"বস্টন প্রবাসী ডা: রুহুল আবিদ ‘ওয়ার্নার রিসাউ নিউ ইনভেস্টিগেটর’ পুরস্কার পেলেন"

June 26, 2011, 4:57 PM, Hits: 2211

"বস্টন প্রবাসী  ডা: রুহুল আবিদ ‘ওয়ার্নার রিসাউ নিউ ইনভেস্টিগেটর’ পুরস্কার পেলেন"

মাসুদ রহমান : রুহুল আবিদ বাংলাদেশি চিকিৎসক। এখন থাকেন যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ১২ বছর ধরে গবেষক হিসেবে কাজ করছেন; পাশাপাশি শিক্ষকতা করছেন হার্ভার্ড Dr._Ruhul_Abidমেডিকেল স্কুলে। ২০০৬ সাল থেকে সেখানকার সহকারী অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন প্রতিবছর নতুন বিজ্ঞানীদের ‘ওয়ার্নার রিসাউ নিউ ইনভেস্টিগেটর’ নামের একটি পুরস্কার দিয়ে থাকে। এ বছর সেই পুরস্কার পেলেন বাংলাদেশি এই চিকিৎসক।
রুহুল আবিদের সঙ্গে আমরা যোগাযোগ করেছিলাম ই-মেইলের মাধ্যমে। যখন মেইল পাঠাই তখন বাংলাদেশে দিন, মার্কিন মুলুকে রাত। রাত পেরোতেই পত্রপাঠমাত্র উত্তর আসে আবিদের কাছ থেকে। তিনি জানালেন, ‘আমার বিদ্যা-বুদ্ধি, ধ্যান-জ্ঞান সব দেশের জন্যই। এখন আমার একটাই লক্ষ্য—যা শিখেছি, যা জেনেছি, তা দেশের কাজে লাগানো। আর আমার এই পুরস্কারপ্রাপ্তি শুধু আমার একার নয়, বাংলাদেশেরও।’
ছয় বছর ধরে আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন ওয়ার্নার রিসাউ নিউ ইনভেস্টিগেটর পুরস্কারটি দিয়ে আসছে। প্রতিবছর বিভিন্ন ক্ষেত্রে একাধিক বিজ্ঞানীকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়। এ বছর ভাসকুলার বায়োলজি বিভাগের পুরস্কারজয়ী রুহুল আবিদ। কী ছিল তাঁর নতুন উদ্ভাবন? আবিদ বললেন, ‘সহজ করে বললে, হূদ্যন্ত্রের করোনারি ধমনি, যা কিনা হূদ্যন্ত্রকে রক্ত সরবরাহ করে, তাতে রিঅ্যাকটিভ অক্সিজেন স্পেসিস (প্রতিক্রিয়াশীল অক্সিজেন) পজিটিভ বা লাভজনক ভূমিকা রাখে। আমার গবেষণাগারে আমরা মানুষের করোনারি ধমনি এবং ইঁদুরের করোনারি ধমনির ওপর গবেষণা করে দেখেছি যে প্রতিক্রিয়াশীল অক্সিজেনের পরিমাণ কমালে তা হূদ্যন্ত্রের ক্ষতি করে! ফলে পুরোনো ধ্যান-ধারণা আমূল পাল্টে দিচ্ছে আমার এই গবেষণার ফল।’

আবিদের এই গবেষণা ফল প্রকাশিত হয়েছিল আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের এক জার্নালে। প্রকাশিত হওয়ার পরই তুমুল আলোড়ন পড়ে যায় গবেষক-চিকিৎসকদের মধ্যে। কারণ, আবিদের গবেষণা বলছে, এই উদ্ভাবন সামনে হূদ্যন্ত্রের নতুন চিকিৎসার দুয়ার খুলে দেবে। এই উদ্ভাবনের পথ ধরে প্রতিক্রিয়াশীল অক্সিজেনকে কীভাবে হূদ্যন্ত্রের চিকিৎসায় ব্যবহার করা যায়, সেটাই এখন বিজ্ঞানীদের ভাবনা।

আমরা গবেষণা শুরুর কথা জানতে চেয়েছিলাম রুহুল আবিদের কাছে। ‘আমি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ১২ বছর ধরে গবেষণা করছি। আমার গবেষণা মূলত মানুষের দেহের রক্তনালির ওপর। রক্তনালি দেহের সর্বত্র থাকে। ফুসফুস থেকে অক্সিজেনে ভরপুর রক্ত নিয়ে রক্তনালি আসে হূদ্যন্ত্রে। সেখান থেকে আবার ওই রক্ত নিয়ে রক্তনালি চলে যায় সারা দেহে। এভাবে রক্তনালি আমাদের সর্বাঙ্গে অক্সিজেন ও পুষ্টি সরবরাহ করে থাকে। দেহের যে অঙ্গ যত বেশি কাজ করে, তার তত বেশি রক্ত সরবরাহের দরকার হয় পুষ্টি ও অক্সিজেনের জন্য। আমাদের হূদ্যন্ত্রের নিজস্ব রক্তনালিকা, যা কিনা হূদ্যন্ত্রের মাংসপেশিকে অক্সিজেন ও পুষ্টি সরবরাহে ব্যস্ত, তার নাম করোনারি ব্লাড ভেসেল বা করোনারি ধমনি। হূদ্যন্ত্রের যথাযথ কাজের জন্য করোনারি ধমনিগুলো ডাইলেটেড বা প্রসারিত থাকলে রক্ত চলাচলে সুবিধা হয়। করোনারি ধমনিগুলো যখন বিভিন্ন অসুখে সংকুচিত বা সরু হয়ে যায়, তখন হূদ্যন্ত্রে পর্যাপ্ত রক্ত চলাচল কমে যায় এবং হূদ্যন্ত্র অক্সিজেন ও পুষ্টির অভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে।’

এত দিন চিকিৎসাবিজ্ঞানের জগতে ধারণা করা হতো, অতিরিক্ত ইলেকট্রনযুক্ত অক্সিজেন যা মানবদেহে স্বাভাবিকভাবে তৈরি হয় এবং যার অপর নাম প্রতিক্রিয়াশীল অক্সিজেন, তা শুধুই ক্ষতিকর এবং হূদ্যন্ত্র ও করোনারি ধমনির কাজকর্মে ব্যাঘাত ঘটায়। ফলে বিজ্ঞানজগতে ধারণা ছিল, ভিটামিন ‘ই’ এবং ভিটামিন ‘সি’ প্রয়োগ করে রক্তনালির ভেতর প্রতিক্রিয়াশীল অক্সিজেনের পরিমাণ কমাতে পারলে হূদেরাগীরা উপকৃত হবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে ভিটামিন ‘ই’ এবং ‘সি’ প্রয়োগ করে অনেক বড় বড় ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল হলেও হূদেরাগীদের তাতে তেমন কোনো লাভ হয়নি। আবিদ বললেন, ‘এখানেই আমার গবেষণা নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিচ্ছে।’ মানুষ কীভাবে উপকৃত হবে এই গবেষণার ফলে? উত্তর দিলেন আবিদ, ‘এই উদ্ভাবনের ফলে নতুন ওষুধ তৈরি হবে, যা হূদেরাগ প্রতিরোধ করতে সাহায্য করবে। এ ছাড়া যে হূদেরাগীর করোনারি ধমনি কোলেস্টেরল বা মেদজনিত কারণে সংকুচিত বা বন্ধ হয়ে আছে, তারাও উপকৃত হবেন। সহজে বললে, এই উদ্ভাবনের ফলে হূদেরাগের নতুন ওষুধ এবং নতুন চিকিৎসার সম্ভাবনা বেগবান হলো।’

রুহুল আবিদের জন্ম ঢাকায়। পৈতৃক ভিটে পাবনার সুজানগরে। বাবা মোহাম্মদ আবদুল গফুর কাজ করতেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবহারিক পদার্থবিদ্যা বিভাগে। তিনি মারা গেছেন ১৯৯৮ সালে। মা রাজিয়া বেগম এখন ঢাকাতেই থাকেন।

‘ভাড়াবাড়িতে থাকতাম আমরা। তাই ছেলেবেলায় ঢাকা শহরের প্রায় সব এলাকাতেই থেকেছি বলতে পারেন! মালিবাগ প্রাথমিক বিদ্যালয় দিয়ে শুরু, এসএসসি পাস করেছি আসাদ গেটের কাছে ধানমন্ডি সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয় থেকে। এরপর ঢাকা কলেজ। সেখান থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ।’ বলছিলেন রুহুল আবিদ।

১৯৯৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান আবিদ। সেখানকার হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফেলোশিপ করেছেন ১৯৯৯ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত। তারপর সেখানেই শিক্ষার্থীদের চিকিৎসক ও গবেষক হওয়ার প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছেন তিনি। তা ছাড়া নিজস্ব গবেষণাগারে চালিয়ে যাচ্ছেন গবেষণাকাজ।

শুধু দেশের বাইরে গবেষণা নিয়েই ব্যস্ত নন রুহুল আবিদ। এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে তিনি দেশে এসেছিলেন। আয়োজন করেছিলেন আন্তর্জাতিক শিশু চিকিৎসা সম্মেলনের। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশের প্রায় তিন লাখ সুবিধাবঞ্চিত শিশু, যারা রক্তনালিকার টিউমারসহ বিভিন্ন জন্মগত রোগে ভুগছে, তাদের সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টি এবং তাদের চিকিৎসার জন্য দক্ষ চিকিৎসক গড়ে তোলা। আবিদ বললেন, ‘আমি চাই, আমার অর্জিত বিদ্যা দিয়ে দেশের চিকিৎসাব্যবস্থা আরও উন্নত করতে। এ জন্য আমি হার্ভার্ডসহ ইউরোপের আরও বিখ্যাত চিকিৎসকদের সাহায্য নিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। আশা করি, অচিরেই আমাদের স্বপ্ন পূরণ হবে।’

 
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ