বেঙ্গল টাইগারের দেশের মেয়ে আমি

July 9, 2017, 9:34 AM, Hits: 231

বেঙ্গল টাইগারের দেশের মেয়ে আমি

হ-বাংলা নিউজ: ইশতিয়াক রুপু: বাঙালি রসনাপ্রিয় জাতি। তারা যেখানেই থাকুক না কেন, অন্য অনেক ব্যাপারে ছাড় দিলেও খাবারের নিজস্ব স্বাদে ও মানে কোনো ছাড় দিতে নারাজ। সে জন্যই হয়তো সুস্বাদু ও তাজা খাবারের সন্ধানে থাকে তারা। প্রবাসে এই দৃশ্য চোখে পড়ে আরও বেশি। প্রায় সব অভিবাসীই দেশে থাকাকালে হয়তো বাড়িতে খুবই সাধারণ তৃপ্তিদায়ক খাবার খেতেন। হয়তো মায়ের মমতার অথবা স্ত্রীর ভালোবাসার ছোঁয়ায় রান্না করা খাবারে অভ্যস্ত ছিলেন তাঁরা।

প্রবাসে তো আর তা হয় না! প্রতিদিন তাঁদের চলতে হয়ে নিয়মের বেড়াজালের মধ্যে। দেদার ছোটাছুটি চলে সময় নামের সোনার হরিণের পেছনে। এরপরও বাজার সদাই থেকে নিস্তার নেই। ঘরোয়া একটা পদের স্বাদ নেওয়ার বাসনা একেক সময় প্রবল হয়ে ওঠে। তবে দেশে যে রকম নানা পদের মুখরোচক আইটেম রান্না হতো, তেমনটা করা যেমন ব্যয়বহুল তেমনি শ্রমসাধ্য। বিশেষ করে ছোট মাছের চচ্চড়ি ও নানা জাতের উপাদেয় ভর্তাজাতীয় ঘরোয়া খাবার প্রস্তুতে অনেক ঝামেলা। সময়ের স্বল্পতায় তা প্রায়শই সম্ভব হয়ে ওঠে না। এসব সমস্যার সমাধান করতে এগিয়ে এসেছেন কয়েকজন সফল রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী।

জ্যাকসন হাইটস নিউইয়র্কের বাঙালিদের প্রতিদিনের মিলন কেন্দ্র। এখানেই রয়েছে ভালো ভালো কিছু বাঙালি রেস্তোরাঁ। পোলাও বিরিয়ানি বা রেজালা টাইপের খাবারের পাশাপাশি তাঁরা প্রস্তুত করছেন একেবারে সাধারণ দেশীয় খাবারও। প্রবাসী বাঙালিরা এ খাবারের জন্য থাকেন উন্মুখ হয়ে। দেশের প্রায় সব অঞ্চলের লোকদেরই বসবাস এই নিউইয়র্ক শহরে। দেশের নানা অঞ্চলে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে আছে হাজারো জাত বা স্বাদের অপ্রচলিত খাবার। এই যান্ত্রিক জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া নিউইয়র্কবাসী কখনো কখনো ব্যতিক্রম খুঁজে বেড়ান। তা হতে পারে কোথাও বেড়াতে যাবার বেলায়, কখনো আবার রসনা তৃপ্তিতে। কেউ কেউ আবার খুঁজে চলেন দেশি স্টাইলে একেবারে নিজস্ব হেঁসেলের রেসিপি নিয়ে বানানো তাজা খাবার।

আর সেই অসম্ভব কাজে জ্যাকসন হাইটসের ব্যস্ততম এক রেস্তোরাঁ পরিবেশিত সব খাবার তৈরিতে যিনি নীরবে অবদান রেখে চলেছেন, তিনি হলেন মাহমুদা বেগম। বাড়ি উত্তরবঙ্গের সীমান্তবর্তী জেলায়। জীবনের সিংহভাগ সময় কেটেছে তাঁর গ্রামের সাধারণ গৃহবধূ রূপে। যিনি শুধু দুটি জায়গা ঠিকমতো চিনতেন—একটি নিজের বাপের বাড়ি, অন্যটি কিশোরী অবস্থায় বধূ হয়ে আসা পতিগৃহ। অথচ আজ তিনি বিশ্বের ব্যস্ততম ও ঐশ্বর্যশালী শহরের এক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের অন্যতম সহযোগী কর্মী। বাকিটুকু মাহমুদা বেগমের ভাষায় শোনা যাক। প্রায় ছয় বছর আগে তিনি এ দেশে এসেছেন নিজের আমেরিকান নাগরিক মেয়ের আবেদনে। স্বামীও এসেছেন সঙ্গে। মেয়ে ও মেয়ের জামাই দুজনে বললেন, আমেরিকাতে তাঁদের ভালো চিকিৎসা হবে। নিজের জন্য না হলে তাঁর স্বামীর জন্য তা জরুরিও ছিল।

আমেরিকায় আসার পর প্রথম এখানে–ওখানে একটু–আধটু ঘোরাফেরা করে সময় কেটে গেলেও পরে বেশির ভাগ সময় বাসায় থাকতে হতো তাঁর। হাতে অখণ্ড অবসর। মেয়ে কাজে চলে গেলে রান্না ছাড়াও ঘরদুয়ার গোছাতে সাহায্য করতেন। তারপরও যেন সময় কাটত না। মনে পড়ত দেশের কথা। সারা দিন কত কাজ করতে হতো। সামলাতে হতো ঘর-বাহির সবই। কয়েক মাস পর মেয়ের বাসায় মেহমান আসবে জেনে আপ্যায়নের সব দায়িত্ব নিজেই নিলেন। রান্না করলেন ১২–১৩ পদ। একদম খাঁটি দেশি স্টাইলে। দাওয়াত খেতে আসা সবার মুখে রান্নার দারুণ প্রশংসা। এরপর থেকে শুরু। পরিচিত আত্মীয়স্বজনের বিশেষ অনুরোধে চালু করলেন হোম কুক ডেলিভারি। কখনো ১০–১২ জনের, কখনো আরও বেশি লোকের খাবার রান্না করে দেন। অর্ডারের নির্দিষ্ট সময় পর নির্ধারিত মূল্য দিয়ে খাবার সংগ্রহ করতেন লোকজন। তারপর ধীরে ধীরে তাঁর রান্নার প্রশংসা পাড়া-পড়শি বন্ধুবান্ধবের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন জায়গায়। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। বর্তমানে তিনি যে রেস্তোরাঁতে কর্মরত আছেন, তার মালিক যোগাযোগ করলেন এই সাহসী ও কর্মদক্ষ ইমিগ্র্যান্ট ভিসা নিয়ে আসা মায়ের সঙ্গে। তাঁর স্বামীও নিয়মিত পূর্ণ উদ্যমে স্ত্রীকে সহায়তা করে যাচ্ছেন। মেয়ে ও মেয়ের জামাইয়ের সাহায্য মিলছে বোনাস হিসেবে।

সপ্তাহে পাঁচ–ছয় দিন নিয়মিত কাজ করেন। আগের দিন ঠিক করে আসেন নানা জাতের বৈচিত্র্যময় মজাদার অপ্রচলিত খাবার তৈরির ফর্দ। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো কমপক্ষে দশ–বারো জাতের ভর্তা। নানা জাতের সবজির সঙ্গে মানানসই মাছের সুস্বাদু তরকারি। পঞ্চাশের কাছাকাছি বয়স হলেও সকালে ঘুম থেকে উঠে ট্রেন ধরে যান কর্মস্থলে। আবার সময় শেষে ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফেরেন। কখনো কখনো গেস্টের বেশি চাপ থাকলে অতিরিক্ত সময় কাজ করেন। অবশ্য এর জন্য মেলে ওভারটাইম। আর স্বাভাবিক মজুরি কত জিজ্ঞেস করলে বললেন, জীবনে কখনো পাঁচ শত টাকা একখানে দেখি নাই। আজ আল্লাহর কী খেলা আর পাহাড় সমান রহমত। আমি এখন মাসে কামাই করি বাংলার দুই লাখ টাকারও বেশি। শতকরা নব্বই ভাগই খরচ হয় না। সে জন্য দেশের গরিব আত্মীয়স্বজন বা পরিচিত কেউ চাইলে সাহায্য করি ওদের। বিশেষ করে ঈদের সময় হাত খুলে দিই। গরিব শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় সহায়তা করি। স্বজনদের চিকিৎসায় ব্যয় করি। এখানে আমি কী করব এত টাকাপয়সা দিয়ে। হয়তো জিজ্ঞেস করবেন, টাকাপয়সারই যদি দরকার নেই তো কাজ করছেন কেন। আরে, কাজ কি শুধু লোকে টাকাপয়সার জন্য করে! ঘরে বেকার বসে কী করব। কাজে এলে মন-শরীর—দুটোই ভালো থাকে। আর পকেটে কিংবা ব্যাগে নিজের কামাই করা টাকাপয়সা থাকলে মনে থাকে বেঙ্গল টাইগারের সমান সাহস। আমি বেঙ্গল টাইগারের দেশের মেয়ে না! 

 
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ