মা, তুমি সুন্দর থেকো

July 11, 2017, 12:00 PM, Hits: 363

মা, তুমি সুন্দর থেকো

মাকে সুস্থ থাকতে হবে সবার আগে। মডেল: দীপা ও আদিয়ার, কৃতজ্ঞতা: হারমনি স্পা—ছবি: কবির হোসেন৪ ঘণ্টা হতে বাকি আর দু-তিন ঘণ্টা। তিন মাসের বাচ্চা কোলে নিয়ে একইভাবে বসে আছেন মা। মাঝে অবশ্য দু-একজন সাহস করে কোলে নিয়েছিল। কান্নাকাটি করার সঙ্গে সঙ্গে আবার মায়ের কোলে ফেরত দিয়ে গিয়েছে। মায়ের কাজ, মা-ই তো করবে। সন্তানের দেখভাল করার দায়িত্ব তাঁর। কিন্তু এই মায়ের নিজেরও তো যত্ন দরকার। সেটা নিচ্ছে কে?

প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে এ রকম অসংখ্য কাজ করতে গিয়ে নিজের প্রতি যত্ন নেওয়ার, নিজেকে ভালোবাসার কথা আর মনে থাকে না মায়ের। ধীরে ধীরে হারিয়ে যায় নিজের পছন্দ-অপছন্দ, ভালো লাগার বিষয়গুলোও। বিষণ্নতা ভর করে, যে কারণে শারীরিকভাবেও নিজেকে আর ফিট রাখতে পারেন না মা। বাচ্চা হওয়ার আগে ও পরের সময়টুকুতে অনেক পরিবর্তন আসে। অনেক মাকেই বলতে শোনা যায়, মোটা হয়ে যাওয়ার কারণে বাচ্চার সঙ্গে ছবি তোলেন না। তবে যে রূপেই থাকুন না কেন, আপনার সন্তানের কাছে আপনিই সবচেয়ে আস্থার জায়গা। আর মাতৃরূপ তো সব সময়ই সুন্দর।

ছাদে কিংবা ঘরে হাঁটুনমানসিকভাবে সুস্থ মা
বাচ্চা হওয়ার পরে অনেক মা অসুস্থ থাকেন। খাওয়া, বিশ্রাম ঠিকমতো হলে আবার সুস্থ হয় ওঠেন। বাচ্চা হওয়ার পর একজন মায়ের জীবনযাপনের রুটিন পাল্টে যায়। প্রথম কয়েক মাস দিশাহারা অবস্থার মধ্য দিয়েই পার হয়। বাচ্চা বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আগের জীবনে একটু একটু করে ফিরে আসা যায়। নিজেকে সামলানো, বাচ্চাকে সামলানো, তার ওপর পরিবারের দায়িত্ব নিতে হয় মাকেই। কর্মজীবী মায়ের চাপ থাকে আরও বেশি। ভাগ্যবান তাঁরা, যাঁরা পরিবারের সহযোগিতা পান। রাত জাগা, অনিয়মিত খাওয়া তো আছেই। এমন দিনও যায় কেউ আশপাশে না থাকলে বাথরুমে যাওয়া যায় না। সারা দিন বাচ্চাকে দুধ খাওয়াচ্ছেন, কিন্তু নিজের জন্য এক গ্লাস দুধ বানানোর সময় হয় না। এত কিছুর মধ্যে এই ভাবনা অনেকের আসে—জীবন শেষ, আর কিছুই করার নেই।
নতুন মায়ের মুখে এমন কথা শুনলে পরিবার বা আশপাশের মানুষকে এড়িয়ে যান অনেক সময়। এটা না করে সচেতন হোন। রাত জাগা, হরমোনের বাড়া-কমা, পরিবারের সহায়তা না পাওয়ার কারণে মা বিষণ্নতায় ভুগতে শুরু করেন। বিষণ্নতার এই সময়টাকে খুব সাবধানে সামলাতে হবে। মাকে ইতিবাচক চিন্তায় ফিরিয়ে আনা জরুরি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সুলতানা আলগিন বলেন, ‘মানসিক ও শারীরিকভাবে মায়ের সুস্থ থাকাটা আবশ্যক। না হলে বাচ্চার সঙ্গে মানসিক বন্ধন গড়ে ওঠে না। এতে করে পরবর্তী সময়ে বাচ্চার সঠিক মানসিক বিকাশ হয় না। পোস্ট পার্টাম ডিপ্রেশনের (প্রসব-পরবর্তী বিষণ্নতা) কারণে মা ঠিকমতো খান না, ঘুমান না, নিজের ও বাচ্চার যত্ন নেন না। এ সময় আপনজনের ওপর রাগ ও ক্ষোভেরও জন্ম হয়।’মৌসুমি ফল খান িনয়মিত
একটুতেই রেগে যাওয়া, খিটখিটে হয়ে থাকা, বিরক্ত হওয়া, কান্নাকাটি করা, বাচ্চার প্রতি মনোযোগ না দেওয়ার ঘটনাগুলো প্রতিনিয়ত ঘটতে থাকলে বুঝবেন, মা বিষণ্ন হয়ে আছেন। প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিন। হাসপাতালগুলোর শিশু বিভাগ, স্ত্রীরোগ ও ধাত্রীবিদ্যা বিভাগে কিংবা টিকা দেওয়ার জায়গাগুলোতে মায়েদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র থাকা উচিত বলে মনে করেন সুলতানা আলগিন। তবে স্বামীর ভূমিকা এ সময় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দর্শকের আসনে না থেকে বাচ্চা পালনে সব ধরনের সাহায্য করতে হবে। প্রয়োজনে চাকরি থেকে ছুটি নিন। রাত জাগুন। তাহলে মা কিছুটা সময় ঘুমাতে পারবে।
মা চাকরিজীবী হলে মাতৃত্বকালীন ছুটি শেষে যেন আবার কর্মক্ষেত্রে ফেরত যেতে পারেন, সেই বিষয়টি খেয়াল রাখতে হবে পরিবারের সবাইকে। সহায়তা পেলে মা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবেন না। স্বামীকে খেয়াল রাখতে হবে, স্ত্রীর সঙ্গে মানসিক ও শারীরিক সম্পর্ক যেন সুস্থভাবে বজায় রাখেন। কোনো রকম অবহেলা প্রকাশ করা যাবে না। মা চাপমুক্ত থাকলে বাচ্চাকে দুধ খাওয়াতে পারবেন ভালোভাবে। বাচ্চাকে কারও কাছে রেখে কিছুক্ষণের জন্য বেরিয়ে আসুন। না হয় বাসার সামনের ক্যাফেতেই এক কাপ চা খেয়ে এলেন। দুই মাসে একবার সিনেমা হলে গিয়ে ছবি দেখে এলেন। মা কিছু সময় দূরে থাকলে বাচ্চারও কিছু নির্ভরতা কমবে। বাচ্চা যখন ঘুমাবে, নিজের কিছুটা যত্ন নিন। আর কিছু না করুন চুলটা অন্তত আঁচড়ান।বাচ্চা যখন ঘুমাবে, বিশ্রাম নিয়ে নিতে পারে মাও

প্রথমেই শারীরিক সুস্থতা
নবজাতককে দুধ খাওয়ানোর কারণে মায়ের খেতে হবে বেশি বেশি। একদমই ভুল ধারণা। বাচ্চা হওয়ার পর মা পুষ্টিকর খাবার খাবেন পরিমাণমতো। গর্ভকালীন সময়ে যাদের ওজন ১৩ কেজির বেশি বেড়ে যায়, পরবর্তী সময়ে খাওয়ার পরিমাণটা ঠিক রাখলেই ওজন কমাতে পারবেন। অ্যাপোলো হসপিটালস ঢাকার প্রধান ডায়েটিশিয়ান তামান্না চৌধুরী বলেন, ‘মায়ের খাওয়া রুটিনের মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। সকালেই নাশতা করে ফেলুন। এরপর সারা দিন দুই ঘণ্টা পরপর খেতে হবে। দুধ আসার জন্য বেশি ক্যালরির খাওয়ার প্রয়োজনীয়তা নেই। বরং পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করলেই হবে। প্রতিদিন নিজের জন্য দুই লিটার, বাচ্চার জন্য আরও এক লিটার পানি পান করুন।’

ধীরে ধীরে নিজের যত্ন নেওয়া শুরু করে দিন। ঘরের ভেতরেই ১০-১৫ মিনিট করে হাঁটা শুরু করুন। বাড়িয়ে ৩০-৪৫ মিনিট পর্যন্ত হাঁটাহাটি করুন। একসঙ্গে সম্ভব না হলে দুবারে করুন। কিছু ব্যায়াম আছে, যেগুলো প্রথম তিন মাসের মধ্যে করলে উপকার পাবেন। শরীরের থলথলে ভাব কমে যাবে, পেটও ভেতরে ঢুকে যাবে অনেকাংশে।
হলি ফ্যামিলি হাসপাতালের অনারারি প্রফেসর রওশন আরা বেগম বলেন, ‘মা হওয়ার পর শরীরে যেমন বদল আসে, তেমনি মানসিকভাবেও একটা পরিবর্তন চলে আসে। এ সময় ইস্ট্রোজেন ও প্রোস্টেজন হরমোন দুটো কমে যায়। মায়ের দিনে দুই ঘণ্টা, রাতে আট ঘণ্টা ঘুমানো প্রয়োজন। এক বালতি পানি তোলা, এক বালতি কাপড় কাচা—এগুলো কিছুদিনের জন্য বন্ধ রাখুন। তিন মাস ভারী কাজ করা যাবে না। মা বিশ্রাম পেলে সুস্থ হয় উঠবেন তাড়াতাড়ি।’ব্যস্ততার মধ্যেও ত্বকের যত্ন নেওয়ার চেষ্টা করুন
ডায়েট নেতিবাচক কিছু নয়। তবে প্রোটিন ডায়েট, মিলিটারি ডায়েট, জিএম ডায়েট—এগুলো সবার জন্যই খারাপ বলে জানালেন তামান্না চৌধুরী। নতুন মায়েদের জন্য প্রতিদিনের খাবার তালিকার একটি নির্দেশনা দিলেন তিনি। দুধ, ডিম প্রতিদিন আবশ্যক। দুই বেলাতেই মাছ বা মাংস খেলে ভালো। আয়রনের ঘাটতি কমাবে। যাঁদের সিজার হয়, কাটা জায়গার অংশটুকু সারাতে সহায়তা করবে প্রোটিন। যাঁরা বেশি মুটিয়ে গেছেন কিংবা গর্ভকালীন সময় যাঁদের ঝুঁকিপূর্ণ ছিল, উচ্চরক্তচাপ বা বহুমূত্র রোগ ছিল—তাঁরা রাতে রুটি খান। বাচ্চাকে দুধ খাওয়ানোর পরপরই প্রচণ্ড খিদে পায়। ঝটপট একটা আপেল অথবা দুই চামচ টক দই খেতে পারেন। চার-পাঁচটা কাঠবাদাম বা দুটি মেরি বিস্কুট, সাগুদানা, খেজুর খেতে পারেন। ওজন কমাতে চাইলে প্রথম তিন মাসে প্রতি দুই সপ্তাহে এক কেজি করে কমান। পরবর্তী তিন মাসে প্রতি সপ্তাহে এক কেজি করে কমাতে পারবেন। এ ছাড়া অল্প পরিমাণে সিরিয়াল, ওটস, সাগুদানা খেতে পারবেন। চিনি এড়িয়ে যান। মৌসুমি সবজি ও ফল খান।
গর্ভবতী হওয়ার সময় থেকেই আয়রন আর ক্যালসিয়াম খাওয়া হয়। কিন্তু বাচ্চা হওয়ার আগে ও পরে ভিটামিন ডির অভাব দেখা যায়। ক্যালসিয়াম ট্যাবলেটের কাজ তখনই হবে, যখন সঙ্গে ভিটামিন ডি খাওয়া হবে। চুল পড়া, হাড়ে ব্যথা হওয়া, পিঠে ব্যথা হওয়া, কোমরে ব্যথা হওয়ার প্রধান একটি কারণ হলো এই ভিটামিনের অভাব। পারসোনা হেলথের প্রধান প্রশিক্ষক ফারজানা খানম জানালেন, কোনো শারীরিক অসুবিধা না থাকলে সন্তান হওয়ার তিন মাস পরই জিমে যোগ দেওয়া যাবে। নরমাল ডেলিভারি হলে যোগব্যায়ামও করতে পারবেন। জিমে যোগ দিতে না পারলে বাড়িতেই খালি হাতে ব্যায়াম শুরু করুন। তবে শরীরচর্চা বা ব্যায়াম যা-ই করুন, বিশেষজ্ঞের পরামর্শমতোই তা করতে হবে।

মায়ের পোশাক
মা হলেই যে সারা দিন ম্যাকসি পরে বসে থাকতে হবে, এমনটি নয়। এ সময়টায় একজন নারীর জীবনে সবচেয়ে আরামদায়ক পোশাক দরকার বলে মনে করেন ডিজাইনার তাহ্সিনা শাহীন। সুতি বা লিনেনের পোশাক বেছে নেওয়ার পরামর্শ দিলেন তিনি। বারবার বাচ্চাকে দুধ খাওয়ানোর প্রয়োজন হয়। সামনের দিকে দুই পাশে চেইন লাগিয়ে নিলে বাচ্চাকে দুধ খাওয়ানোর সময় আরাম পাবেন। পোশাকের সামনে পেটের কাছটায় একটু কুঁচি দেওয়া পোশাকগুলোতে স্বস্তি পাবেন। বাড়ির ভেতর ম্যাকসি গাউন কাটের লম্বা পোশাক পরতে পারেন। মেহমান এলে ওপরে লম্বা কটি চাপিয়ে নিলেই হবে।

আপনার নিজের একটা স্টাইল ছিল। রুচির সঙ্গে মিলিয়ে নিজের ভালো লাগার জন্যই সাজতেন, সুন্দর পোশাক পরতেন। মা হওয়ার কারণে সব বাদ দিতে হবে, এমনটি নয়। বরং একটু দম নিয়ে আবার নিজেকে সাজিয়ে তুলুন। নিজের ভালো লাগার কাজগুলো করুন। কারণ, আপনি যদি ভালো না থাকেন, যত্ন করতে পারবেন না সন্তানেরও। ঘুরেফিরে আপনি হাসিখুশি থাকলে সন্তানও থাকবে আনন্দে। 

 
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ