মেরির দুঃস্বপ্নের দায় কার?

May 27, 2017, 6:03 PM, Hits: 1929

মেরির দুঃস্বপ্নের দায় কার?

একটি বিস্ফোরণের মাধ্যমে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছিল। কার্যত তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর আশঙ্কা সেদিন থেকেই শুরু হয়েছিল। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হবে সব যুদ্ধের শেষ যুদ্ধ। এমনকি মানবজাতির ইতি ঘটানোর শেষ খাঁটি যুদ্ধ। বিজ্ঞানী অ্যালবার্ট আইনস্টাইন বলেছিলেন, তিনি জানেন না, ঠিক কোনো অস্ত্র দিয়ে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হবে। কিন্তু চতুর্থ বিশ্বযুদ্ধ লাঠি আর পাথর দিয়ে হবে বলে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন আইনস্টাইন।

গত সাত দশকের পাপের বোঝা এখন পরাশক্তির কাঁধে। যুদ্ধের দামামা বাজছে। এ যুদ্ধ কোথায় নিয়ে যাবে, এমন প্রশ্নের উত্তর কারও জানা নেই। যেমন জানেন না আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বা উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন। জানেন না রুশ নেতা ভ্লাদিমির পুতিন বা সিরিয়ার বাশার আল–আসাদ। তবে চাপা উৎকণ্ঠা আমেরিকাসহ পশ্চিমের সাধারণ মানুষের মধ্যে। খ্যাপাটে সব নেতার উন্মত্ততার বলি হবে এ বিশ্ব—এমন আলাপ আর শঙ্কা এখন সর্বত্র।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ–পরবর্তী স্নায়ুযুদ্ধ বা শীতলযুদ্ধ এখন আর নেই। সিরিয়াকে কেন্দ্র করে আমেরিকা অন্য পরাশক্তি রাশিয়ার সঙ্গে দ্বন্দ্বে লিপ্ত। উত্তর কোরীয় দূরপাল্লার পরমাণু ক্ষেপণাস্ত্র অপ্রতিরোধ্যভাবে আমেরিকার সিয়াটল নগরীতে আঘাত হানতে সক্ষম। মুক্ত বিশ্বের সঙ্গে সংযোগহীন উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে যুদ্ধের দামামা বাজলে, এর পরিণতি আর আশঙ্কায় এখন পশ্চিমের মানুষ। উসকানির মুখে বা নিজেদের অস্তিত্ব প্রমাণের জন্য উত্তর কোরীয় নেতার হামলার সিদ্ধান্ত মোকাবিলা করার শক্তি আমেরিকার কেন, মানবজাতির নেই। এমন হামলা যার কোনো সতর্ক সংকেত নেই। যার জন্য কোনো প্রতিরোধ নেই এবং যা থেকে রেহাই পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

বর্তমানে আমেরিকায় বসবাসরত ৯২ বছর বয়সী এনা ম্যারি ছো তাঁর জীবদ্দশায় হিরোশিমা ও নাগাসাকি বিপর্যয় দেখেছেন। বার্লিন দেয়াল, কিউবান ক্ষেপণাস্ত্র সংকট—সবই দেখেছেন। এখন তিনি বলেন, ‘আমার মনে নিত্যদিন যুদ্ধ নিয়ে ভাবনা আসে।’ তিনি বলেন, রাশিয়া ও আমেরিকার মধ্যে যোগাযোগের বিরাট শূন্যতা। তারা একে অপরকে বুঝতে পারছে না। এনা ম্যারি নর্থ ক্যারোলাইনায় অবসরজীবন কাটাচ্ছেন। গত নির্বাচনে হিলারি ক্লিনটনকে ভোট দিয়েছিলেন। যুদ্ধের আশঙ্কায় দিনরাত কাটে তাঁর। ওহাইও রাজ্যের মাল্টায় অটো স্টোরের ম্যানেজার ব্রায়ান ওয়াকারও একই ধরনের ভাবেন।

সাউথ ক্যারোলাইনার ম্যালদিনের চুল কাটার দোকান। নরসুন্দর কার্টিস ইনগ্রাম মনে করেন, ‘আমার বিশ্বাস, আমরা আরেকটি যুদ্ধের দিকে ধাবিত হচ্ছি। আমেরিকার লোকজনকে সাধারণত প্রকাশ্যে রাজনীতির আলাপে যেতে দেখা যায় না। নাপিতের দোকানগুলো যেন এর ব্যতিক্রম। ওইখানে গেলে এখন একই আলাপ, একই শঙ্কা—সিরিয়া বা উত্তর কোরিয়া নিয়ে পারমাণবিক হামলা ঘটার আশঙ্কা।

তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঢেউয়ের বেগ যেন তরঙ্গায়িত হচ্ছে। বেসামরিক জনগণের ওপর রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করার প্রতিশোধ হিসেবে ট্রাম্প সিরিয়ার বিমানঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার নির্দেশ দিয়েছিলেন। উত্তর কোরিয়ার রকেট পরীক্ষা করার পর উত্তেজনা বাড়তে থাকে। উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ দুই দফা ব্যর্থ হয়েছে। এর পেছনে আমেরিকার প্রযুক্তিগত কোনো হাত আছে কি না—এ নিয়েও চলছে নানা কানাঘুষা। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ বিষয়ের প্রশ্নের জবাবে রহস্যময় হাসি দিয়ে বলেছেন, সবকিছু বলা যাবে না। উত্তর কোরিয়া উৎক্ষেপণে ব্যর্থ হলেও বসে থাকবে না এবং তাদের এ ব্যর্থ উৎক্ষেপণকে সফল দেখানোর চেষ্টা করবে—এমন আলোচনা আমেরিকার সামরিক বিশ্লেষকদের মধ্যে।

আমেরিকা বিমানবাহী রণতরি প্রেরণ করার কথা ঘোষণা করে। উত্তর কোরিয়া এর জবাবে বলেছে, রণতরিটি ডুবিয়ে দেওয়া হবে। পাবলিক পলিসি পোলিং নামের মার্কিন প্রতিষ্ঠান সম্প্রতি পরিচালিত এক জরিপে দেখেছে, ৩৯ শতাংশ ভোটার মনে করেন, ট্রাম্পের মেয়াদকালে আমেরিকা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে।

এ সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, শর্ত সাপেক্ষে তিনি উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারলে নিজেকে সম্মানিতবোধ করবেন। প্রায় একই সময়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন। গত সপ্তাহে ট্রাম্প বলেছেন, উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে ‘ভয়ংকর, ভয়ংকর’ সংঘর্ষের সম্ভাবনা রয়েছে। সিবিএস নিউজের ‘ফেস দ্য নেশন’ অনুষ্ঠানে প্রশ্ন ছিল উত্তর কোরিয়ার কর্মসূচি বন্ধ করতে আমেরিকা শক্তি প্রয়োগ করবে কি না। তার উত্তরে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভয়ংকর সংঘর্ষের কথাই বলেছেন।

চীনকে দিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। আমেরিকানরা মনে করছেন, চীনই এখন যেন এক ত্রাতার ভূমিকা পালন করছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচনের আগে চীনের বিরুদ্ধে অর্থ বিনিময়মূল্য নিয়ে কারচুপির অভিযোগ করে আসছিলেন। সেই চীনের প্রেসিডেন্টকে নিয়ে একান্ত বৈঠক করেছেন নিজের ব্যক্তিগত অতিথিশালায়। সাম্প্রতিক টিভি ইন্টারভিউয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চীনের প্রেসিডেন্টকে খুব ভালো একজন মানুষ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। দক্ষিণ কোরিয়ায় ৩০ হাজার মার্কিন সৈন্য অবস্থান করছে। উত্তর আর দক্ষিণ কোরিয়ার দীর্ঘ বিরোধ। দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে চীনের সম্পর্ক এবং মার্কিন উপস্থিতি এর মধ্যেই জটিল আকার ধারণ করেছে। উত্তর কোরিয়াকে সামাল দিতে চীন ব্যর্থ হলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে অস্ত্র ছাড়া খেলার আর কোনো ট্রাম্পকার্ড নেই বলেই মনে করা হচ্ছে।

উত্তর কোরিয়া, রাশিয়া, সিরিয়া নিয়ে যে আলাপ এখন মার্কিন জনগণের মধ্যে, সেই আলাপের কোনো না কোনো পর্যায়ে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ–পরবর্তী মানবজাতির অস্তিত্ব নিয়ে জনগণের মধ্যে শঙ্কাটি আজ স্পষ্ট। 

 
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ