নারী নেতৃত্ব্যে অদম্য হিলারি

May 7, 2017, 5:58 PM, Hits: 1833

নারী নেতৃত্ব্যে অদম্য হিলারি

তামান্না ইসলাম, হ-বাংলা নিউজ : এবারের আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ছিল সব দিক দিয়ে বেশ উল্লেখযোগ্য। ডেমোক্র্যাট আর রিপাবলিকানের চিরায়ত লড়াই তো ছিলই, কিন্তু সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল আমেরিকা এই প্রথমবারের মতো একজন নারীর প্রেসিডেন্ট হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছিল। নির্বাচনে উত্তেজনা, বিতর্ক—সব ছাপিয়ে আমি বেশ গর্বসহকারে কাটিয়েছি ওই সময়টা। তৃতীয় বিশ্বের দেশ হয়ে আমরা সেই কবে পেয়েছি নারী সরকারপ্রধান, আর এসব বিষয়ে এগিয়ে থাকা দেশে সে কী গুঞ্জন—‘আমেরিকা কি আসলেই নারী প্রেসিডেন্ট পাবে?’, ‘আমেরিকার মানুষ কি আসলেই এত উদারপন্থী হয়েছে?’—আমি শুনি আর মনে মনে হাসি। যোগ্যতার দিক থেকে অন্য প্রার্থীর তুলনায় সে কোনো অংশেই কম যায় না, তারপরও এটা এত বড় ইস্যু। কিন্তু মনে মনে অনেক আশা নিয়েই বসে ছিলাম, হাজার হলেও দেশের ভালো, আমেরিকানরা নিশ্চয়ই এতটা পশ্চাদপন্থী না যে এত বড় ঝুঁকি নেবে। আমার সব আশা গুঁড়িয়ে দিয়ে প্রমাণিত হলো, ‘আমেরিকানরা এখনো দেশের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে একজন নরীকে দেখতে মানসিকভাবে প্রস্তুত নন।’ আরও অনেক কারণ নিশ্চয়ই আছে, তবে এই কারণটা একটা বড় কারণ ছিল। স্বপ্নভঙ্গের সেই দিন আমি জানতাম না আমার জন্য আরেক বিরাট বিস্ময় অপেক্ষা করছে।

কিছুদিন আগে আমি গিয়েছিলাম মেয়েদের এক কনফারেন্সে। কনফারেন্সের আয়োজন করেছে প্রফেশনাল বিজনেস উইমেন অব ক্যালিফোর্নিয়া। আমি প্রায় প্রতিবছরই যাই এই কনফারেন্সে। তবে এ বছরের সঙ্গে অন্য কোনো বছরেরই তুলনা হয় না। এসেছেন সব বাঘা বাঘা বক্তা, তাঁদের বক্তব্য, তাঁদের সংগ্রাম, তাঁদের প্রাণশক্তি আমাকে এক অবর্ণনীয় আবেশে আবিষ্ট করে ফেলেছিল। এই বক্তাদের মধ্যে নিঃসন্দেহে সবচেয়ে স্মরণীয় ছিল হিলারি ক্লিনটনের বক্তব্য। আমেরিকার শক্তিশালী দুটি রাজনৈতিক দলের একটি থেকে বিজয়ী প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হিলারি ক্লিনটন। আমি খুব যে রাজনীতির সাথে জড়িত তা নয়। টিভির পর্দায় হিলারিকে দেখেছি, কথা শুনেছি ঝানু রাজনীতিবিদ প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হিলারির। রাজনীতিবিদ হিসেবে তাঁকে নিয়ে নানা মত অবশ্যই আছে। তবে একজন শক্তিশালী নারী হিসেবে, নারীদের জন্য একজন রোল মডেল হিসেবে তাঁকে দেখে আমি দারুণভাবে অভিভূত, তাঁর কথাগুলো গভীরভাবে আমার প্রাণ ছুঁয়ে গেছে। হলভর্তি সাড়ে পাঁচ হাজার উচ্চশিক্ষিত নারী সেদিন মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনেছিলেন।

হিলারির নিজের মুখে শুনতে পেলাম তাঁর জীবনের গল্প। তাঁর মা মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে অন্যের বাড়িতে গৃহসহকারী হিসেবে কাজ শুরু করেন। সেই বাড়ির গৃহকর্ত্রী তাঁর পড়ালেখার প্রতি আগ্রহ বুঝতে পেরে তাঁকে বলেন, স্কুলের আগে সকালে আর পরে বিকেলে এসে কাজ করে দিলেও হবে। এটা ছিল তাঁর জন্য এক বিশাল আশীর্বাদ। চৌদ্দ বছরের এই মেয়েটির ছিল একটি মাত্র স্কার্ট আর দুটি শার্ট। দয়ালু সেই গৃহকর্ত্রীর নজরে সেটাও এড়ায়নি। নিজের কিছু পুরোনো কাপড় দিয়ে দেন তাঁকে। এমন একটি সংগ্রামী মায়ের আদর্শে বড় হয়েছেন হিলারি। কম বয়সে একবার শখ হয়েছিল নভোচারী হওয়ার, তাঁকে জানানো হয়, মেয়েদের জন্য এই সুযোগ নেই। সেই প্রথম খটকা লাগে তাঁর, তবে কি মেয়েদের ছেলেদের মতো একই সুযোগ নেই? পরবর্তীতে হার্ভাড ল স্কুলে সুযোগ পাওয়ার পর একই বিভাগের এক শিক্ষক মেয়েদের ল পড়া নিয়ে কটাক্ষ করলে সেটাও তাঁকে ভীষণভাবে নাড়া দেয়। তারপর আর কিছুই তাঁকে মেয়ে বলে আটকাতে পারেনি। আমেরিকার মতো উন্নত দেশে অন্যতম সফল নারী বললে তাঁকে কম বলা হয়। নারী ও শিশুদের জন্য তাঁর অবদান অনস্বীকার্য।

আমাকে যেটা সবচেয়ে মুগ্ধ করেছে, সেটা তাঁর উঠে দাঁড়ানো, তাঁর ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি। আমেরিকায় এই প্রথম একজন নারী প্রেসিডেন্ট পদে লড়াই করলেন, এটা যে কত বিশাল ব্যাপার, সেটা আমেরিকার ভেতরে থেকে অনুভব করেছি প্রতি মুহূর্তে। উনসত্তর বছরের বৃদ্ধা নিঃসন্দেহে তাঁর সর্বশক্তি নিয়ে লড়াই করেছেন। অল্পের জন্য আশাতীতভাবে তিনি হেরে গেছেন। আমেরিকার নিয়ম অনুযায়ী তিনি আর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। তাঁর জীবনের হয়তো সর্বশেষ ও সর্ববৃহৎ স্বপ্ন ছিল এটা। শুধু তাঁর একার নয়, এই স্বপ্ন ছিল আমেরিকার লাখ লাখ মেয়ের। সেটা ভেঙে যাওয়ার পর তিনি প্রচণ্ডভাবে ভেঙে পড়বেন, লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যাবেন, নিজেকে গুটিয়ে নেবেন সেটাই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু তিনি সাধারণ, স্বাভাবিক এগুলোর ঊর্ধ্বে। তাই ফিরে এসেছেন দ্বিগুণ শক্তিতে। কারণ দেশকে, দেশের মেয়েদের তিনি পিছিয়ে দিতে দেবেন না কিছুতেই। আমেরিকার বর্তমান প্রেসিডেন্টের নারীদের প্রতি মনোভাব নিয়ে, তাঁর নারী-সম্পর্কিত বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে। তাই অনেকেই আশঙ্কায় আছেন। হিলারির ভাষ্যমতে, ‘সবাই যেখানে অন্ধকার দেখছে, আমি দেখছি আলো। কারণ এসব পশ্চাদপদ পদক্ষেপ ঠেকাতে আলো জ্বালাতেই হবে আমাদের। তাই আমি আশাবাদী।’ কতখানি মানসিক শক্তি থাকলে একজন ভেঙে পড়া নারী, হেরে যাওয়া নারী আর সব মেয়েকে এভাবে আশার আলো দেখাতে পারে, সেটা আসলেই বিরল।

হিলারি বলছিলেন, ‘মেয়েদের স্বাস্থ্য নিয়ে বিল হবে, সেটা নিয়ে আলোচনা করছে ছেলেরা। এটা কেমন কথা? মেয়েদের সমস্যা মেয়েরাই সবচেয়ে ভালো বোঝে।’ জানি পিছিয়ে থাকা নারীদের এগিয়ে যেতে অনেক ক্ষেত্রেই ছেলেদের সাহায্য লাগবে, কিন্তু ‘মেয়েদের স্বাস্থ্য সমস্যা বা পোশাকের’ মতো একান্ত নিজস্ব অভিজ্ঞতা বা সিদ্ধান্তে ছেলেদের ওপর নির্ভরতা একধরনের দুর্বলতার নামান্তর। হিলারি যথার্থই প্রমাণ করলেন যে তিনি একজন সবল নারী এবং পৃথিবীর সব নারীর শক্তিতে তিনি বিশ্বাসী। তাঁর দিকে তাকিয়ে আছেন যেসব নারী, তাঁদের

জন্য তাঁর এই বিশ্বাসটুকু অমূল্য। এগিয়ে যান হিলারি, এগিয়ে নিয়ে যান আমেরিকা ও গোটা পৃথিবীর নারীদের।

 

 
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ