নদী নিয়ে গবেষণায় সাবরিনার অর্জন সাবরিনা মেহজাবীন

June 11, 2017, 2:14 AM, Hits: 150

নদী নিয়ে গবেষণায় সাবরিনার অর্জন  সাবরিনা মেহজাবীন

গত ২৪ মে এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড ওয়াটার রিসোর্সেস ইনস্টিটিউটের (ইডব্লিউআরআই) বার্ষিক ‘ইডব্লিউআরআই’ কংগ্রেস চলছিল যুক্তরাষ্ট্রের স্যাক্রামান্টো কনভেনশন সেন্টারে। সেখানে বাংলাদেশ থেকে এক তরুণী তাঁর স্নাতক জীবনে করা গবেষণাটি বিশ্বের নামীদামি গবেষক ও প্রকৌশলীদের সামনে উপস্থাপন করেন। মধ্যাহ্ন ভোজের পর যখন পুরস্কার বিতরণের পালা এল, বেশ কিছু ক্যাটাগরির সব কটি পুরস্কার উত্তর আমেরিকার দেশগুলোতেই থেকে গেল। শুধু ‘স্নাতক পর্যায়ের গবেষণা প্রতিযোগিতা’র সেরা তিনের একটিতে ঘোষিত হলো বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম, বাংলাদেশের নাম। বুয়েটের পানিসম্পদ প্রকৌশল বিভাগের প্রাক্তন ছাত্রী সাবরিনা মেহজাবীনের হাত ধরে এল এই সম্মান। সাবরিনা এখন স্নাতকোত্তরে বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটে সাউথ এশিয়ান ওয়াটার ফেলোশিপ নিয়ে পড়াশোনা করছেন।

সম্মেলনে অংশ নেওয়া বাংলাদেশিদের সঙ্গে সাবরিনা (ডান থেকে চতুর্থ)। ছবি: সংগৃহীত

‘ইডব্লিউআরআই কংগ্রেস’ নিয়ে প্রথমে একটু বলে নেওয়া যাক। পুরকৌশলীদের সবচেয়ে বড় সংস্থা হলো আমেরিকান সোসাইটি অব সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্স বা এএসসিই। আর সেই এএসসিইর একটি অঙ্গসংস্থা হলো ইডব্লিউআরআই। এই সংস্থা থেকে প্রতিবছর আমেরিকার বিভিন্ন স্টেটে মহাসম্মেলন আয়োজন করা হয়, যা ‘ইডব্লিউআরআই কংগ্রেস’ নামে পরিচিত। আর এই কংগ্রেসে নিজের গবেষণাপত্র প্রকাশ করা যেকোনো পরিবেশবিদ কিংবা পানিসম্পদ প্রকৌশলীদের জন্য বেশ সম্মানজনক ব্যাপার। কংগ্রেসটির এবারের আসর বসেছিল ক্যালিফোর্নিয়ার স্যাক্রামেন্টোতে। গত মে মাসের ২১-২৫ তারিখ পাঁচ দিনব্যাপী হয়ে গেল পানিসম্পদ প্রকৌশলীদের জন্য এই বিশাল সম্মেলন।

দেশে ফেরার পর এবারের কংগ্রেস নিয়ে কথা হলো সাবরিনার সঙ্গে। ‘এই কংগ্রেসকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বিখ্যাত গবেষক, অধ্যাপক, প্রকৌশলীরা একত্র হন। পরিবেশ, জলবায়ু এবং পানিসম্পদ নিয়ে জ্ঞান আহরণের জন্য সবচেয়ে বড় এই মঞ্চে ১৫টিরও বেশি ক্যাটাগরিতে নিজ নিজ গবেষণাপত্র জমা দেওয়ার সুযোগ থাকে।’ জানালেন তিনি। গবেষণার বিষয়বস্তু অনুযায়ী ক্যাটাগরি নির্বাচন করে গবেষকেরা অনলাইনে তাঁদের কাজ জমা দিতে পারেন। নির্বাচিত গবেষণাপত্রগুলো কংগ্রেসে পাবলিশ করা হয় এবং গবেষকেরা উপস্থিত সবার সামনে তা উপস্থাপনের সুযোগ পান। বাংলাদেশের সাবরিনাও একইভাবে নির্বাচিত হয়েছেন এবং পুরস্কারও পেয়েছেন।

কী ছিল সাবরিনার গবেষণায়? জানতে চাইলে বলেন, ‘পানিসম্পদ প্রকৌশলের ছাত্রী হিসেবে জানতাম দেশের বিভিন্ন নদ-নদী আমাদের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। নদীগুলোর যেকোনো পরিবর্তন আমাদের জীবনে কীভাবে বিরূপ প্রভাব ফেলে, সেগুলো নিয়েও আমরা পড়েছি। আমি তাই স্নাতক পর্যায়ে নদীর লবণাক্ততার ওপরেই আমার গবেষণার বিষয় ঠিক করেছিলাম।’

সাবরিনা বিস্তারিত ব্যাখ্যা করলেন, ‘দেশের পুরো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একমাত্র মিঠা পানির উৎস গড়াই হলেও গড়াই-মধুমতি সরাসরি বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে সংযুক্ত। যার ফলে দেখা যায় লবণ পানি সরাসরি এই নদীতে প্রবেশ করে। সাম্প্রতিক সময়ে দেখা গেছে, নানা কারণে এই লবণাক্ততা দিন দিন বাড়ছে। আমি আমার থিসিসে মূলত “হেক-রাস” নামক সফটওয়্যার ব্যবহার করে এমন একটি মডেল তৈরি করেছি, যা দিয়ে গড়াইয়ের বর্তমান লবণাক্ততা সম্পর্কে জানা যাবে এবং এই মডেল ব্যবহার করে ভবিষ্যতে পানিপ্রবাহের বিভিন্ন পরিবর্তনের জন্য লবণাক্ততা কীভাবে পরিবর্তিত হতে পারে, সে সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে।’

সাবরিনা জানালেন, কংগ্রেসের পাঁচ দিনের প্রতিটি দিনই ছিল বিভিন্ন সফটওয়্যারের ওপর ওয়ার্কশপ। পাশাপাশি চলছিল বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন বিষয়ের ওপর হয়ে যাওয়া গবেষণা উপস্থাপন। নিজের আগ্রহের বিষয় অনুযায়ী যে কেউ যেকোনো প্রেজেন্টেশনে উপস্থিত হওয়ার সুযোগ ছিল।

স্যাক্রামান্টোতে অবশ্য পুরস্কার ছাড়াও আরও চমক অপেক্ষা করছিল সাবরিনার জন্য। ভিনদেশের এক সম্মেলনে গিয়ে অপ্রত্যাশিতভাবে তাঁর দেখা হয়ে গেছে অনেক বাংলাদেশির সঙ্গে। বলছিলেন, ‘সেখানকার বাঙালিদের সবাই আমেরিকার বিভিন্ন ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি করছেন। আমার পুরস্কারপ্রাপ্তিতে তাঁরাও ভীষণ খুশি হয়েছেন। আমার সঙ্গে আমার মা-বাবা ছিলেন। তাঁদের আনন্দও আমার জন্য একটা বড় প্রাপ্তি। প্রেজেন্টেশন শেষে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে আসা বিশেষজ্ঞরা যখন ব্যক্তিগতভাবে বাংলাদেশের নদী আর সেই নদীর লবণাক্ততার বর্তমান অবস্থা, কারণ ও প্রভাব সম্পর্কে খোঁজখবর নিলেন, খুব অবাক হয়েছিলাম।’

কংগ্রেসে পুরস্কারস্বরূপ যাওয়া-আসার খরচসহ ‘টোকেন মানি’ তো পেয়েছেনই, তবে সাবরিনার মতে, এখানে অংশগ্রহণ করতে পারাটাই তাঁর কাছে বড় পুরস্কার। বিভিন্ন ক্ষেত্রে গবেষণার যে এত বড় সুযোগ ও সম্ভাবনা আছে, সেটা তাঁর জানা ছিল না। সাবরিনা বিশ্বাস করেন, এই পুরস্কার তাঁকে সামনে আরও গবেষণার কাজে প্রেরণা জোগাবে। সবশেষে বললেন তাঁর একটা স্বপ্নের কথা, ‘আশা করি, পরেরবার এই প্রতিযোগিতায় আরও বেশি পুরস্কার আসবে বাংলাদেশের ঘরে। পাশাপাশি বাংলাদেশের আরও পুরকৌশলী, পানিসম্পদ প্রকৌশলী ও পরিবেশবিদেরা অংশগ্রহণের সুযোগ পাবেন।’ 

 
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ