প্রবাসে দেশীয় রাজনীতি ও দুর্বৃত্তায়ন

June 12, 2017, 9:54 AM, Hits: 1557

প্রবাসে দেশীয় রাজনীতি ও দুর্বৃত্তায়ন

মাহবুব সুয়েদ, লিসবন (পর্তুগাল) থেকে : আমি তখন ইংল্যান্ডে থাকি। ২০১০ সালের প্রথম দিকের ঘটনা। একদিন বাংলাদেশ হাইকমিশনে গেলাম জরুরি কিছু কাগজ সত্যায়িত করার জন্য। অনেক লম্বা লাইন ছিল। প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। আর মাত্র একজন পরেই আমার সিরিয়াল। এমন সময় হাইকমিশনের ভেতরে ঢুকলেন বিএনপির যুক্তরাজ্য শাখার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত সভাপতি। হাইকমিশনের এক কর্মকর্তা ওই বিএনপি নেতাকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে (তখন আওয়ামী লীগের সরকার ক্ষমতায়) আমার সামনে থাকা ভদ্রলোককে বললেন, ‘ওনাকে একটু সাইড দেন।’ বলে ওই নেতাকে সামনে আসার জন্য বিনীত স্বরে আহ্বান করলেন।

বিএনপির ওই নেতা সামনে আসার চেষ্টা করা মাত্র আমার সামনে সিরিয়ালে থাকা ভদ্রলোক চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করলেন। তিনিও প্রায় পঞ্চাশোর্ধ্ব হবেন দেখে মনে হলো। ভদ্রলোক উচ্চস্বরে দূতাবাসের সেই কর্মকর্তাকে জিজ্ঞেস করতে লাগলেন কোন যুক্তিতে আপনি সবার পরে আসা এই ভদ্রলোককে সামনে এনেছেন। ঘটনার আকস্মিকতায় বিএনপির ওই নেতা অনেকটা লজ্জায় পড়ে গেলেন এবং পেছনে চলে গেলেন। এ ঘটনায় হাইকমিশনের ভেতরে থাকা প্রত্যেক মানুষের মুখে স্মিত হাসি ফুটে উঠল।

ঘটনা দুই.

২০১১ সালের মাঝামাঝি। আমার বর্তমান নিবাস পর্তুগালে তখন বাংলাদেশ দূতাবাস ছিল না। প্যারিস থেকে দুই মাস অন্তর অন্তর দূতাবাসের কর্তারা আসতেন এবং বাংলা পাড়ায় স্থানীয় এক হল ভাড়া করে সেখানে দুই বা তিন দিন কনস্যুলার সেবা দিতেন। দূর-দুরান্ত থেকে বাংলাদেশিরা আসতেন সেবা গ্রহণের জন্য। তখন লিসবনে একদম নতুন আমি। মাত্র কয় মাস হয় এসেছি। বাংলাদেশের পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সত্যায়ন করা দরকার বলে গেলাম বাংলা পাড়ায়। ফ্রান্স থেকে দূতাবাসের তিন কর্তা ব্যক্তি এসেছেন সেখানে সেবা দানের জন্য। গিয়ে দেখলাম বাংলাদেশিরা লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছেন আর দূতাবাসের কর্তারা সেবা দিচ্ছেন। বাংলাদেশি বিভিন্ন রাজনৈতিক-সামাজিক সংগঠনের নেতাদের দেখলাম সেখানে জটলা করে শক্তি আর দাপটের জানান দিচ্ছেন। অনেক দূরের শহর থেকে যারা লিসবনে ছুটে এসেছেন একটা কাগজ সত্যায়িত করবেন এ আশায়, তাদের লাইনে দাঁড় করিয়ে রেখে তথাকথিত অনেক সংগঠনের নেতাকে দেখলাম নির্লজ্জের মতো নিজেদের পরিচিতজনদের কাগজ সত্যায়িত করিয়ে আনছেন। আবার দূতাবাসের কর্তাদের সঙ্গে কার পরিচিতি বেশি বা কাকে একটু বেশি নামে-মানুষ চেনেন সেই প্রচেষ্টায় ঘাম ঝরাচ্ছেন।

ঘটনা তিন.

২০১১ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। লন্ডনের ঐতিহাসিক আলতাব আলী পার্কে গেলাম রাতের একুশে পালন দেখতে। কয়েক শ মানুষ এসেছেন মহান ভাষা দিবসে শহীদ বেদিতে ফুল দেওয়ার জন্য। মধ্যরাতে লোকে লোকারণ্য হয়ে উঠল সাত সাগর তেরো নদীর ওপারে থাকা পূর্ব লন্ডনের ঐতিহাসিক ওই পার্ক। এ যেন হয়ে উঠেছে একখণ্ড বাংলাদেশ। রাত ১২টা ১ মিনিটে একে একে টাওয়ার হ্যামলেটসের বাঙালি মেয়র ও স্পিকার ফুল দিলেন। এবার বাংলাদেশি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলসমূহের ফুল দেওয়ার পালা। আমি দেখলাম বড় দুই দল ও তাদের অঙ্গ সংগঠনের ব্যানার ছাড়াও অনেক নামে বেনামের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক দল সেখানে ফুল দিতে এসেছে। হয়তো পূর্বপরিকল্পিত ছিল যে, সরকারি দল আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনগুলো প্রথমে ফুল দেবে এবং পরে বিরোধী দল বিএনপি।

সেই রীতি অনুযায়ী সবকিছু হলো। কিন্তু বিপত্তি দেখা গেল অন্যখানে। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে একদিকে ছাত্রলীগ ও অপরদিকে যুবদল মিছিল নিয়ে বাংলা টাউনের দিকে যাত্রা শুরু করল। ব্রিকলেন মসজিদের আগে বিএনপির মিছিল থামলে সামান্য পরেই ছাত্রলীগের মিছিলটি সেখানে এল। আমি মিছিলের পাশ দিয়ে হেঁটে আসছিলাম বিদেশে আমাদের দেশের রাজনীতির এই বলবান পুরুষদের দেখার জন্য। হঠাৎ দেখলাম যুবদলের মিছিল থেকে কেউ একজন পানির বোতল ছুড়ে মারল ছাত্রলীগের মিছিলের দিকে। সঙ্গে সঙ্গে সেখানে ধাক্কাধাক্কি লেগে গেল। তখন রাত প্রায় পৌনে একটা। এরপর পুলিশ এল ও সবাই কেটে পড়ল।

লেখক

উপরিউক্ত তিনটি ঘটনার বিবরণ দিলাম এই কারণে যে, দেশ ছেড়ে প্রবাসে আসা বাংলাদেশিরা প্রবাসে দেশীয় রাজনীতির যে নোংরা চর্চা করেন তার সামান্য নমুনা দেখানোর জন্য। শুধু ইউরোপ, আমেরিকা বা মধ্যপ্রাচ্যে বসবাসরত বাংলাদেশিরাই নয়, বাড়ির পাশের দেশ মালদ্বীপেও নাকি এমন ঘটনা ঘটছে। শুনেছি ও ফেসবুকে দেখেছি ওখানকার বাংলাদেশিরা আওয়ামী লীগ আর বিএনপিতে বিভক্ত এবং প্রায়ই তাদের অভ্যন্তরীণ কলহ হয় বা দুই দলে রেষারেষি লেগেই থাকে। এইতো মাত্র কয়দিন আগে স্পেনের মাদ্রিদে বিএনপির সঙ্গে আওয়ামী লীগের নেতা–কর্মীদের মারামারি হয়েছে। এই ঘটনায় বেশ কয়জন জেলেও আছেন।

আবার প্রবাসে বাংলাদেশের রাজনীতি চর্চার খারাপ দিক বাদ দিলে দেখা যায়, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে প্রবাসীদের ভূমিকা ছিল অতুলনীয়। আজও দেশের যেকোনো ইস্যুতে তারা বিভিন্ন সেমিনার–সিম্পোজিয়াম করে থাকেন। দেখা যায়, কয়েক শ মাইল গাড়ি ড্রাইভ করে অন্য শহর থেকে মানুষজন আসেন তাদের নিজস্ব দলীয় কর্মসূচিতে যোগদানের জন্য।

একেকটি পদের বিপরীতে বিপুল অঙ্কের টাকাও খরচ করতে তারা কুণ্ঠাবোধ করেন না। বিনিময়ে তারা চান একটা পরিচয় ও অবস্থান। তবে এই যে শ্রম বা চেষ্টা তার পেছনে যে দেশপ্রেম রয়েছে তাকেও ছোট করে দেখার নয়। কিন্তু দেশপ্রেম থেকে দেশের জন্য কিছু করতে গেলে কি শুধু রাজনীতি করলেই হয়? নাকি অন্য অনেকভাবে করা যায়?

বিদেশে আমরা সাধারণত আসি একটু সুখ–শান্তি আর নিরিবিলি জীবনযাপনের আশায়। কিন্তু এখানে এসে দেশীয় রাজনীতির চর্চা বা আমদানি আমাদের সামাজিক জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে অনেক সময়। প্রবাসে এসেও অনেক রেষারেষি হানাহানি ভর করে কমিউনিটির মধ্যে। দেখা যায়, অমুক এই সিদ্ধান্ত দিয়েছে বলে আমাকে অবশ্যই তার বিপরীত মতো দিতে হবে।

সদ্য সমাপ্ত ব্রিটেনের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বিজয়ী তিন বঙ্গকন্যা এখানকার মূলধারায় জড়িত ছিলেন এবং মূলধারার রাজনীতি করেছিলেন বলে তারা আজ টেমস পাড়ের দুনিয়ার সব সংসদের মা ব্রিটিশ সংসদে সাংসদ হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। যারাই মূলধারায় জড়িত ছিলেন বা আছেন, দেখা যায় তারা আজ বিভিন্ন দেশে ভালো অবস্থানে রয়েছেন। তারা শুধু সাংসদ নয় মেয়র, কাউন্সিলর বা কাউন্সিল চেয়ারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিজেদের নিয়ে গিয়েছেন। অথচ সারা জীবন এখানে দেশের রাজনীতির চর্চা করে হয়তো সেই দলের শাখা কমিটির গুরুত্বপূর্ণ কোনো পদে যান অথবা দেশে গিয়ে একবার সাংসদ হওয়ার জন্য দলীয় মনোনয়ন বোর্ডের সামনে যান।

এই চর্চা থেকে সকল প্রবাসীর বেরিয়ে আসা উচিত। প্রবাসে দেশীয় রাজনীতির চর্চা নয় আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের সুখ আর উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য মূলধারায় জড়িত হওয়া উচিত। দেশপ্রেমকে সামনে রেখে অন্য অনেক উপায়ে নিজ দেশের কল্যাণে কাজ করে যাওয়াটা কি অধিক সুখের নয়? 

 
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ