ট্রাম্পের প্রস্তাবিত চার পিলারে পরিবারভিত্তিক ইমিগ্রেশন নিয়ে সারা আমেরিকায় উদ্বেগ উৎকন্ঠা

February 3, 2018, 11:20 PM, Hits: 1806

ট্রাম্পের প্রস্তাবিত চার পিলারে পরিবারভিত্তিক ইমিগ্রেশন নিয়ে সারা আমেরিকায় উদ্বেগ উৎকন্ঠা

হানিফ সিদ্দিকী , হ-বাংলা নিউজ,হলিউড থেকে: 

কানাঘুষা, তর্কবিতর্ক চলছিল ট্রাম্পের প্রথম স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণের বেশ কিছুদিন আগে থেকেই । আমেরিকার প্রথিতযশা সংবাদপত্রগুলোতে নানারকম রিপোর্ট বেরুচ্ছিল । কোনটিতে ছাপা হল ট্রাম্প ইমিগ্রেশন নীতিতে বরাবরের মতই কঠোর থাকবেন । কোনটিতে বলা হল, ডেমোক্র্যাটদেরকে আস্থায় নেবার জন্য সুর কিছুটা নরম করতেও পারেন ভাষণে । কিন্তু গত ৩০শে জানুয়ারি রাতে কংগ্রেসের উভয় চেম্বারের সম্মিলিত অধিবেশনে আমেরিকার রীতি অনুযায়ী প্রদত্ত স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণে ট্রাম্প প্রথম ধারণাকেই সত্যি প্রমাণ করলেন । তার স্বভাবের বাইরে বেরিয়ে এসে কোমল কন্ঠে গোটা ভাষণটা দিলেন বটে তবে ইমিগ্রেশনের প্রশ্ন যখন এলো তখন আশংকাকে সত্যি প্রমাণিত করে চারটি শর্ত দিলেন যেগুলো সংবাদ মাধ্যমের কল্যাণে জগৎজুডে সচেতন মানুষরা তাৎক্ষণিকভাবে জেনেছেন । কিন্তু চারটি শর্তের মধ্যে সর্বশেষটি নিয়ে দেশ জাতি নির্বিশেষে আমেরিকার ইমিগ্র্যান্ট কম্যুনিটিতে চলছে তুমুল আলোচনা এবং ক্রমাগত বাড়ছে আশংকা । সেই শর্তের সারমর্ম হল, বর্তমানে বিদ্যমান আমেরিকার পরিবারভিত্তিক অর্থাৎ চেইন ইমিগ্রেশন ব্যবস্থায় সময়ের প্রয়োজনে সংশোধন করে ইমিডিয়েট ফ্যামিলি অর্থাৎ শুধু স্বামী-স্ত্রী এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের আমেরিকার ইমিগ্রেশন দেয়া হবে । বন্ধ করে দেয়া হবে বাবা মা এবং প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের ইমিগ্রেশনের মাধ্যমে আমেরিকায় আনার সুবিধা ।

ট্রাম্পের ভাষণের পরপরই সারা আমেরিকার নিউজ চ্যানেলগুলোর খবরে, টক শোতে, লেইট নাইট শোতে তাঁর চারটি শর্ত নিয়ে তুমুল আলোচনা- সমালোচনা হল, পরদিন খ্যাতনামা সব জাতীয় দৈনিকে বিশেষ লেখা ছাপা হল । এর বিরুদ্ধাচারণকারীরা বললেন, আমেরিকা ইমিগ্র্যান্টদের দেশ । এদেশ নির্মিত হয়েছে ইমিগ্র্যান্টদের রক্ত, শ্রম ও ঘামে । মূল দেশে নিজেদের বৃহত্তর পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে লাখ লাখ পরিবার আমেরিকায় বাস করছে ভাগ্যচক্রে, জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে । কিন্তু মূল দেশে পড়ে থাকা প্রিয়জনদের জন্য তাদের মন সবসময় ব্যাকূল থাকে । চেইন মাইগ্রেশন আইনের আশীর্বাদে পাঁচ থেকে পনের বছরের ভেতরে সম্পর্ক ভেদে আপনজনদের আমেরিকায় আনা যায় । ফলে দীর্ঘ সময় লাগলেও এক পর্যায়ে গোটা বৃহত্তর পরিবার এই দেশে বসবাসের সুযোগ পায় । ফলে পারিবারিক বন্ধন বজায় থাকে । এই সুযোগ উঠে গেলে পরিবারগুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে নানা দেশে থেকে যাবার ফলে বৃহত্তর পরিবার বলে আর কিছু থাকবে না । এমনটি হলে এটা হবে অমানবিক । মানবিকতা আর ফ্রিডমের মোডল বলে নিজেকে জাহির করা আমেরিকার উচিত হবেনা এমনতর অমানবিক কিছু করা ।

আবার পক্ষালম্বনকারীরা বলছেন, এতদিনতো মানবিকতা দেখা হল । এবার সময় এসেছে বাস্তবতার নিরিখে আমেরিকার স্বার্থকে আগে প্রাধান্য দেয়া । ট্রাম্পের America First -এই নীতিকে সমর্থন দেয়া । তাদের মতে এত বছর ধরে আমেরিকার উদার অভিবাসন নীতির সুযোগ নিয়ে বাবা মার কোটায় লক্ষ লক্ষ বয়োবৃদ্ধরা এসে গেছেন যারা জীবনের পড়ন্ত বেলায় এই নতুন দেশের সংগে মানসিকভাবে মানিয়ে নিতে পারেন না । এদেশে কাজ করে খাবার মত কোন জব স্কীলও তাদের থাকে না । আবার বয়সের কারণে এবং ইংরেজী ভাষায় অদক্ষতার কারণে নতুন করে এদেশে স্কুলিং করে জব স্কীল অর্জন করতে পারে না । ফলে তাঁরা নিজ পরিবার ও স্টেটের কাছে বোঝা হয়ে পড়ে থাকে । কষ্ট করে অর্থ উপার্জন করা ট্যাক্সপেয়ারদের টাকায় তাদেরকে মেডিক্যাল, মেডিকেইড ইত্যাদিসহ যাবতীয় আইনগত নাগরিক সুবিধা দিতে হয় । ফলে লক্ষ লক্ষ নির্ভরশীল পেরেন্টদেরকে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সুবিধা দিতে গিয়ে সকল স্টেটগুলো তথা গোটা আমেরিকার অর্থনীতির ওপর চাপ পড়ে । আর প্রাপ্ত বয়স্ক সন্তানদের ব্যাপারে এসব বিরুদ্ধবাদীদের বক্তব্য হল , তারা প্রাপ্ত বয়স্ক , আত্মনির্ভরশীল , জোয়ান । তারা নিজেদের জন্মভূমিকে সেবা না দিয়ে আমেরিকায় আসবে কেন ?

ডাকা(Deferred Action for Childhood Arrival)প্রোগ্রামের অন্তর্ভূক্ত, আমেরিকায় স্ট্যাটাস সংকটে থাকা লক্ষ লক্ষ তরুণ তরুণীর (Dreamers) -র স্থায়ীভাবে বৈধতা প্রদানের শর্ত স্বরূপ এই চার পিলারকে তুরুপের তাস হিসেবে ডেমোক্র্যাটদের দিকে ঠেলে দিয়েছেন কুটিল ট্রাম্প । অবশ্য এমনটা করার জন্য নেপথ্য থেকে তাঁর ওপর অব্যাহত চাপ সৃষ্টি করে রেখেছে তাঁর দল রিপাবলিকান পার্টির কট্টর রক্ষণশীল সিনেটর ও কংগ্রেসম্যান এবং বর্ণবাদী White Supermacist-রা । তবে ডেমোক্র্যটিক পার্টির সিনেটর ও কংগ্রসম্যানদের সবাই ট্রাম্পের বিশেষ করে সর্বশেষ পিলারটির( চেইন মাইগ্রেশন বন্ধ করার) ঘোরতর বিরোধী । ট্রাম্প যখন তাঁর স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণে তাঁর প্রস্তাবিত চারটি পিলারের মধ্যে সর্বশেষে এই পিলারটির কথা উল্লখ করছিলেন তখন অধিবেশনে উপস্থিত ডেমোক্রেটিক দলের সকল আইন প্রণেতারা “দুয়ো” ধ্বণি দিচ্ছিলেন । ডেমোক্র্যাটদের সহায়তা ছাড়া সিনেট বা হাউজ অর্থাৎ কংগ্রেসের আপার বা লোয়ার কোন চেম্বারেই ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির পক্ষে এই সর্বশেষ শর্তটি পূরণ করা সম্ভব নয় । কারণ কংগ্রেসে তাদের পার্টির সুপার মেজরিটি নেই । আর সেখানেই আপাতত: স্বস্তি সেসব লিগ্যাল ইমিগ্র্যান্টদের জন্য, যারা বিগত দু এক বছরে বাবা মা বা প্রাপ্ত বয়স্ক সন্তানদের জন্য ইমিগ্রেশনে আবেদন করেছেন বা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন 

                

 
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ