে তিনি যে কোনো ধরনের ক্ষতি করে দিতে পারেন।


চট্টগ্রাম চক্ষুবিজ্ঞান সমিতির সভাপতি ডা. রবিউল হাসান যায়যায়দিনকে জানান, দিদারুল ইসলামের বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম সিভিল সার্জনের কাছে লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে। সিভিল সার্জন যদি কোনো অ্যাকশন না নেন, তারা আর কী করতে পারেন। কেননা, তারা অসহায়।


এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন এসএম আবু তৈয়ব জানান, চট্টগ্রাম চক্ষুবিজ্ঞান সমিতি থেকে তিনি অভিযোগপত্র পেয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছিলেন। কিন্তু তদন্ত কমিটির কী খবর, তা এখন আর তিনি জানেন না।

 


 
সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ