আমি কিনা ‘দৈত্য’ উপাধি পেলাম: শোয়ার্জেনেগার

October 2, 2017, 2:12 PM, Hits: 1188

আমি কিনা ‘দৈত্য’ উপাধি পেলাম: শোয়ার্জেনেগার

আর্নল্ড শোয়ার্জেনেগারের পরিচয় অনেকগুলো। অভিনয়শিল্পী, পেশাদার বডিবিল্ডার। জন্মসূত্রে জার্মান হলেও অস্ট্রিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্বও তিনি পেয়েছেন। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া শহরের গভর্নর হিসেবে দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ বছর ১২ মে, যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব হস্টনের সমাবর্তন বক্তা ছিলেন তিনিআমি সব সময় বলি, তোমরা আমাকে যা খুশি ডাকতে পারো। আর্নল্ড বলো, শোয়ার্জেনেগার বলো, অস্ট্রিয়ান ওক বলো, শোয়ার্জি বলো, আর্নি বলো...যা খুশি বলো। কিন্তু কখনো আমাকে একজন স্বনির্ভর-সফল মানুষ বোলো না।

এতটা পথ আমি একা আসিনি। আমি বলতে চাইছি, আমার অর্জিত মেডেল কিংবা কৃতিত্ব আমি একাই বহন করতে পারি না। তাহলে আজ এত দূর আসতে যেই মানুষগুলো আমাকে সহায়তা করেছেন, উপদেশ দিয়েছেন, পাশে দাঁড়িয়েছেন; তাঁদের অসম্মান করা হবে। জানি এখন বলবে, আপনার অনেক গল্প আমরা শুনেছি, আমরা শুনেছি আপনি একজন আদর্শ মানুষ, একজন স্বনির্ভর-সফল ব্যক্তি। ওসব আমিও শুনেছি, পড়েছি, ভালোও লেগেছে। কিন্তু গল্পের আরও একটা অংশ তোমাদের অজানা রয়ে গেছে। টার্মিনেটর ছবির মতো একটা আগুনের গোলকের ভেতর থেকে হঠাৎ একদিন আমি লস অ্যাঞ্জেলসের রাস্তায় নেমে আসিনি। আমি অনেকের সাহায্য নিয়ে একটু একটু করে এগিয়েছি।

স্কুলে আমার শিক্ষকেরা ছিলেন, বন্ধুরা ছিল, বিকেলে মা হোমওয়ার্ক করতে সাহায্য করতেন। বাবা ছিলেন আমার খেলাধুলার কোচ। শৃঙ্খলা আর খেলাধুলার প্রতি ভালোবাসা তাঁর কাছ থেকে পেয়েছি। জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপদেশটাও তাঁর মুখে শোনা—‘আর্নল্ড, যা-ই করো না কেন, তোমার প্রয়োজন যেন মানুষ অনুভব করে।’

তোমরা নিশ্চয়ই আমার সম্পর্কে জানো। বডিবিল্ডিংয়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার জন্য দিনে পাঁচ ঘণ্টা প্রশিক্ষণ নিয়েছি, আমি সবচেয়ে কম বয়সে মিস্টার ইউনিভার্স হয়েছি—এসব গল্প শুনেছ নিশ্চয়ই। সবই সত্য, কিন্তু এগুলো গল্পের একটা অংশমাত্র। লেকের ধারে একজন লাইফগার্ডের সঙ্গে যদি আমার পরিচয় না হতো, তিনি যদি আমাকে কয়েকজন বডিবিল্ডারের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে না দিতেন, সেই বডিবিল্ডাররা যদি আমাকে একটা গাছের ডাল ধরে জীবনের প্রথম চিন-আপ দেওয়া না শেখাতেন, যদি আমাকে একটা স্থানীয় ভারোত্তলন ক্লাবে নিয়ে না যেতেন, আজ কি আমি এখানে থাকতাম? তাঁরাই আমাকে গড়ে তুলেছেন, এগিয়ে দিয়েছেন।

আমাকে আমেরিকায় নিয়ে এসেছিলেন জো ওয়েডার, যাঁকে ‘ফাদার অব বডিবিল্ডিং’ বলা হয়। তিনিই আমাকে গোল্ডস জিমে প্রশিক্ষণ নেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন। তাঁর সুবাদে একটা ছোট ঘর পেয়েছি। আমি প্রায় শূন্য হাতে আমেরিকায় এসেছিলাম। পকেটে ২০ ডলার আর ব্যাগের ভেতর কিছু ঘামে ভেজা কাপড়—এই ছিল সম্বল। থ্যাংকস গিভিংয়ের সময় গোল্ড জিমের সতীর্থ বডিবিল্ডাররা আমার বাসায় বালিশ, থালাবাসন, চামচ...আরও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে এসেছিলেন। তাঁরা একটা সাদাকালো টিভি আর একটা ট্রানজিস্টর রেডিও-ও নিয়ে এসেছিলেন, সেটা এখনো আমার বিছানার পাশে রাখা আছে। গোল্ডস জিম ছিল একটা জাদুকরী জায়গা। সেখানেই আমার সঙ্গে দেখা হয়েছে সব চ্যাম্পিয়নের, সঙ্গে মিস্টার আমেরিকাস, মিস্টার ওয়ার্ল্ড, মিস্টার ইউনিভার্স, অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন—সবাই সেখানে ছিলেন। তাঁরাই আমাকে একজন আনাড়ি বডিবিল্ডার থেকে পেশাদার চ্যাম্পিয়ন বানিয়েছেন।

এ কারণেই স্বনির্ভর-সফল মানুষের ধারণা আমি বিশ্বাস করি না। শুধু বডিবিল্ডিং না, শোবিজ দুনিয়ার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। তোমরা শুনেছ, শোয়ার্জেনেগার একদিন বডিবিল্ডিং ছেড়ে দিয়ে অভিনয় শুরু করলেন। একে একে কোনানদ্যবারবারিয়ান, টার্মিনেটর, কমান্ডারের মতো ছবিতে অভিনয় করলেন। সবই সত্য, কিন্তু এগুলো গল্পের একটা অংশমাত্র। অসংখ্য মানুষের সাহায্য আমাকে এত দূর এনেছে।

চলচ্চিত্রের জগতে আমার যাত্রাটা খুব কঠিন ছিল। খুবই কঠিন! এজেন্ট, ব্যবস্থাপক, স্টুডিও প্রধান—সবাই শুরুতে আমাকে একই কথা বলেছেন। ‘তুমি কখনো নায়ক হতে পারবে না। নিজের শরীরের গঠন দেখেছ? তুমি তো দেখতে দৈত্যের মতো!’ মন খারাপ হয়েছিল। খুব। দৈনিক পাঁচ ঘণ্টা প্রশিক্ষণ নিয়ে, এত খাটাখাটনির পর আমি কিনা ‘দৈত্য’ উপাধি পেলাম! আমি বলছি সত্তরের দশকের কথা। সেটা ডাস্টিন হফম্যান, আল পাচিনো, উডি অ্যালেনের যুগ। ছোটখাটো মানুষেরাই তখনকার ‘সেক্সসিম্বল’ ছিলেন। অবশ্য শুধু দেহের গঠনই নয়, উচ্চারণ নিয়েও আমাকে কটু কথা শুনতে হয়েছে। লোকে বলত, ‘আমি তোমাকে আঘাত দিতে চাই না। কিন্তু সত্যি বলছি, তোমার জার্মানি স্বরে ইংরেজি উচ্চারণ রীতিমতো ভয়ংকর!’ তারা বলত, ‘এই উচ্চারণ নিয়ে তুমি বরং হোগান’স হিরোজে (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিতে, জার্মান কয়েদিদের নিয়ে বানানো একটি টিভি-কমেডি শো) চেষ্টা করে দেখতে পারো।’

মোদ্দা কথা একটাই, সময়টা সহজ ছিল না। কিন্তু সমালোচকদের তোয়াক্কা না করে আমি চলচ্চিত্রে অভিনয়ের চ্যালেঞ্জটাও বডিবিল্ডিংয়ের মতো দৃঢ়চিত্তে গ্রহণ করেছিলাম। বেশ জোরেশোরে অভিনয়, ইংরেজি উচ্চারণ আর বক্তৃতার প্রশিক্ষণ নিয়েছিলাম। এখন তোমরা বলতে পারো, ‘ওহে আর্নল্ড, তোমার প্রশিক্ষণের সবটাই বৃথা গেছে!’ কিন্তু এসব প্রশিক্ষণ নিয়েই আমি ছোটখাটো চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পেতে শুরু করলাম। এমনকি বড় বাজেটের ছবিতে অভিনয়ের সুযোগও এল। কোনানদ্যবারবারিয়ান আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিল। সংবাদ সম্মেলনে পরিচালক এমনটাও বলেছিলেন, ‘শোয়ার্জেনেগারকে না পেলে এ রকম একটা শরীর আমাদের বানাতে হতো। কারণ, সুগঠিত শরীর আছে আবার অভিনয়ও জানেন, এমন লোক আমরা আর খুঁজে পেতাম না।’ সে সময় তাঁরা যদি আমাকে সাহায্য না করতেন, মূল চরিত্রে অভিনয়ের সৌভাগ্য আমার হতো না।

আর হ্যাঁ, টার্মিনেটরের পরিচালক জেমস ক্যামেরনের কথা বলতেই হয়। সে সময় তিনি বলেছিলেন, ‘টার্মিনেটর ছবিটা ব্যবসাসফল হয়েছে শোয়ার্জেনেগারের জন্য। কারণ, সে যন্ত্রের মতো কথা বলে।’ এই মন্তব্যকে আমি প্রশংসা হিসেবে নেব কি না জানি না। কিন্তু এই ছবিতে অভিনয়ের পরই একটা বড় দায়িত্ব আমার ওপর ভর করল।

অতএব কোনো কিছুই আমি একা করিনি। লোকে বলে, ‘একদিন তিনি গভর্নর হবেন বলে সিদ্ধান্ত নিলেন আর বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম অর্থনীতির শহরটার দায়িত্ব নিয়ে নিলেন।’ না, ব্যাপারটা এমন ছিল না। আমি গভর্নর হয়েছি। কিন্তু টুনাইট শোর উপস্থাপক জে লেনোর সহায়তা ছাড়া এটা কখনোই সম্ভব ছিল না। তাঁকে আমি ফোন করে বলেছিলাম, ‘তোমার অনুষ্ঠানে বসেই আমি গভর্নর পদপ্রার্থী হওয়ার ইচ্ছের কথা ঘোষণা করতে চাই। আমি জানি, একই রাজনৈতিক চেহারা দেখতে দেখতে ক্যালিফোর্নিয়ার মানুষ ক্লান্ত হয়ে গেছে।’ আমার বন্ধু জে লেনো বলেছিল, ‘ঠিক আছে, আমি তোমাকে সাহায্য করব।’

এসব কথা তোমাদের কেন বলছি? স্রেফ একটা ব্যাপার বোঝানোর জন্য। তোমরা আজ এ পর্যন্ত পৌঁছেছ, সেটা তোমার একার কৃতিত্ব নয়। বহু মানুষের সহায়তা তোমাকে এখানে এনেছে। এবার তোমার পালা। তুমি যেমন অনেকের সহায়তা পেয়েছ, এবার তুমি মানুষকে সহায়তা করো। শুধু নিজের কথা ভেবো না। অন্যের পাশে দাঁড়াও। (সংক্ষেপিত)

ইংরেজি থেকে অনুবাদ: মো. সাইফুল্লাহ

সূত্র: টাইম ডট কম 

 
সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ