বোস্টনে বিষবাষ্প ! বোস্টনে ভুত ?

July 12, 2011, 11:01 AM, Hits: 2245

বোস্টনে বিষবাষ্প ! বোস্টনে  ভুত ?


সুহাস বড়ুয়া  : বস্টন থেকে : গত ৬ই জুলাই, ঢাকার দৈনিক  প্রথম আলোর একটি সংবাদ ছিল "ভিকারুননিসার সেই শিক্ষকের বিরুদ্ধে ধর্ষণ মামলা"। পত্রিকার শিরোনামেই জানা যায় ঘটনাটি ঘটিয়েছে একজন শিক্ষক এবং তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে ।


কিন্তু বিগত কয়েক দিন ধরে ঐ খবরের সূত্র ধরে বস্টনের জনপ্রিয় ই-মেইল গ্রুপ বাংলাদেশী আমেরিকান গুগুল গ্রুপের কয়েকজন নিয়মিত  লেখক-প্রেরকের লেখা পড়ে মনে হলো বোস্টনে  সাম্প্রদায়িক ভূত ভর করেছে ! প্রথম ভৌতিক কান্ড হলো,  ই-মেইল গ্রুপে যে ব্যক্তি, আনোয়ার হোসেন নামে ঐ ই-মেইলটি পাঠিয়েছেন, ঐ নামে কোন ব্যক্তি নিউ ইংলান্ডে বসবাস করে না । নামটি পরিচিত হলেও, ই-মেইল প্রেরক ঐ  ব্যক্তি কারো কাছে স্বশরীরে পরিচিত নয়/ ইউ ,এস,  সেন্সাস ব্যুরো, বা  বাংলাদেশ কমিউনিটির কোন রেকর্ডে বোস্টনের ঐ নামটি পাওয়া যায়নি ! তাই প্রশ্ন,  ঐ -সকল ভূতেরা কি  সুদুর ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে অলৌকিক ক্ষমতা বলে এখানে চলে আসলো এবং তারা বোস্টনের  ভদ্র সমাজের বেশ কয়েকজন পরিচিত মুখ- ব্যক্তি বিশেষকে  আক্রান্ত করলো ? অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে  এ-সকল ভূত  আক্রান্ত  ব্যক্তিরা  বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা, যেমন চট্রগাম, ঢাকা ইত্যাদি  থেকে আসা তথাকথিত প্রগতিবাদী পরিবারের সদস্য ও মুক্ত বুদ্ধি সম্পন্ন ব্যক্তি (!) এমনকি তাঁদের মধ্যে রয়েছেন স্থানীয় স্টেট  ডেমোক্রেটিক পার্টির বাংলাদেশী আমেরিকান সদস্য কিম্বা  সদস্যা ও!  ঢাকার ছাত্রী ধর্ষন-   খবরের প্রতিক্রিয়ার  সাথে দুষ্ট বুদ্ধি ও প্রচন্ড ঘৃণার সংমিশ্রন ঘটিয়ে প্রবাস সমাজে বিষবাস্প ছড়াতে ব্যস্ত হলো এমন সব ব্যাক্তি যাঁরা  দেশী -বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়ের কিম্বা প্রকৌশল মহা বিদ্যালয়ের বা -ইনস্টিটিউটের  সনদ ও অর্জন করেছেন ! তাহলে  কি উনারা বাংলা ভাই কিম্বা আব্দুর রহমানের আদর্শের অনুসারী, কেননা তাদেরওতো কলেজ বিশ্ব বিদ্যালয়ের সদন ছিল!


গুগুল গ্রুপের এসকল সদস্য-সদস্যার ই-মেইল -এ  বুঝানোর চেষ্টা করা হলো, বাংলাদেশ একটি মুসলিমদেশ (!), অতএব ছয় (৬) জন হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক বা বিধর্মী  কি ভাবে একটি শিক্ষা  প্রতিষ্ঠানে চাকরী পেতে পারে ? বিধর্মী বা সংখ্যা লঘুরাতো তাদের ধর্মের কারনে  বাংলাদেশ সচিবালয় কিম্বা দুতাবাসে চাকরী পাওয়ার যোগ্য  হতে পারবেনা ! যে  আমেরিকায়  যেখানে শতকরা  ১২.৬ জন আফ্রিকান আমেরিকান এবং যাঁরা   তৃতীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, পৃথিবীর  সবচেয়ে ক্ষমতাশালী প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছে সে সম্প্রদায় থেকে, সে আমেরিকায়  বসবাসকারী এবং নাগরিকত্ব গ্রহনকারী এ সকল বাংগালী কিম্বা বাংলাদেশী ব্যক্তিবর্গ  একজন ব্যক্তির অপকর্মের দায়  তার নিজ সম্প্রদায় থেকে শুরু করে  বাংলাদেশের সমগ্র সংখ্যালঘুর উপর চাপালো! ঢাকার ঘটনার সাথে জড়িত শিক্ষক বাংলাদেশের মূল তিনটি ধর্মীয় সংখ্যালঘু  সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি, হিন্দু সম্প্রদায় ভুক্ত ।  নামের কারনেই তাকে হিন্দু  হিসাবে সনাক্ত করাটা খুবই  সহজ /  ঘটনার পর সে "ব্যাক্তি শুধু একজন হিন্দু ব্যাক্তি  রইল না, তার সাথে তার জাত-বংশের সকলকেসহ বাংলাদেশের আপামর সকল সংখ্যালঘুদেরও নির্বিচারে যুক্ত করা হলো ঘটনার দায়ের সাথে / এক জন  ব্যক্তির একক অপকর্মের জন্য শাস্তি না চেয়ে চূড়ান্ত ভাবে  সকল সংখ্যালঘুদের তুলনা করা হলো পশুদের সাথে, মানুষ কিম্বা বাংগালী হিসাবে নয় !


যে সকল ব্যাক্তিবর্গ, একজন  ব্যক্তি বিশেষের একক অপকর্মটি প্রথমে তার ধর্মীয় সম্প্রদায় হিন্দুদের উপর এবং পরবর্তিতে বাংলাদেশের অন্যান্য ধর্মাবলম্বী মাইনরিটি বা সংখ্যালঘুর সার্বিক ও মোক্ষ্য  চারিত্রিক রূপ হিসাবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্ঠা করেন, তাঁরা কিন্তু বাংলাদেশ কমিউনিটির পরিচিত মুখ এবং বস্টনের সজ্জন সমাজের মাঝে  তাঁদের সমাগমও  দেখা যায় ।  ই-মেইল গ্রুপে তাঁদের পাঠানো বিভিন্ন ই-মেইল বিভিন্ন  সময় বিতর্কিত ও সমালোচিত হয়ে থাকলেও সেগুলি  ছিল মূলত গাঁ- সহা অথবা এড়িয়ে যাওয়া  ধরনের। তাদের পাঠানো আগের  কয়েকটি ই-মেইল ছিল এরকমই যে গনতন্ত্র ভালোবাসি, রাজনীতি নয়।

আবার জেনারেলদের   চাইনা , সামরিক তত্বাবধায়ক  সরকার  চাই / কবিকে লিখতে হবে আমার মত করে, মুক্ত চিন্তায় কিছু লিখা যাবে না, চিন্তায় থাকতে হবে  সীমারেখা, ভারতীয় বলে বাঙালী কবি সাহিত্যিককে নিয়ে বাংলাদেশ বা দুতাবাসে কিছু করা যাবেনা বা সাংস্কৃতিক ডিপ্লোমেসি বলে কিছু বুঝিনা  /  কিন্তু বাংলাদেশের পাসপোর্ট  ফেলে দিয়ে বাংলাদেশের বিমান বন্দর গুলিতে বিদেশী পাসপোর্ট হাতে নিয়ে বিদেশীদের লাইনে দাড়িয়ে হীন স্বার্থ হাসিলে কিছু যায় আসেনা / হ্যায়রে জঘন্য দেশ প্রেম /  
বিগত কয়েকদিনের ই-মেইল পড়লে ভাবতে অবাক লাগে চিন্তায় ও মনোবৃত্তিতে   ঘৃনা নামক সাম্প্রদায়িক ভুত নিয়ে কিভাবে সভ্য জগতের  ভদ্র সমাজের সাথে মিশে আছে  এসব মানুষ ! তাদের চেহারায় বুঝা মুশকিল কত বিভত্স ও  ভয়ঙ্কর রূপ এরা  ধারন করতে পারে ।


এক দোষী  শিক্ষক থেকে সকল  হিন্দু  শিক্ষক, সকল   হিন্দু  শিক্ষক থেকে- সমগ্র হিন্দু সম্প্রদায় ,সমগ্র হিন্দু সম্প্রদায় থেকে সকল ধর্মীয় সংখ্যালঘু  বা মাইনরিটি এবং তা থেকে বাংলাদেশের  অমুসলিম জন গোষ্ঠী এবং পরিশেষে পার্শ্ববর্তী সংখ্যাগুরু অমুসলিম জন গোষ্ঠীর দেশ ভারত। ভৌতিক মনোবৃত্তির কারনে  এ সকল সজ্জনের চিন্তা -চেতনায়  যা  প্রকাশ পায় তা হলো বাংলাদেশে  বসবাস করে দুইটি  সম্প্রদায়, একটি হলো মুসলিম সম্প্রদায় এবং অপরটি হলো মাইনরিটি বা পশু সম্প্রদায় ! যদি তাই হয়, তবে কি বাংলাদেশের মাইনরিটি সম্প্রদায়ে মানুষ কিম্বা বাংগালী  বলে কেউ  নেই ?


চিন্তা ও সতচিন্তা, দুটোই ভালো, তবে দুষ্ট চিন্তা ও জাত-সম্প্রদায়ের প্রতি ঘৃনা  অত্যন্ত ভয়ানক ও অমানবিক ।  ঘৃনাই সাম্প্রদায়িকতার জন্ম দেয়। তাই সাম্প্রদায়িকতা হচ্ছে এক ধরনের মনোভাব। কোন ব্যক্তির মনোভাবকে তখনই সাম্প্রদায়িক বলে আখ্যা দেওয়া হয় যখন সে এক বিশেষ ধর্মীয় সম্প্রদায়ভুক্তির ভিত্তিতে অন্য এক ধর্মীয় সম্প্রদায় এবং তার অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধচারণ এবং ক্ষতিসাধন করতে প্রস্তুত থাকে। ঢাকার ঘটনায় যে ব্যাক্তি ধর্ষক এ ক্ষেত্রে সে  গৌণ হয়ে রইল, মুখ্য হলো তার  সম্প্রদায়। শুধুমাত্র  নিজের ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রতি বিশেষ  এক জাতীয় আনুগত্যের গুরুত্ব বেশি বলেই তাঁরা মনে করছে আর অন্য সকল সম্প্রদায় তাদের কাছে ঘৃণিত পশু  ।  ঘৃণাই সাম্প্রদায়িকতার যে  মূল ভিত্তি এবং এই  সামপ্রদায়িকতাই যে  মানুষকে  সংকীর্ণমনা করে তুলে  এবং ঘৃণার বিষবাষ্প ছড়ায়  বস্টনের গুটি  কয়েক লোক  তা তাঁদের চিন্তা-চেতনার প্রতিফলন ঘটিয়ে দেখিয়ে দিল, উম্মোচন করলো তাঁদের আসল রূপ  ।

-”আমরাই ঠিক, অন্যরা সব ভুল” ।  সাম্প্রদায়িক লোকেরা কোন যুক্তির তোয়াক্কা  করেনা। সম্ভাব্য বা অসম্ভাব্য সকল উপায়ে বিরোধী সম্প্রদায় বা  গোষ্ঠীর দোষ ধরার চেষ্টা করে। তাদের  মধ্যে রয়েছে  নিজের চেয়ে অন্যের দিকে বেশী তাকানোর প্রবণতা।  অন্যের দিকে না তাকিয়ে নিজেই নিজের ভুলগুলো ধরার চেষ্টা করাটা ভাল নয় কি ? তাহলেই তো  ব্যাপারটা অনেক সহজ হয়ে যায়! একজন লোকের অপকর্মের করনে মাইনরিটিরা সচিবালয়ে বিম্বা বাংলাদেশের দুতাবাসে কাজ বা চাকরী  করতে পাবেনা; হিন্দুরা সব  ভারতের দালাল এভাবে, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর নির্বিচারে ঘৃনা ও অপবাদ দেয়া কোন বিবেক সম্পন্ন মানুষের পক্ষে সম্ভব কি ? বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামে অংশ নিয়ে কি পরিমান অমুসলিম বাঙালী বা ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন করেছে, মুক্তিযোদ্ধা হয়ে বাংলাদেশের  জন্য যুদ্ধ করেছে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন দিয়েছে, ইজ্জ্বত দিয়েছে, নি;স্ব হয়েছে,  সে কথা কি তাঁরা ভুলে গেলেন  / সব  চেয়ে বেশি দেশ ছাড়া হয়েছে বাংলাদেশের হিন্দুরা, ঘর-বাড়ি, ভিটে -মাটি ছাড়া হয়েছে ধর্মীয় সংখ্যালগুরা, মাইনরিটিরা ।

আমেরিকায় আমরা যারা আছি, আমরা সকলেই  মাইনরিটি এখানে ।  মাইনরিটি হিসাবে এদেশের প্রয়জনীয় সকল সুযোগ  সুবিধা ভোগ করার পর, এমনকি এদেশে ডেমোক্রেটিক পার্টির সদস্য/সদস্যা হয়ে,এ ধরনের উগ্রতা, সাম্প্রদায়িক ঘৃনা  ও বাংলাদেশের মাইনরীটিকে জানোয়ার বানিয়ে ফেলা, সভ্য দেশে বসবাস করে এ-কোন অসভ্যতা ! একজন বিবেকবান মানুষ কি পারে মুহুর্তেই কদর্য রূপ ধারন করতে? পারে কি অন্ধ যুগের ভুতাস্রিত হয়ে নিজের চিন্তা চেতনাকে ভৌতিক ভাবে  প্রকাশ করতে ?


তাই হাজারো দু:খ প্রকাশ কিম্বা ভুল স্বীকার করলেও কি তাঁরা সাম্প্রদায়িতা  নামক ঘৃণ্য ভুতের কবল থেকে  নিজেকে মুক্ত রাখতে পারবেন  ? ভুল  স্বীকার করে সত্যিকার অর্থে   বিদেশের মাটিতে বসে   তাদের  যদি শুভ বুদ্ধির উদয় হয়, তাহলে তাদের ধন্যবাদ জানাই। আর যদি ভুতকে সন্তর্পনে লালন -পালন করে, তবে বিদেশের মাটিতে মাইনরিটি হয়ে থাকা এসব মানুষও একদিন নিজের ভুতের করাল গ্রাসে পড়বে/


আমরা কখনো  চাইনা সুদুর ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে সামপ্রদায়িকতা নামক  ভূতেরা দলে দলে এসে প্রবাসী বাংলাদেশীদের উপর ভর করুক / তাদের জাতীয়তাবাদকে উগ্র, হিংসার্থক ও ধর্মান্ধ করে তুলুক।  কামনা করছি ,আমাদের প্রবাস প্রজন্ম আমাদের সান্নিধ্যে থেকে মানবতাবাদী চিন্তা চেতনায় উদ্বুদ্ধ হউক, সাম্প্রদায়িক হাতিয়ার নয়, সুসভ্য মানব সম্পদ হিসাবে গড়ে উঠুক /  সাম্প্রদায়িক ভূত মুক্ত  হউক বোস্টন এবং সমগ্র বিশ্ব ।

 


 
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ