দ্বীপ শহর কি ওয়েস্ট

July 8, 2017, 9:01 PM, Hits: 111

দ্বীপ শহর কি ওয়েস্ট

এম আবুল কাসেম ,আমেরিকার কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় :   হেমন্তের এক রোদমাখা মনোরম দিন। আমি নিউইয়র্ক সিটি থেকে বিমানে মিয়ামি যাই। সেখানে হাওয়ার্ড জনসন হোটেলে রাত কাটাই। পরদিন কাকডাকা ভোরে বাসে পর্যটন নগর কি ওয়েস্ট রওনা দিই। বাস মিয়ামি সিটি থেকে দ্রুত হোমস্টেড শহরে এসে পৌঁছায়। এরপর সেখান থেকে সোজা চলে আসে জন পেনিক্যাম্প স্টেট পার্ক। জন পেনিক্যাম্প স্টেট পার্ক থেকে কি ওয়েস্টের দূরত্ব ১০৫ মাইল। এই লম্বা স্থলভাগ একটি চিকন শলার মতো সাগরের ভেতর চলে গেছে। এই সরু লম্বা স্থলভাগের পূর্ব পাশে হলো আটলান্টিক মহাসাগর আর পশ্চিম পাশে মেক্সিকো উপসাগর। বিশাল দুই সাগরের মাঝ দিয়ে চলে গেছে ওভারসিজ হাইওয়ে। এই হাইওয়ে দিয়ে যেতে দুই সাগরের অগাধ নীল জলরাশির যে মোহনীয় রূপ দেখেছি তা অতুলনীয়। বাসে চলার পথে আমি দু চোখ ভরে এপাশ-ওপাশ করে দুদিকে সাগরের নান্দনিক দৃশ্য দেখি। কি লারগো থেকে কি ওয়েস্ট পর্যন্ত এটি ছিল এক সমারোহপূর্ণ বাসভ্রমণ। এসব নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখে আমার চোখ জুড়ায়। এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে সকাল ১০টায় কি ওয়েস্ট পৌঁছাই। বাস থেকে কি ওয়েস্ট একঝলক দেখেই আমার মনটা জুড়িয়ে যায়। চারদিকে লম্বা লিকলিকে নারকেলগাছের সমাহার। এ যেন উপকূলীয় বাংলার আর এক নবরূপ।

দ্বীপ শহর কি ওয়েস্ট আমেরিকার সবচেয়ে দক্ষিণের শহর। এটি চার মাইল লম্বা এবং এক মাইল চওড়া। আয়তন মাত্র চার বর্গমাইল। সাগরের মাঝে অবস্থিত এই শহরের লোকসংখ্যা প্রায় ২৫ হাজার। শহরের অধিকাংশ বাসিন্দা দ্বীপরাষ্ট্র বাহামা থেকে আসা। এদের কঞ্চ বলে। কি ওয়েস্ট হলো প্রমোদ জাহাজের এক জনপ্রিয় গন্তব্যস্থল। এই সামুদ্রিক বন্দর থেকে পর্যটকবোঝাই প্রমোদ জাহাজ বিশ্বের বিভিন্ন ট্যুরিস্ট গন্তব্যে অহরহ যাতায়াত করে। কি ওয়েস্ট বন্দরে ইউএস নেভাল এয়ার স্টেশন অবস্থিত। এই বন্দরের অপূর্ব আবহাওয়ার জন্য বছরব্যাপী এখানে নাবিকদের প্রশিক্ষণ চলে।

আমি প্রথমে হেঁটে শহরের জনপ্রিয় ডুভাল স্ট্রিটে যাই। সেখানে রাস্তার দুধারে অসংখ্য পর্যটক। ডুভাল স্ট্রিট হলো শহরের কেন্দ্রীয় বাণিজ্যিক এলাকা। ফুটপাত দিয়ে ধীরে ধীরে উত্তর-পশ্চিমে হেঁটে চলি। রাস্তার শেষ মাথায় ডান পাশে হলো পিয়ার হাউস এবং বাঁ পাশে ওসান হাউস রিসোর্ট। এই রিসোর্ট দুটির মাঝ দিয়ে হেঁটে সান সেট পিয়ারে আসি। এখানে পিয়ারে দাঁড়িয়ে দেখা যায় সাগরের অপরূপ দৃশ্য। এখান থেকে দেখা যায় যাত্রী পারাপারের ফেরিবোট আসা-যাওয়া করতে। রিসোর্টের চারপাশে নারকেলগাছের সমারোহ এক নান্দনিক দৃশ্যের সৃষ্টি করেছে। এখানে এদিক-সেদিক ঘোরাঘুরি করে কিছু সময় কাটাই। এরপর ওয়াল স্ট্রিট দিয়ে হেঁটে দক্ষিণ দিকে মালোরি স্কয়ারে এসে বসি।

মালোরি স্কয়ার ওল্ড টাউন এলাকায় অবস্থিত একটি মনোরম প্লাজা। মেক্সিকো উপসাগরের মুখোমুখি অবস্থানের কারণে এর নান্দনিক সৌন্দর্যের কোনো তুলনা নেই। এখানকার অপরূপ সূর্যাস্তের জুড়ি মেলা ভার। তাই প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলা শত শত পর্যটক এখানে সূর্যাস্ত দেখতে আসেন। আমি সাগরের তীরঘেঁষা পাকা বেঞ্চিতে গিয়ে বসি। আমার সামনে মেক্সিকো উপসাগরের নীল জলরাশি। এর দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকি। সে এক রোমাঞ্চকর অনুভূতি! গভীর সাগরের মাঝে দু-একটি জাহাজকে আসা-যাওয়া করতেও দেখি। এখানে আমি আনন্দঘন কিছু সময় কাটাই। মালোনি স্কয়ারের পাশেই হলো ক্রুজ শিপ পোর্ট। পোর্টে বিশাল প্রমোদতরী দাঁড়ানো। আমি পোর্টের পাশ দিয়ে হেঁটে ফ্রন্ট স্ট্রিটে আসি।

নোবেলজয়ী লেখক আর্নেস্ট হেমিংওয়ের কি ওয়েস্টের দোতলা বাড়ি l ছবি: লেখক

কি ওয়েস্ট মিউজিয়াম অব আর্ট এই ফ্রন্ট স্ট্রিটে অবস্থিত। লাল ইটের এই দালানটি দেখতে অনেকটা ব্রিটিশ আমলে তৈরি ঢাকার কার্জন হলের মতো। এই দৃষ্টিনন্দন ভবনের সামনে এক জোড়া যুবক-যুবতীর শিল্পকর্ম রাখা। প্রেমিকের বাহুবন্ধনে প্রেমিকা আবদ্ধ। পর্যটকেরা এই অপূর্ব শিল্পকর্মটিকে ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে অনবরত ছবি ওঠাতে থাকে। আমিও বাদ যাইনি। মিউজিয়াম থেকে বেরিয়ে ফ্রন্ট স্ট্রিট ধরে উত্তর দিকে এগিয়ে যেতেই কঞ্চ ট্যুর ট্রেন দেখি। পর্যটকবোঝাই ট্রেনটি আমার পাশ দিয়ে চলে যায়। ট্রেনটি দেখতে অপূর্ব লাগে।

তখন লাঞ্চের সময় হয়। আমি আশপাশে কোথাও হালাল রেস্টুরেন্ট আছে কি না খুঁজি। কিন্তু পাইনি। অগত্যা লাঞ্চের জন্য চায়না গার্ডেন রেস্টুরেন্টে ঢুকি। কি ওয়েস্ট ফ্লিমিং স্ট্রিটের এক নিরিবিলি পরিবেশে এই রেস্টুরেন্ট। ছোট হলেও এর রান্না ছিল বেশ চমৎকার। খাবার সুস্বাদু। এখানে ভেজি ফ্রায়েড রাইস, শ্রিম্প উইথ ব্রোকলি, মিনারেল ওয়াটার এবং এক কাপ কফি খেয়ে লাঞ্চের পর্ব সারি। 

তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল। এবার নোবেলজয়ী লেখক আর্নেস্ট হেমিংওয়ের বাড়ি ও মিউজিয়াম দেখতে যাই। এটা শহরের হোয়াইটহেড স্ট্রিটে। ডুভাল স্ট্রিট থেকে এর দূরত্ব মাত্র মাইলখানেক। গাড়িতে ১০ মিনিটে সেখানে গিয়ে হাজির হই। প্রবেশপত্র কিনে ঢুকতে হয় বাড়িতে। বাড়ির নিচতলায় যেতেই একজন গাইড অভ্যর্থনা জানান। তিনি হেমিংওয়ে ও তাঁর বাড়ি সম্পর্কে বিশদ বর্ণনা দেন। এরপর দোতলা বাড়িটি ঘুরিয়ে দেখান। 

আর্নেস্ট হেমিংওয়ে ছিলেন আমেরিকার একজন জননন্দিত লেখক ও সাংবাদিক। ১৯৫৩ সালে তিনি ফিকশনে পুলিৎজার এবং ১৯৫৪ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান। তিনি বেশ কিছু উপন্যাস ও ছোটগল্প লিখেছেন। তাঁর অধিকাংশ লেখাকে আমেরিকান সাহিত্যের ক্ল্যাসিক হিসেবে গণ্য করা হয়। হেমিংওয়ে ১৮৯৯ সালের ২১ জুলাই ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের ওক পার্কে জন্মগ্রহণ করেন। হেমিংওয়ের জীবন ছিল নানা বৈচিত্র্যে ভরা। হাইস্কুল পাস করে তিনি প্রথমে সাংবাদিকতা শুরু করেন। পরে একজন সফল ঔপন্যাসিক হিসেবে তাঁর আত্মপ্রকাশ ঘটে। ব্যক্তিজীবনে তিনি চার বিয়ে করেন। ছিলেন তিন সন্তানের জনক। তাঁর জীবনের সমাপ্তি অত্যন্ত করুণ। পিতার মতো তিনিও ১৯৬১ সালের এক গ্রীষ্মে আত্মহত্যা করে জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটান।

হেমিংওয়ের বাস করা দোতলা বাড়িটিকেই মিউজিয়াম বানানো হয়েছে। এখানে তাঁর ব্যবহৃত মূল্যবান জিনিসপত্র সংরক্ষিত আছে। হেমিংওয়ে রচিত দুষ্প্রাপ্য বইয়ের কপিও মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে। তা ছাড়া হেমিংওয়ে সম্পর্কে নানা প্রচারপত্র ও পুস্তিকা সাজিয়ে রাখা হয়েছে। হেমিংওয়ে কি ওয়েস্টের এই বাড়িতে ১০ বছর ছিলেন। এখানে থেকে তিনি আ ফেয়ারওয়েল টু আর্মস, টু হ্যাভ অ্যান্ড হ্যাভনটসহ বেশ কয়েকটি সাড়া জাগানো উপন্যাস লেখেন। আমি দোতলার ব্যালকনি থেকে বাড়ির বাইরে তাকিয়ে দেখি। পুরো বাড়ি সবুজ গাছপালায় ভরা। অসংখ্য ছোট-বড় নানা জাতীয় গাছগাছড়া এবং রংবেরঙের ফুলের সমারোহ এই বাড়িতে। বাড়ির ভেতর দেখে বাইরে সুইমিংপুলের পাশে এসে বসি। সুইমিংপুলের চারপাশ ছোট-বড় নারকেলগাছে ভরা। আর সুইমিংপুলের এক পাশে আছে বাঁশঝাড়। মনে হলো, আমি গ্রামবাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের কোনো এক জনপদে বসে আছি। হেমিংওয়ের বাড়িতে সাদা-কালো ও ডোরাকাটা অনেকগুলো বিড়ালকে এদিক-সেদিক দৌড়াদৌড়ি করতে দেখি। আমি এখানে গাছের ছায়ায় চোখ বন্ধ করে বসি। পাখির সুরেলা আওয়াজ ভেসে আসে। কী পাখি বলতে পারব না। তবে সুর বড় মধুর লাগে। শান্ত-নীরব পরিবেশে কিছু সময় কাটিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে আসি। 

আমেরিকার সর্ব দক্ষিণ পয়েন্ট চিহ্নিত বয়া। তার পাশে দাঁড়ানো লেখক

তখন পড়ন্ত বিকেল। নির্মেঘ নীল আকাশে মিষ্টি-মধুর রোদ। এমনি সুন্দর আবহাওয়ায় এবার আমি আমেরিকার সর্বদক্ষিণ পয়েন্ট দেখতে যাই। আমেরিকার সর্বদক্ষিণ পয়েন্ট কি ওয়েস্ট শহরের হোয়াইটহেড ও সাউথ স্ট্রিটের কোনায় অবস্থিত। গাড়িতে ২০ মিনিটে সেখানে গিয়ে পৌঁছাই। গাড়ি থেকে নেমে দুই রাস্তার মোড়ে অবস্থিত বয়ার সামনে যাই। সাদা-কালো-লাল এবং হলুদ রঙের আঁকা বয়ার ওপর লেখাটি মনোযোগসহকারে পড়ি। এতে লেখা দি কঞ্চ রিপাবলিক, নাইনটি মাইলস টু কিউবা, সাউদার্নমোস্ট পয়েন্ট। আমি বয়ার পাশে দাঁড়িয়ে সোজা দক্ষিণে সাগরের দিকে তাকাই। সাগরের তীব্র ঢেউ সজোরে এসে পাড়ে আছড়ে পড়তে থাকে। সাগরের প্রবল বাতাস আছড়ে পড়ে আমার গায়ে। আমি দক্ষিণে তাকিয়ে ফিদেল কাস্ত্রোর কিউবার কথা স্মরণ করি। অতি নিকটবর্তী দুটি দেশ। অথচ দু দেশের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক নেই। কি ওয়েস্ট থেকে বিমানে হাভানা যেতে মাত্র ১৫ মিনিট সময় লাগে। জাহাজে যেতে না হয় আরও কিছু সময় বেশি লাগবে। তবু দু দেশের মধ্যে যোগাযোগ অতি ক্ষীণ। তবে এই বিশাল সাগর পাড়ি দিয়ে বহু কিউবান আমেরিকায় অভিবাসী হয়েছেন। অবশ্য দুই দেশের মধ্যে এখন যোগাযোগ শুরু হয়েছে। শীতল সম্পর্কের অবসান ঘটেছে। আমি বয়ার কাছের আশপাশ এলাকা ঘুরে দেখি। এই মনোরম স্থানের নৈসর্গিক দৃশ্য অতি মনোহর লাগে।

সাউদার্নমোস্ট পয়েন্ট হলো পর্যটকদের অতি প্রিয় স্থান। প্রতিদিন অসংখ্য পর্যটক দেশ-বিদেশ থেকে এই স্থান পরিদর্শন করতে আসেন। বিকেল গড়িয়ে তখন সন্ধ্যা হয় হয়। গোধূলির লাল আভায় সারা আকাশ ছেয়ে যায়। সূর্য তখন ডুবুডুবু। সাগরের নীল জলরাশির ওপর লাল টুকটুকে সূর্যের রক্তিম আভা ছড়িয়ে পড়ে। আমি বয়ার পাশে দাঁড়িয়ে মেক্সিকো উপসাগরের মনোরম সূর্যাস্ত উপভোগ করি। প্রকৃতিকন্যা কি ওয়েস্টের নৈসর্গিক সৌন্দর্য দেখে দিনটি বেশ ভালোই কাটে। এবার আমার ফেরার পালা। সন্ধ্যার মনমাতানো আবহাওয়ার মধ্যে আবার মিয়ামি সিটিতে ফিরে যাই।

 
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ