নিউইয়র্ক থেকে বাসযাত্রা

May 12, 2017, 10:15 AM, Hits: 2106

নিউইয়র্ক থেকে বাসযাত্রা

নিউইয়র্ক থেকে বাসে উঠেছি। যাব নায়াগ্রা জলপ্রপাত দেখতে। লোকাল বাস নয়, টুরিস্ট বাস। বাস ভর্তি মানুষ। সবাই মনে হলো টুরিস্ট। বিভিন্ন দেশি লোকজন। চায়নিজ, জাপানিজ, কোরিয়ান, ভিয়েতনামিজ। দেশি বলতে শুধু কিছু ইন্ডিয়ান দেখতে পাচ্ছি। আমি, আমার স্ত্রী আর দুই বছরের ছেলে বসে আছি বাসের মাঝামাঝিতে একটি সিটে।

তখন খুব সকাল, মৃদু রোদ্দুর নিউইয়র্কের উঁচু উঁচু বিল্ডিংয়ের ফাঁক গলে সোনালি আলো ছড়াচ্ছে। রাস্তাঘাটে তখনো যান অথবা মানুষের চলাচল খুব একটা শুরু হয়নি। সকালবেলার সুনসান নিউইয়র্ক দেখে মনে পড়ে ঢাকার মতিঝিলের কথা। নটর ডেম কলেজে থাকাকালে মেস করে মতিঝিল এলাকায় থাকতাম। ছুটির দিন খুব সকালবেলা মেস থেকে বেরিয়ে রাস্তায় দৌড়াতে বের হতাম। মতিঝিলের রাস্তাঘাটে তখন থাকত সুনসান নীরবতা। শুধু দূরে এক–দুটা রিকশার টুংটাং আওয়াজ কানে ভেসে এসে মিলিয়ে যেত।

প্রায় এক যুগ আগে আমেরিকায় আসার পর সেবারই প্রথম ইস্টকোস্টে বউবাচ্চাসহ বেড়াতে গেছি। আমেরিকায় মানুষের জীবন আরবান অথবা রুরাল। বাংলায় যাকে শহুরে আর গেঁয়ো বলে আর কী। জীবনযাত্রার মান এই দুই প্রান্তে যদিওবা সমান, কিন্তু জীবনযাত্রার ধরন একেবারেই ভিন্ন। আমেরিকায় আসার পর থেকেই আমি রুরাল এরিয়া মানে গাঁ এলাকায় থাকি। সেটা হচ্ছে দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার এক শহরতলি রিভারসাইড। রুরাল আমেরিকার রাস্তাঘাট বেজায় প্রশস্ত, ট্রাফিক কম, গাড়িগুলো নিঃশব্দে চলে। কোনো পেডেস্ট্রিয়ান রাস্তা পার হবে দেখলে আধা মাইল আগে গাড়ি থেমে যায়। গাড়ি চালানো তাই একেবারে পান্তাভাত। রাস্তায় নেমে স্টিয়ারিংটা ঠিকঠাক মতো ধরে কিছুদিন ডান বাম করলেই কাজ সারা। টেস্ট দিয়ে লাইসেন্স পাওয়া যায়। এহেন ড্রাইভিং দক্ষতা নিয়ে মেট্রো শহরে গেলেই বোঝা যায় যে, গাড়ি চালানোটা কি জিনিস।

আমাদের কাছের আরবান মেট্রো হচ্ছে লস অ্যাঞ্জেলেস। প্রথম যেদিন আমি লস অ্যাঞ্জেলেস ডাউন টাউনে গাড়ি চালাই সেদিন বুঝেছিলাম যে, এত দিনে গাড়ি চালানো আসলে কিছুই শিখিনি। এখানে রাস্তাগুলো একেবারেই অপ্রশস্ত। গাড়ি চালানোর সময় পাশের লেন দিয়ে গাড়ি গেলে মনে হতো এই বুঝি লেগে গেল। এখানে বেশির ভাগ রাস্তা দুই লেনের। ফলে কোনো সিগন্যালে বাঁয়ে যেতে হলে (আমেরিকায় রাস্তার ডানে গাড়ি চলে) সোজা লেন থেকেই বাঁয়ে নিয়ে যায়। এ রকমের সিগন্যালগুলোকে বলে প্রোটেক্টেড লেফট। এই সিগন্যাল বাতিগুলো সাধারণত গোলাকার সবুজ অথবা ব্লিংকিং হলুদ তীরের মতো হয়ে থাকে।

জীবনে প্রথম এমন সিগন্যাল বাতিতে গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। আমার পেছন গাড়ির বিশাল লাইন। আমি বাঁয়ে গেলে পরে ওরা সোজা লেন ধরেই যাবে। এ রকম সিগন্যালে গাড়ি চালানোর একটা বিশেষ নিয়ম আছে। সেটা হচ্ছে, আস্তে আস্তে এগিয়ে ইন্টারসেকশনের মাঝ বরাবর গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। তারপর বিপরীত দিক থেকে আসা গাড়িগুলো চলে গেলে অথবা ফাঁকা পেলে দ্রুত বাঁয়ে চলে যেতে হবে। সমস্যাটা হচ্ছে ডাউন টাউনে এত পরিমাণে ট্রাফিক থাকে যে বিপরীতদিক থেকে আসা গাড়ির স্রোত তাদের সিগন্যাল রেড না হওয়া পর্যন্ত যেন আসতেই থাকে। যখন গাড়ি আসা বন্ধ হয় ততক্ষণে বাঁয়ে যাওয়ার সিগন্যাল রেড হয়ে যায়। ফলে খুব অভ্যাস এবং দক্ষতা না থাকলে এই সিগন্যাল বাতিগুলোতে গাড়ি চালানো খুব কঠিন এবং অ্যাক্সিডেন্টের সমূহ সম্ভাবনা থাকে। প্রথমবার এই সিগন্যাল বাতিতে আমি মেক করতে পারিনি। কাজের কাজ যেটা হলো, ইন্টারসেকশনের মাঝখানেই দাঁড়িয়ে থাকতে হলো। সেটা আরও সমস্যা, আমার ডানের ট্রাফিকই কিন্তু সব ব্লক হয়ে গেল। সেদিন বাসায় ফিরে ড্রাইভিং লাইসেন্সের বইটা আবারও পড়লাম। এই সিগন্যাল বাতিতে লেফট নেবার ট্রিকটা হলো, বিপরীত দিক থেকে গাড়িগুলো যখন তাদের রেড সিগন্যাল পেয়ে থেমে যাওয়ার বন্দোবস্ত করে, তখন বাঁয়ে যাওয়ার সিগন্যাল রেড হয়ে যাওয়ার মুহূর্তে অথবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে রেড হয়ে গেলেও দ্রুত গাড়ি ঘুরিয়ে সতর্কতার সহিত বাঁয়ে টার্ন নিয়ে নিতে হবে।

গাড়ি চালাতে চালাতে এটা অভ্যাসে চলে এসেছিল বটে, তবু কোথাও কোনো ডাউন টাউনে গাড়ি চালাতে এখনো আমার অস্বস্তি লাগে। সম্ভব হলে গাড়ি না চালিয়ে পাবলিক ট্রানজিট ব্যবহার করি। লন্ডনে গেলে টিউব ট্রেনে চড়তে মজা। মেট্রো এলাকার বড় সুবিধা হচ্ছে সার্বক্ষণিক পাবলিক ট্রানজিট। নিউইয়র্ক মনে হয়েছে আরও পাগলা শহর, ঢাকার মতো। এখানে গাড়ি চালানো মনে হয়েছে একেবারেই দুষ্কর। নিউইয়র্কে ঘুরতে গিয়ে তাই গাড়ি ভাড়া না নিয়ে পাবলিক বাসে আর ট্রেনে করে ঘুরেছি।

এর আগে একবার ক্যালিফোর্নিয়া থেকে টুরিস্ট বাসে করে লাসভেগাস গিয়েছিলাম। টুরিস্ট বাসে করে ভ্রমণের একটা আলাদা আনন্দ আছে। গাড়ি ড্রাইভ করার ঝামেলা নাই, বসে বসে বাইরেটা দেখতে দেখতে যাওয়া যায়। বাস বিভিন্ন লোকেশনে থেমে থেমে যায়। আরও অনেক মানুষের সঙ্গে সেসব জায়গায় বের হয়ে ঘুরে দেখার সুযোগ হয়। একা একা গাড়ি চালিয়ে গেলে অতটা ঘোরা হয় না। টুরিস্ট বাসে করে ঘুরবার আবার যন্ত্রণাও আছে। বাসের শিডিউল মাফিক নিজেদের ঘোরাঘুরিটাকে খাপ খাইয়ে নিতে হয়। সহযাত্রীদের কথা সারাক্ষণ মাথায় রাখতে হয়, এইটুকুনই যা ঝামেলা।

নিউইয়র্কের সেই টুরিস্ট বাসভর্তি মানুষ। চারিদিক থেকে বিভিন্ন ভাষার কথাবার্তা কানে ভেসে আসছে। আমেরিকায় আসার পর প্রথমদিকে চায়নিজ, কোরিয়ান আর জাপানিজ মানুষদের সবার কথাবার্তা কেমন যেন একরকমই মনে হতো। কে কোথাকার কথা শুনে বোঝা মুশকিল ছিল, শুধু চেহারা দেখে কখনো সখনো চেনা যেত। এরপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কোরিয়ান আর চায়নিজ ছাত্রছাত্রীদের কথাবার্তা শুনে শুনে কোরিয়ান আর চায়নিজ ভাষার টানটা মোটামুটি বুঝতে পারতাম। জাপানিজ কারওর সঙ্গে খুব একটা চলাফেরা করা হয়নি, তাই কোরিয়ান আর জাপানিজ ভাষাটা এখনো শুনলে কানে একরকমই বাজে।

এতক্ষণে বাস ছেড়ে দেওয়ার কথা। সকাল সাতটায় রওনা দিয়ে আমরা নিউজার্সি হয়ে আরও বেশ কটা লোকেশনে থেমে নায়াগ্রা গিয়ে পৌঁছাব বিকেলবেলা। বাস ছাড়তে দেরি হলে সব পরিকল্পনা এলোমেলো হয়ে যাবে। টুরিস্ট গাইড এক চায়নিজ নারী। চায়নিজ একসেন্টে ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে বললেন, আমাদের দুজন টুরিস্ট এখনো এসে পৌঁছাননি। আপনারা দয়া করে একটু ধৈর্য ধরুন। আমরা আর অল্পক্ষণের মধ্যেই আমাদের যাত্রা শুরু করব। এর মধ্যে টুরিস্ট দুজন এসে পৌঁছে গেলেও কিছু মানুষ বাস থেকে নেমে গেছেন পায়চারি করতে। চায়নিজ গাইড সবাইকে ডাকাডাকি করে নিয়ে এলেন আমাদের দেশের লোকাল বাসের কন্ডাক্টরের মতো। বাসের মধ্যে মানুষের ক্যাঁচরম্যাচর শব্দ, চায়নিজ গাইডের সশব্দ চিল্লাচিল্লি, কোনো কিছুতেই যেন বিরক্তি লাগছে না। ঘুরতে বেরিয়েছি বলেই হয়তো পুরো ব্যাপারটিই উপভোগের মনে হচ্ছে।

মজার ব্যাপার হলো বাসের কেউই এতসবে বিরক্তিবোধ করছেন না, পুরো সময়টাকেই সবাই যেন উপভোগ করছেন। অবশেষে বাসের সকল যাত্রী গুনে লিস্টের সঙ্গে মিলিয়ে চায়নিজ গাইড আবারও ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে ঘোষণা দিলেন, বাস এখনই ছেড়ে দেবে। ততক্ষণে নিউইয়র্কের পূর্বাকাশে সূর্য উঁকি দিয়ে উঠেছে, নীলাকাশ ভর্তি সোনালি রোদ। আর আমাদের বাসযাত্রা শুরু হলো নায়াগ্রার উদ্দেশে।

 

 
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ