নিউইয়র্ক সিটির বাইরে এক দিন

October 21, 2017, 8:12 PM, Hits: 747

নিউইয়র্ক সিটির বাইরে এক দিন

লাবলু কাজী : জীবন চলতে চলতে থেমে যেতে চায়, ঠিক আমার নিউইয়র্ক-লস অ্যাঞ্জেলেসের ডেনবারের বিরতির মতো! আমার ঘড়ির কাঁটা একটি নির্দিষ্ট জায়গায় এসে থেমে যায় অ্যালার্ম দেওয়ার জন্য। ও আবার চলতে থাকবে যতক্ষণের জন্য চাবি দেওয়া আছে! আমিও উঠব চলব ঘড়ির মতো যতক্ষণ দম আছে! নিশ্বাসের বিশ্বাস নেই, তবু চলি আমার আটলান্টায় যাওয়ার মতো। আননের রাঙামাটি অথবা মামুনের চায়না ফ্লাই করার মতো। ক্যানডেল বার্ন আউটের মতো আমরা আমাদের শেষ খেলা জানি। তবু আমরা চলি, চলতে হয় ঠিক আমার ‘বিগ বেন’ ঘড়ির মতো! মাঝে মাঝে খেলাঘরের এই চড়ুইভাতি খেলতে খেলতে যখন বাস্তবতায় ফিরে আসি, তখন মনে হয় জীবন আমার প্রতি সুবিচার করেনি, প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তিতে বেজায় ফারাক! অপ্রাপ্তির ব্যথায় হৃদয়-মন ভারাক্রান্ত থাকে! অথচ সৃষ্টিকর্তা আমাকে অঢেল দিয়েছেন, তবু এই ফারাক কিসের? আমাদের মুড সুয়িং হয় অপ্রাপ্তিতে। এই ভাবাবেগ সম্ভবত তারই ফসল! খেল, খেলনা ও খেলোয়াড় নিয়ন্ত্রক এখানে খেলোয়াড়! জন্ম, মৃত্যু ও আখিরাত আল্লাহর সৃষ্টি ও নিয়ন্ত্রিত! তকদির, তামান্না ও কর্ম কোটি বছর আগে লাওহে মাহফুজে আমাদের রব লিখে রাখলেও আমাদের কর্মফলে পরিবর্তন হতে পারে! আমাদের জীবন চলার পাথেয় ও কর্ম নির্ণয় এখানে মুখ্য!

জ্বলন্ত সূর্য ছড়াচ্ছে অগ্নি স্ফুলিঙ্গ, ধরিত্রীসহ গ্রহে গ্রহে! ওর রাগের তাণ্ডব ছড়িয়ে দিচ্ছে সর্বত্র, ওর বুকের জিঘাংসার নিভৃতে শিথিল করছে নিজের গাত্রতপ্তে অন্যত্র। মানুষরূপী এই আমরা নিজের বুকের ভেতরে চেপে থাকা কষ্টের বেদনা, প্রকাশে লোকভয়, মরমের লাজে হ্রদয়ের গহিনে তালা মেরে রাখি। আমরা কি কল্পনা করতে পারি এই কষ্টের বহমান তীব্রতা কত প্রকট, কত হৃদয়বিদারক ও সেলফ ডেসট্রাকটিভ? তাহলে আমরা কেন জন্ম থেকে জ্বলব? আমরা কেন সেই বাঁধ ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে পারি না? মনটা ভালো নেই কয়েক দিন যাবৎ। চুপচাপ থেকেও অহেতুক ঝামেলা আমাকে ছাড়ছে না। নূতন গাড়ি এসেছে গ্যারেজে পুরোনোটাকে সরিয়ে, আমার আপত্তি সত্ত্বেও।

বাচ্চারা অনেক দিন ধরেছে সামারে এবার বোস্টন যাবে। যাই যাই করেও যাওয়া হয়ে ওঠে না। কারণটা বেশ জানা। খুলেই বলছি, নটর ডেমে পড়াশোনার সময় ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা ওখানে চলে এল, নানা জীবনকাহিনির লেন অতিক্রম করতে আমার আর ওখানে আসা হলো না! অথচ ওদের চেয়ে অনেক ভালো ছাত্র ছিলাম আমি, তবু হয়ে ওঠেনি! কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই রওনা দিলাম। সেপ্টেম্বরের রোববারের সকাল, পরিষ্কার আকাশ, মৃদুমন্দ বাতাস খেলে যাচ্ছে। মেঘেরা ভেলা ভাসিয়ে দূর অজানার পানে চলে যাচ্ছে। আমরা রাস্তায়, গন্তব্য বোস্টন। ছুটির দিনের হাইওয়ে ট্রাফিক জ্যাম নেই। চার ঘণ্টার রাস্তায় আমরা পনেরো মিনিট আগে পৌঁছাতে পারব বলে জিপিএস আগাম ঘোষণা দিচ্ছে। টেকনোলজির উন্নতির সুবাদে আমরা কত সুবিধা উপভোগ করছি। এখন আর গুগলে গিয়ে ড্রাইভিং ডাইরেকশনের প্রিন্ট আউট বের করতে হয় না। স্মার্ট ফোনের অ্যাপই যথেষ্ট। একটানা আড়াই ঘণ্টা ড্রাইভ করার পর আমরা রোড আইল্যান্ডে পৌঁছালাম। সমুদ্রের মধ্যে ছোট আইল্যান্ড এই স্টেট। সি ফুডের জন্য খুবই বিখ্যাত এদের রেস্টুরেন্ট। এর আগেও আমরা এসেছি এবং উপভোগ করেছি। খুব ভালো সময় কেটেছিল আমাদের। আজও ওরা ধরল। কী আর করা, খাওয়াতেই হবে! 

আমরা গ্রিলড সলমন, লবস্টার ব্রিসক স্যুপ ও টিরামিসু কেক খেলাম। গ্যাস ভরে, চিপস ও পানি নিয়ে আমরা আবার রওনা দিলাম। আমার ছেলে খুব ভালো চালক, বাকি রাস্তা ও-ই চালাবে। সিডিতে ওর পছন্দের নূতন মিউজিক বাজতে লাগল, আমি পেছনের সিটে বসে ভাবতে লাগলাম জীবন-যৌবনের মিঠাখাটা স্মৃতি, স্মৃতিরা যেন জোনাকই হয়ে আমার অন্তর আলোর বন্যায় ভাসিয়ে সেই পুরোনো দিনে ফিরিয়ে নিয়ে গেল...সবাই যেন আমার চোখের সামনে হাজির! আমার ঘুম এল, বউয়ের ডাকে জেগে উঠলাম। আমরা সাউথ সাইড বোস্টনে এসে পড়েছি। এই সাউথ সাইডে কনস্ট্রাকশনের জোয়ার বসেছে যেন, নূতন নূতন অফিস বিল্ডিং হচ্ছে। নর্থ সাইডটা কিন্তু পুরোনো বোস্টন। যেখানে হার্ভার্ড, এমআইটি ও বোস্টন কলেজ। আমরা বোস্টন হারবারে এসে যাত্রাবিরতি দিলাম।

আগের প্ল্যান অনুযায়ী আমরা ঘণ্টার জন্য স্পিডবোট ভাড়া নিলাম। সমুদ্রের নীলাভ অথই পানিতে আমরা যেন হাওয়ার রথের মতো উড়তি ফেরতা পানির আজব প্রাণী সৃষ্টির বৈচিত্র্য দেখে থ মেরে গেছি। জীবন নাটকের চরিত্রে পানির ওপরে আমাদের জীবনের বেঁচে থাকার নির্দিষ্ট সময়ের মতো এক ঘণ্টা শেষ হয়ে গেল। আমরা হার্ভার্ডের উদ্দেশে রওনা দিলাম। শেষ বিকেলের সময় আমরা নির্ধারণ করলাম, কারণ তখন ছাত্ররা থাকে না, ঘুরে দেখা যায়। প্রায় দুই শ বছরের এই পুরোনো বিল্ডিং ভেতর থেকে কত যে মানুষকে পৃথিবীর বিখ্যাত হতে সাহায্য করেছে, আমার কাছে তার হিসাব নেই। হার্ভার্ড আমার কাছে এক স্বপ্নের দুঃস্বপ্নই হয়ে রয়ে গেল। আজ স্বচক্ষে দেখে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর চেষ্টামাত্র। এমআইটি আমার আরেক সাধের স্কুল, আমার ছেলেটা ভর্তির সুযোগ পেয়েও মা-বাবার জন্য এনওয়াই ইউতে রয়ে গেল, হাজার বুঝিয়েও বোস্টনে পাঠাতে পারলাম না। সে কয়েক মাস আগে অ্যারোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ব্যাচেলর শেষ করে বের হয়েছে। এমআইটি ঘুরে দেখতে দেখতে সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নেমে এল। 

এবার ফেরার পালা, ফিরতে ফিরতে ভাবছি—এ রকম কত ভ্রমণ করেছি আমি দেশে-বিদেশে, প্রতিবারই ঘরের ছেলের ঘরে ফিরে আসা হয়েছে! জীবন সম্ভবত একটি জার্নি; কখন যে আর চিরদিনের জন্য ফেরা হবে না, তাই ভাবছি! নিউ জার্সি টার্ন পাইক হাইওয়ের মৃদু আলোয় নজরে আসছে উঁচু-নিচু পাহাড়ের সারির মিলন, যেন ওদের মধ্যে অমোঘ ভ্রাতৃত্ব বন্ধন চিরদিনের তরে। ঝিঁঝি পোকার কান ফাটানো আওয়াজ আমার গ্রামের ছোটকালের কথা হৃদয় মাজারে দোলা দিয়ে গেল যেন পালিয়ে সিগারেটের একটা সুখটান দেওয়ার মতো। গাড়ি ভেরাজোনা ন্যারো ব্রিজ ধরে স্ট্যাটন আইল্যান্ড থেকে ব্রুকলিনের পথে চলছে। স্ট্যাচু অব লিবার্টি হাত নেড়ে স্বাগত জানাচ্ছে দূরে। অন্যদিকে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার, এমপায়ার স্টেট বিল্ডিংয়েই তো আমার নিউইয়র্ক সিটি! মাঝে মাঝে হাঁপিয়ে উঠি সত্য, কিন্তু এক দিন দূরে থাকলে মিস করি অনেকটা গ্রাম থেকে ঢাকায় থাকলে যেমন কষ্ট হতো। আমরা আমাদের বাসায় দিনের শেষে ফিরে এলাম ঠিক পাখিদের সন্ধ্যায় বাসায় ফেরার মতো। জীবনযুদ্ধে পথ অতিক্রম করতে কখনো কখনো হাঁপিয়ে উঠি। বলি, দূরে কোথাও চলে যাব, দেখি শান্তি পাই কি না। গিয়ে কিন্তু এক দিনও থাকতে পারি না। অনেক দিন থাকতে থাকতে একটা মায়া ধরে গেছে। ঘর এক মন্দির। বাড়ি তখনই সুখের ঘর হয়, যখন প্রিয়জন আপনার একান্ত হয়, সুখে-দুঃখে ভাগ নেয়, আমি সেই সুখের নেশায় বেঁচে আছি...। 

লেখক: কবি ও সাহিত্যিক

নিউইয়র্ক 

 
সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ