নিউইয়র্কে 'সাহিত্য একাডেমি, নিউইয়র্ক 'র উদ্যোগে আলোচনা সভা

January 4, 2018, 9:21 AM, Hits: 126

নিউইয়র্কে 'সাহিত্য একাডেমি, নিউইয়র্ক 'র উদ্যোগে আলোচনা সভা

হাকিকুল  ইসলাম খোকন,বাপসনিঊজ:ঝড়, বৃষ্টি,  তুষারপাত সে যাই হোক না কেন মাসের শেষ শুক্রবারটি যেন নিউইয়র্ক শহরে বসবাসরত সাহিত্যমোদীদের জন্য সাহিত্য একাডেমিকে ঘিরে একটি আনন্দের দিন। বছরের নিয়মিত শেষ আসরটিতে এবারো তার ব্যতিক্রম হয়নি।  হাঁড় কাঁপানো শীতেও বিপুল সংখ্যক সাহিত্যপ্রেমীরা  প্রাণের টানে ছুটে এসেছেন সাহিত্য একাডেমিতে। বাহিরে প্রবাহিত শৈত্য প্রবাহের আধিপত্য, ভেতরের  চা- কফির উষ্ণ আতিথেয়তায় যেন দূর হয়ে গেছে! 

বিজয় দিবসের প্রতি যথাযথ শ্রদ্ধা জানিয়ে পুরো অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন 'সাহিত্য একাডেমি, নিউইয়র্ক ' এর পরিচালক মোশাররফ হোসেন। আলোচনার মাঝে মাঝে এবারও প্রায় ৩০ জনের  মত  লেখক, কবি তাদের লেখা পাঠ করেন। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন হাসান ফেরদৌস, ফজলুর রহমান, তমিজ উদদীন লোদী, আহমাদ মাযহার, ফকির ইলিয়াস, এবিএম সালেহ উদ্দীন।

নিজেদের লেখা কবিতা, গল্প,  প্রবন্ধ এবং আবৃত্তি  করেন সুরীত বড়ুয়া, নাসিরুল্লাহ মোহাম্মদ, ইশতিয়াক রুপু, আবুল বাশার, কাজী আতিক, রানু ফেরদৌস, শামীম আরা আফিয়া, স্বফন দেওয়ান, ফারহানা ইলিয়াস তুলি, বেগম সোনিয়া কাদির, ফকির ইলিয়াস,  আহম্মদ হোসেন বাবু, মমতাজ বেগম (আলো),  শাহীন ইবনে দিলওয়ার, নাসিমা আকতার, কামরুন নাহার রীতা, পলি শাহীনা, তাহমিনা সাইদ, আবু সাঈদ রতন, নীরা কাদরী, মোশাররফ হোসেন,  সালেহীন সাজু, আনোয়ার সেলিম, পারভীন পিয়া,  উইলি মুক্তি প্রমুখ।

শুরুতেই লেখক আহমাদ মাযহার তার আলোচনায় বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনকে তুলে ধরেন। সময়ের পরিক্রমায় লেখকের সৃষ্টিকর্ম তাঁকে অধিষ্ঠিত করেন মহামানবের আসনে। ৯-ই ডিসেম্বর 'বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন'এর জন্মদিন উপলক্ষে  আহমাদ মাযহার তাঁর ' সুলতানার স্বপ্ন' উপন্যাসটির উপরে আলোকপাত করে বলেন,  ' বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন শুধুমাত্র একজন সমাজ সংস্কারক নয় সাহিত্যের দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনা করলে তিনি ছিলেন একজন সৃজনশীল মানুষ। ' তিনি আরো বলেন,  ' সুলতানার স্বপ্ন উপন্যাসটির গঠন অসাধারণ হওয়া সত্বেও বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের দিকে তাকালে  দেখা যায় সে সময়টায় তার কথা কোথায়ও তেমন উল্লেখযোগ্য ভাবে আসেনি। হিন্দু সমাজ খেয়াল-ই করেনি যে মুসলমানরা সাহিত্য চর্চা শুরু করেছেন। ' 

এরপর কবি তমিজ উদদীন লোদী তার নির্ধারিত বক্তব্যে গণমানুষের কবি দিলওয়ারকে তুলে ধরেন।  মহকালের ইতিহাসে লেখকের রচিত সাহিত্যই কথা বলবে। বাংলা একাডেমি ও একুশে পদকপ্রাপ্ত গণমানুষের কবি' দিলওয়ার' সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে কবি তমিজ উদদীন লোদী বলেন, ' কবি দিলওয়ার একজন অসাধারণ মানুষ ছিলেন। কবিতা লেখার জন্য যারাই যেতেন তাঁর কাছে সবাইকে পরম মমতায় কাছে টেনে নিতেন। ছন্দের প্রতি তার প্রবল নিষ্ঠা ছিল।  মাত্রাবৃত্ত, অক্ষরবৃত্ত, স্বরবিত্তে লিখতেন তিনি। সাধারণ মানুষদের সাথে মিশে যেতেন অনায়াসেই। সবসময় পড়ার মধ্যেই থাকতেন। কবি দিলওয়ার একজন প্রথম সারির গীতিকার ছিলেন। গীতিকবিতা যারা লিখেছেন কবি দিলওয়ার ছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম।তাঁর আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এবং কবি দিলওয়ারের অপ্রকাশিত রচনাবলী যেন প্রকাশিত হয় সে আশা পোষণ করে তমিজ উদ্দিন লোদী তার আলোচনার ইতি টানেন।

কবির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে কবিপুত্র শাহীন ইবনে দিলওয়ার এবং মোশাররফ হোসেন একটি করে কবিতা পড়েন। এরপরেই শুরু হয় লেখকদের লেখা পাঠ।

এই পর্যায়ে পঠিত লেখার উপরে আলোকপাত করেন কবি ফকির ইলিয়াস। তিনি বলেন, ' অগ্রজ কবিরা কি বলেছেন তা জানা দরকার, তাঁদের বই পড়া আবশ্যক। কবির কবিতা একজন মানুষের সাথে কিভাবে শক্তিশালী সংযোগ তৈরি করেন তা বর্ণনা করতে গিয়ে ফকির ইলিয়াস উল্লেখ করেন কবি দিলওয়ারের কথা। তাঁর কবিতা পড়ে কিভাবে ঢেউ আঁচড়ে পড়ে পিলারের গায়ে তা দেখার জন্য নৌকা করে তিনি সে জায়গাটি পরিদর্শনে যান। ' 

পাঠকদের ভালোবাসা, আদরে লেখকরা থাকেন তাদের হৃদয়ে। প্রতিটি মানুষের জীবন যেন অলিখিত গল্পের একেকটি মহাসমুদ্র। সাপ্তাহিক ঠিকানা পত্রিকার প্রধান সম্পাদক ফজলুর রহমান বলেন, ' ভালোবাসা দিয়ে খুব সহজে মানুষকে তুষ্ট করা যায়। এখানে ভালোবাসা পাই তাই ফিরে ফিরে আসি। গণমানুষের কবি দিলওয়ার, বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের মত আলোকিত মানুষেরা ছিলেন বলেই আমরা বাঙালীরা গর্ব করতে পারি।অনুষ্ঠানে উপস্থিত সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, বেশী বেশী  পড়বেন, লিখবেন এবং ভালো মানুষ হবার চেষ্টা করবেন। ' 

লেখক এবিএম সালেহ উদ্দিন বলেন, ' আনন্দ এবং বেদনা দুটোই রয়েছে এই বছর জুড়ে। সবাইকে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়ে সামনের দিনগুলো যেন সবার জন্য মঙ্গলময় হয় সে  প্রত্যাশা করেন।

বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি' শহীদ কাদরী'র ' সদ্য প্রকাশিত কবিতার বই ' গোধূলির গান' থেকে কবিতা পাঠ করেন কবি পত্নী নীরা কাদরী।

ভেদ-ক্লেদ ভুলে প্রতিটি প্রাণ জেগে উঠুক নতুন বছরে প্রাণের আনন্দে। কবি কাজী আতিক সবাইকে আগাম নতুন বছরের শুভেচ্ছা জানিয়ে তার নিজের দুটো কবিতা পাঠ করেন। 

কবি তার লেখায় মহাকালের ছবি এঁকে যান। কবি সোনিয়া কাদির বলেন, ' কবি দিলওয়ারের লেখা থেকে তিনি উপকৃত, অনুপ্রাণিত হয়েছেন। তাঁর অফুরন্ত স্নেহের ঢালি থেকে তিনি নিজেকে সমৃদ্ধ করেছেন। 

লেখক হাসান ফেরদৌস নিজ বই থেকে পাঠকৃত প্রবন্ধে  উঠে এসেছে ইতিহাসে দূষ্ট লোকেরাও কবিতা লিখেছেন যেমন, হিটলার, মুসোলিনী প্রমুখ। 'কবিতা লেখকের ভাবনা দৃষ্টির আয়না হলেও লেখকরা অন্যরকম বিশেষ শ্রেণীর মানুষ। তারা চিন্তা, চেতনায় সবাই নিজের জায়গায় আলাদা স্বত্বা। ' তাঁর প্রবন্ধটি পাঠ শেষে বিষয়বস্তুর সাথে সংশ্লিষ্ট কিছু কিছু প্রশ্নের উত্তর দেন।

অনুষ্ঠানের প্রায় শেষ পর্যায়ে এসে কবি তমিজ উদদীন লোদী ও ফকির ইলিয়াসকে সাহিত্য একাডেমির পক্ষ হতে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানানো হয়।সকলকে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়ে এবং জানুয়ারি মাসের শেষ শুক্রবার আবারো সাহিত্য একাডেমি'র মাসিক আসরে মিলিত হবার প্রত্যাশা রেখে একাডেমি'র পরিচালক মোশাররফ হোসেন অনুষ্ঠানের সমাপ্তি টানেন।

 

 
সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ