চোরাইপথে আনা বিদেশী মদ বিয়ারে ছেয়ে গেছে সারাদেশ

July 15, 2011, 10:16 AM, Hits: 1696

চোরাইপথে আনা বিদেশী মদ বিয়ারে ছেয়ে গেছে সারাদেশ


হ-বাংলা নিউজ : ঢাকা থেকে : চোরাইপথে ও শুল্কছাড়ে আনা বিদেশী মদ-বিয়ারে ছেয়ে গেছে সারাদেশ। সরকারও বঞ্চিত হচ্ছে হাজার কোটি টাকা থেকে। অন্যদিকে দেশীয় উৎপাদিত ‘হান্টার’ বিয়ার বিক্রি করতে গেলেই পুলিশ ও র‌্যাব ঝাঁপিয়ে পড়ছে। সরকার অনুমোদিত দেশীয় উৎপাদিত এই আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পণ্য থেকে সরকার রাজস্ব পেলেও তাকে রক্ষার ন্যূনতম প্রচেষ্টা নেই। বরং পদে পদে বাধা ও হয়রানির মাধ্যমে দেশীয় একমাত্র শিল্প প্রতিষ্ঠানটিকে ধ্বংসের চক্রান্তে মেতে উঠেছে কেউ কেউ। তাছাড়া কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক সংস্থায় কর্মরতদের জন্য আমদানি করা মদ ও বিয়ার প্রকাশ্যে বিক্রি হলেও দেখার কেউ নেই। পাঁচতারা হোটেল, অভিজাত ক্লাব এবং বার ছাড়াও রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের যত্রতত্র অনেকটা প্রকাশ্যেই বিক্রি হচ্ছে তরল মাদক। হাতেগোনা কয়েকটি অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান বিদেশ থেকে নামমাত্র মদ-বিয়ার আমদানি করলেও বছরজুড়ে চোরাইপথে সে াতের মতো আসছে মদ ও বিয়ার।

শুল্ক ফাঁকি ছাড়াও মিথ্যা ঘোষণা ও মিস ডিক্লারেশনের মাধ্যমে প্রতি বছর আনা হচ্ছে আরও কয়েকশ’ কোটি টাকার মদের চালান। এগুলোর যেমন ঠেকানোর কেউ নেই, তেমনি দেখারও কেউ নেই। এভাবে অবৈধ পথে বিপুল পরিমাণ মদ-বিয়ার আসার ফলে একদিকে সরকার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে দেশে উৎপাদিত উন্নতমানের মদ ও বিয়ারও মার খাচ্ছে। সরকারের রাজস্ব ফাঁকি ও বৈধ লাইসেন্সের আড়ালে বছরের পর বছর ধরে আমদানির নামে দেদারসে নৈরাজ্য ও লুটপাট হলেও ঘুম ভাঙছে না নারকোটিক্স ও আইন-শৃংখলা বাহিনীর। কিন্তু দেশীয় অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানে উৎপাদিত মানসম্পন্ন বিয়ার ঘাটে ঘাটে আটকানোর জন্য তারা ওঁৎ পেতে থাকে।

সুযোগ পেলেই ঝাঁপিয়ে পড়ে পুলিশ, র‌্যাবসহ আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোকজন। অথচ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর (নারকোটিক্স), কাস্টমস, পুলিশ ও র‌্যাবসহ আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও এজেন্সির যোগসাজশে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশেই অবাধে চলছে মাদক আমদানি, বাজারজাত, বিক্রি ও মাদক সেবনের ধুম। এদের অনেকেই চোরাচালানের মাধ্যমে আসা মদ-বিয়ারে আসক্ত। এগুলো পান করার সময় তারা একবারও জানতে চান না, কিভাবে এসব আসে এবং এ থেকে সরকার রাজস্ব পায় কিনা? কর্তৃপক্ষের সেদিকে নজর নেই। মাঝে মধ্যে লোক দেখানোর জন্য নামকাওয়াস্তে কিছু অভিযান চললেও তা নিতান্তই হাস্যকর ও ‘ম্যানেজ গেম’। সরকারি সংস্থাগুলোর উদাসীনতা ও ব্যক্তিগত স্বার্থের কারণে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে অবৈধ মদ-বিয়ার আমদানির এখন প্রতিযোগিতা চলছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলেছে, এর ফলে একদিকে সরকার প্রতি বছর শত শত কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে। অন্যদিকে মিস ডিক্লারেশনে আনা এসব চালানের মাধ্যমে শত শত কোটি টাকা হুণ্ডির মাধ্যমে বিদেশেও পাচার হচ্ছে।


অনুসন্ধানেও জানা গেছে, দেশের প্রতিটি অভিজাত ক্লাব, আবাসিক হোটেল এবং পাঁচতারা হোটেলে প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আনা চোরাচালানের মদ-বিয়ার। এছাড়া রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রামের প্রতিটি বারসহ দেশের সর্বত্র সয়লাব হয়ে গেছে কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক সংস্থায় কর্মরতদের জন্য আনা বিদেশী মদ-বিয়ারে। কূটনৈতিক বন্ডেড ওয়্যারহাউসগুলো বিভিন্ন কৌশলে প্রায় প্রকাশ্যে পাচার করছে শুল্কমুক্ত সুবিধায় আনা মদ-বিয়ার। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি পর্যটন কর্পোরেশনের শুল্কমুক্ত বিপণি থেকেও অবাধে মদ-বিয়ার পাচার হচ্ছে। চট্টগ্রাম ও ঢাকা কাস্টম হাউসের কমলাপুর আইসিডি দিয়ে মিথ্যা ঘোষণায় আনা তরল মাদকও সরাসরি চলে যাচ্ছে বারগুলোতে। অথচ বৈধভাবে মদ-বিয়ার আমদানির ক্ষেত্রে সাড়ে ৪শ’ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক পরিশোধের বিধান রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো থেকে সংগৃহীত তথ্যে জানা গেছে, রাজধানী ঢাকার ২৪টিসহ দেশের বৈধ-অবৈধ কোন বারেরই তরল মদ আমদানির সুযোগ বা লাইসেন্স নেই। কিন্তু তারপরও রমরমা বার বাণিজ্য চলছে বেপরোয়াভাবে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর মদদপুষ্ট শক্তিশালী মাফিয়া সিন্ডিকেট অতি মুনাফার এ ব্যবসা চালিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। এদিকে কূটনৈতিক বন্ডেড ওয়্যারহাউসের মালিকরা কয়েক বছরেই ফুলে-ফেঁপে উঠছে। একই সঙ্গে তদারকি ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বপ্রাপ্তরাও অবৈধ এ ব্যবসা থেকে প্রতি মাসে হাতিয়ে নিচ্ছেন মোটা অংকের মাসোহারা।


মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীতে বৈধভাবে শুল্ক দিয়ে মদ ও বিয়ার আমদানি করার লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান মাত্র ১৩টি। এগুলো হচ্ছেÑ হোটেল শেরাটন, সোনারগাঁও হোটেল, পূর্বাণী হোটেল, রেডিসন হোটেল, ঢাকা রিজেন্সি হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট, গুলশানের ওয়েস্টিন হোটেল, বনানীর হোটেল সেরিনা লিমিটেড, তেজগাঁওয়ের ফু ওয়াং বোলিং সার্ভিসেস লিমিটেড, ঢাকা ক্লাব, উত্তরা ক্লাব এবং অল কমিউনিটি ক্লাব। কিন্তু অবাক করার বিষয় হচ্ছে, সারা বছরের চাহিদার হাজার ভাগের এক ভাগ আমদানি করে বাকি চাহিদা মেটানো হচ্ছে শুল্কমুক্ত মদ-বিয়ার দিয়ে। এছাড়া পর্যটন কর্পোরেশন, আরবান ইন্টারন্যাশনালে ডিউটি ফ্রি শপ রয়েছে। এর বাইরে অন্য কোন আবাসিক হোটেল, ক্লাব বা বারের মদ-বিয়ার আমদানির কোন লাইসেন্স নেই।


এদিকে কূটনীতিক ও প্রিভিলাইজড পারসনসের কাছে মদ ও বিয়ার বিক্রির লাইসেন্সপ্রাপ্ত বেসরকারি প্রতিষ্ঠান মাত্র ৭টি। এগুলো হচ্ছেÑ ২৫ গুলশান এভিনিউর মেসার্স সাবের ট্রেডার্স, ১৪০ গুলশানের ইস্টার্ন ডিপ্লোম্যাট সার্ভিস, গুলশান-১ এর ঢাকা ওয়্যারহাউস, মহাখালীর এইচ কবীর অ্যান্ড কোম্পানি, ১৮ গুলশানের ন্যাশনাল ওয়্যারহাউস, দক্ষিণ গুলশানের টস বন্ড প্রাইভেট লিমিটেড এবং জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বেসরকারি শুল্কমুক্ত বিপণি সারবান ইন্টারন্যাশনাল। এর বাইরে সরকার নিয়ন্ত্রিত বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের মহাখালী বন্ডেড ওয়্যারহাউস এবং ডিপ্লোম্যাটিক প্রিভিলাইজড ট্যাক্স ফ্রি শপ রয়েছে। এছাড়া জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ট্রানজিট, আগমন ও বহির্গমন যাত্রীদের জন্য রয়েছে পর্যটন কর্পোরেশনের আরও ৩টি শুল্কমুক্ত বিপণি। এর প্রতিটি শুল্কমুক্ত বিপণিই সরাসরি কালোবাজারে মাদক বিক্রির সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।


সূত্রগুলো বলেছে, বার লাইসেন্সের শর্ত অনুযায়ী বিদেশ থেকে সাড়ে ৪শ’ শতাংশ শুল্ক পরিশোধ করা আমদানিকৃত মদ-বিয়ার ছাড়া অন্য কোথাও থেকে সংগ্রহ করা মদ বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কিন্তু প্রচলিত আইন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সারাদেশেই দেদারসে প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে কালোবাজারের মদ। শর্ত অনুযায়ী লাইসেন্স পাওয়া বারে শুধু মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ১৯৯০-এর অধীন দেশে উৎপাদিত বিলাতি মদের পারমিটধারী এবং বিদেশী নাগরিক ছাড়া অন্য কারও প্রবেশাধিকার থাকবে না। আমদানি লাইসেন্স ছাড়া কোন বারে বিদেশ থেকে আমদানি করা মদ ও বিয়ার বিক্রি করা হলে লাইসেন্স বাতিলেরও শর্ত আছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত একটি বারের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে এমন নজির নেই।


জানা গেছে, রাজনৈতিক মদদপুষ্ট সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে শুল্কমুক্ত সুবিধায় আনা মদ-বিয়ার সরবরাহ করা হচ্ছে দেশের অনুমোদিত-অননুমোদিত বার ও অভিজাত ক্লাবগুলোতে। অভিজাত এলাকায় অবস্থিত তথাকথিত গেস্ট হাউস এবং হোটেলেও চলছে মদ-বিয়ারের বেপরোয়া বাণিজ্য। চলছে বেহেল্লাপনাও। হাতের কাছে বিনা বাধায় বিদেশী মদ-বিয়ার ও নেশাদ্রব্য পাওয়ার সুযোগে দেশের তরুণ ও যুব সমাজ বিপথগামী হচ্ছে। ঝাঁকে ঝাঁকে পঙ্গপালের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ছে তারা তথাকথিত ক্লাব, আবাসিক হোটেল ও বারগুলোতে। সৃষ্টি হচ্ছে সামাজিক ও পারিবারিক অস্থিরতা। প্রতিদিন ঢাকার বার, ক্লাব, আবাসিক হোটেল আর গেস্ট হাউসগুলোতে উপচেপড়া ক্রেতাদের মদ-বিয়ার সরবরাহ দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। সরকারকে শত শত কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে মাদক ব্যবসায়ীরা ফুলে-ফেঁপে উঠলেও তা রোধে কার্যকর কোন ব্যবস্থা নেই। সংশ্লিষ্টদের প্রশ্নÑ যাদের বিদেশী মদ-বিয়ার বিক্রির লাইসেন্স নেই সেসব বার, ক্লাব বা হোটেলে প্রকাশ্যে বিদেশ থেকে আমদানি করা উন্নতমানের মদ-বিয়ার বিক্রি হচ্ছে কিভাবে? এ প্রশ্নের জবাব দিতে পারেননি খোদ এসবের তদারকি ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারাও।


সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কূটনৈতিক ওয়্যারহাউসগুলো নারকোটিক্স কর্মকর্তা ও কাস্টমস বন্ড অফিসারের যোগসাজশে কাগজকলমে বৈধতা দেখিয়ে প্রতি মাসে শত কোটি টাকার মদ-বিয়ার কালোবাজারে বিক্রি করে দিচ্ছে। অতি মুনাফার এই জমজমাট ব্যবসা নিরাপদ করার জন্য প্রতি মাসে এ সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে কোটি কোটি টাকার অর্থ লেনদেন হচ্ছে। এছাড়া উন্নত দেশের বড় কয়েকটি দূতাবাস ও কূটনৈতিক মিশন ছাড়া অনুন্নত ও দরিদ্র দেশের অধিকাংশ কূটনীতিক লাভজনক এ ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছেন বলে দায়িত্বশীল সূত্র স্বীকার করেছে।

 


 
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ