বড় ধরনের হোঁচট খেল ব্রেক্সিট সমঝোতা

December 5, 2017, 1:21 AM, Hits: 87

 বড় ধরনের হোঁচট খেল ব্রেক্সিট সমঝোতা

হ-বাংলা নিউজ:  চরমভাবে হোঁচট খেল ব্রেক্সিট (ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে যুক্তরাজ্যের বিচ্ছেদ) সমঝোতা। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে গতকাল সোমবার ইইউ নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বিচ্ছেদ কার্যকর করার বিষয়ে একপ্রকার সমঝোতা করেই ফেলেছিলেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে নর্দান আয়ারল্যান্ডের ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নিস্ট পার্টির (ডিইউপি) নেতা অ্যারলেন ফোস্টারের এক ফোনকলে ভেস্তে গেল সবকিছু।

স্বাধীন আয়ারল্যান্ড ইইউর সদস্য। আর নর্দান আয়ারল্যান্ড যুক্তরাজ্যের অংশ। বিচ্ছেদ কার্যকর হওয়ার পর এই দুই ভূখণ্ডের সীমানা নিয়ে সম্ভাব্য সংকট এড়াতে প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে নর্দান আয়ারল্যান্ডকে বিশেষ মর্যাদা দিতে রাজি হন। যার ফলে যুক্তরাজ্যের অংশ হয়েও নর্দান আয়ারল্যান্ড ইইউ আইনের অধীনে থাকত। কিন্তু ডিইউপি নেতা অ্যারলেন আলোচনা চলা অবস্থায় টেলিফোনে প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মেকে জানিয়ে দিয়েছেন, এমন চুক্তি তিনি সমর্থন করবেন না। ব্রেক্সিট কার্যকর করতে হলে সমগ্র যুক্তরাজ্যকেই বেরিয়ে আসতে হবে।

নর্দান আয়ারল্যান্ডের জন্য ভিন্ন কোনো ব্যবস্থা করা চলবে না। থেরেসা মের কনজারভেটিভ দলের যেসব এমপি ব্রেক্সিটপন্থী বলে পরিচিত, তাঁরাও ডিইউপির এই হস্তক্ষেপকে সমর্থন করেছেন। এমন এমপির সংখ্যা ৩০-এর মতো বলে ধারণা।

সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় মাত্র ১০ আসন দখলে থাকা ডিইউপির সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আছে থেরেসা মের সরকার। যে কারণে ডিইউপির এত দাপট।

সংসদে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও বিরোধীদের ঘায়েল করার লক্ষ্যে থেরেসা মে ২০১৬ সালে মধ্যবর্তী নির্বাচন দিয়েছিলেন। কিন্তু নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়ে ডিইউপির সঙ্গে চুক্তি করে সরকার গঠনে বাধ্য হন তিনি। এখন ডিইউপির হস্তক্ষেপ মধ্যবর্তী নির্বাচনের সেই ক্ষতই থেরেসার সামনে হাজির করছে। ডিইউপির চাওয়াকে সমীহ না করলে থেরেসা ক্ষমতায় থাকতে পারবেন না। বিশ্লেষকেরা বলছেন, থেরেসা মের নেতৃত্ব কতটা ভঙ্গুর, তা খোলসা হয়ে গেছে ডিইউপির হস্তক্ষেপের ঘটনায়।

তবে আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে থেরেসা মে বলেছেন, কিছু বিষয়ে ভিন্নতা থাকলেও সফল সমাপ্তির বিষয়ে তিনি আশাবাদী। আর ইউরোপিয়ান কমিশনের প্রেসিডেন্ট জ্যঁ ক্লদ ইয়ঙ্কার বলেন, অপ্রত্যাশিতভাবে আলোচনা ভেঙে গেছে। তবে সময় খুবই সংক্ষিপ্ত হলেও তারা আরেক দফা আলোচনায় বসতে রাজি। আজ মঙ্গলবার আবারও উভয় পক্ষ আলোচনায় বসতে পারে বলে যুক্তরাজ্যের গণমাধ্যমগুলোর খবরে বলা হয়েছে।

২০১৬ সালের জুনে যুক্তরাজ্যে অনুষ্ঠিত এক গণভোটে দেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটার ইইউর সঙ্গে বিচ্ছেদের পক্ষে রায় দেয়। সেই রায় কার্যকর করতে চলতি বছরের মার্চ মাসে যুক্তরাজ্য বিচ্ছেদের আনুষ্ঠানিক আবেদন জানায়। চলমান প্রক্রিয়া অনুযায়ী সমঝোতা হোক বা না হোক ২০১৯ সালের মার্চে বিচ্ছেদ কার্যকর হবে।

বিচ্ছেদ আলোচনার শুরুতে ইইউ জানিয়ে দেয় যে আগে বর্তমান সম্পর্ক গুটিয়ে বিচ্ছেদ কার্যকর; তারপর ভবিষ্যতের নতুন সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা। এ জন্য তারা তিনটি বিষয়ে আলোচনার অগ্রগতির লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করে দেয়। এগুলো হলো যুক্তরাজ্যে বসবাসরত ইইউ নাগরিকদের ভবিষ্যৎ, ব্রেক্সিট বিল এবং আয়ারল্যান্ড সীমান্তের ভবিষ্যৎ।

ব্যাপক দর-কষাকষির পর যুক্তরাজ্য ইইউ নাগরিকদের ব্রিটেনে স্থায়ী হওয়ার সুযোগ ঘোষণা করে। তারপর ব্রেক্সিট বিল (ইইউর ঋণ, পেনশনসহ বিভিন্ন দেনার ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যের অংশ এতে যুক্ত) বাবদ প্রায় ৫০ বিলিয়ন ইউরো দিতে সম্মত হয়। আর আয়ারল্যান্ড সীমান্ত বিষয়ে বলে ইইউ যদি যুক্তরাজ্যের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করে, তাহলে আয়ারল্যান্ড সীমান্তে কোনো পরিবর্তনের প্রয়োজন পড়বে না। তাই ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নির্ধারণের আগে সীমান্ত নিয়ে আলোচনায় অস্বীকৃতি জানায় যুক্তরাজ্য।

এই তিনটি বিষয়ে সন্তোষজনক অগ্রগতি হলে সেটির একটি খসড়া সমঝোতাপত্র তৈরি করবে উভয় পক্ষ। ২৭ দেশের জোট (যুক্তরাজ্য বাদে) ইইউ সম্মেলনে সদস্য দেশগুলো সেই সমঝোতাপত্র অনুমোদন করলেই কেবল ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা শুরু হবে।

কিন্তু ইইউর শুল্কমুক্ত বাজারের সুযোগ হারানোর ঝুঁকি এড়াতে শুরু থেকেই ভবিষ্যৎ বাণিজ্য সম্পর্ক নিয়ে আলোচনায় মরিয়া যুক্তরাজ্য।

বিচ্ছেদ পর্বের আলোচনায় পর্যাপ্ত অগ্রগতি না হওয়ায় গত সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত ইইউ সম্মেলনে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা শুরুর বিষয়টি অনুমোদন করা হয়নি। ১৪ ও ১৫ ডিসেম্বর আবারও ইইউ সদস্য দেশগুলোর সম্মেলন। এ সম্মেলনে অনুমোদন আদায় করে আলোচনা দ্বিতীয় ধাপে নিয়ে যেতে জোর চেষ্টা চালাচ্ছে যুক্তরাজ্য। অন্যথায় আবার পিছিয়ে যাবে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নির্ধারণে আলোচনার সুযোগ।

এরই অংশ হিসেবে গতকাল ব্রাসেলসে ছুটে যান প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে। কিন্তু ডিইউপির হস্তক্ষেপে সব আলোচনা ভেস্তে গেল।

ঝামেলা আরও বেড়েছে। এখন স্কটল্যান্ডের মুখ্যমন্ত্রী নিকোলা স্টারজিওন বলছেন, প্রধানমন্ত্রী যদি বিশেষ মর্যাদা দিয়ে নর্দান আয়ারল্যান্ডকে ইইউর আইনের অধীন রাখতে সম্মত হন, তাহলে স্কটল্যান্ডকে একই সুবিধা দিতে অসুবিধা কোথায়? লন্ডন মেয়র সাদিক খানও এক টুইট বার্তায় বলেছেন, লন্ডনের ব্যাপকসংখ্যক ভোটার ইইউতে থাকার পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন। লন্ডনকেও ইইউর একক বাজারে থাকার সুযোগ দেওয়া হোক।

সব মিলিয়ে ব্রেক্সিট প্রশ্নে এক হযবরল পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো। এখন প্রধানমন্ত্রী এই ধাঁধা থেকে কীভাবে বেরিয়ে আসেন, সেটিই দেখার বিষয়। 

 
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ