কানেকটিকাট বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজী নজরুল ইসলাম চেয়ার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ফান্ড রেইজিং সংগৃহীত ৩৪,৫৫০ ডলার

December 13, 2017, 11:20 AM, Hits: 1611

কানেকটিকাট বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজী নজরুল ইসলাম চেয়ার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ফান্ড রেইজিং সংগৃহীত ৩৪,৫৫০ ডলার

সালাহউদ্দিন আহমেদ,হ-বাংলা নিউজ:   ‘বিদ্রোহী কবি’ নামে খ্যাত বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম স্মরণে যুক্তরাষ্ট্রের কানেটিকাট বিশ্ববিদ্যালয়ে চেয়ার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নিউইয়র্কে তহবিল সংগ্রহ করা হয়েছে। গত ৯ ডিসেম্বর শনিবার সন্ধ্যায় জ্যাকসন হাইটসে এই ফান্ড রেইজিং ডিনার আয়োজন করা হয়। মূলত: কানেকটিকাট বিশ্ববিদ্যালয়ের নজরুল এনডোওমেন্ট কমিটি, নর্থ আমেরিকা নজরুল কনফারেন্স কমিটি ও নজরুল একাডেমী অব ইউএসএ যৌথভাবে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। উল্লেখ্য, দেশী-বিদেশী নজরুল বিশেষজ্ঞ আর যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী আমেরিকান ও বাংলাদেশী-আমেরিকান কবি নজরুল ভক্ত-সমর্থকগণ এই উদ্যোগ নিয়েছেন। 

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নিউইয়র্কে আয়োজিত প্রথম ফান্ড রেইজিং-এ শনিবার ৩৪ হাজার ৫৫০ ডলার সংগৃহীত হয়েছে। এছাড়াও আরো অনেকের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে। তিনি বলেন, কানেকটিকাট বিশ্ববিদ্যালয়ে নজরুল চেয়ার প্রতিষ্ঠা করতে দুই মিলিয়ন ডলার প্রয়োজন। 

আগামী ৫ বছরের মধ্যে উদ্যোগটি বাস্তবায়নের সম্ভাবনা দেখছেন উদ্যোক্তাগণ। অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী অর্ধ মিলিয়ন প্রবাসী বাংলাদেশীরা যদি প্রত্যেকে ৪ ডলার করে অনুদান দেন তাহলে সহজেই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন সম্ভব। খবর ইউএনএ’র। 

সিটির জ্যাকসন হাইটসের বেলোজিনো পর্টি হলে আয়োজিত ফান্ড রেইজিং ডিনার অনুষ্ঠানমালার মধ্যে ছিলো প্রামাণ্য চিত্র প্রদর্শনী, আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। কানেকটিকাট বিশ্ববিদ্যালয়ে কবি কাজী নজরুল ইসলাম চেয়ার প্রতিষ্ঠার অন্যতম উদ্যোক্তা এবং নজরুল একাডেমী নিউইয়র্কের সভাপতি সৈয়দ টিপু সুলতানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথি ছিলেন জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের স্থায়ী রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন

মোমেন, নিউইয়র্কের কনসাল জেনারেল শামীম আহসান এবং কাজী নজরুল ইসলাম চেয়ার প্রতিষ্ঠার অন্যতম উদ্যোক্তা নজরুল গবেষক ড. গুলশান আরা কাজী, বেলাল কাজী, উত্তর আমেরিকা নজরুল কনফারেন্স কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. জিয়াউদ্দিন আহমেদ ও চলচ্চিত্র নির্মাতা ক্যাথরিন মাসুদ। 

উল্লেখ্য, প্রতিকূল আবাহওয়ার কারণে এশিয়ান এন্ড এশিয়ান আমেরিকান স্টাডিজ ইন্সটিটিউট’র পরিচালক এবং নজরুল এনডোওমেন্ট কমিটি অব ইউসিওএনএন’র চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. ক্যাথি স্কলন্ড-ভিয়ালস, এশিয়ান এন্ড এশিয়ান আমেরিকান কালচারাল সেন্টারের পরিচালক অ্যাঞ্জেলা রোলা, হিউম্যান রাইটস ইন্সটিটিউটের পরিচালক প্রফেসর ড. গ্লিন মিটোমা, ‘কাজী নজরুল ইসলাম : দ্যা ভয়েস অব পয়েট্রি এন্ড দ্যা স্ট্রাগল ফর হিউম্যান হোলনেস’ গ্রন্থের লেখক প্রফেসর ড. উইন্সটন ই ল্যাগলী এবং নজরুল গবেষক, কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্ণার্ড কলেজের এশিয়ান এন্ড মিডল ইস্টার্ন কালচারাল স্টাডিজ-এর প্রফেসর ড. রাসেল ফিল ম্যাকডেরমট অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে পারেননি।

অনুষ্ঠানের প্রথম পর্বের আলোচনায় রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন বলেন, বিশ্বব্যাপী নানা ফোবিয়া আর এক্সট্রিমিষ্ট প্রভৃতির বিরুদ্ধে কাজী নজরুল ইসলামের চেতনা ভূমিকা রাখতে পারে। তাই বিশ্বব্যাপী শান্তির জন্য নজরুল চর্চা জরুরী।  যদিও কাজটি সহজ নয়, চ্যালেঞ্জের। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী হাফ মিলিয়ন বাংলাদেশী যদি ৪ ডলার করে অনুদান দিয়ে সহযোগিতা করেন তাহলে সহজেই উদ্যোগটি কাস্তবায়ণ সম্ভব। এজন্য তিনি সকল প্রবাসীর সার্বিক সহযোগিতা কামনা করে বলেন, আমরা বাংলাদেশ মিশনের পক্ষ থেকে জাতিসংঘের ১৯২টি দেশের প্রতিনিধিদের কাঝে কবি নজরুলকে তুলে ধরার চেষ্টা করবো। তাদের সহযোগিতা কামনা করবো। এজন্য আমরা সবাই মিলে জাতিসংঘে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করতে পারি।

শামীম আহসান বলেন, বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের অন্তরের মাঝে গভীরভাবে আছেন। তিনি আমাদের জাতীয় কবির বাইরে সমগ্র মানবতার কবি, সবার কবি। কবি নজরুল বাংলাদেশের জন্য যে কত বড় সম্পদ তা বলে শেষ করা যাবে না। তিনি সমগ্র বিশ্বের সম্পদ। তাকে তুলে ধরা মানেই বাংলাদেশকে তুলে ধরা। কাজী নজরুল চেয়ার প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে যদি কিছু করার থাকে যেব্যাপারে তিনি সাধ্যমতো কাজ করার চেষ্টা করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন। 

ড. গুলশান আরা কাজী বলেন, আজ মৌসুমের প্রথম বরফ পড়েছে। এটি একটি সিম্বলিক রাত এই জন্যই যে, কবি নজরুলের জন্মদিনের রাতটি ছিলো একটি ঝঞ্জাবহুল রাত। তিনি বলেন, বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে শুরু আমাদের ঐতিহাসিক যাত্রা পথের নতুন মাইল ফলক। কেননা, এই বিজয়ের মাসে আমরা কানেকটিকাট বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজী নজরুল চেয়ার প্রতিষ্ঠার যাত্রা শুরু করেছি। তিনি বলেন, নজরুল সকল বাঙালীর গর্বের ধন। তাই তার নামে কিছু করতে গেলে কোন প্রতিবন্ধকতাই বাঁধার সৃষ্টি করতে পারবে না। আমাদের ভিষন-মিশন হচ্ছে নজরুলকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেয়া। তিনি বলেন, সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া এই মহতি উদ্যোগ সফল হবে না। তিনি বলেন, আশার কথা হচ্ছে যে, অনেক আমেরিকান আমাদের এই উদ্যোগে সাড়া দিয়েছেন, উৎসাহ দিচ্ছেন। 

কাজী বেলাল বলেন, সবার সাহায্য পেলে কাজী নজরুল ইসলাম চেয়ার প্রতিষ্ঠা কোন সমস্যা হবে না। তিনি বলেন, চেয়ার তো বটেই, আমরা নজরুলকে চেয়ারের উপরে পৃথীবিতে সবার মাঝে পৌঁছে দিতে চাই। তিনি বলেন, ১৯৮৫ সালে প্রবাসে কবি নজরুলকে নিয়ে কাজ শুরু করি। ১৯৯০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম কবি নজরুল কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়। 

ডা. জিয়াউদ্দিন আহমেদ বলেন, কবি নজরুল ইসলামকে পরিচিত করা মানেই বিশ্বের কাছে আমাদেরকে পরিচিত করা। তার আদর্শ বাস্তবায়িত হলে বিশ্বে শান্তি আসবে। তিনি বলেন, ১৯৯০ সালে নর্থ আমেরিকা নজরুল কনফারেন্সের আয়োজন করা হয়। দিনে দিনে নজরুল ভক্তের সংখ্যা বাড়ছে বলেই আমরা কবি নজরু কে বিশ্বব্যাপী তুলে ধরার সাহস পাচ্ছি। 

ক্যাথরিন মাসুদ বলেন, বাংলাদেশের সাথে নতুন করে যোগাযোগ করইে নজরুল কনফারেন্স কমিটিরসাথে পরিচয় হয়। আর সেই সূত্র ধরেই নজরুল চেয়ার প্রতিষ্ঠার জন্য কিছু করতে চাই। তিনি বলেন, আজ নিউইয়র্কে বাংলাদেশের হৃদয় পেয়েছি। কবি নজরুলের জন্য যা করার তাই করবো, যেখানে যাওয়ার যাবো। তার টানে আমরা স্বপ্ন দেখছি, কবি নজরুলকে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি। তিনি বলেন, কবি নজরুল চেয়ার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তাকে তুলে ধরার এটাই বড় সুযোগ। সবাই মিলে এই সুযোগ কাজে লাগাতে হবে। 

অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে ছিলো মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এতে নজরুল একাডেমীর শিল্পীরা সঙ্গীত পরিবেশন করেন। অনুষ্ঠানের বিভিন্ন পর্ব উপস্থাপনায় ছিলেন শাহ আলম দুলাল ও মতলব আলী। 

সৈয়দ টিপু সুলতান কানেকটিকাট বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শন ও একটি অনুষ্ঠানে যোগদান করার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বলেন, কানেকটিকাট বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজী নজরুল ইসলাম চেয়ার প্রতিষ্ঠা করা সহজ কাজ নয়, এটি একটি বিশাল কর্মযজ্ঞ। সবার সহযোগিতা পেলে অবশ্যই আমরা সফল হবো। 

সৈয়দ টিপু সুলতান জানান, এই উদ্যোগে নজরুল ভক্ত দেশী-বিদেশী সকল মহলের ব্যাপক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। এজন্য আয়োজিত তহবিল সংগ্রহের অনুষ্ঠানের জন্য জনপ্রতি ১০০ ডলার অনুদান ধার্য্য করা হয়েছে। এছাড়াও রয়েছে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে বিশেষ স্পন্সরশীপ অনুদান প্রদানের ব্যবস্থা। এরমধ্যে রয়েছে ব্রঞ্জ স্পন্সর ৫০০ ডলার, সিলভার স্পন্সর ১,০০০ ডলার, গোল্ড স্পন্সর ৫,০০০ ডলার, ডায়মন্ড স্পন্সর ১০,০০০ ডলার এবং প্লাটিনাম স্পন্সর ২০,০০০ ডলার। সকল অনুদান সস্পূর্ণ আয়করমুক্ত।

সৈয়দ টিপু সুলতান আরো জানান, স্পন্সরকারীদের নাম কানেকটিকাট বিশ্ববিদ্যালয়ে রেজিষ্ট্রিভুক্ত থাকবে, তাদেরকে বিশ্ববিদ্যায় থেকে সম্মাননা প্ল্যাক প্রদান ও সম্মাননা পত্র প্রদান করা হবে। নজরুল চেয়ার প্রতিষ্ঠার জন্য আয়োজিত তহবিল সংগ্রহ অনুষ্ঠানটি সফল করার জন্য সবার সার্বিক সহযোগিতা কামনা করেছেন।

আলোচনা পর্ব শেষে উপস্থিত সুধী ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ প্রশ্ন-উত্ত পর্বে অংশ নিয়ে অতি সংক্ষেপে তাদের মতামত ও পরামর্শ তুলে ধরেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন সাপ্তাহিক পরিচয় সম্পাদক নাজমুল আহসান, সাপ্তাহিক বাঙালী সম্পাদক কৌশিক আহমেদ, বিশিষ্ট রিয়েল এস্টেট ইনভেস্টর মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন, কমিউনিটি অ্যাক্টিভিষ্ট জসিম উদ্দিন, বিশিষ্ট আবৃত্তিকার কবীর কিরণ প্রমুখ। 

অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সম্মিলিতভাবে সঙ্গীত পরিবেশন করেন নজরুল একাডেমী নিউইয়র্কের কর্মকর্তা ও সদস্যবৃন্দ যথাক্রমে নজরুল ইসলাম, ফাতেমা ইসলাম চুমকি, রুমা আলম, নার্গিস রহমান, শিরিন আহমেদ, ডানা ইসলাম, রোকসান আরা ও শাহ আলম দুলাল। এছাড়া গিটারে সঙ্গীত পরিবেশন করেন রেহানা মতলুব আলী। একক সঙ্গীত পরিবশেন করেন অনুপ বরুয়া। কবিতা আবৃত্তি করেন মুমু আনসারী। তবলায় ছিলেন তপন মোদক, কিবোর্ডে ছিরেন রিপন, অক্টোপাসে ছিলেন সাত্তার ও সজিব এবং মন্দিরায় ছিলেন শফিক। এই পর্ব উপস্থাপনায় ছিলেন মতলুব আলী। 

 

 
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ