তারেকের নেতৃত্ব চ্যালেঞ্জ করলেন শমশের মবিন

July 16, 2011, 9:51 AM, Hits: 1723

তারেকের নেতৃত্ব চ্যালেঞ্জ করলেন শমশের মবিন


Mobin_-_Chu__-_SaKiL

 

আবীর খান: বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়াম্যান তারেক রহমানের উপর যখন একের পর এক ওয়ারেন্ট ইস্যু হচ্ছে, এমনকি ধরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা হচ্ছে তখনই তিনি কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লেন নিজ দলের কাছ থেকেই। আর এ চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন বিএনপির আরেক ভাইস প্রেসিডেন্ট শমশের মবিন চৌধুরী।

আওয়ামীলীগ সরকারের গৃহিত নানাবিধ পদক্ষেপে জিয়া পরিবার বিধ্বস্ত। সরকারের আগ্রাসী কর্মকান্ড ও বিচার বিভাগের দলীয়করনের প্রতিবাদে সারা বিশ্ব জুড়ে একই দিনে বাংলাদেশ দূতাবাস ঘেরাও কর্মসূচি আছে ২২ জুলাই। এর উদ্যোক্ত‍া যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির সভাপতি আবদুল লতিফ সম্রাট। বর্হিবিশ্ব বিএনপির ব্যানারে আয়েজিত এ কর্মসূচির প্রতি তারেক রহমানের সম্মতি রয়েছে বলে জানা গেছে। বিভিন্ন বিদেশ কমিটির সাথে ম্যারাথন টেলি-কন্ফারেন্স করে, নানাবিধ যোগাযোগ, পত্রিকা ও গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি প্রচার করে ১৬ জুলাই চুড়ান্ত প্রেস কনফারেন্স করার আগ মুহুর্তে হঠাৎ ঢাকা থেকে খবর রটানো হয়- দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া আবদুল লতিফ সম্রাটের নেতৃত্বাধীন যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির কমিটি ভেঙ্গে দিয়েছেন বা স্থগিত করেছেন। বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান বীর বিক্রম শমশের মবিনের বরাত দিয়ে খবরটি ছড়িয়ে পড়ছে যুক্তরাষ্ট্রে।


যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির নতুন কমিটি হবে এমন খবর যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে চাউড় হয়েছে মাস দুয়েক যাবৎ। বিশেষ করে খালেদা জিয়ার ২১মে যুক্তরাষ্ট্র সফরের আগে ও পরে এ নিয়ে তুমুল উত্তেজনা ও প্রয়াস লক্ষ্য করা গেছে। ২২ মে নিউইয়র্কে খালেদা জিয়ার সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানে নিজেই জানান দেন একটি কমিটি আসছে। যদিও এর আগে বেগম জিয়াকে সম্বর্ধনা জানানোর জন্য ঢাকা থেকে একটি প্রস্তুতি কমিটি গঠন করে দেন শমশের মবিন চৌধুরী।

আর তাতে ডাঃ মজিবুর রহমান মজুমদারকে আহবায়ক ও বেলাল মাহমুদকে সম্পাদক করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির সভাপতি আবদুল লতিফ সম্রাটের যায়গা হয় একজন সদস্য হিসাবে। উল্লেখ্য নব্বইয়ের দশকে ডাঃ মজিব যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা কনভেনর ছিলেন ৪ মাসের জন্য। এরপরে তিনি দলীয় কর্মকান্ড থেকে দূরে ছিলেন দীর্ঘকাল। মুলত এ কমিটি গঠনের পিছনে মূল শক্তি হিসাবে কাজ করেছেন ওয়াশিংটন মেট্রো বিএনপির সভাপতি শরাফত হোসেন বাবু। শমশের মবিনের সাথে শরাফত বাবুর সম্পর্ক গলায় গলায়। শরাফত বাবু নিজেকে তারেক রহমান সম্বন্ধী পরিচয় দেন। অবশ্য শরাফত এ কথা প্রচার করেছে, তারেক রহমানের স্ত্রী ডাঃ যুবাইদার সাথে তার রয়েছে "বিশেষ সম্পর্ক"। তাছাড়া এক-এগার পরবর্তী দুর্দিনে হুলিয়া মাথায় নিয়ে পলাতক অবস্থায় যুবাইদা ছিলেন বাবুর হেফাজতে- এমন কথাও বাবু প্রচার করেছে। ডাঃ মজিবুর রহমানের আহবায়ক কমিটিতে শরাফত বাবু স্থান নেন সিনিয়র কো-কনভেনরের। যাই হোক, এ কমিটি মেনে নেয়নি যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি। তারা বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ সভা ও প্রেস কন্ফারেন্স করে খালেদা জিয়াকে সম্বর্ধনা প্রস্তুতির আরেকটি কমিটির ঘোষণা দেয়, হোটেল ভাড়া করে। এক পর্যায়ে সভায় হাতাহাতি হয় এবং আবদুল লতিফ সম্রাট ঘোষণা দেন, প্রয়োজনে রক্তের বন্যা বয়ে যাবে হোটেল শেরাটনে। এসব খবর শীর্ষ মহলে পৌছে যায়। মিসেস জিয়া তখন যুক্তরাজ্য সফরে। তারেক রহমান হস্তক্ষেপ করেন। শমশের মবিনকে চাপ প্রয়োগ করেন সবকিছু নিষ্পত্তি করে অনুষ্ঠান আয়োজনের। শোনা যায় হুকুমটি ছিলো-  You create the mess, you fix it. সবাইকে নিয়ে কাজ করার আদেশ পৌঁছার পরপরই দৃশ্যপট দ্রুত বদলাতে থাকে। অবশেষে ২২ মে নিউইয়র্ক শেরাটনে আয়োজিত সম্বর্ধনা অনুষ্ঠান হয় খুব সাড়ম্বরে। প্রায় ৩ হাজার লোকের সমাগম হয়।
২৩ মে বেগম জিয়া যান ওয়াশিংটনে। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রী হিলারী ক্লিনটনের সাথে বৈঠক হবার কথা। ওয়াশিংটন বিএনপি দেবে সম্বর্ধনা। দুটোই ভন্ডুল হয়ে যায়। প্রথমটার কারন ছিলো, যে লবিষ্ট ফার্ম এ সাক্ষাতের আয়োজক ছিলো তাদেরকে নাকি পেমেন্ট করেনি শরাফত বাবু। তাছাড়া প্রধানমন্ত্রী তনয় সজীব ওয়াজেদ জয় ও ভারতের উল্টো তদবীর ছিলো। আর ওয়াশিংটন বিএনপির সম্বর্ধনায় বাবুর বিপক্ষ গ্রুপের লোকেরাই বেশী সক্রিয় ছিলো এই কারনে বাবু প্রচার করেন, যারা সম্বর্ধনা দিচ্ছে তারা আওয়ামী গ্রুপ। আর যায় কোথায়? সম্বর্ধনা পন্ড। ওয়াশিংটনের হোটেল কক্ষে শরাফত বাবু খালেদা জিয়াকে দিয়ে নতুন একটি কমিটি সাক্ষর করিয়ে নিতে সক্ষম হন বলে জানা যায়। অবশ্য ঘটনার সাথে সাথেই সে কমিটির কাগজ বিএনপির কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা আবদুল আউয়াল মিন্টু নিজ হেফাজতে নিয়ে নেন, কেননা আইননুগভাবে কোনো বিদেশ কমিটির অনুমোদন দিতে পারেন না দলীয় চেয়ার পারর্সন। তাহলে লংঘন হবে দলীয় গঠনতন্ত্র ও নির্বাচনী আইন। এ ‍অবস্থায় বেগম জিয়া দেশে ফিরে যান ২৭ মে।


এরপরে আরো অনেক ঘটনা ঘটে। শরাফত বাবু প্রতিদিন গুজব রটায়- কমিটি আজ আসছে, কাল আসছে। অন্যদিকে, শরাফতের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠে, বেগম জিয়া চলে যাবার পরেও ঘাটতির নামে ৫১ হাজার ডলার চাঁদা তোলার চেষ্টার। এমন অবস্থায় দলীয় নেতা কর্মীদের চাপে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির সভাপতি ও সেক্রেটারী ওয়াশিংটন বিএনপি কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করেন ৬ জুন। মূল অভিযোগ হিসাবে বলা হয়, ওয়াশিংটনে খালেদা জিয়াকে সম্বর্ধনা দিতে ব্যর্থতা। এ ছাড়াও বাবুর বিরুদ্ধে আরো অভিযোগের মধ্যে ছিলো, দলীয় কার্যক্রমকে ধংস করা, সাধারণ নেতা কর্মীদের সাথে অহরহ দুর্ব্যবহার করা, জিয়া পরিবারের সদস্য দাবী করে যত্রতত্র অর্থ হাতিয়ে নেয়া, লবিইং ফার্মের নামে কয়েক লক্ষ ডলার অপচয় করা, ওয়াশিংটন সফরে খালেদা জিয়াকে গণ-বিচ্ছিন্ন করে রাখা। ১৯ জুন যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির সভাপতি আবদুল লতিফ সম্রাট কাউন্সিল করে গ্রেটার ওয়াশিংটন ডিসির বিএনপির নতুন কমিটি ঘোষনা করেন- আশরাফ সভাপতি, হোসেন সেক্রেটারী। ওই একই দিনে শরাফত বাবুও ওয়াশিংটনে মিটিং ডাকেন নিজেকে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি দাবী করে। কথা ছিলো, যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির নতুন কমিটি ঘোষণা করবেন। কিন্তু উপস্থিত নেতা কর্মীরা গঠনতন্ত্র বিরোধী কাজে রাজী না হওয়ায় বাবুর চেষ্টা ভন্ডুল হয়ে যায়। আরো পরে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি থেকে বহিস্কারের লক্ষে আবদুল লতিফ সম্রাট শোকজ করেন বাবুকে। প্রাণ ওষ্ঠাগত হয় বাবুর। তাকে রক্ষার জন্য আকুতি জানান ডাঃ যুবাইদাকে। যুবাইদাও তারেক রহমানের উপর চাপ সৃষ্টি করেন। এবারে শরাফত বলে বেড়ান, সংসার করতে হলে তারেক রহমান অবশ্যই তাকে সভাপতি করবেন। এ ছাড়া আর কোনো উপায় নাই তার। দিন যায়, কিন্তু কমিটি আর আসে না।


জুলাইর গোড়ার দিকে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির সভাপতি আবদুল লতিফ সম্রাট এক কর্মসূচি ঘোষনা করেন- সরকারের জুলুম নির্যাতনের প্রতিবাদে সারা বিশ্বে একযোগে দূতাবাস ঘেরাও। জিয়া পরিবারকে ধংসের হাত থেকে রক্ষার এ কর্মসূচিতে তারেক রহমানেরও সায় মেলে। এতে হতাশ হযে পড়েন বাবু। নানান যায়গায় ফোন করে নিষেধ করেন প্রোগ্রামে সামিল হতে। তার মনে হয়, প্রোগ্রামটি সফল হলে সম্রাটকে আর আটকানো যাবে না। হাতে পায়ে ধরেন লন্ডনে বোন যুবায়দার। আর কান্নাকাটি করেন শমশের মবিনের কাছে। এমন কথাও বলেন, "আমাদেরকে রাস্তায় নামিয়ে আপনি সরে আছেন। আমরা পড়ে পড়ে মার খাচ্ছি।" শমশেরকে বোঝানো হয়, তারেক রহমানের বাধার কারনেই বাবু যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির সভাপতি হতে পারছে না। কাজেই চ্যালেঞ্জ করতে হবে খোদ তারেককে। আর এ জন্য বেছে নেয়া হয় উপযুক্ত সময়ের।

২১ আগষ্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় তারেক রহমানকে অভিযুক্ত করে ওয়ারেন্ট ইস্যু করেছে সরকার। এরপরে বিস্ফোরক মামলায় চার্জশীট, ওয়ারেন্ট, ক্রোকি পরওয়ানা। সর্বশেষে, আওয়ামীলীগ সরকার তারেককে লন্ডন থেকে ধরে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। আর তাতে তারেক রহমান বিপর্যস্ত। এমন সময়ে ডামাডোলে মধ্যে শমশের মবিন বেগম জিয়ার কাছে যান যুক্তরাষ্ট্র কমিটি ভেঙ্গে দেবার প্রস্তাব নিয়ে। আগ-পিছ বিবেচনা না করেই তিনি সায় দেন। শুরু হয় নতুন কমিটি নেবার জন্য ইদুর দৌড়। একদিকে ডাঃ যুবায়দার মাধ্যমে শরাফত বাবু, এমপি রেহেনা আক্তার রানুর মাধ্যমে বেলাল মাহমুদ, শমশের মবিনের সিলেটি কানেকশনে জিল্লুর রহমান, নোয়াখালী কানেকশনে ডাঃ মজিবুর রহমান। সবাই সভাপতি হবে। আর এটা যদি হয় তাহলে পন্ড হয়ে যাবে ২২ তারিখের সারা বিশ্বজুড়ে দূতাবাস ঘেরাও কর্মসূচি। তবে এটা এমন সময়ে হচ্ছে যখন জিয়া পরিবারের চরম দুর্দিন। যেখানে এখন দরকার কঠিন আন্দোলনের, মিলে মিশে প্রতিবাদ করার; সেখানে ভাঙ্গছে কমিটি। কার স্বার্থ কে হাসিল করে, সেটাই বিএনপির সামনে এখন বড় প্রশ্ন।

 


 
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ