প্রবাসীর মরদেহ সরকারি খরচে দেশে পাঠানো হোক

May 25, 2017, 10:05 PM, Hits: 2148

প্রবাসীর মরদেহ সরকারি খরচে দেশে পাঠানো হোক

মাহবুব সুয়েদ, পর্তুগাল থেকে:পৃথিবীতে মানুষ আসে একা, চলেও যায় একা। এটা নিয়তি, এটাই বাস্তবতা। সবাই চান মাঝখানের এই সফরে সুখ সমৃদ্ধি আর ভালোবাসার বৃত্তে থেকে জীবন কাটাতে। মা-বাবা, ভাই-বোন আর প্রিয়তমা স্ত্রী-সন্তানদের মুখের দিকে চেয়ে বা একটু আলাদা সুখ লাভের আশায় কিছু মানুষ পাড়ি দেন অন্য দেশে। জীবন আর জীবিকার টানে তিনি হয়ে যান পরবাসী। নিজ দেশ থেকে হাজার মাইল দুরে এসে থিতু এবং কষ্টার্জিত টাকাগুলো মাস শেষে দেশে থাকা প্রিয়জনের কাছে পাঠাতে বাধ্য হন। পশ্চিমা বিশ্বে যারা আসেন তারা হয়তো মানবাধিকার ভোগ করতে পারেন আজকাল, কিন্তু যারা মধ্যপ্রাচ্য বা আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে যান জীবন আর জীবিকার টানে, তারা (সবাই নয়) অনেকটা পরাধীন জীবন যাপন করেন।

একটা সময় ছিল যখন মানুষ একাধারে এক দশক বা এক যুগ বিদেশ যাপন করে দেশে ফিরে আসত। এই ১০-১২ বছরে তার দেখা হয়নি প্রিয়জনদের মায়াবী চেহারা। দেড়-দুই দশক আগেও প্রবাসী অনেকে পরিচিত কারও মাধ্যমে দেশে ক্যাসেট পাঠাতেন তার কথা রেকর্ড করে। বাড়িতে খুশির রব উঠত ক্যাসেট আসলে। পরিবারের সবাই জড়ো হয়ে অধীর আগ্রহে টেপ রেকর্ডারে ক্যাসেট প্লে করে শুনত। ক্যাসেটে থাকত প্রবাসীর একতরফা কথা। এটাই ছিল প্রবাসজীবন।

যুগ পাল্টেছে। প্রযুক্তির কল্যাণে এখন মানুষ সঙ্গে সঙ্গেই যেকোনো খবর পেয়ে যায়। নিজের আপডেটও দিতে পারে মিনিটে মিনিটে। বৃদ্ধ বাবা-মা বা প্রিয়তমা স্ত্রীকে এখন দেখে দেখে কথা বলার সুযোগ আছে। যাতায়াত ব্যবস্থাও এখন আগের মতো সোনার হরিণ নয়। সব মিলিয়ে বলা যায় আগের তুলনায় এখন প্রবাসীরা ভালো আছেন। অনেক ভালো।

তবে প্রত্যেক মানবজীবনের চূড়ান্ত গন্তব্য হলো মৃত্যু। মৃত্যু। এটা কারও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। সবাইকে মরতে হয় এটাই চির সত্য। মৃত্যুর সময় প্রিয়জনদের কাছে থাকা বা প্রিয় মানুষগুলোর সামনে মারা গেলে কিছুটা ভালো দেখায়। যারা দেশে থাকেন তারা এটা বুঝবেন না। আমরা যারা দেশে স্বজন রেখে প্রবাস যাপন করি তাদের কাছে এটাই হয় ন্যূনতম চাওয়া। আত্মীয়-স্বজনেরা মারা যায় আমরা শুধু শুনি। কিন্তু শেষ বিদায়ে কাছে থেকে মায়াময় মুখখানি একবার দেখার সুযোগ পাই না। প্রবাসে যিনি আসেন, তার কাছে যেকোনো মৃত্যুর খবরই হয় বেদনাদায়ক। সবার মনে মনে কামনা থাকে, নিজ মৃত্যু যাতে দেশে স্বজনদের কাছে হয়।

প্রায় সব প্রবাসীর এ মনোবাসনা থাকলেও নিয়তি তো আর কারও মনোবাসনা অনুযায়ী নির্ধারিত হয় না। যার যখন মৃত্যুর সময় আসে তখনই চলে যেতে হয় ওপারে। কেউ অল্প বয়সে আবার কেউ কেউ হঠাৎ করে মারা যান প্রবাসে। দেশে স্বজনেরা তার মৃত্যুর খবরে বিমর্ষ হন। বেদনাহত হন। মা শত কষ্টের সংবাদ শোনার পরেও আশায় বুক বাধেন নাড়ি ছেঁড়া ধনকে শেষ বারের মতো দেখার জন্য। বাবা সম্পত্তি বন্ধক রাখেন আদরের সন্তানের লাশ দেশে আনার জন্য। নানা নিয়মকানুনের পরই কেবল মরদেহ দেশে নিয়ে আসা যায়। একটা মরদেহ আনতে গেলে অনেক টাকা দিতে হয় এজেন্সিকে। উপরনন্তু দেশের বিমানবন্দরেও আছে নানা ধরনের হয়রানি ও পেরেশানি।

উদাহরণ হিসেবে বলছি, কেউ একজন মারা গেলেন প্রবাসে। সেখানে বাংলাদেশি কমিউনিটি যদি খুব একটা সংগঠিত না হয় এবং কার্যকরী উদ্যোগ নেওয়ার মতো লোকের অভাব থাকে অথবা বাংলাদেশ দূতাবাসের আওতার বাইরে অনেক দূরের কোনো এলাকা হয়, সেই মরদেহ পাঠানোর ব্যবস্থা কেমনে হবে? মরদেহ পাঠানোর খরচ কে বহন করবে? যিনি মারা গেছেন তিনি মুহূর্তের মধ্যে গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছেন। কিন্তু ওই প্রবাসীর প্রতিটা ফোঁটা ঘামের বিনিময়ে তার পরিবার ও দেশ উপকৃত হয়েছে। যখন লাশ পাঠানোর খরচ বা আনুষঙ্গিক বিষয়াদির অভাবে কারও লাশ দেশে পাঠানো হয় না, তখন সেই পরিবার বা স্বজনদের কি অবস্থা দাঁড়ায় তা কি ভাবা যায়? মানুষটি জীবিত অবস্থায় দেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখার ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করলেন আকাশসম। অথচ তার প্রাণপাখি উড়ে যাওয়ার পর সামান্য টাকার অভাবে তার প্রিয়জনেরা প্রাণহীন দেহখানি দেখার সুযোগ পান না। প্রিয়তম সন্তান বাবার বা প্রিয়তমা স্ত্রী স্বামীর মরা মুখ দেখার ভাগ্য বর্জিত হবেন তা কী ভাবা যায়? কি সমাধান এর? একজন প্রবাসী যদি এ সুখবর পান যে, মৃত্যুর পর তার মরদেহ প্রিয়জনদের কাছে পাঠানো হবে বিনা পেরেশানিতে তার চেয়ে খুশির আর কোনো খবর কি আছে তার কাছে।

কমাস আগের ঘটনা। আমার বর্তমান নিবাস পর্তুগালে সিলেটের এক তরুণ ভাই মারা গেলেন। রাজধানী শহর লিসবন থেকে অনেক দুরে এক শহরে তিনি মারা যান। হাতে গোনা কয়জন বাঙালি ছিলেন সে শহরে। তার মৃত্যু সংবাদ রাজধানী শহর লিসবনে আসলে এখানকার বাংলাদেশি কমিউনিটির সর্বস্তরের মানুষ সমবেত হন স্থানীয় এক রেস্টুরেন্টে। এখানকার কমিউনিটির পারস্পরিক সম্পর্কের সুবাদে পরদিন নানা ভাগে ভাগ হয়ে সর্বস্তরের বাংলাদেশিদের কাছ থেকে মরদেহ পাঠানোর জন্য টাকা উত্তোলন করে এজেন্সি মারফত তার মরদেহ প্রেরণের ব্যবস্থা করা হয়। প্রায় তিন হাজার ইউরোর মতো এজেন্সিকে দিতে হয়েছিল।

প্রসঙ্গত লিসবনে বাংলাদেশি কমিউনটি খুব বড় না হলেও এখানকার বাংলাদেশি সমাজ ব্যবস্থার কারণে হয়তো এমন মহতি একটা কাজ সবে মিলে করা গিয়েছিল। কিন্তু যেসব জায়গায় এমন ব্যবস্থা বিরাজমান নেই সেখানকার মরদেহের কি হবে?

দলমত-নির্বিশেষে সকল প্রবাসী এ ক্ষেত্রে একমত হবেন যে, একজন প্রবাসীর বেদনাদায়ক মৃত্যুর ভার যেন তার পরিবারকে বহনের সঙ্গে সঙ্গে মরদেহ দেশে নেওয়ার পেরেশানি না করতে হয়। প্রবাসীর মরদেহ পাঠানো হোক সরকারি খরচে এটি আমাদের প্রাণের দাবি। শুধু মরদেহ পাঠানো নয়, আইনি সব ধরনের কাজ সংশ্লিষ্ট দেশে বাংলাদেশ দূতাবাস (যদি থাকে) যেন নিজ দায়িত্বে করে। তাহলেই কেবল ন্যায় আচরণ করা হবে একজন প্রবাসীর প্রতি। এ ব্যাপারে সদয় দৃষ্টি কামনা করছি বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর।

 

 
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ