'দুর্নীতিবাজদের সহায়তা করবে ৩২ ধারা'

February 2, 2018, 5:02 AM, Hits: 468

'দুর্নীতিবাজদের সহায়তা করবে ৩২ ধারা'

মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত খসড়া ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৩২ ধারা ব্যাপারে আইনজীবী, তথ্য অধিকার কর্মী, সাবেক সচিব, সাংবাদিক নেতাসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ আশঙ্কা করছেন, এই ধারার অপপ্রয়োগ হতে পারে। তাদের অভিমত, এই ধারা অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে। সরকারি অফিসে দুর্নীতিকে অবাধ করে তুলবে। তারা এ আইন সংসদে পাসের আগে এর অপপ্রয়োগ বন্ধে যথাযথ সংশোধন আনার তাগিদ দিয়েছেন। 

আইনের ৩২ ধারা সম্পর্কে আইনজীবী ব্যারিস্টার তানজিব উল আলম সমকালকে বলেন, খসড়া আইন পড়ে বোঝা যায়, এ ধরনের আইন প্রণয়নের জন্য যে গবেষণা ও তুলনামূলক আইন পড়ার এবং আইনটিকে গ্রহণযোগ্য ও অপপ্রয়োগ রোধে যে প্রচেষ্টার প্রয়োজন হয়, সেসব করা হয়নি। ফলে এ আইনের ৩২ ধারাসহ একাধিক ধারার অপপ্রয়োগের আশঙ্কা রয়েছে। সরকারি অফিসের কোনো ফাইলের ছবি তোলার জন্য ১৪ বছরের জেল- এটা খুব বড় সাজা। তিনি বলেন, ধারার শুরুতেই 'বেআইনিভাবে' প্রবেশের কথা বলা হয়েছে। এখানে কথা উঠবেই যে, আইনিভাবে অনুমতি নিয়ে কোনো অফিসে ঢোকার বিষয়টি কীভাবে প্রমাণ করা হবে। 

সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার বলেন, তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারার মতো এটিরও অপপ্রয়োগের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। তিনি বলেন, সরকারি অফিসে কোনো নির্দিষ্ট আইনে কোনো তথ্যকে সুনির্দিষ্টভাবে 'গোপনীয়' বলা হলে কোনো নির্দিষ্ট ফাইল বা তথ্য 'গোপনীয়' বিবেচিত হতে পারে। তথ্য অধিকার আইনের ৭ ধারায়ও কিছু কিছু ক্ষেত্রে তথ্যের গোপনীয়তার কথা বলা হয়েছে। এগুলো ছাড়া আর কোনো ফাইল বা তথ্যই সরকারি অফিসে গোপনীয় নয়। 

এ প্রসঙ্গে এমআরডিআই-এর নির্বাহী পরিচালক হাসিবুর রহমান মুকুর সমকালকে বলেন, তথ্য অধিকার আইন আর ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন দুটি পৃথক বিষয়। কিন্তু যে কোনো আইন করার ক্ষেত্রেই বিবেচনায় রাখতে হবে, আইনটি যেন জনগণের তথ্য পাওয়ার অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হয়।

এ ব্যাপারে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের এক বিবৃতিতে উদ্বেগ জানিয়ে বলা হয়, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮-এর খসড়ায় ২৫, ২৮, ২৯ এবং ৩১ ধারায় ৫৭ ধারার অনুরূপ বক্তব্য যুক্ত হয়েছে। এ ছাড়া আশঙ্কা রয়েছে, এটির ৩২ ধারা সাংবাদিক, লেখকসহ অন্যান্য বুদ্ধিবৃত্তিক ও তথ্য সংগ্রহের কাজে সম্পৃক্ত পেশাজীবীদের কর্মক্ষেত্র সংকুচিত করবে। আইন ও সালিশ কেন্দ্র আইনটি কার্যকর করার আগে এর বিভিন্ন ত্রুটি সংশোধনের দাবি জানিয়েছে। 

এ আইন সম্পর্কে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান সমকালকে বলেন, এ আইনের নাম ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন রাখা হলেও প্রকৃতপক্ষে এটি ডিজিটাল নিরাপত্তাহীনতা আইন হয়ে উঠেছে। এ আইন সংবিধানে প্রদত্ত নাগরিকের মত ও সংবাদমাধ্যমের তথ্য প্রকাশের অধিকার খর্ব করবে। 

এ আইনের ফলে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা প্রবল বাধার মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন সাংবাদিক নেতা এবং সিনিয়র সাংবাদিকরা। বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি মনজুরুল আহসান বুলবুল বলেন, জঙ্গি কর্মকাণ্ডের জন্য কোনো অফিসের ফাইল গোপনে তোলা আর সাংবাদিকতার জন্য ছবি তোলা একই ধরনের অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে না। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার জন্য তথ্য সংগ্রহকে কোনোভাবেই অপরাধ বলা যায় না। তাই কেউ গুপ্ত ক্যামেরা বা ডিজিটাল ডিভাইস কোনো সন্ত্রাসী কাজের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করলে তার বিচার হতে হবে; কিন্তু সাংবাদিকরা পেশাগত কাজের জন্য এগুলো ব্যবহার করলে তা ভিন্নভাবে দেখতে হবে। এখানে ডিভাইস মুখ্য না হয়ে কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার হচ্ছে, তা বিবেচনায় নিতে হবে। একই সঙ্গে এর অপপ্রয়োগ রোধের সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা থাকতে হবে। তিনি বলেন, এ আইনটি সংসদে পাসের আগে সাংবাদিক নেতা এবং তথ্য অধিকার বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে মতবিনিময় করে চূড়ান্ত করা দরকার। 

সিনিয়র সাংবাদিক এবং একাত্তর টিভির পরিচালক (বার্তা) সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা সমকালকে বলেন, সরকারি অফিসের অনিয়ম-দুর্নীতি আড়ালে রাখার কৌশল হিসেবেই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ৩২ ধারা সংযুক্ত করা হয়েছে। 

রাজনৈতিক নেতারা যা বলেন :ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, চিন্তা-ভাবনা করেই আইনটি করা হচ্ছে। আইনমন্ত্রী, তথ্যমন্ত্রীসহ সংশ্নিষ্ট সবাই এতে তাদের মতামত দিয়েছেন। বিএনপির শাসনকালেই আইসিটি আইনটি করা হয়েছিল। এতে কিছু অস্পষ্টতা ছিল। সেগুলোকে স্বচ্ছ এবং সুস্পষ্ট করা হয়েছে নতুন আইনে।

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা মর্যাদাশীল। অথচ তাদের বিরুদ্ধে যেভাবে লেখা হয়, তাতে তাদের মান-ইজ্জত থাকে না। কখনও সংসদ সদস্যদের প্রতিপক্ষ, কখনও দলেরই বিরোধী গোষ্ঠীর কেউ সাংবাদিকদের নানা তথ্য দিয়ে থাকে। তবে প্রতিবেদন নির্ভুল হলে সাংবাদিকদের কোনো শাস্তি হবে না বলে মনে করেন তিনি। সাংবাদিকদের উদ্দেশে মন্ত্রী বলেন, 'আপনারা লিখে যান, সঠিকভাবে লিখুন।' 

সিপিবি সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম সমকালকে বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের খসড়ায় যে ধারা দেখা গেছে, তা সংবিধান পরিপন্থী, গণবিরোধী। এ আইনের ৩২ ধারার মাধ্যমে সরকারি অফিসে সব ধরনের দুরাচার, দুর্নীতি এবং দুর্বৃত্তায়নকে উৎসাহিত করা হয়েছে। 

 
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ