ইস্ট রিভারের ব্রুকলিন ব্রিজ

July 7, 2017, 11:32 AM, Hits: 117

ইস্ট রিভারের ব্রুকলিন ব্রিজ

রোমেনা লেইস, নিউইয়র্ক (যুক্তরাষ্ট্র) থেকে : যেকোনো শহরে ব্রিজগুলো আমাকে অনেক আকর্ষণ করে। ছেলেবেলার কথা মনে পড়ে যায়। গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরমের বিকেলবেলায় আমাদের বাড়িতে দুটো রিকশা আসত। তারপর আমরা শহরের মল্লিকপুর পার হয়ে সিলেটের দিকে চলে যাওয়া রাস্তার ব্রিজের কাছে গিয়ে সন্ধ্যার সূর্য ডুবে যাওয়া দেখে ফিরে আসতাম। আবার আমার ফুপাতো ভাইবোনরা ছুটিতে বাড়ি এলেও আমরা দল বেঁধে সেই ব্রিজের কাছে গিয়ে বসে আড্ডা দিতাম। গান করতাম।

সিলেট গেলে আব্বা কিন ব্রিজ দেখাতে নিয়ে যেতেন। ইতিহাসও বলতেন। হার্ডিঞ্জ ব্রিজ দেখেছি প্রমত্তা পদ্মার ওপরে। ১৯৭২ সালে আব্বা আমাদের ডাউকী ব্রিজ দেখাতে নিয়ে গেলেন। বর্ডারে জটিলতার কারণে ব্রিজ পার হতে পারিনি যদিও, কিন্তু তামাবিলের যে অপূর্ব সৌন্দর্য দেখেছি তা আজও মনে গেঁথে আছে। সেখানে গাড়ি থেকে নেমে ডাউকী ব্রিজের সৌন্দর্য দেখেছি।

হয়তো এ জন্য শৈশব থেকেই যেখানে যাই সেখানকার ব্রিজগুলো আমি মন দিয়ে দেখি। নিউইয়র্ক শহরে ব্রুকলিন ব্রিজ, ভেরাজ্জানো ব্রিজ, ম্যানহাটন ব্রিজ, হোয়াইট স্টোন ব্রিজ, কসিয়াস্কু ব্রিজ উল্লেখযোগ্য। আজ শুধু ব্রুকলিন ব্রিজ নিয়ে লিখছি।

ব্রুকলিন ব্রিজ নিউইয়র্ক শহরের ইস্ট রিভারের ওপর অবস্থিত। ব্রিজটি ম্যানহাটন ও ব্রুকলিনকে যুক্ত করেছে। জার্মান ইমিগ্রান্ট জন অগাস্টাস রবলিং ব্রিজটির ডিজাইনার। তিনি মূল নকশা করে তাঁর বত্রিশ বছর বয়সী ছেলে প্রকৌশলী ওয়াশিংটনসহ কাজ শুরু করেন। ব্রিজটি তৈরির ঘটনাটি খুবই প্রেরণাদায়ক। হার না মানার গল্প। রয়েছে পুরুষের পাশাপাশি নারীরও অবদান।

ব্রুকলিন ব্রিজ। সংগৃহীত

১৮৮৩ সালে প্রকৌশলী জন রবলিং ম্যানহাটন ও ব্রুকলিনকে একত্রিত করতে একটি সুন্দর ব্রিজ নির্মাণ করার ধারণা প্রদান করেন। তিনি যখন ব্রিজটির ধারণা দেন তখনকার সময়ে সেখানে তেমন ব্রিজের কল্পনাও কেউ করেনি। বিশেষজ্ঞরা তার ধারণাকে অসম্ভব বলে মনে করেন। তাই গ্রহণ করেননি। যখন সকলেই তার পর্যবেক্ষণ বা ধারণাকে বাতিল করে দিলেন তখনো তিনি নিজের পরিকল্পনাকে কাজে লাগাতে সচেষ্ট ছিলেন।

রবলিং তার প্রতিষ্ঠানকে বলেছিলেন, তার দৃষ্টিতে ব্রিজ নির্মাণের ধারণা ঠিকই আছে। রবলিংয়ের ধারণার সঙ্গে শুধুমাত্র তাঁর ছেলে ওয়াশিংটন একমত ছিলেন। ওয়াশিংটনও একজন প্রকৌশলি ছিলেন। বাবা-ছেলে দুজনে বিস্তর পরিকল্পনা তৈরি করেন এবং এ জন্য টিম প্রস্তুত করেন। তারা এই উদ্দেশ্য সফল করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ৬০০ জন শ্রমিক মিলে ১৫ মিলিয়ন ডলার (বর্তমান মূল্যে ৩২০ মিলিয়নের বেশি) ব্যয় করে ১৪ বছর ধরে এটি নির্মাণ করেছিলেন।

সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করে তাঁরা ব্রিজ নির্মাণকাজ শুরু করলেন। কিন্তু কার্যস্থলে এক দুর্ঘটনার পর টিটেনাসে রবলিংয়ের মৃত্যু হয়। বাবার মৃত্যুর পরও কিন্তু রবলিং ওয়াশিংটন কাজ ছেড়ে না দিয়ে তার বাবার স্বপ্ন পূরণে সংকল্পবদ্ধ ছিলেন।

পর্যটক। সংগৃহীত

ভাগ্যের নির্মম পরিহাস! ইস্ট নদীর গভীরে ডুবে কাজ করায় অনেক শ্রমিক ক্যাসন রোগে (Caisson disease/The bends) আক্রান্ত হতে থাকেন। অনেকে মারাও যান। ওয়াশিংটন নিজেও আক্রান্ত হন। তাঁর মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তিনি চলাফেরায় অক্ষম (প্যারালাইজ) হয়ে পরলেন। কথা বলাও বন্ধ হয়ে যায়। শুধু হাতের একটি আঙুল নাড়াতে পারতেন। সে সময় বিশেষজ্ঞরা তাঁকে কাজ বন্ধের পরামর্শ দিলেন। সব মিলে তিনি পাগলপ্রায় হলেন।

ওয়াশিংটন মানবসেবার চিন্তায় তাঁর নির্মাণকাজ কোনোভাবেই বন্ধ করতে চাননি। তিনি তাঁর উদ্দেশ্য সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা রেখেছিলেন। তিনি তাঁর চিন্তা-চেতনা তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে শেয়ার করতেন। কথা বলতে পারতেন না। তাই একটিমাত্র সচল আঙুল ব্যবহার করতেন। তিনি পরবর্তীতে কিছু সংকেত বের করেছিলেন। যেগুলো তাঁর স্ত্রীই বুঝতে পারতেন। শুরুতে তাঁর সবকিছুকেই মূর্খতা বই অন্য কিছু মনে হতো না!

এত কিছুর পরও ওয়াশিংটন হার মানেননি। ১৩ বছর ধরে স্ত্রী এমিলি তাঁর নির্দেশনাগুলো অন্যান্য প্রকৌশলীদের বোঝাতেন। প্রকৌশলীরা তাঁর নির্দেশনা মোতাবেক কাজ করে শেষ পর্যন্ত ব্রুকলিন ব্রিজ তৈরি করতে সক্ষম হন। পক্ষাঘাতগ্রস্ত একজন মানুষ তাঁর স্ত্রীর সহায়তায় সম্পূর্ণ কাজ পরিচালনা করেন।

লেখিকা

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে (২৪ মে ১৮৮৩) তখনকার প্রেসিডেন্ট চেষ্টার এ আর্থার ও মেয়র ফ্রাঙ্কলিন এডসন ম্যানহাটন সাইড থেকে এসে ব্রুকলিন টাওয়ারে পৌঁছালে ব্রুকলিনের মেয়র সেথ লো তাদের অভ্যর্থনা জানান। কামান থেকে তোপধ্বনি ও জাহাজ থেকে গান ফায়ার করে তাদের অভ্যর্থনা জানানো হয়।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পরপরই শয্যাশায়ী ওয়াশিংটনের বাড়িতে গিয়ে তাঁকে করমর্দন করে অভিনন্দন জানান মেয়র আর্থার। ওই দিন রবলিং ওয়াশিংটনের বাড়িটি উৎসবের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।

এক হাজার মানুষ আর অনেক জাহাজ ইষ্ট বেতে সমবেত হয়। ব্যান্ড শো, জাহাজ থেকে গান ফায়ার, ফায়ার ওয়ার্কস উপভোগ করে মানুষ। ১ হাজার ৮০০ গাড়ির বহর আর ১ লাখ ৫০ হাজার ৩০০ জন মানুষ প্রথম দিন ব্রুকলিন ব্রিজ ব্যবহার করেন। ইতিহাসের অন্যতম এই দিনে এমিলি রবলিং ওয়াশিংটন সবার আগে ব্রিজটি পার হয়েছিলেন।

ব্রুকলিন ব্রিজটি ১৩৪ বছর ধরে টিকে আছে। এর ওপর দিয়ে এখন প্রতিদিন কয়েক লাখ যানবাহন চলাচল করছে। আর লাখ লাখ দর্শক, পর্যটক, পথচারীতো আছেই। এই ব্রিজকে কেন্দ্র করে লাভলক নামে একটি মিথ তৈরি করেছে মূলত পর্যটকরাই। প্রেমিক–প্রেমিকা তালায় তারিখ ও নাম লিখে লক করে চাবি পানিতে ছুড়ে ফেলে দেন।

ব্রুকলিন (Brooklyn) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম শহর। নিউইয়র্ক সিটির পাঁচটি বরো বা কাউন্টির একটি। এটি নিউইয়র্কের দ্বিতীয় বৃহত্তম এবং সবচেয়ে জনবহুল বরো। লং দ্বীপের মানে লং আইল্যান্ডের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত। ম্যানহাটন থেকে আপার বে এবং ইস্ট রিভার পার হয়ে এখানে আসতে হয়। মোট আয়তন ১৮২ দশমিক ৯ বর্গ কিলোমিটার (৭০ দশমিক ৬ বর্গ মাইল) এবং বর্তমানে মোট জনসংখ্যা ২৬ লাখ ৬৫ হাজার ৩২৬ জন। এর জনসংখ্যা যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো একক শহর থেকে বেশি। অবশ্য সমগ্র নিউইয়র্ক শহর বা লস অ্যাঞ্জেলেস ও শিকাগো শহর ধরলে এটি চতুর্থ হয়ে যায়। ১৮৯৮ সালের আগে এটি যখন পৃথক মিউনিসিপ্যালটি ছিল তখন এটি যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় বৃহৎ শহর ছিল।

এটি একটি পর্যটন নগরী। এখানে বছরে বিপুলসংখ্যক পর্যটকের সমাগম ঘটে। প্রথম দশটি আকর্ষণীয় স্থান ও স্থাপনার মধ্যে ব্রুকলিন ব্রিজ একটি। 

 
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ