মার্কিন মুলুকে বাংলা সংস্কৃতির জয়ধ্বনি

June 15, 2017, 11:21 PM, Hits: 1524

মার্কিন মুলুকে বাংলা সংস্কৃতির জয়ধ্বনি

ফকির ইলিয়াস :  বিদেশে বাঙালিরা অনেক কিছুই পারেননি। কিন্তু যা পেরেছেন, তার সঠিক মূল্যায়ন হচ্ছে কি? এমন একটি প্রশ্নে আমি প্রায়ই ঘুরপাক খাই। অতি সম্প্রতি একটি প্রকাশনা অনুষ্ঠানে তেমনি উষ্মা প্রকাশ করেছেন নিউইয়র্কের বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পারফর্মিং আর্টসের (বিপা) পরিচালক এ্যানি ফেরদৌস। তিনি বলেছেন, ‘আমাদের এখানের স্থানীয় শিশুশিল্পীরা এখন বড়দের সাথে পাল্লা দিয়ে অনুষ্ঠান করছে। তারা বড়দের লেখা কবিতা আবৃত্তি করছে। গান গাইছে। কিন্তু তাদের গড়ে তুলতে মাসের পর মাস স্থানীয় সংগঠনগুলো যে শ্রম দিয়ে যাচ্ছে, এর মূল্যায়ন হচ্ছে কি?’ তিনি বলেন, ‘বিপা বড় বড় অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। কিন্তু সেখানে লোকসমাগম পর্যাপ্ত হয় না। আমরা যথেষ্ট নৈতিক সমর্থন পাই না।’ তাঁর কথার অনেক যৌক্তিকতা আছে।

নিউইয়র্কের এস্টোরিয়ায় ‘এথেন্স পার্ক’টি একসময় ছিল গ্রিক-আমেরিকানদের সংস্কৃতিচর্চার কেন্দ্রবিন্দু। আড়াই দশক আগে কখনো ভাবাই যেত না, এই এথেন্স পার্ক একদিন বাঙালি অভিবাসীদের অনুষ্ঠানমালায় মুখরিত হয়ে উঠবে। অথচ সেটাই হয়েছে। এই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়েছে প্রবাসের একটি অত্যন্ত সুপরিচিত সংগঠন বিপা। বিপা যুক্তরাষ্ট্রে বাংলা সংস্কৃতিচর্চায় একটি বিপ্ল­ব ঘটিয়েছে, তা বলা যায় আজ খুব দৃঢ়তার সঙ্গে।

বিপা পরপর কয়েক বছর এথেন্স পার্কের মুক্তমঞ্চে আগস্ট মাসের প্রতি শুক্রবার বিকেলে চার ঘণ্টাব্যাপী অনুষ্ঠানমালা করছে অত্যন্ত কৃতিত্বের সঙ্গে। গান, নাচ, নাটক, মূকাভিনয়, কবিতা আবৃত্তি, পুঁথিপাঠসহ বিভিন্ন সূচি ছিল এসব অনুষ্ঠানে।

বিপা এ পর্যন্ত বেশ কিছু নবীন প্রজন্মের অভিবাসী বাঙালি শিল্পীও সৃজন করেছে। সেলিমা আশরাফ, অ্যানি ফেরদৌসরা এই কাজ করছেন খুব মমত্বের সঙ্গে। বিপার ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা শতাধিক। প্রবাসে এভাবেই গড়ে উঠছে মিনি বাংলাদেশ। শক্ত হচ্ছে বাংলা ভাষা, বাঙালির সংস্কৃতির শিকড়।

বিদেশে যে লাখ লাখ বাঙালি প্রজন্ম বেড়ে উঠছে, তাদের ‘সুন্দরতম ভূমি বাংলাদেশ’কে বিশদভাবে জানাতে এগিয়ে এসেছিলেন বাংলা সাহিত্যের এক কৃতী পুরুষ বিশিষ্ট সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, কবি ড. হুমায়ুন আজাদ। তিনি লিখেছিলেন একটি চমৎকার গ্রন্থ মাই বিউটিফুল বাংলাদেশ। শিশু কিশোর-কিশোরীদের পঠন উপযোগী এ গ্রন্থ প্রকাশ করেছিল নিউইয়র্কভিত্তিক প্রকাশনা-বিপণন সংস্থা ‘মুক্তধারা’। গ্রন্থটি ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার অনেক বাংলা স্কুলে পঠিত হচ্ছে। অনেক মাতা-পিতা তাদের সন্তানদের হাতে তুলে দিয়েছেন এই গ্রন্থ। বাংলা শিক্ষানবিশদের উপযোগী আরেকটি বাংলা বই খুব সহজ ভাষায় লিখেছেন নিউইয়র্কপ্রবাসী টিভি ব্যক্তিত্ব, প্রাবন্ধিক বেলাল বেগ। তাঁর গ্রন্থটিও প্রশংসিত হয়েছে পাঠক মহলে।

লন্ডনপ্রবাসী বাঙালিরা দাবি করছেন, ইংল্যান্ড এখন ‘তৃতীয় বাংলা’। একই দাবি নিউইয়র্কবাসীরও। চলছে পরিশুদ্ধ সংস্কৃতিচর্চার প্রতিযোগিতা। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের পর ‘তৃতীয় বাংলা’ নামক চারণভূমিটি কোথায় তৈরি হবে, তা স্পষ্ট করে বলার সময় হয়তো এখনো আসেনি। কিন্তু অভিবাসী বাঙালির সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে, তার অব্যাহত ধারায় একসময় ‘তৃতীয় বাংলা’ কিংবা ‘চতুর্থ বাংলা’র অস্তিত্ব যে বিকশিত হবেই, তা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।

প্রবাসে বাংলা ভাষা, বাংলা সংস্কৃতিচর্চার পথিকৃৎ হিসেবে অনেকের ভূমিকা স্মরণযোগ্য। একজন অগ্রজের কথা না বললেই নয়। তিনি ইংল্যান্ডপ্রবাসী প্রয়াত তাসাদ্দুক আহমদ। ষাটের দশকে ব্রিটেনে এসে বিলেতে বাংলা সংস্কৃতিচর্চার যে ঝান্ডা তিনি উড়িয়েছিলেন, তা আজও উড়ছে ইংল্যান্ডের আকাশে গৌরবের সঙ্গে। তাসাদ্দুক আহমদ তাঁর কর্মের জন্য ব্রিটেনের রানির দেওয়া ‘এমবিই’ খেতাব পেয়েছিলেন।

মনে পড়ছে, ১৯৯২ সালে ইংল্যান্ডে দেশ বিকাশ নামের একটি সাংস্কৃতিক সংগঠনের আয়োজনে বাংলাদেশ মেলায় অংশগ্রহণের সুযোগ আমার হয়েছিল। সেই অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি তাসাদ্দুক আহমদ তাঁর স্বপ্নের কথা আমাদের বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, এই প্রবাসী প্রজন্মের সুযোগ্য সন্তানেরাই একদিন তাদের শিকড়ভূমি বাংলাদেশের পাশে গিয়ে দাঁড়াবে। এরা জানবে তাদের মূল ধারার কথা। তাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সভ্যতা, সংস্কৃতির কথা। তারা তা ধারণ করবে মনেপ্রাণে।

এই ধারাবাহিকতায় মার্কিন মুলুকে শিল্পকলা একাডেমি, নজরুল একাডেমি, প্রকৃতি, আনন্দধ্বনি—এমন অনেক সংগঠনের জন্ম হয়েছে। এ বছর ঢাকার রমনার বটমূলের আদলে নিউইয়র্কে প্রভাতি বাংলা বর্ষবরণ উৎসবের আয়োজন করে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে সাংস্কৃতিক সংগঠন আনন্দধ্বনি ইউএসএ। রমনার বটমূলের ছবি এবং একই রকম মঞ্চে শনিবার ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত গান ও কবিতায় নতুন বছরকে স্বাগত জানান আনন্দধ্বনি ও নিউইয়র্কের জনপ্রিয় শিল্পীরা। সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়ায় এবং চমৎকার আবহাওয়ার কারণে শত শত নারী-পুরুষ উডসাইডের কুইন্স প্যালেসের এই অনুষ্ঠানে ভিড় জমান। আয়োজকেরা তাঁদের সকালের নাশতা দিয়ে আপ্যায়ন করেন।

আনন্দধ্বনি পয়লা বৈশাখের এই আয়োজন ছিল এই প্রথম। তবে সাজানো-গোছালো একটি অনুষ্ঠান উপহার দিয়ে নিউইয়র্কের প্রবাসী বাংলাদেশিদের মন কেড়েছে সংগঠনটি। আনন্দধ্বনির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা অর্ঘ্য সারথী সিকদার বলেন, ‘আমরা এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসে বাংলাদেশের কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের সমৃদ্ধিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়ে আমরা বরণ করেছি বাংলা নতুন বছরকে।’ তিনি বলেন, ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করবে আনন্দধ্বনি।

এ বছরের ২১ মে পিএস ১৪৯,৯৩-১১, ৩৪ অ্যাভিনিউ, জ্যাকসন হাইটসে একটি নিরীক্ষামূলক অনুষ্ঠান ‘এক হাতে বাজে অগ্নিবীণা কণ্ঠে গীতাঞ্জলি’ আয়োজন করেছিল নিউইয়র্কের শতদল।

দুই মহান কবির বৈচিত্র্যময় গান, নৃত্য, কবিতা, সেমিনার, শিশু-কিশোরদের প্রতিযোগিতার মাধ্যমে শেষ হয় এই প্রাণবন্ত অনুষ্ঠান। কবি কাজী নজরুল ইসলামের দৌহিত্র অনিন্দিতা কাজী, বিখ্যাত নজরুলসংগীতশিল্পী সুজিত মোস্তফা, উদীয়মান নজরুলসংগীতশিল্পী শবনম আবেদি সংগীত পরিবেশন করেন।

কানাডা থেকে আগত উলফাত পারভীন রোজি, বিপা, ইন্ডিয়ান কালচারাল কমিউনিটি, সুরছন্দ, সৃজনী, শিল্পকলা একাডেমি ইনক-এর পরিবেশনা ছিল চমৎকার।

বিশেষ করে অনিন্দিতা কাজী ও সুজিত মোস্তফার কথক, আবৃত্তি, গান দর্শক-শ্রোতাদের মন্ত্রমুগ্ধের মতো ধরে রেখেছিল অনেকটা সময়। একটা সময় মনে হচ্ছিল, তাঁদের উপস্থাপনায় রবীন্দ্র-নজরুলের সম্পর্কের দৃষ্টান্ত অনুভবে প্রাণের ছোঁয়া লেগেছিল অনেক অনেক আবেগের ও ভালোবাসার।

একইভাবে কানাডার টরন্টো, মন্ট্রিয়লেও বেশ কিছু সাংস্কৃতিক সংগঠন প্রতিবছর নাচ, গান, সেমিনার, নতুন প্রজন্মের জন্য মুক্ত ফোরামসহ ব্যাপক আয়োজন করছে। ১৯৮৭ সালে ফেডারেশন অব বাংলাদেশি অর্গানাইজেশন অব নর্থ আমেরিকা (ফোবানা) নামে একটি ছাতা সংগঠন জন্ম নিয়েছিল উত্তর আমেরিকায়। কিন্তু দুঃখের কথা নেতৃত্বের কোন্দলের শিকার হয়ে ফোবানা এখন বহুধাবিভক্ত হয়ে পড়েছে। যে লক্ষ্য নিয়ে ফোবানার জন্ম হয়েছিল, সে লক্ষ্য থেকে সম্পূর্ণই সরে এসেছে উদ্যোগটি।

যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ, বাংলা সংস্কৃতিকে তুলে ধরতে আঞ্চলিক সংগঠনগুলো ব্যাপক ভূমিকা রাখছে। এই কাজে এগিয়ে এসেছে এসেছে চট্টগ্রাম সমিতি, বিয়ানীবাজার সামাজিক-সাংস্কৃতিক সমিতি, জ্যামাইকা ফেন্সন্ডস সোসাইটি, ব্রঙ্কস্ বাংলাদেশ সোসাইটিসহ বেশ কিছু সংগঠন।

বোস্টনে কিশলয় বাংলা স্কুল, ওয়াশিংটন বাংলা স্কুল, কিংবা নিউইয়র্কে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী ব্যাপক অনুষ্ঠানের আয়োজন করছে প্রতিবছর। তা ছাড়া ক্যালিফোর্নিয়ায় কাজী মশহুরুল হুদার মতো কৃতী মূকাভিনেতা অথবা শিল্পী রথীন্দ্রনাথ রায়, শিল্পী শহীদ হাসান, শিল্পী কাদেরী কিবরিয়া, শিল্পী দুলাল ভৌমিক, শিল্পী তাজুল ইমাম, শিল্পী কাবেরী দাশ প্রমুখের উজ্জ্বল ভূমিকা কি অস্বীকার করা যাবে? আমাদের মনে আছে প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করে বিশিষ্ট চিকিৎসক ডা. জিয়াউদ্দিন আহমেদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন এই মার্কিন মুলুকে।

প্রবাসে শিল্পীসত্তার ‘আইকন’ তৈরি হয়ে গোটা বিশ্বে বাংলা সংস্কৃতির দ্যুতি ছড়িয়ে দেবে—এ প্রত্যাশা প্রবাসী সমাজের। পশ্চিম বাংলার বাঙালিদের আয়োজন বঙ্গ সংস্কৃতি সম্মেলন উত্তর আমেরিকায় আয়োজিত হচ্ছে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে। এ সম্মেলনে বাংলাদেশের বাঙালিদের অংশগ্রহণও বাড়ছে। বেশ কটি নাট্য সংগঠন নিউইয়র্কের ব্রডওয়ে শোতে অভিনয় করার সুযোগ পেয়েছে। নিউইয়র্ক পাবলিক লাইব্রেরি বেশ কজন বাঙালি লেখক-পাঠককে তাদের সেশনে পাঠ করার সুযোগ দিয়েছে গেল পাঁচ বছরে। এর পরিসর ক্রমশ বাড়ছে। অভিবাসন একটি চলমান প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ায় বাঙালিরা ছড়িয়ে পড়বেই বিশ্বের দেশ-দেশান্তরে। বিশ্বায়ন তাদের ডেকে নেবে আরও কাছাকাছি। তারা বিদেশে যাওয়ার সময় নিজ সংস্কৃতি বহন করে নিয়ে যাবেন এবং তা তুলে ধরবেন যুগে যুগে কালে কালে। 

 
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ