‘ম’-তে মা

May 18, 2017, 6:16 PM, Hits: 3438

‘ম’-তে মা

আবদুল্লাহ জাহিদ,ম্যানেজার, কুইন্স লাইব্রেরি, নিউইয়র্ক :কলেজের ফ্রেশম্যান যে ছেলেটা লাইব্রেরি কম্পিউটার ব্যবহারকারীদের সাহায্য করে, আমার রুমে এসে বলল, সে লাইব্রেরির পাবলিক কম্পিউটারের পাশে একটা সেলফোন পেয়েছে। কী করব? জানতে চাইল। আমি বললাম, ‘ওর মাকে ফোন করো।’ ছেলেটা বলল, ‘কেমন করে? আমি তো ওর মায়ের ফোন নম্বর জানি না।’ আমি বললাম, ‘খুব সোজা, অ্যাড্রেস বুকে যাও, এম বোতাম চাপো, দেখবে সেভ করা আছে মা অথবা মম।’ ছেলেটা তা-ই করল এবং মায়ের নম্বর পেয়েও গেল। ওই ফোন থেকেই ফোনের মালিকের মাকে ফোন করে সব বৃত্তান্ত বলল ও। কিছুক্ষণের মধ্যেই বৃদ্ধা মা চলে এলেন লাইব্রেরিতে। আমার সামনেই ফোনটা তাঁর ছেলের বলে শনাক্ত করলেন। আমি যথাযথ নিয়ম মেনে ফোনটা তাঁকে হস্তান্তর করলাম।

এরপর লাইব্রেরির সেই ছেলেটা আমাকে উদ্দেশ করে বলল, ‘তোমার ফোনেও নিশ্চয়ই তোমার মায়ের নম্বর সেভ করা আছে।’ আমি বললাম, ‘ছিল, তবে আমার ফোনটা হারিয়ে গেছে।’ কথাটা বলে আমি দ্রুত ছেলেটার কাছ থেকে নিজেকে আড়াল করলাম, কারণ উত্তরটা দেওয়ার সময় আমার চোখ ঝাপসা হয়ে গিয়েছিল। আমি নিজের আবেগটা ওকে দেখতে দিতে চাইনি। মানুষের কিছু কিছু দুঃখ থাকে, যা কাউকে বলতে ইচ্ছে করে না। আমি ফোনটা ওই মাকে ফেরত দিতে দিতে ভাবছিলাম, সত্তরোর্ধ্ব বয়সেও একজন ‘মা’ ছেলের টেক কেয়ার করেন। মায়েরা সব সময়ই তা করেন। বয়স সেখানে কোনো বিষয়ই না।

এই ঘটনা আমাকে অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সাঈদ স্যারের বলা একটা গল্প মনে করিয়ে দিল। তিনি কোনো একটা টেলিভিশন অনুষ্ঠানে গল্পটা বলেছিলেন। গল্পটা আজ থেকে কমপক্ষে বিশ বছর আগে শুনেছি, তবুও এখনো স্পষ্ট মনে আছে।

গল্পটা এ রকম: একজন প্রেমিকা তার প্রেমিকের ভালোবাসা কতটুকু তার প্রমাণ চাইল।

প্রেমিকা: তুমি কি আমাকে সত্যি ভালোবাস?

প্রেমিক: তুমি কী প্রমাণ চাও?

প্রেমিকা: আমি যা চাই তা কি তুমি দিতে পারবে?

প্রেমিক: তুমি একবার বলো, তুমি কী চাও।

প্রেমিকা: আমাকে কি তোমার মায়ের হৃৎপিণ্ডটা এনে দিতে পারবে?

ছেলেটা উদ্‌ভ্রান্তের মতো দৌড়ে মায়ের কাছে গিয়ে বলল যে তার প্রেমিকার বিশ্বাস পেতে হলে মায়ের হৃৎপিণ্ডটা দরকার। মা একটুও দেরি না করে বললেন, ‘খোকা এখনই নিয়ে যা।’

ছেলেটা তা-ই করল। পাগলের মতো মায়ের হৃৎপিণ্ড হাতে দৌড়াল। প্রেমিকার বাড়ির কাছে পৌঁছে ছেলেটা হোঁচট খেয়ে মাটিতে পড়ে গেল আর সঙ্গে সঙ্গে মায়ের হৃৎপিণ্ডটা বলে উঠল, ‘আহা! খোকা ব্যথা পেয়েছিস?’

মায়েরা তাদের সন্তানদের জন্য কী করেছেন তা ইন্টারনেটে দেখতে গিয়ে অবাক হয়ে দেখেছি কত কত মায়ের বীরগাথা—সম্রাট আলেকজান্ডারের ‘মা’ থেকে চেঙ্গিস খানের ‘মা’ পর্যন্ত তাদের সন্তানদের জন্য কেমন করে নিজেদের উজাড় করে দিয়েছেন। সাহিত্যে ম্যাক্সিম গোর্কি, রবীন্দ্রনাথ, এমি ট্যান, টনি মরিসন, আনিসুল হক আরও কত লেখক যে ‘মা’কে নিয়ে কত লেখা লিখেছেন তার তালিকা করলে তা অনেক দীর্ঘ হবে।

আসলে পৃথিবীর সব মেয়েই একজন মা। আর তাই মেয়েদের বলা হয় মায়ের জাত। মা তার সন্তানকে ১০ মাস পেটে ধারণ করেন। মায়ের রক্তেই বেড়ে ওঠে শিশুর শরীর। মায়ের এই ঋণ কোনোভাবেই শোধ করা যায় না। তাই সব ধর্মেই মাকে দেওয়া হয়েছে সর্বোচ্চ মর্যাদা। মায়ের কাছেই সন্তানের যত আবদার। একজন মা সন্তানের জন্য কী না করেন। নিজে না খেয়ে সন্তানের জন্য খাবার তুলে রাখেন। কিছুদিন আগে পত্রিকায় খবর পড়েছিলাম, একজন মা ক্রাচে ভর দিয়ে চলেন। ভিক্ষা করে যা পান তা দিয়ে সন্তানের লেখাপড়ার খরচ চালান।

আমার আত্মীয়া যিনি একজন স্কুলশিক্ষিকা, স্বামী একটা বেসরকারি ফার্মের কর্মকর্তা। দুই ছেলে নিয়ে সুখেই চলছিল তাদের সংসার। হঠাৎ করেই তার মাথায় টিউমার ধরা পড়ল। অপারেশন হলো ভারতে। মোটামুটি সুস্থ হয়ে দেশে এলেন। কিছুদিনের মধ্যে তার বড় ছেলের মারাত্মক কিডনির সমস্যা দেখা দিল। কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট ছাড়া উপায় নেই। কিডনির জন্য যখন চারদিকে খোঁজাখুঁজি চলছে তখন সেই মা বললেন তাঁর কিডনি নিতে হবে। ডাক্তারসহ সবাই বোঝালেন তাঁর নিজের অসুস্থ শরীরে কিডনি দেওয়াটা ঠিক হবে না। কিন্তু কোনোভাবেই তাঁকে ফেরানো গেল না। নিজের জীবনকে আরও সংকটের মধ্যে ফেলে ছেলেকে কিডনি দিলেন। মা ছাড়া কেউই এমন আত্মত্যাগ করতে পারে না।

অনেক সময় পরিস্থিতির কারণে আমাকে আমার মেয়ের মায়ের ভূমিকা পালন করতে হয়েছে। এই নিয়ে আমার মেয়ের সর্বদাই অভিযোগ, আমি ওর ড্রেস পছন্দ করতে পারি না, দুপুরে ওকে খাওয়া দিতে ভুলে যাই, পনিটেইলটা ঠিকমতো বাঁধতে তো পারিই না, বরং ওকে ব্যথা দিই। আসলে সন্তানের কাছে মায়ের কোনো বিকল্প নেই। কোনো বাবা তার মায়ের অভাব পূরণ করতে পারে না।

আমি আমেরিকায় আসার এক মাসের মধ্যেই আমার মা মারা যান। এরপর আমি দেশে যেতে ভয় পেতাম। শুধুই মনে হতো মা ছাড়া শূন্য বাসাটা আমি সহ্য করতে পারব না। অনেকের অনুরোধে একবার দেশে গিয়েছি। বাসায় ঢুকে মায়ের জন্য প্রচণ্ড জোরে কেঁদেছি। আর সেই কান্নায় হালকা হয়েছে আমার ছয় বছর ধরে বুকে রাখা মায়ের শোকের তীব্র যন্ত্রণা। মনে পড়ে মা আমার জন্য কত ত্যাগই না করেছেন। আমার বাবা সরকারি চাকরির সুবাদে নানা জায়গায় ঘুরেছেন। আর মা আমার পড়াশোনার সুবিধার্থে থেকেছেন আমাকে নিয়ে। আমি চাকরি পেয়ে প্রথম টেলিফোনটা আমার মাকেই করেছিলাম। আমি চাকরি করতাম ঢাকায় আর মা থাকতেন ময়মনসিংহে। সময় পেলেই চলে যেতাম ময়মনসিংহে। যতবার এসেছি দেখেছি মা দাঁড়িয়ে আছেন বারান্দায়। টেনশন, কখন ঢাকা থেকে রওনা হয়েছি, এখনো কেন বাসায় পৌঁছাইনি। আসলে আমি টাইম মতোই আসতাম, মা টেনশন করতেন পথে যদি কোনো অসুবিধা হয়। মা আমাদের পরিবারটিকে নানাভাবে আগলে রেখেছিলেন। সেসব লিখলে এই রচনাটি এক বিশাল উপন্যাস হয়ে যাবে। সেসব বলব আরেক সময়। মনে পড়ে ছোটবেলায়, ‘ও তোতা পাখিরে শিকল কেটে উড়িয়ে দেব আমার মাকে যদি এনে দাও...’ গানটা শুনে খুব মন খারাপ হতো। আমি গানটা শুনতে চাইতাম না। খালি মনে হতো আমার মা যদি সত্যই কোনো দিন মরে যায়! আজ মনে হয় আহারে সত্যি যদি মাকে আরেকবার পেতাম তবে তার বিনিময়ে কী না করতাম। প্রতিবছর ঘুরে ঘুরে ‘মাদার্স ডে’ আসে। এই সময়টা আমি খুব বিষণ্ন থাকি। সবাই যখন তাদের মায়ের জন্য উপহার কেনে আমার ভেতরটা তখন হু হু করে ওঠে। নিজেকে সান্ত্বনা দিই, কারও মা-ই চিরদিন থাকে না। এটাই সত্য। তবে এই সত্যটা মেনে নেওয়াটা যে কী কষ্টের তা কখনো বোঝানো সম্ভব না। আমি এসব ভাবতে ভাবতে অনেকটা উদাস হয়ে জানালা দিয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছি। দেখলাম বাসার উল্টো দিকে একটা স্কুলবাস এসে থামল। কিছুক্ষণ পর বাসের বিশেষ দরজাটি খুলল এবং বাস থেকে হুইলচেয়ারে ছোট একটি মেয়েকে নামানো হচ্ছে। মেয়েটির মা বাসার বাইরে দাঁড়িয়ে মেয়েটির জন্য অপেক্ষা করছেন। বাস থেকে হুইলচেয়ারটির নামানো শেষ হলে মা হুইলচেয়ারে বসা মেয়েকে চুমু দিয়ে ঠেলে বাসায় নিয়ে গেলেন। দৃশ্যটা আমার মনকে তীব্রভাবে নাড়া দিল। মানুষ স্বভাবতই নিজের দুঃখটাকেই বড় করে দেখে। আমিও তার ব্যতিক্রম নই।

বাস থেকে ছোট একটা মেয়েকে এভাবে নামতে দেখে মনে হলো এই ছোট মেয়ে আর তার মায়ের দুঃখটা কি আমার চেয়ে কম? আমার মায়ের জন্য বিষণ্ন হয়ে থাকা মনটা কিছুটা হালকা হয়ে গেল। আমি যখন মেয়েটার কথা ভাবছিলাম এমন সময় আমার মেয়ে এসে আমার পিঠে মাথা রেখে বলল, ‘বাবা তোমার কি দাদুর জন্য মন খারাপ।’

আমি বললাম, ‘নারে মা, কেন খারাপ হবে, তুই তো আমার মা, নতুন মা, তোর মাঝেই আমার মাকে আমি খুঁজে পাই।’ এভাবেই হয়তো প্রতিটি মেয়ে কোনো না কোনোভাবে মা হয়ে ওঠে। আমার মেয়েকে জড়িয়ে ধরে আমার মায়ের গন্ধ পেতে চাইলাম আর সত্যি যেন পেয়েও গেলাম। আমার মায়ের জন্য দুঃখটা এভাবেই হালকা হয়ে এল। আর হ্যাঁ, আপনারা যদি কেউ আমার হারিয়ে যাওয়া ফোনটা খুঁজে পান তবে প্রথম আলোর অফিসের প্রযত্নে ফেরত পাঠাবেন। আর যাঁদের মা আছেন তাঁদের কাছে অনুরোধ ‘মাদার্স ডে’তে মাকে ফোন করতে ভুলবেন না।

 
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ