মার্কিন ডলার এখন আর সহজে মিলছে না - ডলার পাচারে দাম বাড়ছে

June 18, 2011, 7:43 AM, Hits: 2213

মার্কিন ডলার এখন আর সহজে মিলছে না - ডলার পাচারে দাম বাড়ছে


সৈয়দ মিজানুর রহমান ও আহসান হাবিব রাসেল : ঢাকা থেকে : মার্কিন ডলার এখন আর সহজে মিলছে না। ডলার পেতে যেমন ভোগান্তি বেড়েছে, তেমনি ব্যয় করতে হচ্ছে অতিরিক্ত অর্থ। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে এক ডলার কিনতে লাগত ৬৭ টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের গত বৃহস্পতিবারের দেয়া তথ্য অনুযায়ী এখন এক ডলার কিনতে ব্যয় হচ্ছে ৭৩ টাকা ৯৫ পয়সা।
সরকারি ব্যাংকে ডলারের দর ৭৪ টাকা হলেও বেসরকারি ব্যাংকে ডলার বিক্রি হচ্ছে ৭৫ থেকে ৭৬ টাকায়। আবার খোলাবাজারে (কার্ব মার্কেট) ডলার বিক্রি হচ্ছে ৭৭ টাকায়। সরকারি ব্যাংকে পর্যাপ্ত ডলার মিলছে না।

বিদেশ যাত্রীদের অভিযোগ, সরকারি ব্যাংকে কয়েকদিন ধরনা দিয়েও যাত্রীরা বড়জোর দু-একশ’ ডলার পর্যন্ত পাচ্ছেন। আবার যারা আমদানিতে ঋণপত্র খুলছেন, বড় সমস্যা দেখা দিয়েছে তাদের। ডলার সঙ্কটে সময়মত এলসি বা ঋণপত্র খোলা যাচ্ছে না। এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইএবি) সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী জানান, ডলার সঙ্কটের কারণে শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে বড় সমস্যা দেখা দিয়েছে। সেইসঙ্গে বাড়তি দামে ডলার সংগ্রহ করতে গিয়ে কাঁচামালের আমদানি ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। এতে পণ্য উত্পাদনের পর যখন আবার রফতানি হচ্ছে, তখন উত্পাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন দেশীয় রফতানিকারকরা।


জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ব্যাংকগুলোতে ডলারের কিছুটা চাপ সৃষ্টি হয়েছে। ফলে টাকার মান কমে যাচ্ছে ডলারের বিপরীতে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আমদানিকারকরা। এ মুহূর্তে ডলার রিজার্ভের পরিমাণ বাড়াতে রেমিট্যান্স আয়ের ওপর বেশি নজর দেয়া প্রয়োজন।


অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন কারসাজির মাধ্যমে দেশ থেকে পাচার হয়ে যাচ্ছে ডলার। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, আমদানি-রফতানির নামে সুকৌশলে ডলার পাচার করা হচ্ছে বিভিন্ন দেশে। পাচারকারী সদস্যদের সঙ্গে দেশি-বিদেশি সিন্ডিকেট জড়িত রয়েছে। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, পাচারের ক্ষেত্রে ব্যাংকিং চ্যানেলের পাশাপাশি একাধিক মানি চেঞ্জারকেও ব্যবহার করা হচ্ছে। এদিকে বৈদেশিক বাণিজ্যের ভারসাম্যহীনতা এবং বৈদেশিক মুদ্রা আসার পথ সঙ্কুুচিত হয়ে আসায় দেশের ব্যাংকিং চ্যানেলে তীব্র ডলার সঙ্কট
সৃষ্টি হয়েছে। ফলে টাকার বিপরীতে ডলারের মান ক্রমেই তেজি হয়ে উঠছে। অথচ বিশ্বের অন্য দেশে ডলারের মূল্য পতনের ধারা অব্যাহত রয়েছে।


সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ডলার পাচার নিয়ে সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক উদ্বেগ প্রকাশ করে পাচারকারীদের চিহ্নিত করতে মাঠে নামে। এরই অংশ হিসেবে সব তফসিলি ব্যাংককে চিঠি দেয়া হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে। পাশাপাশি মানি চেঞ্জারগুলোতেও তল্লাশি চালানো হচ্ছে বলে জানা গেছে। তবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের উদাসীনতার কারণে ডলার পাচার ঠেকানো যাচ্ছে না বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করছে।


সূত্রে জানা গেছে, অবৈধ মানি চেঞ্জারের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা পাচার হচ্ছে। পাচারকারী চক্রের সঙ্গে বিমানবন্দরের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু কর্মকর্তা জড়িত রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ব্যাংকিং চ্যানেলে ওভার ইনভয়েসিং ও আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে ডলার পাচার করা হয়। অর্থাত্ পণ্য না এনে ডলার পেমেন্ট করা এবং কম মূল্যের পণ্য ক্রয় করে বেশি মূল্য (ডলার) প্রদান করা। বৈদেশিক মুদ্রা পাচার তদন্তকারীরা কয়েকটি মাধ্যমকে চিহ্নিত করেছেন। যেমন অবৈধ মানি চেঞ্জারের কারসাজি, আন্ডার ইনভয়েসিং, লাগেজ পার্টির দৌরাত্ম্য, চোরাচালান, হুন্ডি বৃদ্ধি, ইন্টারন্যাশনাল ক্রেডিট কার্ড প্রবর্তন, বিদেশি কর্মকর্তাদের ডলার কেনাসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ডলার পাচার।


এদিকে ডলার পাচার হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি চলতি অর্থবছরে রেমিট্যান্স আয়ের প্রবৃদ্ধি আগের তুলনায় আশঙ্কাজনক হারে কমেছে। ৪০ শতাংশ রফতানির প্রবৃদ্ধির বিপরীতে তুলনামূলকভাবে বেড়েছে আমদানি প্রবৃদ্ধি। এর ফলে তীব্র চাপ সৃষ্টি হয়েছে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর। এসবের কারণে একদিকে টাকার বিপরীতে ডলারের দাম বাড়ছে, অন্যদিকে বাজারে দেখা দিয়েছে ডলারের তীব্র সঙ্কট।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, দেশের রেমিট্যান্স আয়ের প্রবৃদ্ধি কমে যাচ্ছে। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে রেমিট্যান্স আয়ে প্রবৃদ্ধির হার ছিল সাড়ে ২২ শতাংশ। পরে ২০০৯-১০ অর্থবছরে রেমিট্যান্স আয়ে প্রবৃদ্ধির হার ছিল সাড়ে ১৩ শতাংশ। আর চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে রেমিট্যান্স আয়ের প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৫ শতাংশে। এভাবে ধীরে ধীরে কমে আসছে রেমিট্যান্স আয়ের প্রবৃদ্ধি। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এর প্রভাবে ব্যাংকগুলোতে ডলার সঙ্কট ত্বরান্বিত হয়েছে। পাশাপাশি ব্যালেন্স অব পেমেন্টের ওপরও এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।


অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, চলতি অর্থবছরের এপ্রিল পর্যন্ত ১০ মাসে বৈদেশিক সাহায্য ছাড়ের পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় কমেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে বৈদেশিক সাহায্যের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ৩৯৮ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ২ দশমিক ২১৬ বিলিয়ন ডলার। একই সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত রফতানি আয় হয়েছে ১৬ দশমিক ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আমদানি হয়েছে ২১ দশমিক ০৩ বিলিয়ন ডলার। অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০১১-তে দেখা গেছে, ২০১০ অর্থবছরের জুলাই থেকে জানুয়ারি সময়ে কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ব্যালেন্সে উদ্বৃত্তের পরিমাণ ছিল ৩ দশমিক ৭৩৭ বিলিয়ন ডলার। বর্তমান অর্থবছরের একই সময়ে এই উদ্বৃত্ত কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬০২ মিলিয়ন ডলারে। তাছাড়া ২০১০ অর্থবছরের জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত সামগ্রিক ব্যালেন্স অব পেমেন্টে উদ্বৃত্তের পরিমাণ ছিল ২ দশমিক ৮৬৫ বিলিয়ন ডলার। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে ব্যালেন্সে বড় অঙ্কের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। ঘাটতি ব্যালেন্সের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৯০ মিলিয়ন ডলার।


সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিগত বছরগুলোর তুলনায় রফতানি আয় বাড়লেও এই আয় দেশে আনতে সময়ক্ষেপণ হচ্ছে। ফলে স্থানীয় বাজারে ডলারের সঙ্কট বাড়ছে। প্রায় ২০০ কোটি ডলারের রফতানি আয় দ্রুত নিষ্পত্তি না হওয়ায় তা দেশে আনতে কালক্ষেপণ হচ্ছে। ফলে ব্যাংকিং খাতে ডলারের সাময়িক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। আমদানি ব্যয় সময়মত পরিশোধিত হলেও রফতানি আয় আনার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে অ্যাড কনফারমেশন না থাকায় ওই আয় দেশে ফিরে আসতে দেরি হয়। অ্যাড কনফারমেশন না থাকায় রপ্তানিকৃত পণ্যের বিপরীতে ক্রেতা দেশের ব্যাংক ওই টাকা তাদের ইচ্ছামাফিক দিয়ে থাকে।


বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বৈদেশিক সাহায্যের পরিমাণ কমে যাওয়ার পাশাপাশি বৈদেশিক বিনিয়োগের পরিমাণ না বাড়ায় ডলার রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়েছে। ডলার পাচারের ধারা এ চাপকে আরও বৃদ্ধি করেছে। ডলার আসার পথ এভাবে সঙ্কুচিত হয়ে আসার পাশাপাশি ডলারের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এর তীব্র সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে। এ কারণেই ডলারের বিপরীতে টাকার মান এক বছরে কমেছে প্রায় ৬ শতাংশ।


কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে একজনের নামে মানি চেঞ্জারের লাইসেন্স নিয়ে ১০ থেকে ১৫ ব্যক্তি ওই লাইসেন্সে ব্যবসা চালাচ্ছে। মানি চেঞ্জারগুলো দৈনিক বা মাসিক, এমনকি বছরে কী পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন করছে তার হিসাব প্রদান করছে না। এতে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে। পাশাপাশি দেশ থেকে শত শত কোটি ডলারসহ বিভিন্ন ধরনের বৈদেশিক মুদ্রা পাচার হয়ে যাচ্ছে।


বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পাওয়া তথ্যমতে, রাজধানীর মতিঝিল, গুলশান, উত্তরা এবং চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে একাধিক অবৈধ মানি চেঞ্জার রয়েছে, যেগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনায় পরিচালিত হচ্ছে না। এসব মানি চেঞ্জারের দু-একটির লাইসেন্স থাকলেও সেগুলোর আবার একাধিক শাখা খোলা হয়েছে। কিন্তু কোনো মানি চেঞ্জার একাধিক শাখা খুলতে পারে না বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা রয়েছে। এই ব্যবসায় কোনোভাবেই মালিকানা পরিবর্তন বা ভাগাভাগি করতে পারে না, কিন্তু বাস্তবে ঘটছে উল্টো ঘটনা। ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে ওঠা অবৈধ মানি চেঞ্জার বৈদেশিক মুদ্রা ক্রয়-বিক্রয়ের পাশাপাশি হুন্ডি ব্যবসার সঙ্গেও সম্পৃক্ত রয়েছে। এসব মানি চেঞ্জার বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই ডলার, ইয়েন, রিয়াল, ইউরোসহ বিভিন্ন ধরনের বৈদেশিক মুদ্রা ক্রয়-বিক্রয় করে। তারা পাসপোর্টে অবৈধভাবে ইনডোর্সমেন্ট ইনক্যাশমেন্ট করে। এর কোনো প্রমাণ বাংলাদেশ ব্যাংককে প্রদান করতে হয় না তাদের।

 

 


 
সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ