যখন গ্রহণ লাগে

June 16, 2017, 4:03 PM, Hits: 1485

যখন গ্রহণ লাগে

আমার বয়স তখন সাত বছর। দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র। ১৯৯৫ সাল। হঠাৎ একদিন শুনি সবাই বলাবলি করছে যে আজ সূর্যগ্রহণ। আমার এখনো মনে আছে, এই সূর্যগ্রহণের খবরে অনেককে দেখেছি উদ্দীপ্ত আবার অনেককেই দেখেছি বেশ উদ্বিগ্ন।

সকলের এ ব্যাপারে এত আগ্রহ দেখে আমারও আগ্রহের কমতি রইল না। সূর্যগ্রহণ দেখতে হবে। কিন্তু সকাল থেকে মায়ের কড়া নির্দেশ আজ কিছুতেই সূর্যের দিকে তাকানো যাবে না। তাকালেই নাকি চোখ নষ্ট হয়ে যাবে।

মাকে এর কারণ জিজ্ঞেস করতে, সংসারের শত কাজ সামলানোয় ব্যস্ত আমার মা অত ব্যাখ্যায় না গিয়ে, তিনি তার ছোটবেলায় শোনা সূর্যগ্রহণের গল্পটাই আমাকে শুনিয়ে দিলেন। গল্পটা এ রকম—এক রাক্ষস এসে নাকি পুরো সূর্যটাকে মুখে পুরে ফেলবে। দিনেরবেলা পুরো পৃথিবী হয়ে যাবে অন্ধকার। কিন্তু সূর্য প্রচণ্ড গরম বিধায় রাক্ষস সাহেব ওটাকে গিলতে পারবেন না। তাই কিছুক্ষণ পরই উনি আবার সূর্যটাকে মুখ থেকে বের করে দেবেন। আর পুরো সময়টাতে রাক্ষসের রাগ থাকে খুব বেশি। তাই এই সময় কেউ যদি তার দিকে তাকায় রাক্ষস নাকি তার চোখ গেলে দেবে।

একে তো মায়ের কড়া নির্দেশ তার ওপর চোখ নষ্ট হওয়ার ভয়। পড়লাম মহাবিপদে। এখন সূর্যগ্রহণ দেখব কীভাবে? এমন সময় পাড়ার এক বড় ভাই বললেন, পুরোনো এক্সরে ফিল্ম দিয়ে সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে। এতে নাকি রাক্ষস সাহেব রাগ করবেন না। আর চোখও গেলে দেবে না। তখনকার সময় কেউ এক্সরে করালে ফিল্মটা সহজে ফেলত না, যত্ন করে রেখে দিত। আমাদের ঘরেও ছিল ওরকম কয়েকটা পুরোনো এক্সরে ফিল্ম। অনেক কান্নাকাটি করে মায়ের কাছ থেকে চেয়ে নিলাম একটা এক্সরে ফিল্ম এবং দেখলাম জীবনের প্রথম ও একমাত্র পূর্ণ সূর্যগ্রহণ। ওই দিন আরও জেনেছিলাম সূর্যের মতো একই রকমভাবে চাঁদেরও নাকি গ্রহণ হয়।

বিবর্তনের শুরু থেকে পৃথিবী জুড়ে এই সূর্য ও চন্দ্রগ্রহণ নিয়ে রয়েছে হাজারো জনশ্রুতি, কল্পকাহিনি ও কুসংস্কার। এর মধ্যে একটাতো আমি নিজেই বললাম। এ ছাড়া আমাদের দেশে অনেকে বলেন, গর্ভাবস্থায় কোনো নারী সূর্য অথবা চন্দ্রগ্রহণের সময় যদি কিছু কাটাকাটি করেন তাহলে গর্ভের সন্তানের নাকি অঙ্গহানি হয় ইত্যাদি, ইত্যাদি। আসলে এগুলোর সবই এক শ ভাগ কুসংস্কার।

আসলে প্রকৃতির এক অনন্য, অনবদ্য ও খুবই স্বাভাবিক একটি ঘটনা হচ্ছে এই সূর্য অথবা চন্দ্রগ্রহণ। এখানে ভিত্তিহীন গল্পগাঁথা বা কুসংস্কারের কোনো জায়গা নেই।

পৃথিবী ও চাঁদ একটি নির্দিষ্ট নিয়মে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করছে এবং এর ফলে সূর্যের বিপরীতে পৃথিবী এবং চাঁদের অবস্থান প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হচ্ছে। এই পরিবর্তন হতে হতে চাঁদ, সূর্য ও পৃথিবী যখন একটি নির্দিষ্ট ফ্রেমে অবস্থান নেয় তখনই হয় সূর্য অথবা চন্দ্রগ্রহণ। ব্যাপারটা মনে হয় জটিল করে বলা হয়ে গেল। আর একটু সোজা করে বলার চেষ্টা করি। পৃথিবী সূর্যকে কেন্দ্র করে সূর্যের চারপাশে ঘুরছে। আবার চাঁদ পৃথিবীকে কেন্দ্র করে পৃথিবীর চারপাশে ঘুরছে। সুতরাং চাঁদও কিন্তু পৃথিবীর সঙ্গে সঙ্গে সূর্যের চারপাশে ঘুরছে। এভাবে ঘুরতে ঘুরতে সূর্য, চাঁদ ও পৃথিবী একসময় একই সরল রেখায় উপনীত হয় আর তখনই সূর্য অথবা চন্দ্রগ্রহণ হয়।

সূর্য অথবা চন্দ্রগ্রহণ দুই ক্ষেত্রেই মূল ভূমিকাটা পালন করে আমাদের চন্দ্রমামা। চাঁদ পৃথিবীর চারপাশে ঘুরতে ঘুরতে এক সময় চলে আসে সূর্য আর পৃথিবীর মাঝখানে। সূর্য, পৃথিবী ও চাঁদ সবাই এক সরলরেখায় উপনীত হয়। প্রথমে সূর্য। তারপর চাঁদ এবং সবার পেছনে পৃথিবী।

যেকোনো বস্তুর ছায়া তার আলোর উৎসের উল্টো দিকে পড়ে। যেমন আমার মুখে যদি কেউ টর্চের আলো ফেলে আমার ছায়া পড়বে আমার পেছনে। আবার আমার পিঠে আলো ফেললে ছায়া পড়বে আমার সামনে। এভাবে চাঁদ যখন সূর্য ও পৃথিবীর মাঝখানে, সূর্য তখন চাঁদের ওপর সরাসরি আলো ফেলে। এর ফলে চাঁদের ছায়া সোজা গিয়ে পড়ে পেছনে থাকা পৃথিবীর ওপর। পৃথিবীর যে অংশে চাঁদের এই বিশাল ছায়া পড়ে, দিনের বেলাতেই সেই অংশ অন্ধকার হয়ে যায়। আর ওখান থেকে সূর্যের দিকে তাকালে মনে হবে যে সূর্য অন্ধকারে মিলিয়ে যাচ্ছে।

আসলে সূর্য অন্ধকারে মিলিয়ে যাচ্ছে না বা কোনো রাক্ষসও সূর্যকে গিলে ফেলছে না। প্রকৃতপক্ষে এখানে চাঁদ সূর্যের বরাবর আসায় সূর্য চাঁদের আড়ালে চলে যায়। চাঁদের অবস্থানের ওপর নির্ভর করে কখনো চাঁদ পুরোপুরি অথবা কখনো আংশিকভাবে সূর্যকে আড়াল করে। একেই আমরা যথাক্রমে পূর্ণ ও আংশিক সূর্যগ্রহণ বলি।

সূর্য কিন্তু চাঁদের চেয়ে ৪০০ গুন বড়। তবু আমাদের চাঁদ পুরো সূর্যকে আড়াল করে দিতে পারে। এটা সম্ভব হওয়ার একমাত্র কারণ হচ্ছে, সূর্য যেমন চাঁদ অপেক্ষা ৪০০ গুন বড় ঠিক তেমনিভাবে সূর্য পৃথিবী থেকে চাঁদের চেয়ে ৪০০ গুন দূরে অবস্থিত। এই কারণে পৃথিবী থেকে চাঁদ ও সূর্যের আকার আমাদের কাছে সমান মনে হয়। সূর্যগ্রহণের সময় সূর্য থেকে মাত্রাতিরিক্ত পরিমাণ অতি বেগুনি রশ্মি ছড়ায়। তাই এই সময় খালি চোখে সূর্যের দিকে তাকালে চোখের ক্ষতি হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক। আমার মা যে জন্য সূর্যগ্রহণের সময় সূর্যের দিকে তাকাতে বারণ করতেন, তার কারণ নিশ্চয় এখন স্পষ্ট।

এই তো গেল সূর্য গ্রহণের কথা। এবার আসি চন্দ্রগ্রহণে। চন্দ্রগ্রহণও সূর্যগ্রহণের মতো আরেকটি আলোছায়ার খেলা। চাঁদ ও পৃথিবী ঘুরতে ঘুরতে আবার এক সময় সূর্য বরাবর একই সরলরেখায় উপনীত হয়। কিন্তু এবার পৃথিবী এসে দাঁড়ায় সূর্য ও চাঁদের মাঝখানে। প্রথমে সূর্য তারপর পৃথিবী এবং সবার পেছনে এবার চাঁদ। এখন পৃথিবী যখন মাঝখানে, সূর্য এবার পৃথিবীতে সরাসরি আলো ফেলছে। এর ফলে পৃথিবীর ছায়া গিয়ে পড়ছে চাঁদের ওপর। পৃথিবী ও চাঁদের অবস্থানের ওপর নির্ভর করে এই ছায়া চাঁদকে কখনো সম্পূর্ণ কখনো আংশিকভাবে আড়াল করে দেয়। আর এভাবেই যথাক্রমে পূর্ণ ও আংশিক চন্দ্রগ্রহণ হয়। এই অবস্থানগত প্রক্রিয়ার কারণেই সূর্যগ্রহণ শুধুমাত্র অমাবস্যার সময় এবং চন্দ্রগ্রহণ শুধুমাত্র পূর্ণিমার সময় ব্যতীত অন্য কোনো সময় হওয়া সম্ভব নয়।

সুতরাং এখন আশা করি বোঝা যাচ্ছে যে, সূর্য ও চন্দ্রগ্রহণ খুবই স্বাভাবিক। প্রাকৃতিক ও মহাজাগতিক ঘটনা। এ ক্ষেত্রে কোনোরকম কুসংস্কার প্রশ্রয় দেওয়া নিছক বোকামি ছাড়া আর কিছু নয়। বরং আমি বলব বর্তমান আধুনিক যুগে এসেও সূর্য ও চন্দ্রগ্রহণ ঘিরে কোনো প্রকার কুসংস্কার বিশ্বাস করা বা প্রচার করা আর হাজার বছরের জ্যোতির্বিদ্যাকে অসম্মান করা এক সমান। 

 
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ