আমার বন্ধু মিন্ডি কাফম্যান

June 19, 2017, 12:14 AM, Hits: 1320

আমার বন্ধু মিন্ডি কাফম্যান

ক্লাসের প্রথম দিনটা বেশ ভালোই কেটেছে। মেয়েটার নাম জানা গেল। মিন্ডি কাফম্যান। কাফম্যান মানেই ইহুদি রমণী। তাতে কি? খুব চুপচাপ, অসাধারণ সুন্দরী, লাল গালটা ঠান্ডায় যেন আরও লাল হয়ে গেল। ক্লাসের প্রথম দিনের পরিচয়ে বেশি কথা বলা ঠিক না। তাই চুপচাপ থাকাটাই শ্রেয় মনে হলো। কিন্তু অবাক করার মতো ঘটনা।

দেখি মিন্ডি তার কলেজের বেক পেকে কি যেন হন্তদন্ত হয়ে খুঁজছে। ‘কিছু কি হারিয়েছেন?’ জিজ্ঞেস করতেই মাথা নাড়িয়ে এর উত্তর এল। তার মানে হলো কিছু হারায়নি। তারপর ছোট পুঁটলির মতো কি যেন একটা আবিষ্কার করল বেক পেক থেকে। পুঁটলিটা খুব ধীরে ধীরে খুলে সেখানে থেকে পামকিন কেকের একটা স্লাইস বের করে এনে আমার দিকে এগিয়ে দিল। আমি ভদ্রতা করে ‘নো থ্যাংকস’ বলে কাঁধ ঝাঁকালাম। কিন্তু ‘নো’ বলাটা কেন জানি সমীচীন মনে হলো না। এত আনন্দের সঙ্গে সে কেকটা বের করে আমাকে বাড়িয়ে দিল আর আমি কি না ‘ভদ্রতা’ দেখালাম! মিন্ডিও আমাকে আর সাধল না। কিন্তু মনে হলো বেচারা দুঃখ পেয়েছে। সে হয়তো ভাবছে যে পুঁটলি থেকে আবিষ্কার হওয়া কেকটাকে হয়তো আমি অবজ্ঞা করেছি।

এবার আমি কেক খাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলাম। দেখি ওর ছোট্ট গালে হাসির টোল পড়েছে। আবার বেক পেকের পুঁটলি থেকে একটা ছোট কেকের স্লাইস বের করে আমার দিকে এগিয়ে দিল। সত্যি চমৎকার পামকিন কেক। একেবারে বাড়ি থেকে হাতে বানানো। বাজারে কেনা কেক থেকে এর স্বাদই আলাদা। এবার নির্লজ্জের মতো আরেকটা পিস দেওয়া যাবে কি না জানতে চাইলাম। বলার সঙ্গে সঙ্গে আবার বেক পেক থেকে আরেক স্লাইস আমার হাতের নাগালে চলে এল। জানা গেল, কেকটি ওর দাদি বানিয়েছেন। উনি নাকি খুব ভালো কেক বানাতে পারেন। বেশ বুঝতে পারলাম, দাদির গর্বে নাতনি প্রচণ্ড গর্বিত। এভাবেই কেকপর্ব দিয়ে মিন্ডি কাফম্যানের সঙ্গে আমার পরিচয়পর্ব শুরু হলো।

মিন্ডির সঙ্গে আমার বেশ সুন্দর একটা বন্ধুত্ব হলো। ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে অনেক বিষয় নিয়েই আমাদের আলাপ হতো। বিশেষ করে আমাদের অভিবাসী জীবনের গল্প, রান্নাবান্না, রাজনীতি, পারিবারিক রীতিনীতি, আচার-আচরণ অনেক কিছুই। মিন্ডির কাছ থেকেই জানা গেল, তারা পারিবারিকভাবে খুবই গোঁড়া টাইপের। আমি মনে মনে প্রমাদ গুনলাম। আমার মতো একজন মুসলমানের সঙ্গে ইহুদির বন্ধুত্ব! একদিন কথায় কথায় মিন্ডির কাছ থেকে ওর ধর্ম নিয়ে চিন্তাভাবনা কী জানতে চাইলাম। ওর কথা শুনে আমি অবাক! সে-ও আমার মতোই ‘রবুবিয়ত’কে সমর্থন করে। ‘রবুবিয়ত’ অর্থাৎ সৃষ্টির পালনবাদ। ‘সৃষ্টিকে ভালোবাসা মানেই এর স্রষ্টাকেই ভালোবাসা’। অর্থাৎ পৃথিবীর সব ধর্ম, মানুষ, পশু-পাখি, গাছপালা, পোকামাকড়—সব সৃষ্টির প্রতি ভালোবাসা থাকাটাই রবুবিয়তের নিগূঢ় অর্থ। মিন্ডি নাকি প্রচুর সুফিদের ওপর বইপত্র পড়ে। জালাল উদ্দিন রুমির কবিতার সে ভীষণ ভক্ত। আমি ওর কথা যত শুনছিলাম, ততই যেন শ্রদ্ধায় তার প্রতি নত হচ্ছিলাম। আমার ধারণা ছিল, সে যেহেতু ইহুদি, তাই হয়তো খুব গোপনে মুসলমান বিদ্বেষ থাকবেই। এদিকে এই ইহুদির বন্দুকের গোলাতেই গাজায় প্রতিদিন অগণিত নিরীহ মুসলমানেরা মারা যাচ্ছে। আমি এর কোনো হিসাব মেলাতে পারি না। শুধু এটুকুই জানি বা বুঝি যে সব ধর্মের মানুষের মধ্যেই ভালো-মন্দ রয়েছে। অনেক মুসলমানও জিহাদের নামে নিত্য মানবতা এবং প্রকারান্তরে ইসলামকেই ধ্বংসের চেষ্টা করছে।

যা হোক, একদিন মিন্ডি কাফম্যান ওদের বিশেষ ধর্মীয় একটি দিনে (হানুখা) তাদের বাড়িতে আমাকে নিমন্ত্রণ করল। এবার আমার প্রাণবায়ু যায় আর কি! মনে মনে ভাবছিলাম, বন্ধুত্বটা হেঁটে হেঁটে কলেজের ক্যাম্পাস না পেরোলেই কি নয়? মিন্ডির কাছ থেকে জেনে নিলাম হানুখার টুকটাক কিছু নীতিমালা। হানুখা একটি ধর্মীয় উৎসব। ক্রিসমাস বা ঈদের মতোই আনন্দের। তবে উৎসবের পাশাপাশি এর ধর্মীয় মূল্যবোধ অনেক। হানুখার মূল বাণী হলো, সত্যকে মিথ্যার কাছ থেকে আলাদা করা ও তাকে ধারণ করা। যা মিথ্যা বা অসুন্দর, তা জীবন থেকে বর্জন করা। হানুখাকে সামনে রেখে আমাদের ঈদের মতোই এদের কেনাকাটার ধুম পড়ে যায়। আট দিনের এই উৎসবে একদিন নিউইয়র্কের ব্রুকলিনের ডিকালভ অ্যাভিনিউতে মিন্ডির সঙ্গে ওদের বাড়িতে হাজির হলাম। বলার অপেক্ষা রাখে না, আমি সঙ্গে করে আমাদের বাংলাদেশের ঐতিহ্য চমচম আর রসগোল্লার প্যাকেট নিয়ে নিলাম। আর যা-ই হোক, উৎসব বলে কথা! খালি হাতে নিশ্চয়ই যাওয়া যায় না। তবে মনে মনে খুব ভয় পাচ্ছিলাম যে ওর বাবা-মা বা দাদি আমাকে কীভাবে দেখবেন? এই বুঝি মিন্ডিকে তার মা বলবেন, কোথা থেকে মুসলমান ছোকরা ধরে নিয়ে এসেছিস ইহুদি বাড়িতে হানুখার দাওয়াত খেতে? নাহ! যা ভাবছিলাম তার কিছুই হলো না। বরং আমার নেওয়া মিষ্টি বাড়ির সবাই খেলেন। সেই সঙ্গে আমার বাবা-মা, ভাইবোন সবার কথা জানতে চাইলেন। সবচেয়ে ভালো লাগল মিন্ডির দাদিকে দেখে। বুড়ো হয়েছেন তো কি হয়েছে, কি সুন্দর তুর তুর করে হাঁটেন। ওনাকে দেখে বাংলাদেশে আমার নানির কথা মনে পড়ল। আমার নানিও অসাধারণ এক মহিলা। দেখতে ঠিক তাঁর মতোই ফরসা আর খুব অতিথিপরায়ণ। রাতে সবার সঙ্গে খাওয়াদাওয়া করে বাড়ি ফিরলাম। ফেরার সময় মিন্ডি আমাকে ছোট একটা প্যাকেট দিয়ে দিল। বাড়িতে এসে প্যাকেট খুলে দেখি আমার প্রিয় আস্ত একটা পামকিন কেক।

সেমিস্টারটা হু হু করে চলে গেল। মিড টার্ম শেষ হলো। ফাইনালও একদিন শেষ হয়ে গেল। বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হওয়ায় আমি তখন খুন্নিবৃত্তি নিবারণের দিকে মনোযোগ দিলাম। তবে মিন্ডির সঙ্গে সব সময়ই যোগাযোগ ছিল। আর আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে পরের সেমিস্টারের ক্লাসও একসঙ্গেই নেব। এর মধ্যেই হঠাৎ মিন্ডির জরুরি ফোনকল। আমার সঙ্গে দেখা করতে চায়। আমি তখন একটা প্লাস্টিক ফ্যাক্টরিতে কাজ জুটিয়েছি এবং মহাব্যস্ত। তারপরও মিন্ডি যেহেতু বলছে ‘জরুরি’ তাহলে ওর কিছু একটা হয়েছে। কথা হলো মিন্ডি ম্যানহাটনের ইউনিয়ন স্কয়ারে আসবে আর আমিও কুইন্স থেকে আর ট্রেনে সেখানে চলে যাব।

ইউনিয়ন স্কয়ারে গিয়ে মিন্ডিকে খুঁজে পেতে খুব একটা অসুবিধা হলো না। সত্যি বলতে অনেক দিন পর বন্ধুকে দেখে খুব ভালো লাগল। কিন্তু মিন্ডির মুখে কোথায় যেন বিষণ্নতার ছায়া। তারপর সব নীরবতা ভেঙে ও সরাসরি আমার দিকে তাকাল। দেখি ওর চোখে জল। আমি ওর চোখের জলের ভাষা বোঝার চেষ্টা করলাম। তারপর সে ধীরে ধীরে বলল, আর দুই সপ্তাহের মধ্যেই সে ইসরায়েল চলে যাচ্ছে। ওর বাবা-মা-দাদি সবাই ইসরায়েলে সেটেল হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তার মানে, মিন্ডির সঙ্গে আমার আজই শেষ দেখা। আমার কাছ থেকে সে বিদায় নিতে এসেছে। সত্যি বলতে আমি খুব আবেগপ্রবণ একজন মানুষ। মিন্ডির চোখের দিকে তাকাতে পারছিলাম। শুধু তার শুভকামনা করে বললাম, ‘ভালো থেকো বন্ধু। হয়তো আবার কখনো দেখা হবে কোনো সময়।’

এই কথাগুলো বলেই আর ট্রেন ধরে আমি আমার বাস্তবতার দুনিয়া কুইন্সের দিকে পা বাড়ালাম। বলাই বাহুল্য, মিন্ডির সঙ্গে আর কখনো আমার দেখা হয়নি। কেমন আছ মিন্ডি কাফম্যান? তুমি কী জানো, দোকানে পামকিন কেক দেখলেই তোমার দাদির দেওয়া পামকিন কেকের কথা আমার সব সময় মনে পড়ে। 

 
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ