বাবাকে উপহার দেওয়া হলো না

June 17, 2017, 9:38 PM, Hits: 1392

বাবাকে উপহার দেওয়া হলো না

লাবলু কাজী, নিউইয়র্ক (যুক্তরাষ্ট্র) থেকে : উপহার একজনের অন্তরের অনুভূতি অন্যের কাছে প্রকাশের একটি উত্তম বাহক। কখনো কখনো অন্যের কাছে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করার একটি শক্তিশালী ও মূল্যবান উপায়। যা কিনা এটি কেনার জন্য কত খরচ হয়েছে এবং কতটা মূল্যবান তা নিয়ে বিচার করা যাবে না। এটি প্রিয়জনের কাছ থেকে তাদের হৃদয় থেকে পাওয়া একটি উপহার এবং কোনো অর্থই যা কিনতে পারবে না। এটি একটি ধারক ও পরিদর্শনকারী বন্ধুদের বা আত্মীয়স্বজনদের প্রশংসা করার জন্য সৌজন্যের প্রতীক। আধুনিক সমাজের জন্য উপহার দিতে পারা এবং এর চাকচিক্য ও দাম সফলতা আনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রেমিকদের বাজারে একটি প্রবাদ আছে—মেয়েটি কত সুন্দর আপনার উপহার কত বড়। আমি যুক্তিগুলোর সঙ্গে একমত। তবে আমি এই ধারণাটি নিয়ে মতবিরোধ করি না যে, এর কোনো ব্যতিক্রম নেই।

সমাজে সর্বসাধারণের মধ্যে বিয়ের অভ্যর্থনার মতো অধিকাংশ ক্ষেত্রে সমাজে সর্বাধিক উদ্দীপ্ত হয়। যেখানে হোস্ট তাদের মূল্যবান জিনিসগুলো আনাতে সক্ষম হয় এবং দরিদ্র আত্মীয়দের আমন্ত্রণ পাওয়ার জন্য বাদ দেওয়া হয়। কারণ তাদের কোনো ভালো পোশাক পরার নেই ও উপহার ক্রয় করার সামর্থ্যও নেই। কিন্তু ইসলামি আইন অনুযায়ী তারা অংশগ্রহণকারী প্রথম দল। এ ছাড়া আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করার জন্য তা জরুরি। যারা এগুলো অনুসরণ করেন না তাদের বলার কেউ নেই। কেউ কেউ মনে করেন, এটা তাদের জগৎ ও তারা এখানে চিরকাল বেঁচে থাকবেন। কিন্তু তারা জানেন না যে, তাদের সমুদ্র তীরে বালু দিয়ে বাড়ি নির্মাণের মতো কত ঠুনকো তাদের দাবি।

ছোটবেলা থেকেই আমার বাবা-মা উৎসব উপলক্ষে আমাকে কোনো উপহার দিতে পারেননি। এটা তারা দিতে চেয়েছেন কিন্তু তাদের ক্ষমতা ছিল না। যখন আমি বড় হয়েছি এবং পরিবারের সব দায়িত্ব পালন করছি, সমস্ত অনুষ্ঠানের জন্য উপহারগুলো অন্তর্ভুক্ত করে তাদের জীবনে খুশি বয়ে আনার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। সবাইকে সন্তুষ্ট করার জন্য আমি সব সময় তাদের সুখ কিনতে তালিকা থেকে আমাকে বাদ দিয়েছি। যেহেতু আমি আমার একমাত্র লক্ষ্য বিয়ে করার পর কীভাবে আমার বাচ্চাদের সর্বোত্তম ও শ্রেষ্ঠ মানুষ করে তোলা যায় এবং এখনো আমি তা চালিয়ে যাচ্ছি। এই জন্য আমার অংশটি ত্যাগ করতে হয় ওদের সুখের জন্য। আমি জানি এটা নিষ্ঠুরতা। কিন্তু আমি মনে করি আমার পরিতৃপ্তি সেখানেই আছে—সম্ভবত সে উদ্দেশ্যেই আল্লাহ আমায় পয়দা করেছেন। আমার সবচেয়ে বড় উপহার আমার সন্তান। যখন আমি তাদের দেশের সেরা বিদ্যালয়ে যেতে দেখি এবং প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করে তখন আমি আমার প্রভুর কাছে এর চেয়ে বেশি আর কি চাইতে পারি?

এখন আমার জ্যেষ্ঠ পুত্র স্নাতক শেষ করে আইটি হিসেবে চাকরি পেয়েছে এবং সব বোঝা বহন করছে সংসারের। সে শুধু অর্থনৈতিক দুরবস্থা থেকে আমাকে মুক্ত করেনি উপরন্তু আমাকে যে উপহারগুলো দিচ্ছে তা আগে কখনোই কিনতে পারতাম না। সে ঠিক সময় দরকার পূরণ করে আর অভাব বোধটা আমি আর আগের মতো ফিল করি না। সে জন্য শাওনের হৃদয়কে আমি কতটা মূল্যবান বলে গণ্য করব এবং ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ রাখব আপনারাই বলুন? প্রতি বার ও একটি উপহার নিয়ে আসে আর আমি আনন্দে চিৎকার করে কাঁদতে থাকি। এই ধরনের অনুভূতি ও অভিজ্ঞতা যা আমার জীবনে আগে অস্তিত্ব ছিল না। আমি আপ্লুত ও হৃদয়ের এই স্বর্গীয় অনুভূতি কীভাবে প্রকাশ করতে পারি তা লেখার ভাষা আমার জানা নেই !

আমার নিজের জীবনে বাবার স্নেহ ভালোবাসার সুযোগ হয়নি। কারণ চাকরির করার ছলে তিনি দূর পরবাসে থাকতেন। কিন্তু তার জীবন চলার স্টাইল আমার পছন্দনীয় ছিল এবং আমার জীবন চলার পাথেয় হিসেবে আমি বেছে নিয়েছি। আমার ছেলেমেয়েরা, আমার মা এই বলেন—বাপ কা বেটা সিপাই কা ঘোড়া না হয় থোড়া থোড়া। আমি সহমত পোষণ করি তাদের সঙ্গে। আমার জীবনে ছোটখাটো যদি কোনো সফলতা এসে থাকে আমার বাবার নীরব অনুপ্রেরণা তাতে ইন্ধন জুগিয়েছে। মনে হয় বাবা যেন দূর থেকে হাত নেড়ে নেড়ে বলছেন, তুই এগিয়ে যা তুই পারবি। ভয় কীসে, আমিতো আছি। এখনতো আর কেউ আমায় এমন করে বলে না, বাবা! বাবা তোমায় খুব মিস করি! তুমি যেখানে থাক না কেন, ভালো থেকো! রব্বির হাম হুম্মা কামা রব্বা ইয়ানি ছগিরা...।

আমি আমার ব্যক্তিগত জীবনের একটি হৃদয়বিদারক ঘটনা দিয়ে এই লেখা শেষ করব। আমার বাবা তার সমুদ্রের নাবিকের চাকরি থেকে অবসর নেন এবং আমাদের নিজ গ্রামে শেষ জীবন উপভোগ করছিলেন। খুব স্বপ্রণোদিত কম কথার মানুষ যিনি তার নিজের ছেলের সঙ্গে কথা বলেছেন ভীষণ প্রয়োজনে। তার মানে আমাদের সারা জীবনে তার আর আমার মধ্যে পঞ্চাশ বারের কম একুশ বছরের একসঙ্গের জীবনে কথা হয়েছে।

আমি তখন ঢাকায় চাকরি করি। তার জন্য একটি সুন্দর টিভি কিনেছিলাম খবর দেখার জন্য। আমি ওটা গ্রামে নিয়ে আসলাম এবং বাবার সামনে রাখলাম। বাবাকে এই বলেছিলাম যে, আমি আপনার জন্য এ টিভি কিনেছি। তিনি কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালেন না। কিছু বললেনও না। আমি তার মুখের পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম—আকাশ যেন কালো আঁধারে পূর্ণ হয়েছে। বৃষ্টি আসার আগের মতোই মেঘে ঢাকা চোখ দুটো ছলছল, যেন মেঘের বৃষ্টি রূপে ঝরে পড়বে!

পরে আমি আমার মাকে জিজ্ঞাসা করলাম নতুন টিভিতে খুশি নন বাবা। মা আমাকে বললেন যে, তিনি নিজের হৃদয়ের কথা বলার জন্য লজ্জা পাচ্ছেন। কিন্তু আমি সত্য বলছি, প্রতিবেশীরা ঢাকা শহরে বাড়ি কিনছে, তোর বাবার সারা জীবনের স্বপ্ন ঢাকায় একটি বাড়ি কেনার। সে তার স্বপ্ন পূরণ করতে পারেনি। সে দেখতে চায় যে, তুই এটা করবি।

আমি আমার মাকে বাবাকে বলতে বলেছিলাম, আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি যে, আমি শিগগিরই তার ইচ্ছা পূর্ণ করব। এর ছয় মাস পর আমার বাবা মারা যান এবং আমি এত অভাগা ছেলে যে, আমি তার স্বপ্নের সাধটি পূরণ করতে পারিনি। পরে আমার নিজের উপার্জন থেকে ঢাকায় আভিজাত এলাকা, যেখানে ধনী ও খ্যাতিমানরা বসবাস করেন, সেখানে বাড়ি কিনেছি। কিন্তু আমার বাবা দেখে যেতে পারেননি। বাবাকে তার ইচ্ছার উপহার দিতে পারিনি। এ ব্যথা আমাকে কষ্ট দেয় এবং আমার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সম্ভবত আমাকে কষ্ট দেবে!

আমি রিয়েলটর। বাড়ি কেনাবেচা আমার পেশা। যখনই নতুন বাড়ি কিনি থাকার জন্য গিয়ে উঠি। বাবার সেই দিনের সেই মুখটা ভেসে ওঠে। তখন কান্নায় বুক ভেঙে যায়। দুই চোখে অশ্রুর ধারা ঝরে পড়ে...।

—লেখক রিয়েলটর ও সাহিত্যিক। 

 
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ