নিউইয়র্কের ভাড়াটে কত অসহায়!

December 5, 2017, 7:40 PM, Hits: 147

নিউইয়র্কের ভাড়াটে কত অসহায়!

হ-বাংলা নিউজ: নিউইয়র্ক শহরের একটি অ্যাপার্টমেন্টে আগুন লাগলে মারা যায় দুটি শিশু। এটি গত বছরের ঘটনা। অগ্নিকাণ্ডের সময় অ্যাপার্টমেন্টটির অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা কাজ করেনি। যদিও এর কিছুদিন আগেই শহরটির আবাসন কর্তৃপক্ষের দেওয়া পরিদর্শন প্রতিবেদনে অ্যাপার্টমেন্টটির অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা কার্যকর বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। এমন অজস্র ভুয়া প্রতিবেদন প্রতিনিয়তই আসছে নিউইয়র্কের আবাসন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে।

কোনো ধরনের পরিদর্শন ছাড়াই নিউইয়র্ক শহরের বিভিন্ন ভবনের অবস্থা সম্পর্কে ভুয়া প্রতিবেদন দিয়ে যাচ্ছে নিউইয়র্ক নগর আবাসন কর্তৃপক্ষ (এনওয়াইএইচএ)। একবার-দুবার নয়, বহু বছর ধরেই তদারককারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা এ কাজ করে যাচ্ছেন। এমনকি বিষয়টি সম্পর্কে নগর কর্তৃপক্ষ অবহিত হলেও এ বিষয়ে তারা কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। একটি তদন্তকারী সংস্থার সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

নিউইয়র্ক শহরের বিভিন্ন ভবনের মান সম্পর্কে নির্দিষ্ট বিরতিতে পরিদর্শন করে প্রতিবেদন দাখিলের দায়িত্ব এনওয়াইএইচএর। বিশেষত, কোনো ভবনে লেড পেইন্ট করা হচ্ছে কি না, তার তদারকি এই পরিদর্শন কার্যক্রমের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মূলত ভবনগুলোর বিভিন্ন অ্যাপার্টমেন্টে বসবাসরত মানুষের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে এ ধরনের তদারককারী কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা কোনো ধরনের পরিদর্শন ছাড়াই প্রতিবেদন জমা দিয়ে আসছেন। এতে ওই সব অ্যাপার্টমেন্টের বাসিন্দাদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত হয়েও এ বিষয়ে নগর কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি; বরং বিষয়টি সাধারণ মানুষের কাছ থেকে গোপন রাখা হয়।

এ বিষয়ে নিউইয়র্ক টাইমস–এ ২৬ নভেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, এত বড় একটি ঘটনা দীর্ঘদিন ধরে চলল, সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন মহলও বিষয়টি সম্পর্কে জানল, অথচ কোনো ব্যবস্থা নিল না। এটিই প্রমাণ করে, নিউইয়র্ক শহরের বিভিন্ন ভবনের ভাড়াটেরা কতটা অসহায়। তাঁদের অসহায়ত্ব যেমন বাড়ির মালিকের কাছে, তেমনি নগর কর্তৃপক্ষের কাছেও। এটি একই সঙ্গে প্রশাসনিক ক্ষয়েরও প্রমাণ বহন করে।

ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্টের সময় পাবলিক হাউজিং সিস্টেমের পত্তন করা হয়েছিল। মূলত অল্প ভাড়ায় আমেরিকানদের জন্য বাসস্থানের সুবিধা দিতেই এ পদ্ধতি চালু করা হয়। কিন্তু শ্বেতাঙ্গ শ্রমজীবীদের সংখ্যা কমার সঙ্গে সঙ্গে যখন আরও দরিদ্র কৃষ্ণাঙ্গ ও হিসপানিকদের সংখ্যা বাড়তে থাকল, তখন ফেডারেল সরকারের এমন উদ্যোগে ভাটা পড়ল। ১৯৯০ সালের মাঝামাঝি বাজে অবস্থার ও উচ্চ সংস্কার ব্যয়ের কারণ দেখিয়ে আমেরিকায় প্রায় সিকি মিলিয়ন (আড়াই লাখ) আবাসন ইউনিট ভেঙে ফেলা হয়। তবে অন্য অনেক শহরের চেয়ে নিউইয়র্কের পাবলিক হাউজিংয়ের অবস্থাই ভালো। শ্রমজীবী মানুষের জন্য তুলনামূলক ভালো একটি আবাসন ব্যবস্থা রাখার লক্ষ্যেই এটি করা হয়। কিন্তু ২০০১ সাল থেকেই এনওয়াইএইচএ বরাবর ফেডারেল সরকারের বরাদ্দ ২ দশমিক ৭ বিলিয়ন করে কমানো হয়। এরই ধারাবাহিকতায় বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির আবাসন খাতে সংস্কার বাবদ বকেয়ার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৮ বিলিয়ন ডলার।

তহবিল সংকোচন থেকে শুরু করে নানা জটিলতার কারণে ভাটা পড়েছে এনওয়াইএইচএর সার্বিক কার্যক্রমেও। শহর ও ফেডারেল আইন অনুযায়ী, নিউইয়র্কের বিভিন্ন আবাসিক ভবনের প্রকৃত অবস্থা নিরূপণে পরিদর্শন কার্যক্রমও এর বাইরে নয়। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, ২০১২ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি কোনো পরিদর্শন না করেই প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। এ ভুয়া প্রতিবেদনের মাধ্যমে ফেডারেল ডিপার্টমেন্ট অব হাউজিং অ্যান্ড আরবান ডেভেলপমেন্টকে প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন ভবন ঠিক অবস্থায় রয়েছে বলে জানিয়েছে।

বিষয়টি সম্পর্কে গত বছরের গ্রীষ্মেই অবগত হন এনওয়াইএচএর চেয়ারপারসন শোলা ওলাতোয়ে। তখন তিনি বিষয়টি মেয়র বিল ডি ব্লাজিওকে জানান। কিন্তু বিষয়টি প্রকাশ্যে আনেননি। এ বিষয়ক প্রতিবেদনটি প্রকাশ্যে আসার আগ পর্যন্ত প্রায় দেড় বছর ধরে তাঁরা দুজনই বিষয়টি গোপন রাখেন।

আবাসন কর্তৃপক্ষের বাজেট ঘাটতি মেটাতে মেয়র ডি ব্লাজিও বিস্তর অর্থ ব্যয় করেছেন। কর্তৃপক্ষও নিজেদের কার্যক্রম বেগবান করার কথা বলছে। একই সঙ্গে উভয় অংশ থেকেই লেড পেইন্ট–বিষয়ক পরিদর্শন কার্যক্রম সত্যিকার অর্থেই পরিচালনার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু এসব প্রতিশ্রুতির কোনোটিই সত্যটিকে চাপা দিতে পারছে না। আর তা হচ্ছে সবকিছু জানা সত্ত্বেও এনওয়াইএইচএর অদক্ষতা ও দুর্নীতিকে নীরবে সহ্য ও প্রশ্রয় দিয়েছে নগর কর্তৃপক্ষ। এ কারণেই এখন সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্ট অব নিউইয়র্কের জন্য নিযুক্ত মার্কিন অ্যাটর্নি এনওয়াইএইচএর জন্য পর্যবেক্ষক নিয়োগের সুপারিশ করেছে। এটি নিশ্চিতভাবেই নিউইয়র্কের পাবলিক হাউজিংয়ের ৪ লাখ বাসিন্দার সুরক্ষার গুরুত্বকে তুলে ধরছে। একই সঙ্গে এটি নগর কর্তৃপক্ষের জন্যও কঠোর বার্তা।

 

 
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ