জর্জ স্যান্ডার্স : ‘যা ঘটেছে ভুলে যাও, যা ঘটতে পারে তা লেখো’

October 27, 2017, 8:06 PM, Hits: 957

জর্জ স্যান্ডার্স : ‘যা ঘটেছে ভুলে যাও, যা ঘটতে পারে তা লেখো’

মোজাফফর হোসেন : এ বছরের ম্যান বুকার পুরস্কারজয়ী মার্কিন লেখক জর্জ স্যান্ডার্সকে নিয়ে আয়োজন

প্রথম উপন্যাস লিংকন ইন দ্য বার্ডোর জন্য জর্জ স্যান্ডার্স জিতেছেন ম্যান বুকার। মূলত গল্পকার এই লেখকের দুটি সাক্ষাৎকারের নির্বাচিত অংশ অনুবাদ করেছেন মোজাফফর হোসেন

উপন্যাস নিয়ে, ‘লিংকন ইন দ্য বার্ডো’ প্রসঙ্গে

* হাজার হাজার বই লেখা হয়েছে আব্রাহাম লিংকনের ওপর। আরও একটা কেন?

জর্জ স্যান্ডার্স: সত্যি বলতে, আমি লিংকনকে নিয়ে লিখতে চাইনি, কিন্তু বছর বিশেক আগে মাঝরাতে সদ্যমৃত ছেলের সমাধিতে লিংকনের প্রবেশের গল্পটি যখন শুনি, ভীষণভাবে তাড়িত হইয়েছিলাম তখন। মূলত লিংকন ইন দ্য বার্ডো উপন্যাসের ভেতর দিয়ে আমি আগের সেই বিমোহিত অনুভূতির ভেতর প্রবেশ করতে চেয়েছি। এরপর লিংকনকে নিয়ে লিখতে যাওয়াটা প্রয়োজন হয়ে উঠেছে, চাপ মুক্তির জন্য। নিজেকে এই বলে শুরু করি যে আমি লিংকনকে নিয়ে বড়সড় করে বিস্তারিতভাবে কোনো বই লিখছি না, আমি কেবল তাঁর কিছু খণ্ড খণ্ড মুহূর্ত—ওই রাতের ওই বিশেষ মুহূর্তটি তুলে ধরতে যা যা দরকার, তাই লিখছি। এটা হয়ে উঠেছে ফেব্রুয়ারির হুল ফোটানো ঠান্ডা রাতে সন্তানহারা এক পিতার মনোজগতের আখ্যান।

* সম্পূর্ণ উপন্যাসটি লেখা হয়েছে ব্লক কোটেশনে। কেন?

স্যান্ডার্স: আমার এক গুণী ছাত্র, অ্যাডাম লেভিন একবার আমাকে ই-মেইলে বলল, সে ভাবছে, আমি যদি কখনো উপন্যাস লিখতাম, সেটা হয়তো টানা মনোলগে লেখা হতো। তার কথায় আমার অভিব্যক্তি ছিল এমন: ওহ্‌, মজার তো! এবং একই সঙ্গে আমি চেষ্টা করছিলাম বিরক্তিকর বিষয়গুলো এড়িয়ে চলার। যেমন, আমার ইচ্ছা ছিল না ৩০০ পৃষ্ঠার লিংকন মনোলগ লেখার। এবং সরল-সোজা বর্ণনামূলক শৈলী, যেমন: ‘এক ঘন অন্ধকার রাতে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন সকলের অলক্ষ্যে অন্ধকারের চাদরে মোড়ানো সমাধিস্থলে প্রবেশ করল।’ এ ধরনের সূচনাকে মনে হলো বিরক্তিকর।

অনেক লেখা আছে যা ভেতরে-ভেতরে বিরক্তিসূচক বিষয় থেকে আপনাকে সরিয়ে নেবে। এ ধরনের লেখার ভালো কৌশল হলো রঙ্গ-তামাশার দিকে ঝুঁকে পড়া। আর এ উপন্যাসের ক্ষেত্র আমি ‘আহা’ অনুভূতি পেলাম এই ভেবে যে আমি যদি ভূতের সঙ্গে সমান্তরালভাবে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে দাঁড় করাতে পারি তাহলে ঘটা করে কোনো তামাশা সৃষ্টি না করেও এ দুটোর মধ্য দিয়ে গল্পটা বলে যেতে পারব আমি।

* বিজ্ঞান কল্পকাহিনি ও উদ্ভট ঘটনাকে বাস্তববাদী গল্প বা উপন্যাসে ব্যবহার করার জন্য ‘স্লিপস্ট্রিম’ (কল্পকাহিনি, রোমান্স কাহিনি এবং বাস্তবাদিতার মিশ্র শৈলী) লেখক বলা হয় আপনাকে। বাস্তবতা কি এ ধরনের পাগলাটে বাস্তববাদের ভেতর দিয়ে নির্ণয় করা যায়?

স্যান্ডার্স: আমি এ ধরনের ঘটনা বা উপকরণ ব্যবহার করি একটি বাস্তব ঘটনার ভাবোদ্দীপক সত্যের ভেতর মধু সঞ্চার করতে। যখন আমি নিজের জীবনের দিকে ফিরে তাকিয়ে দেখি আমার জীবনটা আসলে কেমন ছিল—যেটা আক্ষরিকভাবে ঘটেছে, সেটা তুলে ধরতে আমি যে আবেগঘন মুহূর্তের ভেতর দিয়ে গেছি, সেটাকে কমিয়ে আনতে হয়েছে। অন্যভাবে বলতে হয়, জীবনের সোজাসুজি বাস্তবধর্মী বয়নরীতি অনেক কিছু কঠিন করে তোলে, এমনকি আমার মতো তুলনামূলক মধ্যবিত্ত জীবনকেও। নিজেকে আমি আসলে গোগলীয় বলে মনে করি, চেষ্টা করি জীবন কেমন অনুভূত হয় সেটা বুঝতে; তবে সেটা অনুভব করতে হলে আমাদের কিছুটা দুরন্তভাবে দোলাতে হবে। কারণ, জীবন প্রকৃতিগতভাবেই যেমন সুন্দর তেমন অপ্রকৃতিস্থ।

টাইম, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৭।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন: সারা বেগেলে

ছোটগল্পের জগতে

* টেনথ ডিসেম্বর আপনার চতুর্থ ছোটগল্পের বই। আগের তিনটি বই থেকে এটি কি আলাদা বলে মনে হয়েছে আপনার কাছে?

স্যান্ডার্স: হ্যাঁ। এর কারণ, এটা বিক্রি হচ্ছে; যা খুব ভালো তো বটেই, আমার জন্য অস্বাভাবিকও। আরও একটা বিষয়ে এটা আগের তিনটি সংকলন থেকে সম্পূর্ণ আলাদা—আমি এটা লিখেছি আনন্দঘন সময়ে—আমাদের মেয়ে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে কলেজে যাওয়া শুরু করেছে—আমি এবং আমার স্ত্রী পলার জন্য সেটা সুখের মুহূর্ত বটে। আমি মনে করি, এই বিশেষ অনুভূতিটা এই বইয়ের গল্পগুলো লেখায় চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে থাকবে।

ম্যান বুকার পুরস্কার ও লিংকন ইন দ্য বার্ডো হাতে জর্জ স্যান্ডার্স

আমার প্রথম দুটি বই যখন প্রকাশিত হয়, আমার মনে হয়েছিল, জীবন আরও কঠিন হয়ে পড়বে এবং পুঁজিবাদ আরও সাংঘাতিক রূপ ধারণ করবে। তার প্রভাব পড়বে আমার জীবনেও। আমি জানি না, আমার কাছে সেটা কেন এমন করে ‘চিন্তার উন্মোচন’ বলে মনে হলো! তাই সেই গল্পগুলো জীবনের সংকট ও সমস্যার ভেতর আটকে গেল। মানুষগুলো একজন অন্যজনের ওপর কঠিন হয়ে পড়ল। কিন্তু এই বইয়ে—যদিও নিষ্ঠুরতা, অন্ধকারাচ্ছন্ন ব্যাপার কিছুটা আছে—আমি লক্ষ করলাম, আমার চোখ সেই সব স্থানে আটকে গেল, যেখানে সবকিছু মন্দ না। কোনো কোনো গল্পের কোথাও কোথাও অনুভব করলাম, নান্দনিক গতি—প্লটের মোচড়; গতানুগতিক গল্প লেখার যে ধরন, যা আবার অভ্যাসগতভাবেই সর্বনাশা, সেখান থেকে আচমকা সরে এসেছে আমার গল্প।

এ ছাড়া রচনাশৈলীসংক্রান্ত ক্রমাগত বিবর্তনের ভেতর দিয়ে গেছি আমি, যা হয়তো এসেছে আমার ভ্রমণগদ্য থেকে। প্রতিটা বাক্যে বারুদ সেঁটে দেওয়ার পক্ষে নই আমি। অর্থাৎ আমি আরেকটু ছড়িয়ে গল্প লিখতে পারি, যার ভেতর কোনো উচ্চকিত আড়ম্বর থাকবে না।

* এটা ঠিক যে বইয়ের অনেক গল্প একধরনের মুক্তির বার্তা দিয়ে শেষ হয়। অন্তত একটা আশা থাকে। তবে মুক্তির ঘটনাটি ঘটে একেবারে ছুরির ডগায় এসে।

স্যান্ডার্স: আমরা ছোটগল্পের বিষয়বস্তু অথবা বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বা উদ্দেশ্য নিয়ে যতই কথা বলতে চাই না কেন, আমার মনে হয়, যখন এটা লেখা হয় তখন থাকে কৌশলগত বিষয় হিসেবে। অন্তত আমার কাছে। পরে পরিমার্জন করতে গিয়ে ওই গল্পটি যখন আবার যখন পড়ি, শত শত সম্ভাবনার ভেতর থেকে আমাকে একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়। ধরুন আমি লিখেছি: ‘জেন কক্ষে ঢুকে নীল বিছানার ওপর বসল’, এরপর লেখা থামিয়ে পড়লাম, আবার যেন শুরু থেকে লিখছি, ভাবতে থাকি, ‘কক্ষে আসল’ এবং ‘ওপর’ এবং ‘নীল’ (কেন তাকে কক্ষে আসতে হবে? কেন তাকে বিছানার ওপর বসতে হবে? কেনই-বা বিছানার রং নীল হতে হবে?) এবং এরপর বাক্যটি হয়তো দাঁড়াল—‘জেন বিছানায় বসল’—এবার যেন হয়েছে বলে মনে হলো (হেমিংওয়ের স্টাইলে!), যদিও জেনের আদৌ কি দরকার ছিল বিছানায় বসার? সেটার কি আর প্রয়োজন আছে?

আমার লেখকসুলভ আরেকটি অভ্যাস হলো, ‘খাড়া খাদের কিনারে শিশুকে রেখে দেওয়ার’ মতো; আবেগ বা উত্তেজনার মাত্রাটা বাড়িয়ে তোলার কাজটা খুব ভেবেচিন্তে করি না আমি। ফলে আমার কোনো গল্প বা সংকলনকে যদি ‘আরও আশাবাদী’ বলে মনে করি, তবে সেটা হবে কিছুটা আপেক্ষিক ভাবনা—শিশুটি হয়তো শেষ পর্যন্ত খাদের কিনার থেকে পড়ে গেছে কিন্তু কোনো বাজে জায়গার পরিবর্তে পড়েছে নরম ঘাসের ওপর।

এর কোনোটাই লেখন-পূর্ব ভাবনা নয় যদিও। এটা বইয়ের একটা সংকটপূর্ণ অবস্থা, যেখানে অন্ধকার বা বিপর্যয়ের দিকে হঠাৎ বাঁক নেওয়াটা অনেক সম্ভাবনার একটি মাত্র। হতে পারে সবচেয়ে জানাশোনা এবং স্বস্তিকর একটা সম্ভাবনা। কাজেই বইটি পাঠের একটা সামগ্রিক অনুভূতি হতে পারে ইতিবাচক। এটা অনেক সম্ভাবনার দরজা উন্মুক্ত করে।

তার মানে এই না যে আমার আগের বইগুলোর বৈশ্বিক দৃষ্টিকোণকে আমি অগ্রাহ্য করছি। আমি মনে করি, পুঁজিবাদ সহিংস ও নিষ্ঠুর যন্ত্র হয়ে উঠবে, সামনে যা-ই বাধা হয়ে আসবে, গুঁড়িয়ে দেবে। আমার ধারণা, বর্তমান বইটি যদিও এই প্রকাণ্ড যন্ত্রের পেটের ভেতর অবস্থান করছে, এর ভেতর উল্লাস, ন্যায়বোধ, তৃপ্তি আছে—কখনো কখনো আপনি এই যন্ত্রের চাকার মাঝখানে নিজে থেকেই অনুভব করতে পারেন।

* আপনার লেখায় আত্মজৈবনিক উপাদান চিহ্নিত করা মুশকিল। আমি নিশ্চিত আপনি জেলে যাননি, সেলিব্রিটি নিলামে অংশ নেননি, ইরাকে যুদ্ধ করেননি, মাথা ছেদ করে তার দিয়ে বাঁধা পড়েননি উদ্বাস্তু নারীদের ভেতর। তারপরও আপনার বর্ণনার ভেতর দিয়ে অনুভব করা যায় আপনি আছেন।

স্যান্ডার্স: আমি শুরুর দিকে দেখেছি যে আমি যখনই আমার ব্যক্তিগত জীবন থেকে লেখার চেষ্টা করেছি, গল্পটা সরলরৈখিক পথে এগিয়েছে। আমি ঠিক বলতে পারব না কেন। ভাষার মধ্যে ওই উত্তেজনাটা আসেনি। তাই একটা পর্যায়ে এসে ভাবতে শুরু করলাম, ‘যা ঘটেছে তা ভুলে যাও, যা ঘটতে পারে তা লেখো। পাঠককে গল্পের ভেতর টেনে আনো, তাকে ধরে রাখো—যেকোনো মূল্যে’।

* কার্টুনীয় তথা ব্যঙ্গাত্মক অলীক জগতের কথক হিসেবে আপনার পরিচিতিটা কীভাবে দাঁড়াল? ‍আপনার প্রায় সব লেখায় ভীষণ বাস্তব উপকরণ আছে, কিন্তু একটা কার্টুনীয় অলীক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে। এই আধা আজগুবি জগতে এসে লেখক হিসেবে আপনি কি মুক্তি খুঁজে পান? আপনি এই অযৌক্তিক বিষয়ের সঙ্গে যৌক্তিকতার সম্পর্কটি স্থাপন করেন কীভাবে?

স্যান্ডার্স: ‘মুত্তিদান’ এ ক্ষেত্রে উপযুক্ত শব্দ। আমি শুরুতে এই আজগুবি বিষয়াদি ব্যবহার করতে শুরু করি অনেকটা জোর করে, নিজেকে অভ্যস্ত রীতি থেকে বের করত। আমি বাস্তববাদী লেখালেখির দিকে ঝুঁকে পড়েছিলাম, যেটি আমার জন্য খুব একটা কাজে দিচ্ছিল না।

নিউ ইয়র্কার, ২৪ জানুয়ারি ২০১৩।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন: ডেবোরা ট্রিইসম্যান 

 
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ