ভালোবাসার আহ্বান

July 8, 2017, 3:57 AM, Hits: 87

ভালোবাসার আহ্বান

নাইম আবদুল্লাহ,অস্ট্রেলিয়ার সিডনিপ্রবাসী : খুব ভোরে দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে বাহারের ঘুম ভাঙল। তাড়াহুড়া করে দরজা খুলতে গিয়ে সে দরজা খুঁজে পাচ্ছিল না। আজ ঈদের সকাল। এত সকালে কে কড়া নাড়বে? দরজা খুলতেই একটা অল্প বয়সী মেয়েকে দরজার সামনে দাঁড়ানো দেখতে পেল। তিন মাস আগে এই মেসে উঠেছে বাহার। এই বাসার অন্যান্য ফ্ল্যাটের কারও সঙ্গেই তার পরিচয় হয়নি।

মেয়েটা বলল, এটা আমাদের বাসা। আজ মধ্যরাত থেকে হঠাৎ করে বাবার বুকের ব্যথাটা আবার বেড়েছে। এখনই তাকে ক্লিনিকে নিতে না পারলে খারাপ কিছু ঘটে যেতে পারে। আপনি কি কষ্ট করে একটা সিএনজি ডেকে আনতে পারবেন?

বাহার বিস্ময়ের ধাক্কা সামলে উঠে বলল, আমি এখুনি সিএনজি নিয়ে আসছি। দৌড়ে গেটের বাইরে যেতে না যেতেই সৌভাগ্যবশত একটা খালি সিএনজি পেয়ে গেল। তারপর দোতলায় উঠে গিয়ে বাড়িওয়ালাকে ধরে সিএনজিতে উঠতে সাহায্য করল।

একে ভোরবেলা, তার ওপর ঈদের দিন। ঢাকার রাস্তাঘাট একদম ফাঁকা। সিএনজি প্রায় হাওয়ার বেগে ক্লিনিকে পৌঁছাল। ক্লিনিকও ফাঁকা ফাঁকা। ভাগ্য ভালো ইমারজেন্সিতে ডাক্তার আছেন। সঙ্গে সঙ্গে রোগীকে ইনটেনসিভ কেয়ারে নিয়ে যাওয়া হলো। বাহার ও বাড়িওয়ালার মেয়ে দুজনেই পাশের একটা বেঞ্চে বসে পড়ল।

বাহারের গ্রামের বাড়িতে নিকটজন কেউ থাকে না। বাবা-মা গত হয়েছেন হাইস্কুলে থাকতে। বড় দুই ভাইবোন বিয়ের পরে যার যার সংসার সামলাতে ব্যস্ত। তারা দুজনেই ঢাকার বাইরে থাকেন। তাই ঈদে বাহারের যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। মেসের অন্য দুজন গত পরশু বাড়ি চলে গেছে। গত ছয় মাস ধরে তার চাকরিটাও নেই। টিউশনির টাকায় কোনোরকম চলে যাচ্ছে।

একজন নার্স আইসিইউ থেকে বেরিয়ে এসে বলল, রোগী এখনো শঙ্কামুক্ত নয়। কিছু ওষুধ বাইরে থেকে আনাতে হবে। এই বলে একটা প্রেসক্রিপশন বাহারের হাতে ধরিয়ে দিল।

মেয়েটা তার হাতব্যাগ থেকে দুটি পাঁচ শ টাকার নোট বাহারের হাতে দিয়ে বলল, আপনি একটা রিকশা নিয়ে যান। আর কী মনে করে একটা ছোট্ট কাগজে তার মোবাইল নম্বরটাও লিখে দিল।

বাহার রিকশা নিয়ে আশপাশের ফার্মেসিগুলোতে ওষুধ না পেয়ে গ্রিন রোডে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। আর তা মেয়েটাকে জানানোর জন্য কাগজের টুকরো থেকে নম্বর দেখে তাকে ফোন করল।

—আমি বাহার বলছি। আশপাশের দোকানগুলোতে ওষুধ না পেয়ে আমি গ্রিন রোডের দিকে যাচ্ছি।

ওপাশ থেকে উত্তর এল, আমরা আপনাকে কঠিন বিপদে ফেলে দিয়েছি। সে জন্য দুঃখিত। আর তাড়াহুড়ার কারণে আমার নামটাও আপনাকে বলা হয়নি। আমি স্বর্ণা। একটা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে পড়ি।

বাহার ওষুধ নিয়ে দুপুরের কিছু পরে ফিরে এল। রোগীকে তা খাওয়ানোর পরে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসে। কিন্তু বিপদ তখন কাটেনি বলে ডাক্তারেরা জানালেন।

স্বর্ণাদের প্রায় সব আত্মীয়স্বজনেরা ঢাকার বাইরে ঈদ করতে গেছে। তারা খবর পেয়েই স্বর্ণাকে ফোন করে খোঁজ খবর করতে থাকে। এদিকে স্বর্ণার মাও ব্যাকুল হয়ে বাসায় অপেক্ষা করছেন আর বারবার ক্লিনিকে আসার জন্য স্বর্ণাকে ফোন করছেন।

বাহার কিংবা স্বর্ণার সকাল থেকে কোনো দানাপানি পেটে পড়েনি। তার ওপর আজ ঈদের দিন। এদিকে বাহারের খিদের চোটে পেটে মোচড় দেওয়া শুরু হয়েছে। কিন্তু বেচারা লজ্জায় কিছু বলতে পারছে না। ঠিক তখনই স্বর্ণা বলে উঠল, আপনার তো সেই সকাল থেকে কিছুই খাওয়া হয়নি।

বাহার বিনয়ের ভঙ্গিতে বলল, কিছু হবে না। আর আপনিও তো না খেয়েই আছেন।

—আপনি কি আর একটু কষ্ট করে বাইরে গিয়ে দেখবেন, কোনো খাবার পাওয়া যায় কিনা? স্বর্ণা বাহারকে বলল।

বাহার ক্লিনিকের আশপাশে কোনো দোকান খোলা পেল না। বেশ কিছু দূর যাওয়ার পর একটা ছোট রেস্টুরেন্ট থেকে রুটি আর ভাজি কিনে সে ক্লিনিকে ফিরে স্বর্ণার হাতে প্যাকেটটা দিল।

স্বর্ণা বলল, বাথরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে আসেন। আমি খাবার বেড়ে দিচ্ছি।

বাহার হাত-মুখ ধুয়ে এসে দেখল স্বর্ণা খবরের কাগজ বিছিয়ে তার ওপর রুটি ভাজি সাজিয়ে অপেক্ষা করছে। তাকে দেখে কী মনে করে যেন ওড়নাটা টেনে মাথায় দিয়ে বলল, নেন শুরু করেন। তারপর একটু লজ্জিত ভঙ্গিতে রুটি ভাজিসহ কাগজটা তার দিকে এগিয়ে দিল।

বাহার বলল, কই আপনার জন্য তো রাখেননি। কথাটা বলে নিজেই খানিকটা সংকুচিত হয়ে পড়ল।

—না, না এই যে আমার জন্যও রুটি ভাজি রেখেছি। বলে তার জন্য এক পাশে রাখা রুটি আর ভাজি দেখাল।

খেতে খেতে স্বর্ণা বলল, আজ ঈদের দিন। আমাদের সঙ্গে এসে আপনার এবারের ঈদটাই মাটি হলো।

—আসলে আমার ঢাকায় বা গ্রামে নিকট আত্মীয় বলে কেউ নেই। তাই আজ ঈদের দিনে বিশেষ কোথাও যাওয়ারও ছিল না। বরং ভালোই হলো চাচাজির সঙ্গে থাকতে পারলাম। কথাটা বলেই বাহারের বুক থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এসে চোখ দুটোকে একটু ভিজিয়ে দিয়ে গেল।

স্বর্ণা ব্যাপারটা আঁচ করতে পেরে বলল, তারপরও তো বাবার ওষুধের জন্য আপনাকে অনেক ছোটাছুটি করতে হলো। না খেয়ে বিকেল পর্যন্ত থাকতে হলো।

বাহার এর উত্তরে কী বলবে বুঝতে পারল না। কিছুক্ষণ পরে বাহার গিয়ে বাসা থেকে স্বর্ণার মাকে ক্লিনিকে নিয়ে এল। ডাক্তারেরা জানিয়ে দিলেন রাতটা পার না হওয়া পর্যন্ত রোগী সম্পর্কে কিছু বলা যাবে না। তাই সিদ্ধান্ত হলো বাহার আর স্বর্ণা বাসায় ফিরে যাবে। স্বর্ণার মা ওর বাবার সঙ্গে রাতে ক্লিনিকে থাকবেন।

স্বর্ণাকে নিয়ে বাহার সন্ধ্যার পরে বাসায় ফিরে এল। বাহার রুমে ফিরে ক্লান্তিতে বিছানায় গা এলিয়ে দিল। বেশ কয়েক ঘণ্টা পরে হঠাৎ আবারও দরজা নক করার শব্দে বাহার উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিল।

স্বর্ণাকে দেখে সে বেশ কিছুটা অবাক হলো। কিছুক্ষণ আগে গোসল করে গোলাপি রঙের একটা শাড়ি পরেছে। ভেজা চুল থেকে শ্যাম্পুর মিষ্টি গন্ধে চারপাশটা সুবাসিত হয়ে উঠেছে। মাথা তুলে চোখে চোখ রেখে চিরচেনা আবদারের সুরে বলল, আজ ঈদের দিন। একটু আগে আমি রান্না শেষ করেছি। আপনি তৈরি হয়ে আসুন। আমি বাসায় খাবার টেবিলে আপনার জন্য অপেক্ষা করব। বলেই উত্তরের অপেক্ষা না করে মিষ্টি হেসে ঘুরে দাঁড়িয়ে শ্যাম্পুর মিহি সুবাস আরও খানিকটা ছড়িয়ে দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেল।

বাহার হতভম্বের মতো সিঁড়ির ধাপগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল। আর মনে মনে ভাবল, ভালোবাসার আহ্বান অগ্রাহ্য করার মতো ক্ষমতা তাকে দেওয়া হয়নি। 

 
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ