বাবার হাত ধরে এক পা দু পা

June 18, 2017, 10:18 AM, Hits: 2313

বাবার হাত ধরে এক পা দু পা

জাহাঙ্গীর বাবু

যার হাত ধাতের আংগুল ধরে

এক পা দু পা করে হাঁটতে শিখেছি

তিনি আমার বাবা।

বাবা এখন লাঠি ছাড়া এক পা ও

চলতে পারেন না।

বাবা এখন চেয়ারে বসে নামাজ পড়েন

বাবা আমায় লাল রঙ এর সাইকেল দিয়েছিলেন

সাইকেলে বসিয়ে পেছনে হাত রেখে দৌড়েছেন

পড়ে গেলে ঘাম মুছে দিয়ে, সাবাস বলে আবার

সাইকেলের সিটে বসিয়েয়েছেন।

বাবা এখন বিছানায় থাকেন বেশী

বাবার হাত ধরে গ্রামের হাঁটে যেতাম

বাবার সাথে গুলিস্থান হকার মার্কেট

বাংলাবাজার, কমলাপুর রেল ষ্টেশন

ময়মনসিং,গৌরিপুর,আখাউড়া,

পাকশী,শান্তাহার,আড়িখোলা,সিলেট

এক পা দু পা করে স্কুল,কলেজ,পলিটেকনিক

এয়ারপোর্ট দেশ বিদেশ।

প্রথম কলেজে যাবার দিন বাবার চোখে স্বপ্ন

প্রথম বিমান বন্দরে বিদায়ের দিন

বাবার মুখে সা্হস, বুকে তার ধড় ফড়,

চোখে তার অশ্রু ছল ছল,এক ফোঁটাও পড়েনি

বুকে বুক মেলাতে হু হু করে কেঁদে উঠেছিল।

এক দম ভয় পাবি না

শরীরের যত্ন নিবি,খাবি, ঠিক মতো চলবি

যদি কিছু থাকে পাঠাবি, এক দম আমাদের কথা ভাববি না

আমি এখনো চাকরী করি।

বাবার কান্না বুঝিনি

আজ আমি পিতা, এখন বুঝি

বাবা আমার টি শার্টে, সানগ্লাসে পুরাই হিরো

মোটা ব্লেল্টের প্যান্ট, হাই হিল সু, আশির দশক।

বাবা এখন ভীষন রোগা,  নামাজের বিছানায়,চেয়ারে, শোবার বিছানায় গোংগ্রায়।

বাবা আমায় একটা টুকটুকে লাল পরী বউ দিয়েছিলো

যেমন সে বলতো আমায়

বাবার পকেটের টাকা চুরি করতাম হামেশা দুই টাকা মাত্র প্রতি দিন

বাবার সামনে দাড়ালে আরো দুই টাকা

হোস্টেলের বারান্দায় মশার কামড় খেয়ে আমাকে না পেয়ে রাতের শেষ ট্রেনে ফিরতো

চিরকুটে লিখতো,  যে দিন থাকবো না বুঝবি

যে দিন বাবা হবি বুঝবি,যে দিন বন্ধুরা অনেক বড় হবে সে দিন বুঝবি, মঞ্চে নাটক করে সময় কাটাস,তোর কাজ মঞ্চে অভিনয় নয়,জীবন যুদ্ধের মঞ্চে।

হ্যা এখন বুঝি সে দিন নাটকের মঞ্চে রাতের পর রাত না কাটিয়ে আরেকটু পড়লে বড় একটা কিছু হতাম বটে।

বাবাই আমায় মঞ্চে তুলেছিলো শৈশবে,আর নামতে পারিনি।

না অভিনেতা হই নি পর্দায়, জীবন যুদ্ধে পরাজিত সৈনিকের অভিনয়টা করছি বেশ।

বাবা এখন বুড়ো,আমি তার বুড়ো খোকা

ভীষন অভিমান করে অল্পতে

আমার কলেজ জীবনে তিনি ছিলেন বন্ধুর মতো

বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতেন।

সে বাবা আজ বদলে গেছে,মৃত্যু ভয় তাকে জেঁকে বসেছে।

ঘর, মসজিদ,নামাজের জায়নামাজ,চেয়ার তার নিত্য সঙ্গী।

এখনো আমার বাউন্ডেলে ভাব যায়নি,নামাজ রোজায় ইবাদতে লেবাসে তিনি খুব একটা খুশী নন।

ভালোবাসেন অনেক,বুঝতে দেন না। 

প্রতিদিন বলেন, আমার সময় শেষ,চলে যাবার অপেক্ষায়।

আমি হারিয়ে যাই  শৈশবে,কৈশরে,যৌবনে সবখানেই বাবা

প্রতি ধাপে ধাপে বাবা,অসুস্থ্য হলে কাঁধে নিয়ে ছুটতেন হাসপাতালে সব ভাসে আমার চোখে।

জীবনের যোগ বিয়োগ গুনন ভাগে অংক কষে প্রজন্ম

স্ত্রী সন্তান নিয়ে স্বার্থপর হয়ে যাই অনেক সময়

সময়ের প্রয়োজনে দূরে সরে যাই।

একাকী চোখ বন্ধ করে বাবার হাতের আঙ্গুল ধরে এক পা দু পা করে আজো হাঁটি

আমার সন্তানদের কপালে আদরের চুমু আঁকি

বাবার কপালে চুমু আঁকি,একাকী নিসঙ্গতায়।

ক্লান্ত বাবা,ক্লান্ত আমি আমার আমিত্বে।

যোগ বিয়োগ,গুনন ভাগ ধর্ম অধর্ম দায়িত্ব কর্তব্য স্বার্থপরতায়।

বাবার ছোট বাবু,ছোট্ট খোকা হয়ে যদি থাকতে পারতাম পেতাম নি:স্বার্থ আদর

যা এখন পায়না আমার বাবা, 

বাবা আর আমার মাঝে এই দুরত্ব।

বাবার আশীর্বাদ পেতে আজো বসে থাকি

উঠোনে,বারান্দায়,দরজায়,ঘরে বাইরে,মোবাইল ফোনে।

তবুও দুরত্ব থেকে যায়,দুরত্ব রয়ে যায়,ব্যাক্তি স্বার্থ চরিতার্থে সন্তান দূরে চলে যায়।বাবা ফেলে নীরবে চোখের জল।

বাবার হাত ধরে এক পা দু পা করে হাঁটি

মনের অলিতে গলিতে।

বাবা তোমায় ভালবাসি,ক্ষমা করো আমায়।

 

 
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ