বিজ্ঞান কল্পকাহিনি বুমেরাং

June 6, 2017, 9:24 PM, Hits: 1341

বিজ্ঞান কল্পকাহিনি বুমেরাং

ডা. পুলক : কানাডার টরন্টোপ্রবাসী : উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় চলছে আশার গোপনীয় সভা কক্ষে। তুমুল বিতর্ক! হওয়ারই কথা। একজনের মতামত অন্যজনের পছন্দই হচ্ছে না। কেউ একটা প্রস্তাব দিলে অন্যজন তাচ্ছিল্যের সঙ্গে তা উড়িয়ে দিচ্ছে। মাঝে মাঝে এত হইচই হচ্ছে যে, কেউ কারও কথা শুনতেই পাচ্ছে না।

আশা (ASA) হলো মঙ্গল গ্রহের অ্যারোনটিক্যাল ও স্পেস অথোরিটি'র সংক্ষিপ্ত রূপ। আশার প্রধান নিউস অসহায় দৃষ্টি নিয়ে এই সব দেখছেন এবং একুশ দশকের এক বিখ্যাত কবির একটা বিরহের কবিতা আবৃত্তি করতে ইচ্ছে হচ্ছিল তার। কিন্তু কিছু বললে এখন সবাই মাথায় চেয়ার ছুড়ে মারতে পারে। তাই চুপ মেরে যান। সবাই মঙ্গল গ্রহের ভালো করার জন্য উদ্‌গ্রীব কিন্তু সেটা কীভাবে তা যেন কেউ মেলাতে পারছে না। এক দৃষ্টিতে নিউস তাই তাকিয়ে থাকলেন সামনে থাকা মঙ্গল গ্রহের প্রত্যেক গোষ্ঠীর প্রধানের দিকে।

—না, এইভাবে আর নয়! সবার দিকে তাকিয়ে নিউস তারস্বরে চিৎকার করে উঠলেন। কি করব আমরা এখন? কি করব? কারও কিছু ভালো পরিকল্পনা আছে? নাকি অনর্থক বকবক করবেন সবাই?

কারওরই যেন এখন কিছু বলার নেই। হঠাৎ করে সব কোলাহল বন্ধ হয়ে গেল! সবাই চুপ। যেন আশ্চর্য এক নীরবতা নেমে এসেছে এই কক্ষে।

এমন সময় হঠাৎ ‘খায়রুন লো তোমার লম্বা মাথায় কেশ/ চিরল দাঁতের হাসি দিয়ে পাগল করলি দেশ...।’ রুমের নীরবতাকে খান খান করে বেজে উঠল রোনাল্ড থাম্পের হাতের চামড়ার নিচে বসানো বিশেষ ছোট্ট একটা চিপ।

এই মহা গুরুত্বপূর্ণ সময়ে কে বিরক্ত করতে পারে ভাবতে ভাবতেই ভ্রু কুঁচকে উঠল থ্যাম্পের। কল দিয়েছে ওর নানি! মনে মনে ‘ও নানি, এখনই তোমার কল দিতে হবে, আর টাইম পাইলা না’ বলে তাড়াতাড়ি চিপটা সাইলেন্ট মুডে দিয়ে আশপাশের মানুষদের বিরক্ত চেহারার দিকে লাজুক হাসি দিয়ে বলে উঠল, আমার কিছু বলার আছে।

—এক মিনিট। তার আগে বলো, এমন জঘন্য গানকে রিংটোন রাখার কারণ কি? যেন রাগে চেঁচিয়ে উঠল নিউস।

সবাই জানে থাম্পের পুরোনো দিনের ব্যাপারে আগ্রহটা বড্ড বেশি। এই নিয়ে যদিও ওকে কেউ কখনো ঘাটায় না। কারণ সবাই জানে ওর বংশের অতীতের ইতিহাস। তাই পারতপক্ষে কেউ ওর ছায়া মাড়ায় না। কিন্তু আজকের দিনটা আলাদা। আর সবার চিপে অটো ট্রান্সলেটর থাকায় গানের অর্থ বুঝতেও কারও সমস্যা হয়নি। সব মিলিয়েই চাপা এক গুঞ্জন।

—এটা জঘন্য গান হতে যাবে কেন? আমার নানির সবচেয়ে পছন্দের গান হচ্ছে এটা। যখনই এই গানটা শোনেন, তখনই তার মন ভালো হয়ে যায়। আর নানির জন্য আমার কমিউনিকেশন ডিভাইসে এটা আইডেনটিটি রিংটোন করে রাখলে কারও কোনো সমস্যা হবে বলে আমার মনে হচ্ছে না। যদিও আমরা এখন অনেক বড় সমস্যার ভেতরে আছি। বরং সেটা নিয়ে আলাপ আলোচনা করা যায় …।

একটু যেন শান্ত হয়ে এল নিউস।—কি বলবে, বলো।

—ভাবছি কিছুদিন ধরেই। কিন্তু বিষয়টা কে কীভাবে নেবে তা বুঝতে পারছি না। তাই আগেই বলে নেই, আমার কথার মাঝে যেন কেউ আমাকে না থামায়। আমি পুরো প্ল্যানটা শেয়ার করব। তারপরে সবাই প্রশ্ন করতে পারবে। ঠিক আছে?

সবাই মাথা নেড়ে সম্মতি দিল।

—আমার চিন্তাটা হচ্ছে মঙ্গল গ্রহের সুরক্ষার স্বার্থে! আমরা আমাদের ভালোর জন্য এই ব্যবস্থা করতে পারি। পৃথিবীতে মানুষ যে ভুল করেছে সেই ভুল আমরা মঙ্গলে করতে পারি না। বলে একটু দম নিল থাম্প।

—হ্যাঁ, যা বলছিলাম, পৃথিবীতে দুই ধরনের মানুষ বাস করত। এক ছিল ধনী শ্রেণি, যারা শাসন করত। আরেক ছিল গরিব শ্রেণি, যারা শোষিত হতো। ধনী শ্রেণির টাকা ছিল বলেই তারা একটু ভালো থাকবার আশায় মঙ্গলে পাড়ি জমিয়েছে। কারণ পৃথিবী তার রূপ হারিয়েছে মূলত গরিবের হাহাকারের জন্য। ওরা অভাব ও টাকার জন্য সারা পৃথিবীর সর্বনাশ করেছে।

—এটা কোনো স্কুলের ক্লাসরুম না থাম্প। এটা আশা! কি বলতে চাইছ ভণিতা না করে বলে ফেলো? বলে উঠল নিউস।

—আমার প্রস্তাব হচ্ছে মঙ্গলে কোনো গরিব লোকের জায়গা হবে না। আমাদের সাহায্যের জন্য রোবট আছে। কিন্তু কিছু কিছু কাজে আমাদের সেই সব গরিবের সাহায্য লাগবেই। তাই সেই সব গরিব লোক বা ভৃত্য আমরা রূপান্তরিত করে আনব।

—মানে, কি বলছ! রূপান্তরিত, কীভাবে? মুখ ফসকেই যেন নিউস বলে উঠল।

একটু আধটু ফিসফিস ও গুঞ্জন শোনা গেল।

প্রতীকী ছবি। সংগৃহীত

—হ্যাঁ, যা কিছু সবাই ভাবছ, তা-ই। প্রচণ্ড কঠিন ও ঝামেলার কাজ নয় এটা! পৃথিবী থেকে মঙ্গলে আনবার সময় আমরা সেই সব ভৃত্যকে Sterile করে নিয়ে আসব …।

খানিকক্ষণের জন্য হা হয়ে গেল সকলে। যন্ত্রের মতো শুনতে লাগল থাম্পের পুরোটা প্ল্যান।

***

লেখক

দুই বছর পরের এক বিকেলবেলা। দর দর করে ঘামছে থাম্প। আশার প্রচণ্ড শীতল কক্ষে ঘামার অর্থ যে ভালো নয় বুঝতে বাকি রইল না নিউসের। কপালের ঘামটা মুছে কাপা কাপা কণ্ঠে থাম্প বলতে শুরু করল, তার বউ কেলানী লাপাত্তা। তার ধারণা তার ঘরের ভৃত্যর সঙ্গে ভেগেছে।

নিজের প্ল্যান এভাবে বুমেরাং হবে তা কখনো ভাবতে পারেনি রোনাল্ড থাম্প!

 
সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ