যে ভাবনা আমায় সব সময় কষ্ট দেয়

June 24, 2017, 9:20 PM, Hits: 1809

যে ভাবনা আমায় সব সময় কষ্ট দেয়

লাবলু কাজী, নিউইয়র্ক থেকে : ষড় ঋতুর দেশ বাংলাদেশ। ঋতুর বিবর্তনে প্রকৃতির বদলে যাওয়ার সঙ্গে আমাদের জীবনের নানাবিধ পরিবর্তন লক্ষণীয়। যেমন রোজা প্রতি বছর এগারো দিন এগিয়ে আসে। এবারও তার ব্যত্যয় নেই। শ্রাবণের ঝর ঝরো বাদল দিনে প্রবল বরিষনে খাল-বিল-নদী-নালা জলে উপচে পড়ে। সে বছর রোজা ছিল আগস্ট মাসে। এই কাহিনি সেই রোজার বাইশ দিনের ভর দুপুরের এক সত্য কাহিনি।

রোজা শেষে ঈদ আমাদের দ্বারপ্রান্তে। কিন্তু স্মৃতির পাথার থেকে নিঃসৃত এই হৃদয়বিদারক কাহিনির জন্য আমার হৃদয় ব্যথায় ভারাক্রান্ত। চোখ অশ্রু ভেজা। আমার ব্যথার লাঘবে উপশমের ভান্ডার তো আপনারা। আপনাদের জন্য দুঃখ ভরা এ স্মৃতির নৈবেদ্য!

রাতের শেষ প্রহরে কনকনে শীত। বয়লারের গ্যাস হিট আমি লেপের নিচে। সকাল পাঁচটায় ঘুম ভেঙে গেল। ঘুম ভেঙে গেলে ঘুম আর ফিরে আসে না। এটা ঘুমের জেদ এবং আমাকে সম্ভবত আর সুখ দিতে চাচ্ছে না। দীর্ঘদিন সাহায্য করার পর আমার নিজের মতো হয়তো ওর জীবনেও হতাশা নেমে এসেছে। এ জন্য এই ব্যত্যয় ধরা পড়ছে। নামাজের তখনো অনেক সময় বাকি। আমি আর উঠলাম না। বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবছি। ভাবতে ভাবতে গ্রামের বাড়ি, পুরোনো দিনের কথা মনে পড়ে গেল।

চাহিদা এমন একটা জিনিস, যা মনের ভেতর শত কষ্ট হলেও পূরণ করতে হয়। নিজের মনের ভেতর ও বাহির—দুটো জগৎ সামাল দিতে গিয়ে আমি দেখেছি। কত সুন্দর মেয়ে তাদের মনের বিরুদ্ধে বাপ-মার চাহিদার খোরাক মেটাতে মনের কষ্ট বুকে চাপা দিয়ে হাসিমুখে হবু বরকে বরণ করে শ্বশুর বাড়ি গিয়ে ঘরসংসার করে জীবন চালিয়ে নিচ্ছে।

গ্রাম বাংলার সেই হাসি খুশি ছেলে আমিও গ্রামের মায়া ছেড়ে একবারে রসহীন, শুষ্ক মরুভূমির দেশ দুবাইতে চলে এলাম। পয়সা—তার তো দরকার আছেই। আমিও সেই অবলা নারীর মতো প্রয়োজন মেটাতে চলে এলাম। খেত-খামারবিহীন আমাদের এলাকার লোকদের অন্য আর কি অবলম্বন থাকতে পারে আর্থিকভাবে সচ্ছল হওয়ার? এ জন্য গ্রামগুলোর চিত্র পরিবর্তন নজর কাড়ে। পয়সা আছে বলেই তো প্রত্যেকটা বাড়িতে কুঁড়েঘরের পরিবর্তে পাকা দালান উঠছে।

এটাকে খারাপ বলব না। ভালোই তো। কিন্তু ইটের পাঁজরে লোহার খাঁচায় দারুণ মর্মব্যথার সুর শুনি। এই ধারার গড্ড প্রবাহিকার সমতা আনায় আমরা অনেকে এখন পরবাসে। শৌখিন জীবনের অভ্যাস, বড় বড় মাছ, নামীদামি ব্রান্ডের কাপড় কেনা, ছুটিতে এসে সবার মনোরঞ্জনে সমস্ত পয়সা শেষ করে, ঋণ করে দেশ থেকে ফিরে এসে আগের শূন্য অবস্থায় থাকা। এভাবেই চলে আসছে আমাদের জীবন। এটা আমরা প্রবাসীরা নিজেরাই সৃষ্টি করেছি। কষ্ট আমাদের তো পেতেই হবে! হারাচ্ছি নিজের যৌবন, স্ত্রীর অধিকার এবং শিশু বাচ্চাকে বঞ্চিত করছি তার প্রাপ্য ভালোবাসা ও আদর থেকে।

ছোট চাচা, কতই বা বয়স হবে তার। কাতারের দোহাপ্রবাসী। ভালোই রোজগার করেন তিনি। ওই আগস্টে দেশে এসেছেন ছুটিতে। আসার পর প্রথম দিন মানে ফুরফুরে মন। নতুন করে পুরোনো রোমান্স। বিবাহিতের এত দিন পর আসা। কখন বিছানায় যাব যাব ভাব। হানিমুনের অপেক্ষা আর সইছে না...। এই আগস্ট মাসেই আমার বাবা, যিনি সম্ভবত ত্রিশ বারের বেশি কথা বলেননি তার ছেলের সঙ্গে, যার নির্ভীক সাহস গ্রামের লোকদের অনুপ্রাণিত করত সকল কাজে, স্বল্পভাষী, সত্যবাদী এ মানুষটি সবার অলক্ষ্যে অভিমানের ভারে চিরদিনের জন্য চলে গেলেন না ফেরার দেশে। আমার বুকের ভেতরটা এখনো চিনচিনিয়ে হার্ট অ্যাটাকের ব্যথার কষ্ট দেয় এ জন্য। আমার শিশুর মতো বাবাকে ছেলে হিসেবে কিছুই করতে পারিনি। আমাদের ভালো সময়ের কিছুই উপভোগ বা দেখে যেতে পারলেন না। বিত্ত দিয়ে যদি সুখ কেনা যায় সেটা তিনি দেখে যেতে পারেননি!

লেখক

লাবণি চাচাতো ছোট বোন। ফুটফুটে চাঁদের মতো সুন্দর। দেখতে যেন এঞ্জেল। অনেকে বলেন, আমার মেজ বোন হাছনা আপার মতো। গ্রামে যেমন আপার রূপের প্রশংসা ছিল, তেমনটি বাচ্চাদের মধ্যে লাবণির প্রশংসা ছিল। ওই দুই বছরের শিশু বাচ্চা কোলে এসে বুকের সঙ্গে লেপটে থাকত। অন্যেরা জোর করে নিতে পারত না। বুনা ফুপু বলতেন, তোর কাছে ওকে বিয়ে দেব। আমি বলতাম দূর ফুপু, আপনার যে কথা! ওর চেয়ে আমি কত বড় বয়সে, তা কি হয়! তিনি বলতেন, রহিম বাদশা, রূপবানের মতো হবে। এত ভালো পাত্র আমরা হাত ছাড়া করতে পারি না।

সেই লাবণি ঘর ভরা মানুষ থাকতেও কখন, কীভাবে দিনদুপুরে হালটের পানিতে ডুবে মারা গেল, আমার বোধগম্য হয় না। আমি তখন প্রবাসে। ভাবি ওর নিথর ছোট্ট দেহটা যখন পানি থেকে ওঠানো হলো, কী করুণ সেই দৃশ্য। উঠিয়ে আনা, কবরে রেখে আসা, কাকা-বাবা হিসেবে তার অনুভূতি আমি উপলব্ধি করতে পারি। কষ্ট হয়, করার কিছু নেই। মা বলতেন, আল্লাহর মাল, তার মাল তিনি নিয়ে গেছেন, যাকে যখন পছন্দ হয়।

আমায় সব সময় একটা ব্যাপার প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয় এবং এর সঠিক গ্রহণযোগ্য উত্তর আজও পেলাম না। দুই বছরের শিশু ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে সবার আড়ালে, অথচ একজন লোকেরও খেয়াল হলো না এই মাছুম বাচ্চা কী করছে এবং কোথায়? ব্যাপারটা আমি মেনে নিতে পারিনি। তারা কি এতই আনন্দে মত্ত ছিল যে, লাবণি তাদের কাছে মূল্যহীন হয়ে পড়ে। এ চরম অবহেলা বাচ্চার প্রতি এবং মানবিক দিক থেকে অনৈতিক দেখতে গেলে, যার ক্ষমা নেই।

লাবণি বেঁচে থাকলে এখন কত বড় হতো? পূর্ণ যৌবনার ভারে সে হয়তো স্বর্গের অপ্সরা বনে যেত। হয়তো কারও স্ত্রী, কারও মা হতো। আমার ভাবতে ভালো লাগে বড় হলে সে দেখতে কেমন হতো। কল্পনার ফানুস উড়িয়েও আমি এ জটিল অঙ্কের সমাধান বের করতে পারি না। আপনারা কেউ কখনো গোলাপ ফুল ফোটার আগের অবস্থায় দেখেছেন? আমাদের বাসার সামনে লনে আছে। মাঝে মাঝে দেখি। ফোটার আগে পাপড়িগুলো ঝরে যায়। আমার খুব কষ্ট হয় এ ভেবে যে, ওর পূর্ণাঙ্গ রূপ বিকশিত করার, দেখানোর সুযোগ পেল না। এ ভাবনা ও চেতনা আমায় সব সময় কষ্ট দেয়। আমার বুকের ভেতর একটা অভাব বোধ—সামথিং ইজ মিসিং কাজ করে।

‘আমার বুকের ভেতর রইলি তুই

খুলল না সে জট

ধরতে গেলে পিছিয়ে যায়

রইল দূর চিরন্তন!’

 

 
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ