সিলেটে লন্ডন ও আামেরিকার ভিসা জালিয়াতি করে কোটিপতি !

June 22, 2011, 8:48 AM, Hits: 2883

সিলেটে লন্ডন ও আামেরিকার ভিসা জালিয়াতি করে কোটিপতি !


হ-বাংলা নিউজ : সিলেট থেকে : লন্ডন ও আামেরিকার ভিসা জালিয়াতি করে রাতারাতি কোটিপতি হয়েছেন সিলেটের এক প্রিন্টিং প্রেসের মালিক। মৌলভীবাজার ও সুনামগঞ্জ পাসপোর্ট অফিস থেকে ভুয়া নাম-ঠিকানায় পাসপোর্ট তৈরি এবং এসব পাসপোর্টে ভিসা জালিয়াতি করে কোটিপতি বনে যান তিনি। এমনকি কয়েকশ' লোককে তিনি লন্ডন-আমেরিকায়ও পাঠিয়েছেন এসব জাল ভিসায়। পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য জানা গেছে। গত শনিবার এই ভুয়া ভিসাওয়ালাকে আটকের পর সংঘবদ্ধ জালিয়াত চক্রের সঙ্গে জড়িতদের ধরতে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ।


সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সম্প্রতি মৌলভীবাজার পাসপোর্ট অফিসে হাকালুকি গ্রামের জনৈক ব্যক্তি পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেন। তদন্তে দেখা যায়, হাকালুকি নামে বাস্তবে কোনো গ্রাম নেই। জালিয়াত চক্র হাকালুকি হাওরকে গ্রাম বানিয়ে ভুয়া পাসপোর্ট তৈরির চেষ্টা চালায়। সূত্র মতে, ইতিপূর্বে মৌলভীবাজার ও সুনামগঞ্জ পাসপোর্ট অফিসের মাধ্যমে এ রকম কয়েক হাজার ভুয়া পাসপোর্ট তৈরি হয়েছে। এসব পাসপোর্ট তৈরির পর আমেরিকা ও বৃটেন থেকে উন্নত মানের কাগজ এনে তাতে জালিয়াতি করে ভিসা লাগানো হতো। এ কাজটি করা হতো সিলেটের জিন্দাবাজারের জামান প্রিন্টিং প্রেসে। এই জালিয়াতির মাধ্যমেই প্রেসটির মালিক এম কে জামান রাতারাতি বনে যান কোটিপতি।


এই সংঘবদ্ধ চক্রের সঙ্গে জড়িতদের ধরতে পুলিশ সিলেট অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালাচ্ছে। মৌলভীবাজারের রাজনগরের বালিশহর গ্রাম থেকে এই চক্রের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে রোববার হায়দার আলী নামে এক যুবককে আটক করা হয়। এ নিয়ে এ ঘটনায় মোট ১০ জনকে আটক করা হলো। এছাড়া রোববার জামানের বটেশ্বরের বাসা থেকে বেশ কিছু পাসপোর্ট এবং বিদেশি ভিসার স্টিকার উদ্ধার করা হয়।


পুলিশের ঢাকা স্পেশাল ব্রাঞ্চের ওসি কাজী ইমতিয়াজ মাশরুর জানান, আটককৃতদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের ব্যাপারে সিলেট কোতোয়ালি থানা পুলিশকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এমনকি আটক জামানও এ ব্যাপারে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিতে রাজি আছে। তিনি আরো জানান, বিষয়টি খুবই স্পর্শকাতর। এর সঙ্গে বাংলাদেশের সঙ্গে আমেরিকা ও বৃটেনের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিষয়টি জড়িত। কাজেই বিষয়টি তারা গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন। মৌলভীবাজার ও সুনামগঞ্জ পাসপোর্ট অফিস ভিসা জালিয়াত চক্রের মূল টার্গেট।


জামানের অজানা তথ্য অনুসন্ধানে ভিসা জালিয়াতকারী আন্তর্জাতিক চক্রের হোতা জামান ধরা পড়ার পর তার সম্পর্কে নানা রকম অজানা তথ্য বেরিয়ে আসছে। জিরো থেকে হিরো হয়ে যাওয়া এম কে জামান দেশ-বিদেশে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। তার গ্রামের বাড়ি লালমনিরহাটে। আশির দশকে একদম শূন্য হাতে তিনি সিলেটে এসেছিল। তখন তার নাম ছিল দুলাল আহমদ। এ সময় সে নগরীর সুরমা মার্কেটে ব্যানার-সাইনবোর্ড লিখে সংসার চালাত। আশির দশকের শেষ দিকে জামান সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে পাসপোর্ট জালিয়াত চক্রের সঙ্গে। নব্বইয়ের দশকে এক সহযোগী নিয়ে জাল পাসপোর্টসহ ধরাও পড়ে পুলিশের হাতে। তখন পার পেয়ে যায় নানা কৌশলে। এরপর দুলাল আহমদ নাম পরিবর্তন করে জামান হয়ে যায় সে।


সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ভিসা জালিয়াতির মাধ্যমে জামান বিপুল পরিমাণ অর্থ উপার্জন করে হয়ে যায় কোটিপতি। শুরুতেই জিন্দাবাজার হক সুপার মার্কেটে একসঙ্গে ৯টি দোকান কেনে। পরে কেনে আরো দুটি দোকান। নগরীর টিলাগড় শাপলাবাগ আবাসিক এলাকায় বিলাসবহুল একটি ৬ তলা বাড়িসহ দুটি বাড়ি তৈরি করে। বটেশ্বরে কেনে আরো একটি বাড়ি। পীরবাজারে তার রয়েছে বিশাল জমি। হক সুপার মার্কেটে তার জামান প্রিন্টিং প্রেসেই ভিসা জালিয়াতির কাজ চালিয়ে যাচ্ছিল।


সূত্র জানায়, জামান ৪ বিয়ে করেছে। এর ম্যধ্যে দুই স্ত্রী লালমনিরহাটে এবং দুই স্ত্রী সিলেটে রয়েছে। সম্প্রতি একজনের সঙ্গে তার ছাড়াছাড়িও হয়ে গেছে। প্রথম দই স্ত্রীর সন্তান রয়েছে। তারা লালমনিরহাটে থাকে। তৃতীয় বিয়ে করেছে সিলেটের বড়লেখার নিছমপুরে। স্ত্রীর নাম আয়শা বেগম। সে শাপলাবাগের ১ নাম্বার রোডের 'মনি মহল' নামক নিজস্ব বাড়িতে থাকে। তার রয়েছে ২ ছেলে এবং ২ মেয়ে। তাদের মধ্যে আয়শা বেগম জালিয়াতি ভিসায় মলি্লকা নামের এক মেয়েকে নিয়ে লন্ডন ঘুরে এসেছে। বর্তমানে তাদের এক পুত্র লন্ডনে রয়েছে। এরপর জামান তার কাছে আশ্রিতা এক মেয়েকে চতুর্থ বিয়ে করে। তার নাম ফাতেমা বেগম। বটেশ্বরের পীরবাজার এলাকায় জমিজমা ক্রয়ের সূত্র ধরে পরিচিত ক্যান্টনমেন্টের এক বাবুর্চির মেয়ে ফাতেমাকে লেখাপড়া করানোর কথা বলে বাসায় নিয়ে এসে বিয়ে করে সে। ফাতেমার এক পুত্রসন্তান রয়েছে। ফাতেমাকে নিয়ে টিলাগড় শাপলাবাগের ২০/১ নাম্বার বাড়িতে থাকত জামান। পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের সদস্যরা ওই বাড়ি থেকেই তাকে গ্রেপ্তার করেন।


নির্ভরযোগ্য সূত্র মতে, জাল ভিসায় বিদেশে পাঠানোর ব্যাপারে শতভাগ নিশ্চয়তা দিতে পারত জামান। তার জীবনে কয়েকশ' লোক পাঠিয়েছে লন্ডন ও আমেরিকায়। তার স্ত্রী-পুত্রকেও একই পন্থায় লন্ডন পাঠায় সে। ভিজিট ভিসায় লন্ডন পাঠাতে একজন ব্যক্তির কাছ থেকে সর্বনিম্ন ১০ লাখ টাকা নিত। সর্বশেষ তার তৃতীয় স্ত্রীর মা শামসুন্নেসাকে নিজের মা বানিয়ে আরো ৬ জনকে ছেলে-মেয়ে-নাতি পরিচয় দিয়ে আমেরিকার ভিসাযুক্ত লন্ডনে ভিজিট ভিসার জন্য ভিএফএসে ফাইল জমা দেয়। একমাত্র শাশুড়ি ছাড়া সবার কাছ থেকে ১০-১২ লাখ টাকার চেক এবং কারো কারো কাছ থেকে নগদ টাকা নেয় সে। অতীতের সব ক'টি কাজে সফল হলেও এই ৭ জনকে পাঠাতে গিয়ে ধরা পড়ে যায়। এর মধ্যে ছিল শিবগঞ্জের মোবাইল ফোনের লোড ব্যবসায়ী আছকির মিয়া, সৌদি আরব ফেরত গোলাপগঞ্জের ভাদেশ্বর গ্রামের আখতার হোসেন, সুলতানা বেগম ও তার শিশুকন্যা মোহনা, বিয়ানীবাজারের মুহিত এবং কানাইাঘাটের লক্ষ্মীপুর গ্রামের আনোয়ার কামাল খান। এই ৭ জনের জালিয়াতি পাসপোর্ট ও ভিসা ব্রিটিশ হাইকমিশনের কাছে ধরা পড়ে।


প্রসঙ্গত, এম কে জামান এবং তার চাচাতো ভাই বেলাল উদ্দিনসহ ৬ জনকে শনিবার পুলিশের ঢাকা স্পেশাল ব্রাঞ্চের বিশেষ টিম ও পুলিশ সদস্যরা আটক করেন। মৌলভীবাজার থেকে আটক করা হয় রোববার হায়দার আলী নামের এক যুবককে। বর্তমানে তারা কোতোয়ালি থানাহাজতে রয়েছে। সোমবারই তাদের আদালতে হাজির করার কথা।

 


 
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ