প্রবাসে বেড়ে ওঠা প্রজন্মের মনোজগতে শারদীয় দুর্গোৎসব

September 17, 2017, 11:24 AM, Hits: 951

প্রবাসে বেড়ে ওঠা প্রজন্মের মনোজগতে শারদীয় দুর্গোৎসব

সুব্রত চৌধুরি,হ-বাংলা নিউজ: আটলান্টিক সিটি থেকে : বাংলার আকাশে এখন ছেঁড়া ছেঁড়া পেঁজা পেঁজা সাদা তুলোট মেঘের ছোটাছুটি, কাশবনে কাশ ফুলের দোল, শিউলি ফুলের সুগন্ধে মাতোয়ারা ধরিএী।যদিও সুদূর মার্কিন মুলুকে এসবের  কোন ছোঁয়াই  নেই, তথাপি অন্তরে লালন-পালন করা দেশীয় কৃষ্টি ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য মনন পোড়া মনকে জানান দেয়-ঋতুটা শরৎ,সময়টা শারদোৎসবের।আর এই বার্তা পেয়েই প্রবাসী বাঙালি হিন্দুরা মেতে উঠেছে  শারদোৎসবের হরেক আয়োজনে। সবাই এখন সেই মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষায়। সারা বিশ্বের সনাতন হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের  মতো  নিউজারসি অঙ্গরাজ্যের আটলান্টিক সিটিতে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশী সনাতনী হিন্দু ধর্মাবলম্বীরাও দুর্গোৎসবের কাউন্টডাউনে ব্যস্ত। 

সুদূর এই প্রবাসে  বহুজাতিক  ধর্মীয় কৃষ্টি ও সংস্কৃতিতে  বেড়ে ওঠা প্রজন্মের মনোজগতে এই দুর্গোৎসবের কতটুকু আবেদন রয়েছে সেই সম্পর্কে জানার জন্য মুখোমুখি হয়েছিলাম এই প্রজন্মের কয়েকজনের সাথে।তাদের জবানীতে শোনা যাক দুর্গোৎসব সম্পর্কে তাদের মনোভাব।

তিলাঞ্জলি কর্মকার - বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া তিলাঞ্জলি কর্মকার এর মার্কিন মুলুকে আগমন পাঁচ  বছর বয়সে। আটলান্টিক সিটি হাই স্কুলের দশম গ্রেডের এই কৃতী ছাএী জানা্‌ল, পূজার দিনগুলো সে স্থানীয় গীতা সংঘের দুর্গোৎসবেই কাটায়।সন্ধ্যা গড়াতেই মা-বাবার সাথে নতুন পোশাক-পরিচ্ছদে সজ্জিত হয়ে উৎসব প্রাঙ্গনে ছুটে যায়,দেবীর প্রার্থনা করে।তাদের জন্য নির্ধারিত দিনে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নৃত্য পরিবেশন করে,অন্যদিন অন্যান্যদের পরিবেশনা সে প্রাণভরে উপভোগ করে।আর প্রতিদিন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শেষে ঢোল-করতালের তালে তালে সমবয়সীদের সাথে  আরতি নৃত্যে মেতে ওঠা-তার কাছে সে এক অনাবিল আনন্দ।তবে বিজয়া দশমীর  দিন    সকালে তার মন বিষাদে ভরে যায়,  'সংগীত রজনী'র আনন্দ-উচ্ছ্বাসে সেই বিষাদ কিছুটা লাঘব হয়।দুর্গোৎসবে স্কুল খোলা থাকায় আনন্দ-উৎসবের রাশ টেনে ধরে রাখতে হয় বলে তার একটু মন খারাপ হয়।

বাংলাদেশের পূজার অনেক কিছুই সে এখানে উপভোগ করতে পারে না।বিশেষ করে পূজার অনেক আগে থেকেই মা-বাবার সাথে বিভিন্ন বিপনীতে ঘুরে ঘুরে কেনাকাটা করা, মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরে  ঠাকুর দেখা, দশমীর দিন  প্রতিমা নিরঞ্জন-এসব কিছুই তাকে বেশ পীড়া দেয়।তারপরও সে মনে করে,বিদেশ-বিভুঁইয়ে এখানে পূজার যে ক'টা দিন আনন্দ-উৎসবে কাটে-তাও কম কীসের?

পার্বতী দাশ-যুক্তরাষ্ট্রে  জন্মগ্রহন করা পার্বতী দাশ এদেশের আলো-বাতাসে বেড়ে উঠলেও   শিল্পবোদ্ধা  মা-বাবার সার্বিক দেখভালে এই দেশের বহুজাতিক কৃষ্টি ও সংস্কৃতি তার মনোজগতে তেমন আঁচড় কাটতে পারেনি। পার্বতী দাশ সভরেন এভিনিউ  স্কুলের  অষ্টম    গ্রেডের ছাএী।কৃতী এই শিক্ষার্থী জানাল,স্থানীয় গীতা সংঘ আয়োজিত দুর্গোৎসবের ক'টা দিন সে বেশ আনন্দ-উৎসবেই কাটায়।তাদের জন্য নির্ধারিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সে নৃত্য পরিবেশন করে,অন্যান্য দিন বাকিদের পরিবেশনা উপভোগ করে।পুজার অনেক আগে থেকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মহড়া শুরু হয় বলে সে  কাউণ্টডাউন করতে থাকে- 'মা আসছে......।' পূজোর সময় স্কুল খোলা থাকায়  লাগামহীনভাবে আনন্দ করতে পারে না  বলে তার মন একটু খারাপই থাকে।তারপরও দুর্গোৎসব বলে কথা।দশমীর দিন সিঁদুর খেলার ক্ষণটা সে বেশ উপভোগ করে।এছাড়া মিউজিকাল নাইটে  বান্ধবীদের সাথে সে নেচে- গেয়ে বেশ আনন্দ পায়।দেশের পূজার কোনও সুখস্মৃতি তার  না থাকলেও নাড়ির বন্ধন অটুট রাখতে প্রবাসে শত প্রতিকূলতার মাঝেও দুর্গোৎসবের আনন্দটুকু কোনওভাবেই হারাতে সে রাজী নয়।তাই সে প্রাণভরে পূজার প্রতিটি আনন্দক্ষণ উপভোগ করে।

আকাশ সেনগুপ্ত -বাংলাদেশের চট্টগ্রামে জন্মগ্রহণকারী অাকাশ সেনগুপ্ত ছয় বছর বয়সেই বাবা-মার সাথে যুক্তরাষ্ট্রে আসে।এরপর ভিন্ন কৃষ্টি-সংস্কৃতিতে বেড়ে উঠলেও অভিবাবকদের সার্বিক দেখভালে অাকাশ ধর্মীয় অনুশাসনগুলো বেশ ভালোই মেনে চলে।বর্তমানে চেলসি হাইটস স্কুলের অষ্টম গ্রেডের কৃতী ছাএ অাকাশ জানালো, বিভিন্ন ধর্মীয় আচারাদি পালনের মাধ্যমে সে চারদিনব্যাপী দুর্গোৎসব উদযাপন করে।দুর্গাপুজা উপলক্ষে সে নতুন জামা-কাপড় কেনে,মার হাতে তৈরী বিভিন্ন ধরনের উপাদেয় খাবার খায়।পুজার সময় আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের বাড়িতে আতিথ্য নেয়।দুর্গাপুজা শেষে অনুষ্ঠিত 'সংগীত রজনী'তে  বিভিন্ন শিল্পীদের পরিবেশনা সে প্রাণভরে উপভোগ করে।সে আরো জানাল, দুর্গাপূজার সময়  বাংলাদেশে থাকা  আত্মীয়স্বজনদের তার খুব মনে  পড়ে, যা তাকে খুব পীড়া দেয়।এছাড়া দেশের দুর্গাপূজার উৎসব-আনন্দ থেকে বঞ্চিত হওয়ায় সে খুব মনোকষ্টে ভোগে।

অদ্রি চৌধুরী  - বাংলাদেশের চট্টগ্রামে জন্ম নেওয়া অদ্র্র্র্রি চৌধুরী  বাবা-মার সাথে  সাত বছর বয়সেই আমেরিকায় আসে।এরপর এখানকার বহুজাতিক  কৃষ্টি ও সংস্কৃতিতে বেড়ে উঠলেও আপন কৃষ্টি ও সংস্কৃতিকে আঁকড়ে রেখেছে  আষ্ঠে-পৃষ্ঠে।তাইতো সে নিয়মিত কবিতা আবৃত্তি করে।চেলসি হাইটস  স্কুলের  অষ্টম  গ্রেডের কৃতি ছাএ অদ্রি চৌধুরী জানাল,পূজার ক'টা দিন সে মাতৃদেবীর আরাধনা করে,সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আবৃত্তি পরিবেশন করে, নৃত্যারতি করে।পূজার ক'টা দিন সে বাংগালির ঐতিহ্যবাহী পাঞ্জাবী-পাজামা পরিধান করে,বিভিন্ন পদের মুখরোচক খাবার গলাধঃকরন করে।তার মনে খুব খেদ, দুর্গাপূজার সময় স্কুল বন্ধ না  থাকায় মনমতো পূজার আনন্দটুকু উপভোগ করতে পারে না বলে। দুর্গা পূজা শেষে  'সংগীত রজনী'তে শিল্পীদের পরিবেশনার সময়  সমবয়সীদের সাথে মিলেমিশে  নেচে-গেয়ে একাত্ম হওয়া সে খুবই উপভোগ করে।বাংলদেশে পূজার সময় লাইনে দাঁড়িয়ে ভিড় ঠেলে ঠেলে এগিয়ে গিয়ে প্রতিমা দর্শন সে খুব মিস করে।তাছাড়া পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে প্রতিমা বিসর্জনের যে আবহ এটা  সে খুব মিস করে।অদ্রি চৌধুরী আরো জানাল,বাংলাদেশে দুর্গাপূজার আয়োজনের যে ব্যাপকতা তা হয়তো এখানে নেয়,তারপরও দূর প্রবাসে দুর্গাপূজার আনন্দ-আয়োজনে মেতে থাকার যে সুযোগ মেলে তাও কম কী?  

পঞ্চতপা বল       - নর্থফিল্ডে বসবাসরত পঞ্চতপা বলের    জন্ম বাংলাদেশের চট্টগ্রামে ।তার বয়স যখন  আড়াই   বছর তখন মা- বাবার সাথে যুক্তরাষ্ট্রে আসা।বহুজাতিক কৃষ্টি ও সংস্কৃতিতে  পঞ্চতপা বল   বেড়ে উঠলেও তার মনোজগতে তা তেমন একটা প্রভাব ফেলতে পারেনি।তার মা-বাবা দু'জনই শিল্পমনা  হওয়ায় একটা বাংগালি   সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলেই তার বেড়ে ওঠা।নর্থফিল্ডের  মেইনল্যান্ড রিজিওনাল হাই  স্কুলের নবম গ্রেডের কৃতি এই ছাএী জানাল, পূজার চারদিন সে খুব আনন্দ- উচ্ছ্বাসে কাটায়।পূজার   সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সে  তার সমবয়সীদের   পরিবেশনা প্রাণভরে উপভোগ করে।সে নিজেও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেয়।দুর্গাপূজায় ঢাকের বাদ্যির তালে তালে হাল ফ্যাশনের পোশাক পরে বান্ধবীদের সাথে নাচার মুহূর্তটা তার কাছে খুবই প্রিয়।বিজয়া দশমীর দিন লাল পাড়ের সাদা শাড়ি পরে অঞ্জলি শেষে সিঁদুর খেলায় মেতে ওঠা সে খুব উপভোগ করে।তাছাড়া দুর্গা পূজা শেষে  'সংগীত রজনী'তে শিল্পীদের পরিবেশনার সময়  বান্ধবীদের সাথে মিলেমিশে  নেচে-গেয়ে একাত্ম হওয়া সে খুবই উপভোগ করে। দুর্গাপূজার সময় স্কুল বন্ধ না  থাকায় মনমতো পূজার আনন্দটুকু উপভোগ করতে পারে না বলে এক ধরনের দুঃখবোধ তাকে তাড়া করে ফেরে।পুজার কেনাকাটা সে প্রায়ই অনলাইনেই সেরে ফেলে।

আমাদের এই প্রবাস  প্রজন্ম দিবানিশি ভিন্ন সংস্কৃতির ডামাডোলের মধ্যেও যে এখনো নিজস্ব ধর্মীয় অনুশাসন মেনে আচারাদি পালন করছে,বাংগালি  কৃষ্টি ও  সংস্কৃতি অন্তরে লালন করছে, বিজাতীয় সংস্কৃতির চোরাবালিতে পা ফেলছে না- তা সত্যিই আশা জাগানিয়া,যা আলোক বর্তিকা হিসাবে কাজ করবে প্রবাসে  বেড়ে ওঠা  পরবর্তী  প্রজন্মের জন্য।  

 
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ