অশ্রুর প্রোটিন থেকে বিদ্যুৎ তৈরিতে আমরাই প্রথম

December 8, 2017, 5:52 PM, Hits: 765

অশ্রুর প্রোটিন থেকে বিদ্যুৎ তৈরিতে আমরাই প্রথম

হ-বাংলা নিউজ মানুষ এবং যে কোনো স্তন্যপায়ী প্রাণীর চোখের জলে লাইসোজাইম নামে প্রোটিন রয়েছে। এ প্রোটিন পাওয়া যায় এসব প্রাণীর লালায় এবং দুধেও। মুরগির ডিমের সাদা অংশেও এ প্রোটিন থাকে। আয়ারল্যান্ড, পর্তুগাল ও রাশিয়ার একদল বিজ্ঞানী এই প্রোটিন থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। এই দলের নেতৃত্বে রয়েছেন এক বাংলাদেশি বিজ্ঞানী। অ্যাপ্লাইড ফিজিক্স লেটার্সে তাদের গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে এ বছর ২৭ অক্টোবর। প্রবন্ধের প্রধান লেখক অ্যাইমি স্টেপলসন। ই-মেইলে আয়ারল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব লিমেরিকের তরুণ এই বিজ্ঞানীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বিজ্ঞান লেখক জাহাঙ্গীর সুর

প্রশ্ন : এ বছরের জুলাই মাসে ফিনল্যান্ডের বিজ্ঞানীরা ঘোষণা করেন, তারা বিদ্যুৎ ব্যবহার করে প্রোটিন ও কার্বন ডাই-অক্সাইড উৎপাদন করেছেন। এখন আপনারা সফল হলেন প্রোটিন থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। দারুণ আবিষ্কার। অভিনন্দন।

উত্তর : ধন্যবাদ। হ্যাঁ, ফিনিশ গবেষণাটা খুব আকর্ষণীয়। নতুন কোনো গবেষণা ও নতুন নতুন আবিষ্কারের খবর শোনা সব সময়ই আনন্দের।

প্রশ্ন : স্তন্যপায়ীদের অশ্রুতে থাকা একটা প্রোটিনে পিজোবিদ্যুতের অস্তিত্বের প্রমাণ দেওয়ার ক্ষেত্রে আপনারাই প্রথম বৈজ্ঞানিক দল। এ গবেষণা প্রবন্ধের প্রথম লেখক (ফার্স্ট অথার) হতে পেরে কেমন লাগছে?

উত্তর : এ দলে আয়ারল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব লিমেরিকের এবং পর্তুগালের ইউনিভার্সিটি অব অ্যাভিরোর গবেষকরা রয়েছেন। দীর্ঘ সময় ধরেÑ চার বছরেরও বেশিÑ এ প্রজেক্টে কাজ করছি। সুতরাং আমাদের গবেষণাকর্মকে বিশ^বাসীর কাছে তুলে ধরতে পেরে ভীষণ ভালো লাগছে। এটাকে ‘সবে শুরু’ বলে মনে করছি। আমরা আরও সামনে এগোব।

প্রশ্ন : আপনাদের দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বাংলাদেশি বিজ্ঞানী সৈয়দ তোফায়েল। তার নেতৃত্বকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন?

উত্তর : পাঁচ বছর আগে আমি ব্যাচেলর থিসিস শুরু করি। তখন থেকেই তোফায়েল আমার অধীক্ষক (সুপারভাইজর)। এরপর তিনি আমার পিএইচডির অধীক্ষক। সব সময়ই তোফায়েলকে আমি খুব চমৎকার একজন অধীক্ষক, নেতা ও বিজ্ঞানী হিসেবে পেয়েছি।

দল গঠনের ব্যাপারে তোফায়েলের অসাধারণ প্রতিভা আছে। তার বর্তমান দলের নাম মোজাইক। এ গবেষণা দলে বিশে^র অসাধারণ বিজ্ঞানীরা যুক্ত রয়েছেন। একেক ক্ষেত্রে একেকজনের দক্ষতা ও পারদর্শিতা।

আমার বিজ্ঞানযাত্রায় তিনি যেভাবে পথ দেখিয়েছেন এবং যতটা সমর্থন জুগিয়ে আসছেন, এ জন্য আমি তোফায়েলের কাছে কৃতজ্ঞ। তিনি খুব প্রতিভাবান বিজ্ঞানী ও নেতা এবং আমি নিশ্চিত, তিনি অনেক বড় কিছু আবিষ্কার ও অর্জন করবেন।

প্রশ্ন : প্রোটিনটির নাম লাইসোজাইম। এ প্রোটিনের অন্য জৈব-উৎসগুলো কী-কী?

উত্তর : লাইসোজাইম হলো গ্লোবিউলার [গোলাকার ও জলে দ্রবণীয়, যেমন : হিমোগ্লোবিন] প্রোটিন। চোখের জলে তাদের দেখা মেলে। তবে অন্য নিঃসরণেও এদের পাওয়া যায়। যেমন স্তন্যপায়ী প্রাণীর লালা ও দুধে এরা থাকে। এটা প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায় মুরগির ডিমের সাদা অংশে।

প্রশ্ন : লাইসোজাইম প্রোটিনের ক্রিস্টালে চাপ প্রয়োগ করে আপনারা বিদ্যুৎ তৈরি করেছেন। সাধারণভাবে আমাদের বোঝানোর জন্য কী বলা যায়, নির্দিষ্ট পরিমাণ অশ্রু থেকে কিংবা পাখির ডিম থেকে ঠিক কতখানি বিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব?

উত্তর : এটা খুব ভালো একটা প্রশ্ন। এবং এর উত্তর করাটা বেশ কঠিনও। প্রথমে আমরা মুরগির ডিমের সাদা অংশ থেকে তৈরি লাইসোজাইম প্রোটিন পাউডার থেকে লাইসোজাইম ক্রিস্টাল বানাই। আমি এটা ঠিক করে বলতে পারছি না, নির্দিষ্ট পরিমাণ প্রোটিন পাউডার তৈরি করতে কত মুরগির ডিম লাগবে। কিন্তু এটা বলতে পারি, প্রোটিন ক্রিস্টাল তৈরি করতে খুব সামান্য পরিমাণই প্রোটিন পাউডার লাগবে। এমনকি এটা একশ মিলিগ্রামেরও কম।

লাইসোজাইম ক্রিস্টালের ফিল্মে পিজোতড়িৎ ক্রিয়া প্রায় ছয় পিকো-কুলম্ব পার নিউটন। এটা কোয়ার্টজের চেয়ে বেশি [কোয়ার্টজ হলো সিলিকন ডাই-অক্সাইডের খনিজ যা আগ্নেয় বা পাললিক শিলায় পাওয়া যায়]। পিজোবৈদ্যুতিক বৈশিষ্ট্যাদির জন্য এটা ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। অথচ কোয়ার্টজের পিজোতড়িৎ ক্রিয়া লাইসোজাইমের চেয়ে কম, মাত্র ২ পিকো-কুলম্ব পার নিউটন।

প্রশ্ন : ক্রিস্টালকে শক্তভাবে বা সজোরে চাপ দিয়ে পাওয়া বিদ্যুৎকে বলা হচ্ছে পিজোবিদ্যুৎ। এটা আবিষ্কার হয়েছিল ১৮৮০ সালে। কুরি ভ্রাতৃদ্বয়Ñ জ্যাকস ও পিয়েরে কুরি পিজোবিদ্যুৎ আবিষ্কার করেন। পিজোবিদ্যুৎ নিয়ে গবেষণা করাটা কেন দরকারি বলে মনে করেন?

উত্তর : পিজোবিদ্যুতের অনেক তাৎপর্যপূর্ণ ব্যবহার রয়েছে। দৈনন্দিন কাজ থেকে শুরু করে আল্ট্রা-সাউন্ড ইমেজিংয়ে এটা কাজে লাগে। যেমন সিগারেট লাইটারের ইগনাইটারে এটা ব্যবহৃত হয়। এসব কাজে পিজোবিদ্যুতের ভূমিকা বাড়াতে ও উন্নত করতে আরও গবেষণা দরকার।

আমাদের গবেষণার মতো জৈব পদার্থে পাওয়া পিজোবিদ্যুৎ নিয়ে গবেষণা একটা বিষয়ে সাহায্য করবে : শরীরে এ বিদ্যুৎ কোনো অবদান রাখতে পারে কিনা, তা বোঝা যাবে। উদাহরণস্বরূপ, দীর্ঘদিন ধরে আমরা জানি, আমাদের হাড়গুলো পিজোবৈদ্যুতিক। এবং ধারণা করা হয়, এ কারণেই হাড় আপনা থেকেই জখম নিরাময় করে।

প্রশ্ন : এমনকি সেই উনিশশ ষাটের দশক থেকেই জীববিজ্ঞানীরা লাইসোজাইমের ক্রিস্টালের গড়ন-কাঠামো সম্পর্কে জানেন।

উত্তর : ঠিক বলেছেন। অনেক দিন আগে থেকেই লাইসোজাইমের গড়ন-কাঠামো সম্পর্কে জানা আছে আমাদের। এমনকি লাইসোজাইম হচ্ছে সবচেয়ে বেশি গবেষণা হওয়া প্রোটিনগুলোর অন্যতম। কিন্তু এরপরও এর অনেক রহস্য অজানা! অত্যন্ত দুর্বল ও ভঙ্গুর হওয়ায় প্রোটিন ক্রিস্টাল নিয়ে কাজ করা খুব কষ্টসাধ্য। একে নিয়ন্ত্রণ করার পদ্ধতি জানতে পারায় নতুন উপায়ে লাইসোজাইম নিয়ে অনুসন্ধান চালাতে পেরেছি আমরা।

প্রশ্ন : ক্রিস্টাল লাইসোজাইমে পিজোবিদ্যুৎ আবিষ্কার করাÑ এ কৃতিত্বে কী-কী বিষয় প্রথম ঘটল?

উত্তর : আমাদের গবেষণাই প্রথম দেখিয়েছে, লাইসোজাইম প্রোটিনেরা পিজোবৈদ্যুতিক। উনিশশ পঞ্চাশের দশক থেকে আমরা জানি, কিছু জৈবপদার্থ (যেমন হাড় ও কাঠ) পিজোবৈদ্যুতিক। কিন্তু এই প্রথম আমরা পিজোবিদ্যুৎ দেখতে পেলাম কোনো গ্লোবিউলার প্রোটিনে।

প্রশ্ন : মানুষের কল্যাণে লাগে এমন কী কী কাজে এই জৈব-পিজোবিদ্যুৎকে ব্যবহার করা যেতে পারে?

উত্তর : আমরা কল্পনা করছি, ভবিষ্যতে বৈদ্যুতিক যন্ত্রগুলোয় শক্তি আরোহী হিসেবে লাইসোজাইম ব্যবহৃত হবে হয়তো। বিশেষত বায়োমেডিক্যাল যন্ত্রাদিকে বিদ্যুৎ জোগাতে এ প্রোটিন কাজে লাগবে। অন্য অনেক পিজোবৈদ্যুতিক বস্তু বেশ বিষাক্ত, কেননা এসবে সিসা থাকে। কিন্তু লাইসোজাইম প্রাকৃতিকভাবে জৈব সামঞ্জস্যপূর্ণ। ফলে এটা বেশি উপকারী হবে।

প্রশ্ন : সুতরাং অশ্রু কেবলই যন্ত্রণার গোপন ভাষা নয়, যেমনটা ভলতেয়ার বলেছিলেন। অশ্রু বিদ্যুতের গোপন উৎসও বটে।

উত্তর : ঠিক বলেছেন।

প্রশ্ন : অনেক অনেক ধন্যবাদ।

উত্তর : আমাদের গবেষণা নিয়ে আপনার আগ্রহের জন্য আপনাকেও ধন্যবাদ জানাই।

 

 
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ