উষা রঞ্জনের স্বপ্ন

May 25, 2017, 4:17 PM, Hits: 2040

উষা রঞ্জনের স্বপ্ন

পি আর প্ল্যাসিড, টোকিও (জাপান) থেকে : জাপানে কোনো কোনো বাংলাদেশির ইচ্ছা ও অক্লান্ত পরিশ্রম এনে দেয় তাদের সফলতা। পরবর্তীতে যার ফল ভোগ করেন তারা নিজেরা। কখনো কখনো ভোগ করি আমরা প্রবাসী বাংলাদেশিরাও। এমনকি তাদের একক প্রচেষ্টার ফলে অর্জিত সফলতার সঙ্গে গৌরবের সঙ্গে জড়িয়ে যায় দেশের নামও। শুধু তাই নয়, তাদের একক প্রচেষ্টায় অর্জিত সাফল্যের জন্য উজ্জ্বল হয় বাঙালি জাতি ও বাংলাদেশের নাম। জাপানে এমনই একজন সফল মানুষের নাম উষা রঞ্জন দাস (৪৭)। 

তিনি জাপানে এসেছেন ১৯৯৫ সালের ডিসেম্বর মাসে। ১৯৯২ সালে বাংলাদেশ মেরিন ফিশারিজ একাডেমি (চট্টগ্রাম) থেকে মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে প্রথম চাকরি নেন আন্তর্জাতিক পথে চালিত দেশের জাহাজে। এরপর কাজের সুবিধার্থে জাহাজ পরিবর্তন করে পুনরায় কাজ নেন থাইল্যান্ডের এক জাহাজে। পরবর্তীতে আরও ভালো ও সুবিধা পাওয়ায় কাজ নেন সিঙ্গাপুরের জাহাজে। সব মিলিয়ে জাহাজে তিনি কাজ করেছেন সাড়ে তিন বছর। 

কাজ করার ফাঁকে কখনো কখনো বিভিন্ন দেশের সমুদ্র বন্দরে নেমে ঘুরে বেরিয়েছেন। শেষবার জাহাজ যখন জাপানের সমুদ্র বন্দরে নোঙর করল তখন বন্দরে নেমে ঘুরতে বেরিয়ে পড়লেন। ঘুরতে এসে দেখা পান দেশের কিছু পরিচিত-অপরিচিত লোকদের সঙ্গে। তখন দেখা পান তার এলাকার কিছু লোকের, যারা আগে থেকেই ছিলেন জাপানে। তাদের অনুপ্রেরণা ও পরামর্শ এবং নিজেরও কিছুটা ইচ্ছাতে থেকে যান জাপান। 

সেই যে জাহাজ থেকে নামলেন চাকরিতে আর ফিরে যাননি। একসময় তার ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। ভিসা না থাকার কারণে দেশেও যেতে পারেননি দীর্ঘ কয়েক বছর। ভিসা না থাকার কারণে তাকে কাজ করতে হতো লুকিয়ে। অনেকটা চোর পুলিশ খেলার মতন করে কাজ করতে হতো। ছিল নানা সমস্যা। সমস্যার মাঝেও শান্তিতে থাকা কথা চিন্তা করে জাপান ছেড়ে যেতে তার আর মন চায়নি। পরে চিন্তা করেন জাপানে বিয়ে করে বৈধতা নিয়ে ভালো কিছু করার। ২০০৩ সালে জাপানি এক নারীকে বিয়ে করে বৈধ ভাবে থাকার অনুমোদন পান। এ ছাড়া বৈধ ভাবে থাকার তার আর কোনো বিকল্প পথ খোলা ছিল না।

জাপানে আসার পর তার স্বপ্ন কখনো থেমে থাকেনি। স্বপ্ন সার্থক করার জন্য তার অদম্য ইচ্ছা ও পরিশ্রম তাকে নিয়ে পৌঁছে দিয়েছে সফলতার এক সুন্দর চূড়ায়। বিয়ে করে বৈধতা পাওয়ার পর শিজুকা ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে একই প্রতিষ্ঠানে সপ্তাহে তিন দিন বিজনেস ইংলিশ প্রেজেন্টেশন পড়াতে শুরু করেন। এখনো তিনি এই কাজটি চালিয়ে যাচ্ছেন। পাশাপাশি চারটি মাল্টি কোম্পানিতে সপ্তাহে একদিন ব্যবসায়িক করপোরেট লোকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের বিদেশের সঙ্গে কাজ করার জন্য প্রস্তুত করান।

একসময় ইউনাইটেড ন্যাশনস ইংলিশ টেস্ট জাপানের (ইউএনইটিজে) জাপান শাখায় ইংরেজি পরীক্ষক হিসেবে কাজ করেছেন। এই কাজটি করার পাশাপাশি নিজে কিছু করে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। মেরিনে পড়াশোনার কারণেই ইংরেজিতে তার দক্ষতা ছিল খুব ভালো। জাপানে আসার পর দেখলেন জাপানিদের মাঝে ইংরেজি শেখার আগ্রহ খুব বেশি। তাই নিজের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা কাজে লাগানোর জন্য তিনি জাপানিদের ইংরেজি শেখানোর স্বপ্ন দেখেন। আট বছর ইউএনইটিজের জাপান শাখায় পরীক্ষক হিসেবে কাজ করার পর স্বপ্ন ধরা দেয় তাকে।

জাপানিদের ইংরেজির প্রতি দুর্বলতা সব সময়। সেই দুর্বলতাকে তিনি কাজে লাগিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন ইংরেজি শিক্ষার প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু করেন ২০০১ সালে। শুরুতে তার এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি ছিল ব্যক্তি মালিকানাধীন। ২০১৬ সালে তিনি এই প্রতিষ্ঠানকে করেন যৌথ মালিকানাধীন। বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৫০ জন। আর শিক্ষক রয়েছেন মোট ছয়জন। শিক্ষকদের সবাই বিদেশি। তার মধ্যে দুজন আমেরিকান। বাকিরা ফিলিপিনো, নেপালি ও জাপানি। এ পর্যন্ত প্রায় প্রায় ২০০০ শিক্ষার্থী ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ইংরেজি শিক্ষার কোর্স সম্পন্ন করেচেন। 

রোববার ও সরকারি ছুটির দিন ছাড়া বাকি সব দিনই ক্লাস চলে এই প্রতিষ্ঠানে। উষা রঞ্জন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম নিজের নামেই রেখেছেন। নাম উষা ইন্টারন্যাশনাল করপোরেট কোম্পানি। তার স্ত্রীও এই প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। তিনি অফিস দেখাশোনার কাজ করেন। উষা রঞ্জন স্থানীয় চেম্বার অব কমার্সের একজন সদস্য।

উষা রঞ্জন এখন স্বপ্ন দেখছেন জাপানিদের নিয়ে নিজের মাতৃভূমি বাংলাদেশে দেশের মানুষদের জন্য ভালো কিছু করার জন্য। তিনি থাকেন জাপানের শিজুওকা প্রিফেকচারের হামামাত্স্যু শহরে। সেখানে বাড়ি করেছেন দুটি। একটিতে নিজে থাকেন ছেলেমেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে। অন্যটিতে নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। মেয়ে চামেলি (১২), ছেলে ধীমান (১০) ও জাপানি বধূকে নিয়ে চলছে তার সুখের সংসার। স্ত্রী ও ছেলেমেয়ে নিয়ে বছরে অন্তত একবার ছুটি কাটাতে দেশে যান বাবা-মা ও আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে দেখা করতে।

বাংলাদেশে তার পৈতৃক বাড়ি গাজীপুর জেলার পুবাইল এলাকায়। তার বাবার নাম চদ্র মোহন দাস। 

 
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ