মজার ব্যবসা : কুমিরের মুখ থেকেও খাবার ছিনতাই

June 25, 2011, 5:30 PM, Hits: 2087

মজার ব্যবসা : কুমিরের মুখ থেকেও খাবার ছিনতাই


আলাউদ্দিন আরিফ ও জাকারিয়া মাহমুদ বাগেরহাট থেকে : বাগেরহাট জেলার চিতলমারী উপজেলা থেকে হনুফা বেগম এসেছে ঐতিহাসিক খাঞ্জেলী দীঘিতে (খানজাহান আলী দীঘি)। তিনি মানত করেছেন, সুফি সাধক হযরত খানজাহান আলী (র.)-এর পালিত কুমির কালা পাহাড়কে দুটি মুরগি খেতে দেবেন। সেজন্য ঘরে পোষা দুটি তাজা মুরগি নিয়ে আসেন তিনি। খানজাহান আলী (র.)-এর মাজারের পাশে এফ এম কামাল হোসেনের বাড়ির ঘাটে কুমির উঠেছে শুনে সেখানে দৌড়ে গেলেন। মানতের মুরগি দুটি কুমিরকে দিতে যাবেন এমন সময় উপস্থিত এক যুবক বলল, ‘শুধু মুরগি দিলে হবে না, সঙ্গে হাদিয়া লাগবে। হাদিয়া বাবদ আড়াই কেজি চাল, একশ’ একুশ টাকাও দিতে হবে। চাল না থাকলে আড়াই কেজি চালের দাম দিতে হবে।’ এত টাকা নেই হনুফা বেগমের কাছে। তাই বাড়ি ফেরার ভাড়া রেখে যা ছিল তার সঙ্গে মুরগি দুটি খাদেমের উপস্থিত প্রতিনিধির হাতে তুলে দিলেন। হনুফা বেগমের সামনেই মুরগি দুটি পানিতে ভাসমান কুমিরের দিকে ছুড়ে মারা হলো। কুমির খাওয়ার আগেই ছোঁ মেরে একটি মুরগি তুলে নেয় এক যুবক। এরপর একটি সুতার মধ্যে বাঁধা মুরগির রান দেখিয়ে কুমিরটিকে সরিয়ে এনে অন্য মুরগিটিও তুলে নেয় সে। ওই ঘাটে ২০ মিনিট সময়ের মধ্যে এভাবে পাঁচটি মুরগি তুলে নেয় খাদেমের লোকজন। মুরগিগুলো কোথায় নেয়া হচ্ছে জানতে চাইলে তারা জানায়, এগুলো মাজারে নিয়ে যাবে।


স্থানীয় লোকজন জানান, এভাবে প্রতিদিন মানুষের মানতের শত শত মুরগি, মাছ, খাসির রানসহ বিভিন্ন খাবার কুমিরের মুখ থেকে ছিনতাই করে নেয় মাজারের খাদেম পরিচয় দেয়া লোকেরা। কুমিরের মুখ থেকে খাবার কেড়ে নেয়াটাই তাদের পেশা। প্রত্নসম্পদে বিশ্ব ঐতিহ্য সমৃদ্ধ ঐতিহাসিক জেলা বাগের হাট। জেলার ইতিহাস থেকে জানা যায়, সুলতান নাসির উদ্দিন মাহমুদ শাহ্-এর রাজত্বকালে খান উল আজম উলুঘ খান-ই-জাহান পদবিধারী একজন মুসলিম সেনানায়ক ‘খালিফাতাবাদ’ নামে একটি শহরের প্রতিষ্ঠা করেন। তার কবরে উত্কীর্ণ শিলালিপি থেকে জানা গেছে, তার মৃত্যু ১৪৫৯ খ্রিস্টাব্দে। খান উল আজম পদবিধারী ওই সেনানায়ক তার শহরে দরবার হল (ষাটগম্বুজ মসজিদ), মসজিদ, আবাসিক ভবন, রাস্তাঘাট দ্বারা সুসজ্জিত করেছিলেন। এলাকার মানুষের সুপ্যেয় পানির জন্য ১৪৫০ খ্রিস্টাব্দে খানজাহান আলী (রা.) খাঞ্জেলী দীঘি নামে একটি বিশাল দীঘি খনন করান। যা এখনও খানজাহান আলী দীঘি নামে পরিচিত। ৩৬০ বিঘা আয়তনের বিশাল এই দীঘিতে হযরত খানজাহান আলীর দুটি পালিত কুমির ছিল। কীভাবে ওই কুমির দীঘিতে এসেছে তার সঠিক ইতিহাস জানা যায়নি।


এই কুমির নিয়ে রয়েছে নানান জনশ্রুতি। একটি জনশ্রুতি হলো হযরত খানজাহান আলীর দুটি ঘোড়া অলৌকিকভাবে কুমিরে পরিণত হয়েছে। তার একটি ‘কালা পাহাড়’ অপরটি ‘ধলা পাহাড়’। অপর একটি জনশ্রুতি রয়েছে, হযরত খানজাহান আলী দুটি দুষ্ট জ্বিনকে কুমির বানিয়ে দীঘিতে ছেড়ে দিয়েছিলেন। অপর একটি জনশ্রুতি রয়েছে, সুপ্যেয় পানির জন্য খনন করা দীঘির পানি যাতে কেউ অপবিত্র করতে না পারে সেজন্য নদী থেকে দুটি কুমির ধরে এনে দীঘিতে ছেড়ে দেয়া হয়েছিল। কেউ কেউ বলছেন, উপকূলীয় এই জেলাতে স্বাভাবিকভাবেই কুমির বাস করে। ওইসব কুমিরই কোনোভাবে দীঘিতে চলে এসেছে।


হযরত খানজাহান আলীর পালিত সেই কুমিরগুলো বহুকাল আগেই মারা গেছে। তাদের শেষ বংশধর ছিল দুটি কুমির। এর মধ্যে মাদি কুমিরটির নাম ছিল ‘ধলা পাহাড়’। আর মদ্দা কুমিরটির নাম ‘কালা পাহাড়’। ধলা পাহাড় কুমিরটি কয়েক বছর আগে মারা গেছে। কালা পাহাড় এখনও বেঁচে আছে। এর বয়স হয়েছে প্রায় একশ’ বছর। কালা পাহাড়কে সঙ্গ দেয়ার জন্য সরকারি উদ্যোগে ২০০৫ সালে আরও ৬টি কুমির এনে ছাড়া হয়েছে দীঘিতে। এর দুটি মারা গেছে। এখন বেঁচে আছে চারটি কুমির। এখন দীঘিতে কুমিরের সংখ্যা ৫টি। মাজারের খাদেম ও আশপাশের লোকজন জানান, খানজাহান আলীর কুমিরের বংশধর কুমিরগুলো ছিল বেশ শান্ত স্বভাবের। কিন্তু নতুন আনা কুমিরগুলো খুবই হিংস্র। এগুলো বেশ কয়েকজনকে আক্রমণ করেছে। এই হিংস্র কুমিরের মুখ থেকেও প্রতিদিন কেড়ে নেয়া হচ্ছে তাদের খাবার।


মাজারে আসা ভক্তদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কুমিরকে খাওয়ানোর উদ্দেশ্যে আনা মুরগিগুলো খাদেমের লোকজন নিয়ে যায়। সেগুলো হাটবারের দিন স্থানীয় বাজারে বিক্রি হয়। আবার একই মুরগি বিক্রি হয় ১০ বার বা তারও বেশি। অনেকেই মুরগি নিয়ে মাজারে যান না। সেখানে গিয়ে শুনতে পান কুমিরকে মুরগি খাওয়ালে নিয়ত বা মনোবাসনা পূর্ণ হবে। খাদেমের লোকজন তাত্ক্ষণিক মুরগি নিয়ে হাজির। বিক্রি করে চড়া দামে। সেই মুরগি কুমিরের উদ্দেশে ছুড়ে দিয়ে আবার তুলে নিয়ে রেখে দেয় তারা। এভাবেই কুমিরের খাবার নিয়ে মাজারে জমজমাট ব্যবসা চলে আসছে দীর্ঘকাল থেকে।


স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, শুধু দীঘি নয় খানজাহান আলীর দরগাহকে ঘিরে রয়েছে খাদেম পরিচয় দেয়া শক্তিশালী একটি চক্র। এরা লোকজনের দেয়া হাদিয়া, নজরানা নিয়ে যায়। মাজারের ভেতরে যে দানবাক্স আছে তার মধ্যে পড়া টাকা-পয়সা খানজাহান আলীর (র.) ওয়ারিশ পরিচয় দেয়া ব্যক্তিরা নিয়ে নেয়। এছাড়া লোকজন প্রতিদিন যেসব মোমবাতি, আগরবাতি, গোলাপজলসহ সুগন্ধি মাজারে দেয়, সেগুলোও জ্বালাতে দেয় না খাদেমের লোকজন। সেগুলো রেখে আবার বাজারে বিক্রি করে দেয় তারা। এছাড়া তাবিজ, কবজ বিক্রি, পানি বিক্রি, পানি পড়া দেয়াসহ মাজারকেন্দ্রিক হাজারও রকমের ব্যবসার ফাঁদ রয়েছে সেখানে।


ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যেসব দরগাহ ও মাজার রয়েছে সেগুলো প্রতিবছর ইজারা নিতে হয় স্থানীয় সিটি করপোরেশন কিংবা পৌরসভা থেকে। সেগুলো থেকে সরকারের বিশাল অংকের রাজস্ব আদায় হয়। কিন্তু ব্যতিক্রম খানজাহান আলীর দরগাহ। এখানে কোনো ইজারা নেই।


মাজারের পাশেই খাজা খানজাহান আলী দরগার দরবারে খানকা শরিফ তৈরি করেছেন এম এম জামাল হোসেন চিস্তী ও তার ভাই এম এম কামাল হোসেন। জামাল হোসেন জানান, তার বাবার নাম মরহুম ফকির শাহাদাত হোসেন চিস্তি, তিনি মাজারের খাদেম ছিলেন। তাদের পরিবার হযরত খানজাহান আলীর ওয়ারিশ ও বংশ পরম্পরায় মাজারের খাদেম। জামাল হোসেন জানান, দরগাহ, দীঘিসহ সবকিছু তাদের পারিবারিক সম্পত্তি। তারাই সেগুলো দেখাশোনা করেন। সেখানে সরকারি কোনো প্রশাসক নেই। যেহেতু পরিবারের সম্পত্তি, তাই তারাই দরগা ও দীঘির আয় ব্যয় নেন। খানজাহান আলীর ওয়ারিশদের সংখ্যা এখন প্রায় ৫শ’। একেকটি পরিবার একেক দিন মাজারের হাদিয়ার টাকা নেন। শুক্রবারে যেহেতু হাদিয়ার টাকা বেশি হয় তাই শুক্রবারগুলোও ক্রমান্বয়ে ভাগ করে নেন তারা। কুমির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দীঘিতে ৫টি কুমির আছে। লোকজন নজরানা হিসেবে মুরগিসহ যেসব খাবার দেয়, কুমির তাত্ক্ষণিক সেটা না খেলে তারা ওই খাবার বাড়িতে নিয়ে রাখেন। সময়মত সেগুলো কুমিরকে খেতে দেন।

 

 


 
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ